১৯ মে ২০১৯

রাজনীতি ও জোট রাজনীতি নিয়ে কিছু কথা-১

রাজনীতি ও জোট রাজনীতি নিয়ে কিছু কথা-১ - ছবি : নয়া দিগন্ত

গত সপ্তাহের কলামটি ছিল পবিত্র রমজান উপলক্ষে। সাধারণভাবে সব বয়সের পাঠকের জন্য হলেও প্রত্যক্ষভাবে তরুণদের উদ্দেশেই কলামটি লিখেছিলাম। গত সপ্তাহের কলামটি পড়ার পর পাঠক যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তা ব্যতিক্রমী। আমার পক্ষ থেকে আপনারা অভিনন্দন গ্রহণ করুন। পুনরায় সিয়াম মোবারক, তারাবি মোবারক, সালাতুল কিয়ামুল লাইল মোবারক জ্ঞাপন করছি; পাঠকের প্রতি জানাচ্ছি শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহ যেন আমাদের রমজানের কল্যাণ পাওয়ার সুযোগ দেন, সেই প্রার্থনা থাকল। গত সপ্তাহের কলামেই পাঠকদের উদ্দেশে বলে রেখেছিলাম, আজ ১৫ মে কলামটি নিখাদ রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর হবে।

বিগত চার সপ্তাহের রাজনৈতিক অঙ্গন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক কিছুই ঘটে গেল বিগত তিন-চার সপ্তাহে। এর কয়েকটি দেই। এক. এরশাদ সাহেবের সম্পদের কী হবে বা কে কী পাবে বা কে কী জিনিস ভোগ করবে ইত্যাদি নিয়ে পরিচিত মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। তার অপারগতায় বা অবর্তমানে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্বের নিষ্পত্তি হয় তো হয় না, এ রকমই একটি অবস্থা চলছে। দুই. প্রায় ২০ বছর আগের চারদলীয় জোটের শরিক হিসেবে যাত্রা শুরু করা, বর্তমানে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর নাম বারবার মিডিয়ায় উঠে আসছিল অতীতের কারণগুলো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বা অপ্রত্যাশিত কারণে। তাদেরই দলের কয়েকজন সাবেক ব্যক্তি নতুনভাবে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেছেন; এটা নিয়ে পরিচিত মহলে বা মিডিয়ায় আলোচনা হয়েছে যথেষ্ট। তিন. বিএনপির যে কয়জন ‘নির্বাচিত’ ব্যক্তি সংসদে গিয়ে শপথ নিলেন, তাদের ওই কর্মের আলোচনা-সমালোচনা যেমন হয়েছে বা হচ্ছে, তেমনি সংসদ গমনের প্রক্রিয়ায় প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্যভাবে জড়িতদের প্রসঙ্গেও আগ্রহ-কৌতূহল-আলোচনা-সমালোচনা থেমে নেই। চার. ২ মে থেকে দু-তিন দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচনার মধ্যমণি ছিল লন্ডনে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রীর একটি (সম্ভাব্য) ফোনালাপ-কেন্দ্রিক অডিও-ভিডিও। মে মাসের ২, ৩, ৪ তারিখের কথা; এক দিকে প্রকৃতির ‘ফণী’ ঘূর্ণিঝড় মানুষকে উদ্বিগ্ন করেছে। অপর দিকে, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘চাপা ঘূর্ণিঝড়’ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু প্রকাশ্যে এটা নিয়ে মাতামাতি হয়নি, কারণ আইসিটি অ্যাক্টের মামলায় পড়ার ভয়। পাঁচ. ফণী মহাঘূর্ণিঝড়টি প্রলয়ঙ্করী রূপ নিয়ে পূর্বভারত ও বাংলাদেশের ভূখণ্ডের দিকে এগিয়ে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আসতে আসতে তার তীব্রতা কমে যায়। ফলে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। ছয়. সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ঘটনা হচ্ছে, ২০ দলের একটি বিষয়।

জোটের একজন সহকর্মীর প্রস্থান
২০ বছর আগের চারদলীয় জোটের আমল থেকে বিএনপির সাথে জোটে থাকা এবং সাত বছর ধরে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বিজেপি, ৯-১০ দিন আগে ২০ দলীয় জোট থেকে বের হয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে ওই পার্টির প্রেস রিলিজ অনুসরণ করেই আমরা কিছু কারণ পাই। এ ছাড়াও বিজেপির চেয়ারম্যান, সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ নিজেও টেলিভিশনের টকশোতে গিয়ে প্রত্যক্ষভাবে অনেকগুলো বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এগুলো আলোচনা করা যেতে পারে। এ কলামটি লেখা শেষ করে নয়া দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদকীয় দফতরে ই-মেইল মারফত প্রেরণ করেছি সোমবার ১২ মে অপরাহ্ণ ৪টা ৫ মিনিটে। অতএব, ১৩ মে বিকেলে ২০ দলীয় জোটের মিটিংয়ের কোনো কিছুই অগ্রিম লিখতে পারলাম না। এ প্রসঙ্গে আগামী সপ্তাহে ২২ মে যে কলামটি লিখব, সেখানে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। আজকের কলামে, প্রাকৃতিক ফণীর অথবা রাজনৈতিক ফণীর তীব্রতা কমে যাওয়া আলোচনার বিষয় নয়। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টিকারী প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য (ইংরেজি পরিভাষায় : কুড বি) বক্তব্য নিয়েও আলোচনা করছি না। এখানে যেসব উদাহরণ দিলাম, প্রত্যেকটি নিয়েই কিছু না কিছু বক্তব্য উপস্থাপন করা যায় এবং করা প্রয়োজন। এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে, সব কিছু নিয়ে বলা ঠিক নয়। এ দুই সত্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কলাম লেখার কাজটি কৌশল, সাহস ও প্রজ্ঞার দাবি রাখে। এরূপ কৌশল, সাহস ও প্রজ্ঞা যথেষ্ট আমার নেই বলেই অনুভব করি। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, যেন আমার অন্তরে ও মস্তিষ্কে কৌশল, সাহস ও প্রজ্ঞা বৃদ্ধি করে দেন।

সীমাবদ্ধতা ও স্পর্শকাতরতা
এটাও উল্লেখযোগ্য যে, একাধিক কারণেই রাজনীতি নিয়ে কোনো কলাম লেখা কঠিন, কষ্টকর এবং অতি সাবধানতামূলক কাজ। রাজনীতি নিয়ে লেখা কলামগুলো স্পর্শকাতর। এ সবকিছুর কারণ আছে। কলাম লেখক হিসেবে আমার নৈতিক দায়িত্ব, পাঠকের কাছে নির্মোহ বা বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য বা বিশ্লেষণ বা মতামত উপস্থাপন করা। কিন্তুপাঠক যে কলামটি পড়ছেন, এর লেখক ব্যক্তি ইবরাহিমের পরিচয় তো শুধু কলাম লেখক নয়; পরিচয় একাধিক, যথা- সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা; বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের একজন সৈনিক তথা খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা; বাংলাদেশের টেলিভিশন জগতে একজন সুপরিচিত আলোচক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অথবা একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে। কলামলেখক বা টেলিভিশন আলোচকের পরিচয়কে অবশ্যই ব্রাকেটবন্দী করা হয় যুগপৎ ধর্মীয় মূল্যবোধের অনুসারী ও প্রচারক, মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম চেতনার ধারক ও প্রচারক এবং জাতীয়তাবাদী ঘরানার বলিষ্ঠ সমর্থক ও প্রচারক হিসেবে। অবশ্যই আরো পরিচয় আছে, যথা- বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি নামে একটি নিবন্ধিত উদীয়মান, প্রসারমান রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের একটি শরিক দলের প্রধান। তা ছাড়া, তিনি হাটহাজারী উপজেলার তথা চট্টগ্রাম জেলার অধিবাসী; তিনি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ নামক বিখ্যাত বিদ্যাপীঠের সাবেক কৃতী ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন ছাত্র ইত্যাদি। প্রায় অপ্রকাশিত পরিচয় হলো, তিনি সামরিক জগতে বিশ্ববিখ্যাত, ইংল্যান্ডে অবস্থিত, ‘দ্য রয়েল স্টাফ কলেজ’ নামের প্রতিষ্ঠানের গ্র্যাজুয়েট এবং সামরিক জগতে বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় অবস্থিত, ‘ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি ওয়ার কলেজ’ নামে প্রতিষ্ঠানের গ্র্যাজুয়েট। কিছুটা প্রকাশিত, কিছুটা অপ্রকাশিত অন্যান্য পরিচয়ের মধ্যে আছে- তিনি সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজ নামে একটি গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান তথা থিঙ্কট্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক ছিলেন চার বছর; ইনস্টিটিউট অব হজরত মুহাম্মদ সা: নামে একটি গবেষণা প্রচার প্রতিষ্ঠান তথা থিঙ্কট্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন আড়াই বছর। তিনি অনেকগুলো বই লিখেছেন, যার মধ্যে অন্তত তিনটি যেমন পাঠকপ্রিয়, তেমনি প্রয়োজনীয়। অর্থাৎ চতুর্দিকেই কলাম লেখক সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের পরিচিত মুখে ভরা; কেউ সরব শুভাকাক্সক্ষী, কেউ নীরব শুভাকাক্সক্ষী; কেউ প্রশংসামুখর সমালোচক, কেউ স্পষ্টভাষী সমালোচক অথবা কেউ ইশারায় সমালোচক; কেউ ঈর্ষাকাতর, কেউ সহযোগিতা করতে আগ্রহী, কেউ সহযোগিতা নিতে আগ্রহী, কেউ বা দূরে থাকতে আগ্রহী। এরূপ পরিস্থিতিতে, উন্মুক্ত একটি কলামে রাজনৈতিক আলোচনা বা সমালোচনা করা কঠিন কাজ, না করাও বিপজ্জনক। সেজন্য রাজনৈতিক সমালোচনা না বলে বলতে চাই ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষণ’। সমালোচনা শব্দটির সাথে যমজ ভাইয়ের মতো যে শব্দটি যুক্ত, তা হলো- আত্মসমালোচনা। একটু আগেই বললাম সমালোচনা করা কঠিন ও স্পর্শকাতর। এখন বলছি, সমালোচনার তুলনায় প্রকাশ্যে আত্মসমালোচনা করা অধিক কঠিন, অধিক স্পর্শকাতর, অধিক বিপজ্জনক। অতএব, প্রকাশ্য আত্মসমালোচনা করে লেখালেখি পরিহার করাই শ্রেয়। তারপরও গত সাতটি বছরে অনেক করেছি; গত তিনটি বছরেও বিশেষভাবে করেছি এবং গত চার মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে করেছি; এই নয়া দিগন্ত পত্রিকার পৃষ্ঠাতেই। আত্মসমালোচনা নামে শব্দটির দু’টি ভাগ আছে, যথা- আত্ম এবং সমালোচনা। প্রকাশ্য আত্মসমালোচনার ক্ষেত্রে আত্ম বলতে যত না আমার নিজেকে তথা ব্যক্তি ইবরাহিমকে বুঝায়, তার থেকে বেশি বুঝায় ওই রাজনৈতিক বলয়কে, আমি নিজে যেটার অংশ, অর্থাৎ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণাকারী ধর্মীয় মূল্যবোধের ঘরানা বা বলয়। এইটুকু সূচনা বক্তব্য বা কৈফিয়ত দিয়েই নাতিদীর্ঘ আলোচনা শুরু করছি। কলামের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগের বেশি এই সূচনা বক্তব্য বা কৈফিয়তেই চলে গেল।

সমালোচনা করা ও গ্রহণ করার সীমা আছে
বিগত সংসদ নির্বাচনের অশ্রুতপূর্ব অনিয়ম এবং রাজনৈতিক সরকারের আগ্রাসী অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ অনেকেই দিয়েছেন, আমিও দিয়েছি। টেলিভিশনের টকশোতে অনেকেই বলেছেন, আমিও বলেছি। কিন্তু আজো লিখে দিচ্ছি; আর হয়তো লিখতে হবে না বা লিখতে পারব না অথবা বলতে পারব না। লিখলেও বা বললেও সেটার ভাষা কী হবে তা এখনো চিন্তা করিনি। কারণ, যা ঘটেছিল তা হচ্ছে ক্রিয়া বা কর্ম; ক্রিয়ার পরিণতিতে সৃষ্টি হয় বিশেষ্য বা নাম বা ফলাফল। ক্রিয়া ছিল নির্বাচনী প্রক্রিয়া বা নির্বাচন অনুষ্ঠান করার প্রক্রিয়া, বিশেষ্য বা ফলাফল হয়েছে কথিত নির্বাচিত পার্লামেন্ট। যখন পার্লামেন্টকে বৈধ বলব, তখন আমি যদি ক্রিয়াকে অবৈধ বলি, তাহলে বিষয়টি স্ববিরোধী হয় এবং অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। অবৈধ প্রক্রিয়ায় বৈধ ফলাফল হয় না। কোনো ছাত্র যদি পরীক্ষার হলে নকল করে এবং নকল করার কর্মটি যদি ধরা পড়ে যায়, তাহলে ওই ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কার যদি কেউ করতে না পারে, বহিষ্কার করার দায়িত্ব যাদের সেটা, তাদেরই ব্যর্থতা। এই উদাহরণটিকে পার্লামেন্ট নির্বাচনের সাথে মিলিয়ে নেয়ার অনুরোধ করছি। যা হোক, বলছিলাম বর্ণনার কথা। এরূপ বিশ্লেষণ বা সমালোচনা করতে করতে ক্লান্তি এসে যায়। কারণ- হয় আমার এই বিশ্লেষণগুলো দুর্বল, যার কারণে কেউ এর উপকার নিতে চায় না, অথবা যিনি উপকার নিতে পারতেন; তিনি নিজেই এত দুর্বল যে, উপকার গ্রহণ করার সক্ষমতা নেই। সে জন্যই এরূপ বর্ণনা তথা সমালোচনা তথা বিশ্লেষণ আর বেশি করতে চাই না।

বিগত নির্বাচনের অপ্রিয় চেহারা
৩০ ডিসেম্বরের জন্য ধার্য করা পার্লামেন্ট নির্বাচনের কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে গিয়েছিল ২৯ ডিসেম্বর দিনের শেষে, রাত সাড়ে ৭টা, ৮টার দিকে। শক্তিশালী প্রশাসনিক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর খণ্ড খণ্ড দলগুলো বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে যায়। কোনোটিতে সাড়ে ৭টায়, কোনোটিতে ৮টায় গেছেন, এভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে গেছে এবং ভোর রাতে তথা সাহরির সময় পর্যন্ত যায়। তাদের কাজে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের জন্য নির্ধারিত, সরকার দলীয় এবং পেশিশক্তিতে বলীয়ান কিছু ব্যক্তি। সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের স্থানীয় বিএনপি ও প্রার্থীর কর্মী ও সমর্থকরা প্রতিবাদ করে, বাধা দিতে চেষ্টা করেছে। কোনো জায়গায় প্রতিবাদ ও বাধা অল্পক্ষণ টেকে, কোনো জায়গায় একটু বেশি সময় টেকে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে কোনো জায়গায় টিকতে পারেনি। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সরকারের হুকুমে, নির্বাচন কমিশনের যোগসাজশে এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনস্থ ব্যক্তিদের সচেতন সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই কাজ হয়েছে। এ ধরনের কাজ যে হবে, সেটি ২০ দলীয় জোটের কোনো কোনো প্রার্থী নির্বাচনের ১০-১৫ দিন আগে অনুভব করেছেন, কোনো প্রার্থী পাঁচ-সাত দিন আগে অনুভব করেছেন, কোনো প্রার্থী দু-তিন দিন আগে অনুভব করেছেন, কোনো প্রার্থী মাত্র একদিন আগে অনুভব করেছেন।

একজন প্রার্থী ঘটনার ক’দিন আগে বিষয়টি অনুভব করলেন, এর দিকে খেয়াল রেখেই ওই প্রার্থী নিজের নির্বাচনী আচরণ স্থির করেছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে ২০ দলীয় জোট বা বিএনপি কী অনুভব করেছিল বা আদৌ অনুভব করেছিল কি না, সেটি এখনো প্রকাশ্যে আলোচিত হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনের দিন বেলা ২টা পর্যন্ত, নির্বাচনী মাঠেই ছিলাম, নির্বাচনী এলাকাতেই ছিলাম। ৩০ ডিসেম্বর অপরাহ্ণ ২টা ৫৫ মিনিটে ফেসবুকে লাইভ গিয়ে আমি নির্বাচন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেই এবং ঠিক ১০ মিনিট পর দু’টি টেলিভিশন ক্যামেরাকে সাক্ষী রেখে একই ঘোষণা রিপিট করি। একই দিন অপরাহ্ণ ৪টা ১৫ মিনিটে ফেসবুকে লাইভ গিয়ে ইংরেজি ভাষায় নাতিদীর্ঘ বক্তব্য উপস্থাপন করেছি। ওই লাইভে, নির্বাচন নিয়ে সার্বিক অভিজ্ঞতা এবং প্রত্যাহারের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করি। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ পরে, ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপির আহ্বানে আমার নির্বাচনী অভিজ্ঞতা এবং আমার নালিশ বা সমালোচনাগুলো ইংরেজি ভাষায় লিখিত আকারে এবং ইংরেজি ভাষায় প্রদত্ত বক্তব্য সিডিতে সন্নিবেশ করে, বিএনপির কাছে দাখিল করেছি। ৩০ তারিখ অপরাহ্ণে ইংরেজিতে বলেছিলাম, সম্ভাব্য বিদেশীদের বোঝার সুবিধার্থে। ৩০ ডিসেম্বর অপরাহ্ণ ৪টা ১৫ মিনিটে ফেসবুকে যে বক্তব্য লাইভ উপস্থাপন করেছিলাম, তা এখনো ইন্টারনেটে আছে; গত ১২ মে অপরাহ্ণ ৩টা ৩০ মিনিটে এই কলাম লেখার সময় একবার যাচাই করেছিলাম, তখন ৩১ হাজার ব্যক্তি ভিডিওটি দেখেছেন এবং ৭৫০ জন এটি শেয়ার করছেন বলে জানতে পারি। এখনো দেখতে পারেন, শুধু ইংরেজিতে আমার নামটি (ঝুবফ গঁযধসসধফ ওনৎধযরস) টাইপ করলেই ফেসবুকে আমার টাইমলাইন পাবেন এবং সেখানে পেছনের দিকে যেতে যেতে ৩০ ডিসেম্বর তারিখে গেলে, বক্তব্যটি পাবেন। এ নির্বাচনের দিন অপরাহ্ণ ৪টার আগেই, যথাসম্ভব আমিসহ মোট ৫৫ জন ২০ দলীয় জোট প্রার্থী, নির্বাচন বর্জন করেছিলেন।

রাজনীতির শেষ কথা এবং সিএমএলএ
‘রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই’ বলেই একটি কথা প্রচলিত আছে। কিন্তু আমাদের দল বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি বিশ্বাস করে, রাজনীতিতেও শেষ কথা বলে কিছু থাকা প্রয়োজন। কয়েক দশক আগে, ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি প্রসঙ্গে একটি কথা প্রচলিত ছিল। ওই আমলের রাষ্ট্রপতি, রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ছিলেন চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, সংক্ষিপ্ত ইংরেজি সিএমএলএ। সমালোচকেরা তথা ‘দুষ্টু’ লোকেরা তার নামে বলতেন, সি মানে ক্যানসেল, এম মানে মাই, এল মানে লাস্ট এবং এ মানে অ্যানাউন্সমেন্ট, অর্থাৎ আমার শেষ ঘোষণাটি বাতিল করো।

বর্তমান শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকেও সেই সাবেক রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে এই বলে যে, খুব অতি ঘন ঘন সিদ্ধান্ত বদলান। প্রসঙ্গত, সেই সাবেক রাষ্ট্রপতি বর্তমানে অসুস্থ, আমরা তার সুস্থ হায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। তার ৯ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিক নিপীড়িন বা রাজনীতির মাঠে অনৈতিক কাজ হয়েছে এটা যেমন সবাই মনে রেখেছেন; তেমনই বাস্তব হলো- তিনি অনেক ইতিবাচক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের মিডিয়া ও রাজনৈতিক মহল, এ প্রসঙ্গে খুব কমই আলোচনা করে থাকে; আমি ওইসব ইতিবাচক কাজের তালিকা এখানে উপস্থাপন করতে না পারলেও ইতিবাচক কর্মগুলোর কাণ্ডারিকে সম্মানের সাথে স্মরণ করছি। ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহের জন্য নির্ধারিত সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে বা ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে-পরে; অথবা জাতীয় পার্টির শীর্ষতম নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন ইত্যাদি নিয়ে যা কিছু ঘটনা, সেগুলো বিশ্লেষণ করলেই আমার কথার মর্ম বোঝা যাবে; এগুলো আমার কথা নয়, এগুলো দেশবাসীর কথা, মিডিয়ার কথা। সাবেক সেই রাষ্ট্রপতির কর্মকাণ্ডের একটি বৈশিষ্ট্য যদি হয় ঘন ঘন সিদ্ধান্ত বদলানো এবং সেটি যদি সমাজে সমালোচনাযোগ্য হয়ে থাকে, তাহলে চার বা পাঁচ বা সাতজনের পার্লামেন্টে যাওয়ার ঘটনা কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকবে? সমালোচনা হতেই পারে। সমালোচনার অধিকারকে প্রশ্ন করা যাবে না, বরং আলোচনা করা যেত বা আলোচনা করা যায় যে, সমালোচনাকে মিনিমাম রাখার উপায়গুলো কী কী অথবা ইংরেজি পরিভাষায়, ড্যামেজ কন্ট্রোলের পন্থা কী কী? নিশ্চিতভাবে অনুভব করি, যত সহজে বা যত অবলীলায় আমি কথাগুলো কলামে লিখছি, অত সহজে বা অবলীলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বিএনপির নেতৃত্বের পক্ষে সম্ভব ছিল না। সরকারি রাজনৈতিক ও বিবিধ চাপ, লোভ ও প্রলোভন, নিজেদের সীমাবদ্ধতা, একক নেতৃত্বের অনুপস্থিতি- এসব কিছু মিলিয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাকে কঠিন করেছিল। বিএনপির মতো বিশাল দলের কোটি কোটি নিপীড়িত, নির্যাতিত নেতাকর্মীর অনুভূতির সাথে আমি একাত্ম। কিন্তু সেই অনুভূতি যথাযথ মাধ্যমে (অর্থাৎ থ্রু প্রপার চ্যানেল) সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছায় কিনা এটি আলোচনার বিষয়; অথবা ওইরকম সক্রিয় নির্ভরযোগ্য প্রপার চ্যানেল আছে কি না এটিও আলোচনার বিষয়। না থাকলে তা সৃষ্টি করতে হবে।

কেন জোটে আছি, কেন থাকব?
২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক দল হচ্ছে বিএনপি। দীর্ঘ দিনের জোটগত বন্ধুপ্রতিম দলের ব্যস্ত সময়ে, ঝঞ্ঝার সময়ে কোন সমস্যা উপস্থাপন করা উচিত বা কোন সমস্যা উপস্থাপন করা উচিত নয়, এটি নির্ধারণের জন্য বিবেক ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রয়োজন। বিএনপি নিজের পুনর্গঠনে ব্যস্ত। অতএব, ২০ দলীয় জোটের পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা বা প্রত্যাশা করার উপযুক্ত সময় এটা নয়। এ বাস্তবতা আমি মেনে নিই। আমাদের দল বা আমাদের মতো ছোট দলগুলো একা একা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক ক্ষুদ্র বিন্দুমাত্র। তাই বিন্দুগুলো একত্রিত থাকাই উত্তম। আবার প্রধান শরিক, পরিবারের বড় ভাই সুস্থ থাকলে, সাবলীল থাকলে, সচ্ছল থাকলে, সচল থাকলে পুরো পরিবারের লাভ। এ সূত্রে এবং এ যুক্তিতেই আমরা জোটবদ্ধ রাজনীতিতে বিশ্বাসী। দু’টি প্রবাদবাক্য উদ্ধৃত করছি। এক. দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। দুই. ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকণা বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল। উভয় প্রবাদবাক্যের মর্ম কিন্তু একতা; কোনোমতেই একনায়কত্ব নয়, কোনোমতেই ‘একলা চলো’ নীতি নয়। বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের ক্ষমতার বহুমুখী আগ্রাসী আচরণ প্রতিরোধে ঐক্য বা একতাই একমাত্র রাস্তা। একতা মানে অবশ্যই কিঞ্চিত ত্যাগ স্বীকারও বটে। একতার শক্তি আসে স্বচ্ছতা থেকে, ত্যাগ স্বীকার করা থেকে।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com.bd


আরো সংবাদ