২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

প্রিন্সিপাল আশরাফ ফারুকী : ভুলে না যাওয়া এক ব্যক্তিত্ব

-

জীবনে বহু মানুষের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ ঘটে। কিন্তু এমনও লোক আছেন যারা আমাদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেন। এমনই এক ব্যক্তিত্বের সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটেছিল, যার প্রভাব আমার জীবনে অনেকখানি। তিনি সম্প্রতি ইন্তেকাল করেছেন। তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আজো কমেনি। তিনি একজন শিক্ষক। কখনো আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন না। তার সাথে জীবনে দেখাও হয়েছিল মাত্র দু’বার এবং দুই সাক্ষাতের মাঝে ব্যবধান ছিল দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের।

আমাকে মনে রাখার কোনো কারণ ছিল না তার; কিন্তু তাকে কখনো ভুলিনি। না ভোলার কারণও ছিল। প্রথম সাক্ষাতে তার যে বক্তৃতাটি শুনেছিলাম, তাকে স্মরণ রাখার জন্য সেটিই যথেষ্ট। তাকে মনে পড়লেই ওই একটি বক্তৃতার কারণেই কবি কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতার কয়েকটি লাইন মাথায় ঘুরপাক খেত: ‘... শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার/ দিল্লীর পতি সে তো কোন্ ছার,/ ভয় করি না’ক, ধারি না’ক ধার, মনে আছে মোর বল,/ বাদশাহ্ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাব অনর্গল।/ যায় যাবে প্রাণ তাহে, / প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে।’

স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অনেক শিক্ষককে ছাড়িয়ে প্রিন্সিপাল আশরাফ ফারুকী আমার হৃদয়ের অনেকখানি জুড়ে ছিলেন। তিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতবাসীদের মধ্যে শামিল করুন।

১৯৬৯ সাল। তদানীন্তন পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন তখন তুঙ্গে। প্রশাসনের পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানে বিক্ষোভ দমিয়ে রাখা আর সম্ভব হচ্ছিল না। সরকারের গৃহীত একটি পদক্ষেপ তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। ঊনসত্তরের ২০ জানুয়ারি ঢাকায় এক মিছিলে গুলিবর্ষণে নিহত হন ছাত্রনেতা আসাদ। কয়েক দিন পরই নিহত হয় কিশোর ছাত্র মতিউর। ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার’ অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আটকাবস্থায় হত্যা করা হয়।

তিন দিন পর পুলিশের গুলিতে নিহত হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা। এ সময় আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের অধীনে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের পদত্যাগে বাধ্য করার আন্দোলনও চলছিল। অনেকেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেও কট্টর মুসলিম লীগার ‘মৌলিক গণতন্ত্রীরা’ পদত্যাগ করছিলেন না। এমনই একজন চেয়ারম্যান ছিলেন শেরপুরে। তার নাম এখন মনে নেই। বেশ কিছু ছাত্র তার বাড়িতে যায় তাকে পদত্যাগ করানোর জন্য।

কিন্তু তিনি তার ব্যক্তিগত বন্দুক দিয়ে গুলি চালান ছাত্রদের ওপর। গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় দারোগ আলী নামে আমাদের স্কুলের নবম শ্রেণীর এক ছাত্র। তার মৃতদেহ বয়ে আনা হয় শেরপুর শহরে। শান্ত শহরটি ফুঁসে ওঠে। যারা আন্দোলনের অংশ ছিলেন না, তারাও একজন কিশোরের নিহত হওয়া ঘটনায় হয়ে ওঠেন বিক্ষুব্ধ। গুলিবর্ষণকারী চেয়ারম্যানের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনে, এমনকি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যেকোনো গণ-আন্দোলনে শেরপুরের একমাত্র শহীদ এই কিশোর দারোগ আলী।

আমি তখন এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। চলমান আন্দোলন এবং বিশেষ করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার যে শুনানি চলছিল পত্রিকায় তার বিবরণী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তাম। যে দলেরই হোক, ঘরোয়া আলোচনা ও খোলা মাঠে আয়োজিত সমাবেশে হাজির হতাম নেতাদের বক্তব্য শোনার জন্য। ২৩ মার্চ ‘পাকিস্তান দিবস’। সেদিন শেরপুর টাউন হলে এক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের বেশ আগে থেকেই জোর প্রচার হচ্ছিল, কারা সেমিনারে বক্তব্য দেবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ছাড়াও দু’টি কলেজের প্রিন্সিপালও থাকবেন সমাবেশে। একজন খুলনার কোনো এক কলেজের, আরেকজন পার্শ্ববর্তী জামালপুর জেলার (তখন মহকুমা ছিল) সরিষাবাড়ী কলেজের প্রিন্সিপাল আশরাফ ফারুকী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মানে বড় শিক্ষক, এমন ধারণা থাকলেও ঠিক কত বড় সে সম্পর্কে জ্ঞান ছিল কমই। কিন্তু প্রিন্সিপাল কী, তা ভালোভাবে বুঝতাম। কয়েক বছর আগে ১৯৬৪ সালে শেরপুরে প্রথম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং কলেজের যাত্রা শুরু হয় আমাদের স্কুল থেকেই।

স্কুলের বিশাল জিমনেশিয়াম হলসহ বেশ কিছু বিল্ডিং কলেজের ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। প্রিন্সিপাল হিসেবে এসেছিলেন কিতাব আলী। বয়োবৃদ্ধ, প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। তিনি কলেজের সব শিক্ষকের প্রধান। আমরাও যেতে আসতে তাকে দেখলে অবনত মস্তকে তার সামনে দিয়ে অতিক্রম করতাম। আমাদের স্কুলের জাঁদরেল হেডমাস্টার রোহিনীকান্ত হোড়সহ সব শিক্ষক তাকে এবং কলেজের সব শিক্ষককে শ্রদ্ধা করতেন। এসব কারণে প্রিন্সিপাল বা অধ্যক্ষ কিতাব আলীর অবস্থানকে মনে হতো পর্বততুল্য এবং নিজেকে মনে হতো অনেক নিচে, অতি ক্ষুদ্র। এমন দু’জন প্রিন্সিপাল শেরপুরে আয়োজিত একটি সেমিনারে বক্তব্য দিতে আসছেন, তাদের দেখতে পাবো, এটিই ছিল আনন্দের বিষয়।

সেমিনার শুরু হওয়ার বেশ আগে থেকেই টাউন হলের সামনে উপস্থিত ছিলাম। ওই সময় কোনো স্থান থেকে শেরপুর আসা সহজ ছিল না। জানা গেল, ঢাকা থেকে যারা আসবেন তারা জামালপুর পর্যন্ত ট্রেনে আসবেন। শুকনো মওসুমে ব্রহ্মপুত্র নদ শীর্ণ হয়ে পড়ত। নৌকায় নদী পার হয়ে মূল রাস্তা পর্যন্ত ধু ধু বালি। অনভ্যস্ত কারো পক্ষে সেই বালিপথ পেরিয়ে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত আসা বেশ শ্রমসাধ্য ব্যাপার ছিল। এরপর সেকেলে বাসে শেরপুর পর্যন্ত দশ মাইল পথ অতিক্রম করতে আর সমস্যা হতো না। অতিথিরা যে এত কষ্ট করে সেমিনারে আসার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন, এখন তা ভাবলে অবাক লাগে।

যা হোক, আমন্ত্রিতদের মধ্যে সম্ভবত একজন আসতে পারেননি। আরো কয়েকজন কিশোরের সাথে এই আশায় গেটে দাঁড়িয়ে ছিলাম, যদি নিবিড়ভাবে দেখতে পারি, কারো সাথে হাত মেলাতে পারি। ভিড়ের মধ্যে একজনের সাথেই হাত মেলানো সম্ভব হয়েছিল। তিনি বয়সে তরুণ। মোটামুটি দীর্ঘদেহী, শীর্ণকায়। সুন্দর করে ছাঁটা দাড়ি। পরনে খয়েরি রঙের শেরোয়ানি, মাথায় কালো টুপি। তখনো তার নাম জানি না। হাত মেলাতে পেরেছি; আরেক হাতে তিনি গালে আদর করে দিয়েছেন, এতেই আমি প্রফুল্ল।

তারা টাউন হলের বিশ্রাম কক্ষে গেলেন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হলো তাদের বিশ্রামে ব্যাঘাত না ঘটাতে। কিন্তু আমরা কৌতূহলী কিশোর। উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিলাম। কখন তারা হলে আসবেন। আমাদের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তারা হলে এসে সামনের সারিতে বসলেন। আমরা হাততালি দিলাম। সেমিনারে কে সভাপতিত্ব করেছিলেন বা কে পরিচালনা করেছিলেন, এতদিন পর সেসব মনে নেই। পরিচালক অতিথিদের মঞ্চে আসন গ্রহণের আহ্বান জানালে তারা একে একে মঞ্চে উঠছিলেন।

দেখা গেল, যার সাথে হাত মেলানোর সুযোগ পেয়েছিলাম তিনি সরিষাবাড়ী কলেজের প্রিন্সিপাল। হল ভর্তি শ্রোতা। হলের বাইরের আঙ্গিনা এবং রাস্তায়ও মানুষের ভিড়। শেরপুরের মতো মফঃস্বল শহরে একসাথে এত গুণীজনের সমাবেশ লোকজন দেখেনি। তার ওপর, আন্দোলনের উত্তপ্ত অবস্থায় তারা কী বলেন তা শোনার জন্যও সব শ্রেণীর মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল। আমি এবং আমার বয়সীদের হলের একেবারে পেছন দিকে বসার সুযোগ হয়েছিল। আমি যার হাতের স্পর্শে ধন্য হয়েছি, তিনি আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন।

তার বক্তৃতার পালা এলে তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পটভূমি ব্যাখ্যা করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতির করণীয় সম্পর্কে দীর্ঘ বক্তব্য দিলেন। যেখানে হাততালি ও উল্লাসধ্বনি দেয়া প্রয়োজন, বড়দের অনুসরণ করে অনুরূপ হাততালি ও উল্লাসধ্বনিতে যোগ দিচ্ছিলাম। এত গোছানো বক্তব্য আমি যেহেতু আগে কখনো শুনিনি, অতএব তার কথাগুলো মনে গেঁথে গিয়েছিল। তাকে আপন মনে হয়েছিল, কারণ তিনি খুব দূরের মানুষ নন। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারেই। অনুষ্ঠান শেষ হয়েছিল বেশ রাতে। পাশেই বেঙ্গল রেস্টুরেন্ট। শেরপুরে ওই সময়ের সবচেয়ে ভালো রেস্টুরেন্ট। সেখানেই তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমি এবং আমার কয়েক বন্ধু তখনো অপেক্ষা করছি; আবার যদি হাত মেলাতে পারি। কিন্তু সে সুযোগ আর হয়নি। তাদেরকে বাসে তুলে দেয়া পর্যন্ত তাদের পেছন পেছনই ছিলাম।

অনেক ঘটনার মতো এ ঘটনাটিও আমার ভুলে যাওয়ার কথা। কিন্তু ভুলতে পারিনি। পরদিনই জেনারেল ইয়াহিয়া খান দেশে সামরিক আইন জারি করেন। আমি তা যথাসময়ে জানতে পারিনি। কারণ আমাদের কোনো রেডিও ছিল না। বাইরে বের হতে পারিনি। সেমিনার শেষ করে বাড়িতে এসে খেয়ে শুয়ে পড়ার পর শরীর কাঁপিয়ে জর এসেছিল। সকালে জ্বরের প্রকোপ ছিল আরো বেশি। বিকেল পর্যন্ত আমাকে কোথাও না দেখে বন্ধুরা দল বেঁধে বাড়িতে এসে আমাকে শয্যাশায়ী দেখল।

তাদের কাছেই জানতে পারলাম দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়েছে। শেরপুরেরও মিলিটারি এসে পৌঁছেছে, টহল দিচ্ছে। কেউ কোথাও জড়ো হতে পারছে না। আমি বেশ ক’দিন জ্বরে ভুগলাম। বন্ধুরাই এসে জানাল, এসএসসি পরীক্ষা পিছিয়ে গেছে। পরীক্ষা পেছানো মানতে কষ্ট হলো। পরীক্ষা হলেই কলেজে যেতে পারব। কলেজের ছাত্ররা স্কুলের ছাত্রদের মতো একগাদা বই নিয়ে ক্লাসে যায় না। একটি খাতা হাতে থাকে, পকেটে একটি কলম। এক ধরনের স্বাধীনতা।

শিগগিরই এসএসসি পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা করা হলো। পরীক্ষার পর ফলাফল দেয়া পর্যন্ত বেশ অবসর। যেকোনো বই পড়ার অভ্যাস ছিল। কোথা থেকে আমার হাতে এসে পৌঁছল ‘স্কুলে তারা মানুষ হোক’ নামে বেশ বড়সড় একটি বই। অনুবাদ করেছেন প্রিন্সিপাল আশরাফ ফারুকী। কোনো বই পেলে সেটির প্রিন্টার্স লাইন থেকে পড়া শুরু করি। ফ্রাঙ্কলিন বুক প্রোগ্রামস-এর বই। এর আগেও ফ্রাঙ্কলিন বুক প্রোগ্রামস-এর কিশোরোপযোগী কয়েকটি বই পড়েছি। ভালো লেগেছে।

ফ্রাঙ্কলিন বুক প্রোগ্রামস কী তা আমার জানার কথা নয়। আশপাশের কেউ জানবে বলেও মনে হয়নি। বইটির কয়েক পৃষ্ঠা পাঠ করেই বুঝলাম, এটি আমার মতো পাঠকের জন্য নয়। শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য। কিন্তু আমার পরিচিত এবং আমার হাতে যার স্পর্শ আছে, যিনি আমাকে আদর করেছেন, তার নাম শোভিত বইটি কঠিন হলেও আমাকে পড়তেই হবে। বেশ সময় নিয়েই বইটি পড়লাম। বোঝার জন্য মাঝে মধ্যে থামতে হলো। ভালো করে বোঝার জন্য দ্বিতীয় বার বইটি পড়লাম। কিছুটা বোধগম্য হলো।

যদি প্রিন্সিপাল আশরাফ ফারুকীকে একবার বলতে পারতাম, ‘স্যার, আপনার অনুবাদ করা বইটি আমি পড়েছি।’ মূল বইটি আমেরিকার প্রেক্ষাপটে লেখা হলেও স্যারের অনুবাদগুণে অনেকটাই বাংলাভাষীদের জন্যও উপযোগী। বইটি এখনো আমার সংগ্রহে আছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত আমার সংগৃহীত প্রায় ৫০০ বই শহরের বাড়ি থেকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেছি সাইকেলের ক্যারিয়ারে বেঁধে, বইভর্তি ব্যাগ হ্যান্ডেলের দু’পাশে ঝুলিয়ে। এ ছাড়া উপায় ছিল না।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ‘সংগ্রাম কমিটি’ শহর থেকে কাউকে পালিয়ে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। শহর থেকে বের হওয়ার প্রতিটি রাস্তায় পাহারা বসিয়েছিল। রিকশাযোগে বা গরুর গাড়িতে বই নিয়ে শহর ত্যাগ করার উপায় ছিল না। অতএব, মূল রাস্তা ছেড়ে আলপথ ধরে সাইকেল টেনে টেনে আমাকে এতগুলো বই গ্রামে ‘পাচার’ করতে হয়েছে। শহরের বাড়ি ছেড়ে আসার পর বাড়ি লুণ্ঠিত হয়েছে। বইগুলো সেখানে থাকলে লুটেরারা নিয়ে রদ্দি কাগজ হিসেবে বিক্রি করে দিত। দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় দেড় দশক পর অর্থাৎ ১৯৮৫ সালে বইগুলো গ্রামের বাড়ি থেকে সোজা ঢাকায় নিয়ে আসি। যখনই আমার বুকশেলফ খুলেছি, স্যারের বইটি চোখে পড়েছে। নেড়েচেড়ে দেখেছি, হয়তো কয়েক পৃষ্ঠা পড়েছি।

আশির দশকের শুরুর দিকে এক তরুণের সঙ্গে আমাদের অফিসেই দেখা হলো। সাংবাদিকতায় শিক্ষানবিস। কবিতা লেখে, গল্প লেখে। নাম মুজতাহিদ ফারুকী। বাড়ি সরিষাবাড়ী। ফারুকী নাম শুনে সাথে সাথে প্রিন্সিপাল আশরাফ ফারুকীর কথাই মনে পড়ল। তার কাছে জানতে চাইলাম, ‘প্রিন্সিপাল আশরাফ ফারুকী কী তোমার কিছু হন?’ ‘আমার আব্বা’, মুজতাহিদ উত্তর দিলো। কী কাকতালীয় ব্যাপার! বললাম, ‘হয়তো তোমার জন্মেরও আগে তোমার আব্বার সাথে আমার দেখা হয়েছে।’

মুজতাহিদের হয়তো বিশ্বাস হয় না। জানতে চায়, ‘কোন্ সালে?’ আমি বলি, ‘১৯৬৯ সালের মার্চ মাসের ২৩ তারিখ পাকিস্তান দিবসে।’ সে হাসে। উত্তর দেয়, ‘না, না, আমার জন্ম এর আগে হয়েছে।’ আমি রসিকতা করি, ‘হতে পারে, কিন্তু তুমি হয়তো কেবল ‘আব্বা’ ডাকতে শিখেছ, বাপকে ভালোভাবে চিনতে শিখোনি। কিন্তু আমি তো আমার ভালোমতো বোঝার বয়স থেকে উনাকে চিনি। উনার বইও পড়েছি। এখনো তার বই আমার কাছে আছে।’ মুজতাহিদের মাধ্যমে স্যারের সাথে নতুন করে যোগসূত্র স্থাপিত হয়। স্যার কেমন আছেন? এখন কী করছেন- জেনে নেই ওর কাছে। কখনো আমার সালাম জানাতে বলি।

দ্বিতীয় এবং শেষবার স্যারের সাথে সাক্ষাৎ ঘটেছিল সম্ভবত ১৯৯৬ সালে; প্রথম সাক্ষাতের ২৮ বছর পর। এক সন্ধ্যায় মুজতাহিদের সাথে তিনি দৈনিক সংগ্রাম অফিসে আসেন। দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর ধরে ওই অফিসে নিগৃহীত, অপাঙক্তেয়, পতিত অবস্থায় ছিলাম। পারতপক্ষে কারো সাথে কথা হতো না আমার। স্যারকে দেখে উৎসাহে এগিয়ে গেলাম। হাত বাড়িয়ে দিলাম। কৈশোরের জড়তা ছিল না। বললাম, ‘স্যার, আমাকে চেনার বা মনে থাকার কথা নয়। ১৯৬৯ এর ২৩ মার্চ শেরপুরে এক সেমিনারে গিয়েছিলেন। আমার বাড়ি শেরপুর। ওই সেমিনারে আপনার বক্তৃতা শুনেছি। এরপর আপনাকে আর ভুলিনি।’

তিনি স্মিত হাসেন। তার হাসির সাথে তার আরেক ছেলে কমিশনার অব ট্যাক্সেস ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকীর হাসির মিল আছে। মুতাসিমও আমার প্রিয়ভাজন। স্যারের সন্তানদের মধ্যে এ দু’জনের সাথেই আমার সখ্য রয়েছে। তার আরেক ছেলে জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের প্রিন্সিপাল মুজাহিদ বিল্লাহর সাথে ফেসবুকে পরিচয় হয়েছে। দু’একদিন চ্যাটিংও হয়েছে। তাকে রসিকতা করে লিখেছি, “আপনার বড় ভাই মুজতাহিদকে ‘তুমি’ করে বলি। কিন্তু এত নামী একটি কলেজের প্রিন্সিপালকে কী করে ‘তুমি’ সম্বোধন করি? আমাকে ‘তুমি’ বলার অনুমতি দেয়ার পরও আমি এখনো তা আমল করিনি।”

যা হোক, স্যার বলেন, ‘সেই কবেকার কথা, এখনো আপনার মনে আছে?’ আমি আপত্তি জানাই, “আমাকে ‘তুমি’ বলবেন।” স্যার আবার হাসেন। আমি অনেক কিছু জানতে চাই। কিন্তু তিনি মেপে কথা বলেন। হয়তো সব সময়ই বলতেন। সবশেষে বলি, ‘স্যার, একদিন বাসায় আসুন।’ মুজতাহিদকেও বলি, স্যারকে বাসায় নিয়ে আসতে, যাতে একবেলা একসাথে খেতে পারি। এসব ক্ষেত্রে যা হয়, ‘আচ্ছা দেখা যাক, আসব কখনো’ ইত্যাদি। আমার উচিত ছিল, পীড়াপীড়ি করে তাকে বাসায় নেয়া। একটি দিনের জন্য হলেও তো একজন মহান শিক্ষকের সেবা করতে পারতাম।


আরো সংবাদ