২৩ জুলাই ২০১৯

নির্বাসিত প্রবাদের প্রত্যাবর্তন

নির্বাসিত প্রবাদের প্রত্যাবর্তন - ছবি : সংগ্রহ

বাংলা সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্য হচ্ছে বচন-প্রবচন, প্রবাদ, লোককথা, ছড়া ইত্যাদি। এগুলোর উদ্ভব সামষ্টিক লোকজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যা জীবন ঘনিষ্ঠ, সমাজবাস্তবতার নির্যাস। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর যাপিত জীবনের একটি বুদ্ধিদীপ্ত রূপ। আবহমানকাল থেকে এগুলো আদৃত। সময়ের পরিক্রমায় অনেক প্রবাদ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। কিছুকাল পরে হয়তো ফের প্রাসঙ্গিক হয়ে ধরা দেয় আমাদের জীবনে।

‘বচন’ শব্দটি উচ্চারণের সাথে সাথে খনার নাম সামনে চলে আসে। মানে ‘খনার বচন’। আমাদের সমাজে বহুলালোচিত খনার দু-একটি বচন কেউ জানেন না, তা খুঁজে পাওয়া ভার। এক সময় গ্রামবাংলায় খনার বচন ছিল সবার মুখে মুখে। বিশেষ করে কৃষকসমাজে। শত শত বছর আগে একজন বাঙালি নারী একই সাথে প্রবাদ রচনায়, জ্যোতির্বিদ্যায়, গণিতে ও বিজ্ঞানে, বিশেষ করে কৃষি উন্নয়নে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার ক্ষেত্রে কিভাবে এতটা পারদর্শী ছিলেন; তা এখনো রহস্যময়। খনার বচন আজ আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির অবদানই নয়, বরং গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের অংশ। খনার কিছু কথা পল্লীবাসীর জীবনের নিত্যসঙ্গী। খনার অসংখ্য বচন যুগ যুগ ধরে গ্রামবাংলার জনজীবনের সাথে মিশে আছে। আনুমানিক ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে খনার জন্ম। অনেকে অবশ্য বলেন, খনার বচন রচিত হয়েছে চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে। কিংবদন্তি আছে, গণনা করে খনার দেয়া পূর্বাভাসে কৃষকেরা উপকৃত হতেন বলে রাজা বিক্রমাদিত্য খনাকে ‘দশম রত্ন’ হিসেবে আখ্যা দেন। খনার বচন মূলত কৃষিতত্ত্বভিত্তিক ছড়া। ‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ’- এমন বচনের সত্যতায় এখনো কৃষকেরা বিশ্বাস করেন। খনার কর্মের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তিনি জটিল তথ্য সার্থকভাবে সহজ কবিতা ও বচনের মাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ করেছেন।

নদীমাতৃক দেশ ভাটি বাংলা। এ অঞ্চলকে জালের মতো চার দিক থেকে ঘিরে রেখেছে নদী। আমাদের আর্থসামাজিক জীবন বির্নিমাণেও নদী মুখ্য। তাই তো আমাদের শিল্প-সাহিত্যের এক বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে আছে নদনদী। নদীর ওপর ভিত্তি করে জন্ম নিয়েছে অনেক প্রবাদ-প্রবচন আর লোককথা। বাংলাদেশ জলসম্পদে সমৃদ্ধ। সমগ্র দেশজুড়ে রয়েছে অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, দীঘি-পুকুর। দক্ষিণে বিস্তীর্ণ সমুদ্র। মৎস্য উৎপাদনের বিস্তৃত ক্ষেত্র আছে দেশের সর্বত্র। তাতে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির মাছ। এসব মাছ সুস্বাদু ও সহজপাচ্য। মাছ তাই বাঙালির অতিপ্রিয়। মাছ আর ভাত ছাড়া বাঙালির খাবার মনঃপূত হয় না; তৃপ্তি মেটে না। বাঙালির খাদ্যে আজো মাছ আর ভাতের প্রাধান্য। অতীতকাল থেকে মাছ এবং ভাতের ওপর বাঙালির নির্ভরতার কারণে এ দেশের মানুষের পরিচয় ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’।

চিরাচরিত প্রবাদটি অতীতের কল্পকথা হয়ে গিয়েছিল এত দিন। প্রতিবেশী দেশ ভারত উজানে বড় বড় নদীতে বাঁধ দিলে বাংলাদেশের মানুষের কপাল পোড়ে। মিঠাপানির মাছের আকাল দেখা দেয়। নদনদী আর জলাশয়ে পানিসঙ্কট দেখা দেয়ায়, এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। মানে পানির অভাবে মাছেরা হয়ে যায় গুম। এ জন্য ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি গা ঢাকা দিয়েছিল। উজানে বাঁধ দেয়া ছাড়াও ক্রমাগত দূষণ ও দখলে দেশের নদী-খাল-বিল থেকে মাছ হারিয়ে এমন এক অবস্থা হয়ে উঠেছিল, যার আর উল্টোযাত্রা সম্ভব বলে কেউ মনে করতেন না। কিন্তু গত এক যুগে সাধারণ মানুষের পাতে ফিরে আসতে শুরু করেছে মাছ। আর সেই মাছ মিঠা বা স্বাদুপানির। বলা চলে, নির্বাসন থেকে ফিরে এসেছে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’র চিরায়ত প্রবাদটি। গত শতকের শেষ দিকে মাছের আকাল পড়ায় একটি কথা চালু করার চেষ্টা করা হয়, ডাল-ভাতে বাঙালি। ডাল ‘গরিবের গোশত’ হিসেবে কৃষিবিজ্ঞানে পরিচিত।

কিভাবে দেশে ফের মাছের সুদিন ফিরে এলো? এমন প্রশ্নের উত্তরে অনায়াসে বলা যায়, দেশের বিজ্ঞানীদের গবেষণায় নতুন নতুন প্রজাতির মাছ চাষে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। এ উপমহাদেশে ৩৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে পুকুর ও হ্রদের মতো বদ্ধ জলাশয়ে মাছ চাষের প্রচলন। অবিভক্ত বাংলায় পুকুরে মৎস্য চাষের (১৯৩২-১৯৪৭) প্রথম সফল উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৬৭ সালে কার্প মাছে কৃত্রিম প্রজনন শুরুর পর এ দেশে মৎস্য চাষ ও মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের গতি বেড়ে যায়। বিশ শতকের সত্তরের দশকের শেষে খাঁচায় বাণিজ্যিক মৎস্য চাষ চালু হয়। আশির দশকের গোড়ায় ঝিনাইদহের বাহাদুরপুর বাঁওড়, নবগঙ্গা নদী এবং ঢাকা মহানগরের গুলশান ও ধানমন্ডি লেকে পরীক্ষামূলকভাবে খাঁচায় মাছ চাষ শুরু হয়। এতে কার্প, রুই, কালবাউশ, কাতলা, মৃগেল ও চীনা কার্প মাছের মিশ্র চাষ ফলপ্রসূ হয়েছে।

দেশের বাজারে মাছের সরবরাহ ক্রমাগত বাড়ছে বটে, কিন্তু এই মাছ আসছে কোথা থেকে? সহজ উত্তর- বেশির ভাগ আসে চাষের মাছ থেকে। শুধু পুকুর বা বদ্ধ জলাশয় থেকে আসে মোট উৎপাদিত মাছের ৫৫ দশমিক ১৫ শতাংশ। আর নদী বা খালবিলের মতো উন্মুক্ত জলাধার থেকে আসে ২৮ শতাংশ মাছ। দেশের দক্ষিণে বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকূল থাকলেও সেখান থেকে বাজারে আসে মাত্র ১৭ শতাংশ মাছ। ফলে স্বাধীনতার এত বছর পর মাত্র বছর দুয়েক আগে প্রথম বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে প্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।

মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকা ইলিশের। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তিন লাখ ৯৪ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় চার লাখ ৯৬ হাজার টন। মৎস্য অধিদফতরের হিসাবে, ওই অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশ ছিল ইলিশ।

গত কয়েক দশকে দেশে চাষ করা মাছে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে। কৈ, শিং, মাগুর, পাবদা এবং আরো বিভিন্ন প্রজাতির দেশী মাছ হারিয়ে যেতে বসেছিল। গবেষণার মাধ্যমে এ জাতের মাছ এখন চাষ হচ্ছে। চাষ করা মাছ থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে।
১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে দেশে মাছের মোট উৎপাদন হয়েছিল ৭ দশমিক ৫৪ লাখ টন। ৩৩ বছরের ব্যবধানে ২০১৬-১৭ সালে এ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৩৪ লাখ টন। অর্থাৎ, এ সময়ের ব্যবধানে মোট মৎস্য উৎপাদন বেড়েছে সাড়ে পাঁচগুণ। ১৯৯০ সালে দেশে মোট চাষকৃত মাছ উৎপাদিত হয়েছিল এক লাখ ৯৩ হাজার টন। ২০০০ সালে তা বেড়ে হলো ছয় লাখ ৫৭ হাজার টন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ দশমিক ৫০ লাখ টন। উৎপাদন হয়েছে ৪১ দশমিক ৩৪ লাখ টন।

২০১৭ সালে দেশে ৪১ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। দেশের নদনদীতে মাছের বিচরণ ক্রমাগত কমছে বটে, কিন্তু পুকুর-জলাশয়ে এর চাষ বাড়ছে। ২০১০ সালে সারা দেশে পুকুরে মাছ উৎপাদিত হয়েছে ১৬ লাখ টন। মৎস্য অধিদফতরের হিসাবে, দেশে বর্তমানে মোট তিন লাখ ৭১ হাজার ৩০৯ হেক্টর আয়তনের পুকুর রয়েছে। দেশের মাছের প্রধান আশ্রয়স্থল নদী ও জলাশয়গুলো দূষণমুক্ত করতে পারলে এবং সামুদ্রিক সম্পদের সঠিক আহরণ যদি সম্ভব হয়, তাহলে মাছের উৎপাদন আরো বাড়বে।

জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বিশ্বের মৎস্য সম্পদের ওপর একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন ২০১৬ সালের ৭ জুলাই প্রকাশ করেছে। তাতে বাঙালির খাদ্যতালিকায় মাছের উপস্থিতি বাড়ার চিত্র ফুটে ওঠে। ‘দ্য স্টেট অব ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৬’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মাথাপিছু বাৎসরিক মাছ খাওয়ার চেয়ে তিনগুণ বেশি মাছ খাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশীরা মাথাপিছু যে পরিমাণে মাছ খায়, তা এখন বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশের লোকজনের মাছ খাওয়ার গড় পরিমাণের প্রায় সমান।

২০১২ সালের আগেও বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ ছিল বছরে ১৪ কেজি। ২০১৬ সালে বাংলাদেশের মানুষ প্রতি বছর ১৯ কেজি করে মাছ খেয়েছে। এরপর তিন বছরে নিশ্চয়ই এটা আরো বেড়েছে। এফএও’র হিসাবে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অধিবাসীরা বছরে সাড়ে তিন থেকে সাড়ে সাত কেজি মাছ খায়। বাংলাদেশের মানুষ এখন বিশ্বের মাছ খাওয়ার গড় মানের কাছাকাছি চলে এসেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাথাপিছু মাছের ভোগ ১৮ দশমিক ৮ কেজি আর বিশ্বের মাথাপিছু ভোগ ২০ কেজি। বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর মাথাপিছু মাছের ভোগ ২৬ দশমিক ৮ কেজি। ওই মৎস্যবিজ্ঞানীরা রুই, কৈ, পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়ার উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন বলেই মাছের উৎপাদন বাড়ছে। এটি দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা অর্জনের পথেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।

মাৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, দেশের মানুষের প্রোটিনের যে চাহিদা, তার ৬০ শতাংশ এখন পূরণ করা হচ্ছে মাছ থেকে। ১০ বছর আগেও এটি ছিল ৩০-৪০ শতাংশ। পুকুরে চাষ করা পাঙ্গাশ, কৈ ও তেলাপিয়া নিয়ে অনেকে নাক সিটকায়। কিন্তু আমাদের দরিদ্র মানুষের একটি বড় অংশ এই কম দামি মাছ খেয়ে পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে থাকে। ফলে এ মাছ যাতে নিরাপদভাবে চাষ করা যায়, সে লক্ষ্যে কাজ করা উচিত।
ওপরের চমকপ্রদ সব তথ্যের পর বলা চলে, একটি ‘ফেরারি ও গুম হয়ে যাওয়া’ প্রবাদ আমাদের জীবনে ফের প্রাসঙ্গিক হয়ে ফিরে আসায় সবার জন্য এটি স্বস্তির। গুম হয়ে যাওয়া কোনো ব্যক্তি ফিরে এলে পরিবারের সবার মধ্যে যে খুশির বন্যা বয়ে যায়, তেমন আর কী।
[email protected]


আরো সংবাদ