১৪ অক্টোবর ২০১৯

জ্ঞান-বুদ্ধি-অর্থ এবং ক্ষমতার বদহজম!

জ্ঞান-বুদ্ধি-অর্থ এবং ক্ষমতার বদহজম! - ছবি : নয়া দিগন্ত

বাংলা ভাষা এবং বাঙালির জীবনে বদহজম খুবই সুপরিচিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে জনপ্রিয় শব্দও বটে। বাঙালির স্বভাব ও বদহজমের বৈশিষ্ট্য একে অপরের সাথে আম-দুধের মতো মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। ফলে কোনো বাঙালির শরীর বদহজমজনিত অজীর্ণতা থেকে একেবারে মুক্ত এমন বদনাম কোনো রায় বাহাদুর অথবা খান বাহাদুর উপাধিধারী ডাক্তার-কবিরাজ অথব্য পীর-ফকির-বৈদ্য মহোদয়গণ দিতে পারবেন না। বাঙালির শরীর ছাড়াও তাদের মন-মানসিকতা এবং মস্তিষ্কেরও প্রায়ই বদহজমের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কখনো আবার এজাতীয় পঞ্চইন্দ্রিয়ের কার্যক্রমে অজীর্ণতার প্রভাবে বাহারি বিপত্তি ঘটতে থাকে। লোভ-লালসা-ক্ষুধাজনিত অতি ভোজন, শরীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব এবং মশা-মাছি-তেলাপোকা প্রভৃতি পতঙ্গ সৃষ্ট দূষিতকরণের কারণে বদহজম হওয়া ছাড়াও বাঙালির স্বভাব চরিত্রের কারণেও বদহজমের বিপত্তি ঘটে থাকে।

বদহজমের কারণে প্রকৃতি ও পরিবেশে কী কী বিপত্তি ঘটে, তার বিশদ বিবরণ দিতে গেলে রীতিমতো মহাভারত রচনা করা যাবে। কাজেই আজকের আলোচনায় আমরা সেদিকে না গিয়ে বরং শিরোনাম নিয়ে কার্যক্রম শুরু করি। জ্ঞান-বুদ্ধি-অর্থ এবং ক্ষমতা হলো আল্লাহর দেয়া সর্বোত্তম নেয়ামতগুলোর মধ্যে প্রধানতম, যা কেবল মানুষকেই দেয়া হয়। কোনো বন্যপশু, কীটপতঙ্গ অথবা জিন-পরী-দৈত্যদানব কিংবা শয়তানকে মানুষের মতো জ্ঞান-বুদ্ধি, অর্থ ও ক্ষমতা অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা দেয়া হয় না। কাজেই আল্লাহপ্রদত্ত এ চারটি নেয়ামতের উত্তম কার্যকারণের জন্য মনুষ্য চরিত্রেও কতগুলো উত্তম গুণাবলি থাকা দরকার। মানুষের মধ্যে যদি পর্যাপ্ত গুণাগুণের সমাবেশ না ঘটে এবং সেসব গুণ যদি অনুসরণ ও বাস্তবায়নের জন্য চারিত্রিক দৃঢ়তা না থাকে তবে জ্ঞান-বুদ্ধি-অর্থ এবং ক্ষমতার বদহজম শুরু হয়ে যায়। চরিত্রহীন ও লম্পটের হাতে যদি অর্থ ও ক্ষমতা চলে আসে, তবে তা এমনভাবে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে যার সাথে কোনো বর্জ্যজাত দুর্গন্ধের তুলনা চলে না। এসব কারণে বিদ্যাহীন বুদ্ধিমান অথবা বুদ্ধিহীন বিদ্বান কিংবা চরিত্রহীন বিদ্যাবুদ্ধির মানুষ নিকৃষ্টতায় শয়তান-পশু ও পতঙ্গকে অতিক্রম করে যায়।

জ্ঞান-বুদ্ধি-অর্থ এবং ক্ষমতার মধ্যে জ্ঞানার্জন হলো সবচেয়ে শ্রমসাধ্য এবং জ্ঞানকে সংরক্ষণ করা সত্যিকার অর্থেই কঠিন ও দুঃসাধ্য বিষয়। অন্য দিকে, অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা মানবচরিত্রের সর্বোচ্চ স্তর। ফলে আমাদের সমাজে সঙ্গত কারণেই জ্ঞানীর সংখ্যা যেমন কম, তেমনি জ্ঞানভিত্তিক জীবন যাপন করা লোকের সংখ্যা আরো কম। জ্ঞানীদের মতো না হলেও বুদ্ধিমান লোকের সংখ্যাও কিন্তু খুব বেশি নয়। বুদ্ধি হলো মানুষের একটি মৌলিক গুণ, যা জন্মগতভাবে মানুষ বিধাতার কাছ থেকে পায়। জ্ঞান ছাড়া বুদ্ধির কোনো গুরুত্ব নেই। আবার বুদ্ধি ছাড়া কোনো জ্ঞানই পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। এ কারণে জ্ঞান ও বুদ্ধিকে সাধারণত একে-অপরের পরিপূরক বলা হয়ে থাকে। বুদ্ধি যেমন জ্ঞানকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে, তেমনি বুদ্ধির যদি বদহজম হয় তবে বুদ্ধিমান মানুষ জ্ঞানগরিমা থেকে দূরে থেকে নিজেকে জমিনের জন্য ভয়ঙ্কর বানিয়ে ফেলে। একইভাবে কম বুদ্ধির লোক যদি দৈবক্রমে অধিক জ্ঞানার্জন করে ফেলে, তবে সেই জ্ঞান সংশ্লিষ্ট লোকের মন-মস্তিষ্কে বদহজমের প্রতিক্রিয়া ঘটাতে থাকে।

জ্ঞান-বুদ্ধির মতো অর্থ এবং ক্ষমতাও একে অপরের পরিপূরক। অর্থ ও ক্ষমতার মধ্যে সাধারণত অর্থ উপার্জনের জন্য যে পরিমাণ শ্রম ও জ্ঞান-বুদ্ধি দরকার পড়ে সে তুলনায় ক্ষমতা লাভের জন্য এত কিছু লাগে না। মানুষের রাষ্ট্রক্ষমতা লাভ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বংশগত কারণ, দলীয় বা গোত্রীয় কারণে হয়ে থাকে। কেউ কেউ আবার কোনো দৈবাৎ দুর্ঘটনা, ঘটনা অথবা পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে হঠাৎ করে ক্ষমতা লাভ করে ফেলেন। ফলে বেশির ভাগ মানুষের ক্ষমতা লাভের সাথে বিদ্যা-বুদ্ধি এবং অর্থজাত প্রভাব থাকে না। তবে ক্ষমতা পরিচালনার জন্য বিদ্যা-বুদ্ধি-অর্থ অতীব জরুরি, অত্যাবশ্যক উপকরণ এবং সেগুলো যদি ক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবেই ক্ষমতার মারাত্মক বদহজম শুরু হয়ে যায়। উত্তরাধিকার নীতির কারণে পাগল-শিশু অথবা বিকলাঙ্গ যেমন অনায়াসে ক্ষমতার সিংহাসনে বসতে পারে, তেমনি সেই উত্তরাধিকার নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অযোগ্য ক্ষমতাধরদের ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সর্বগুণে গুণান্বিত মহামানুষের নেতৃত্ব দরকার পড়ে। ক্ষমতাচক্রের একটি নীতিকথা হলো- কোনো অযোগ্য নেতা কখনো অনুরূপ অযোগ্যকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে না। তবে আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে- ইতিহাসে এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে যখন একজন অযোগ্য অথবা নিকৃষ্টতম নেতা দিয়ে যোগ্য এবং উৎকৃষ্টতম নেতার পতন হয়েছে।

জ্ঞান-বুদ্ধি-অর্থ এবং ক্ষমতার বদহজমের কার্যকারণ এবং সেই বদহজম থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় সম্পর্কে আলোচনার আগে আমাদের সমাজের কিছু বাস্তব চিত্র তুলে ধরা আবশ্যক। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় অর্থকড়ি এবং টাকা-পয়সাকে সব কিছুর নিয়ামক বলে প্রচার করা হচ্ছে। যারা অর্থকে দ্বিতীয় খোদা অথবা টাকা-পয়সাকে সব সুখ-শান্তি, মান-মর্যাদা পাওয়া বা বেঁচে থাকার একক বলে প্রচার করেন, তারা সবাই অর্থজাত বদহজমের শিকার। অর্থের স্বাভাবিক নিয়ম হলো- এটি মানুষের হাতে এলে মানুষ হালকা অনুভব করে। অর্থের কারণে মানুষের মনে ক্ষণস্থায়ী পুলক সৃষ্টি হয়, যা কালক্রমে দাম্ভিকতায় রূপ নেয়। অর্থ যদি বিনা পরিশ্রমে অথবা অনায়াসে এবং স্বল্পপরিশ্রমে অর্জিত হয় তবে মানুষ বিলাসী, রাগচণ্ডাল ও জেদি হয়ে পড়ে। বিত্ত-বিলাসের কবলে পড়ে এই শ্রেণীর মানুষের বুদ্ধিনাশ ঘটে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চরিত্রহানি হয়ে থাকে। এই শ্রেণীর বিত্তবানেরা এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অনিরাপত্তাজনিত মনোরোগের শিকার হয়ে রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রক্ষমতার পদলেহন করার জন্য উঠেপড়ে লাগে।

বিত্ত যদি অসৎ পথে ব্যক্তির হস্তগত হয় তবে সংশ্লিষ্ট বিত্তবানের মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা হয়ে পড়ে। এর অর্থ, সারাক্ষণ জাহান্নামের আগুন জ্বলতে থাকে এবং তার আচার-আচরণের নোংরা পশু-পাখির কদর্যতা ফুটে ওঠে। অসৎ বিত্তের মালিকেরা যেকোনো জীবাণুযুক্ত কীটপতঙ্গ ও রোগবাহী ভাইরাসের চেয়েও মারাত্মক। এরা এক ধরনের ছোঁয়াচে রোগের মতো নিজেদের কুকর্ম কু-অভিলাষ এবং কু-অভ্যাসগুলো অত্যন্ত নির্লজ্জ ও বেহায়াপনার মাধ্যমে সমাজ-রাষ্ট্র-প্রতিবেশ ও পরিবেশে বিস্তার ঘটায়। অন্য দিকে, এরা আপন পরিবার ও ক্ষমতার বলয়ে নিজেদের মন্দ চরিত্রের রীতিমতো প্রজনন ঘটাতে থাকে। প্রতিটি অসৎ অর্থের মালিকই ভয়ঙ্কর মানসিক রোগী এবং এক ধরনের আত্মঘাতী অপরাধী হিসেবে সমাজ-সংসারে ক্রমাগত অশান্তি সৃষ্টি করে থাকে। এদের বিবেকবোধ রহিত হয়ে যায় এবং দিনকে দিন নিষ্ঠুরতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে এক সময় রাক্ষস রূপ ধারণ করে। তারা অর্থ ছাড়া অন্য কোনো কিছু কল্পনা করতে পারে না এবং অর্থের জন্য নিজের স্ত্রী-মা ও কন্যাদের যেমন ধর্ষকদের হাতে নির্দ্বিধায় তুলে দিতে পারে, তেমনি পুত্র-সন্তান-পিতা ও ভাইদের জীবন তার মতো নরপিশাচদের কাছে বন্ধক রাখতে পারে।

রাষ্ট্রে যদি সুশাসন ও ন্যায়বিচারের অভাব ঘটে তবে জাতীয় অর্থনীতি বেসামাল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রশক্তি যখন চোরদের অধীনে চলে যায়, তখন পরিশ্রমী শ্রমিকের ঘাম, মেধাবী ও সৎ ব্যবসায়ীর পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। পুরো অর্থব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে পড়ে। ফলে সুযোগসন্ধানী, অর্থনীতির চোর-ডাকাত-বদমাশ-লুটেরা ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, শিল্পকারখানা ইত্যাদি সব কিছু করায়ত্ত করে নেয়। একটি দুর্ভিক্ষ, একটি গৃহযুদ্ধ, বিপুল সংখ্যক লোকের প্রাণহানি এবং বাস্তুচ্যুতি ছাড়া এ রকম পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না।

অর্থবিত্তের বদহজমের পর আমরা এবার জ্ঞান-বুদ্ধির বদহজম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। জ্ঞান-বুদ্ধির বদহজমে আক্রান্ত লোকেরা প্রথমত মুনাফেক প্রকৃতির হয়। তারা সর্বংসহা মিনমিনে স্বভাবের হয়ে থাকে এবং পেশা হিসেবে চাটুকারিতা ও দালালিকে ভারি পছন্দ করে। এই শ্রেণীর লোকেরা জিনা-ব্যভিচারে পটু হয়ে থাকে এবং কুটনামির মাধ্যমে সমাজ সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করতে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করে। তারা সাধারণত পরগাছার মতো নিজের উপকারী বন্ধুবান্ধব, পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে আপন স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের সর্বনাশ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এ ধরনের লোকেরা নিজেদের স্বার্থের জন্য সব কিছু করতে পারে। যেহেতু এরা জ্ঞান-বুদ্ধি নামের দুর্লভ গুণাবলিসম্পন্ন, সেহেতু তারা খুব সহজে পরিবেশ পরিস্থিতি আন্দাজ করতে পারে এবং আপন স্বার্থমতো ক্ষমতার কাছে নিজেদের উপাদেয় ও অপরিহার্য বলে তুলে ধরতে পারে।

বুদ্ধির বদহজম হলে সামাজিক, পারিবারিক শান্তি ও সংহতি নষ্ট হয়। এই রোগাক্রান্ত বুদ্ধিমানেরা সব সময় প্রগতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং মনগড়া কাহিনী, আজব কুসংস্কার দিয়ে সমাজকে কলুষিত করে। অর্থলিপ্সা বা ক্ষমতা লিপ্সার চেয়ে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করাকেই তারা বেশি প্রাধান্য দেয়। তাদের মধ্যে একাংশ রয়েছে, যারা সব সময় অন্যের ত্রুটি খুঁজে বেড়ায় এবং নিজের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য নাস্তিকতাকে ফ্যাশন হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অদ্ভুত পোশাক পরে এবং ব্যতিক্রমী কথাবার্তা বলে নিজেদের পাণ্ডিত্য প্রকাশের চেষ্টা এবং লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণের পাঁয়তারা করে। তারা সাধারণত কম হাসিঠাট্টা করে এবং চলনে-বলনে কৃত্রিম গাম্ভীর্যতা ফুটিয়ে তুলে নিজেদের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করে। বুদ্ধির বদহজমে আক্রান্ত লোকদের একাংশ অবশ্য ভণ্ডামিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। তারা সাধু-সন্ন্যাসীর বেশ ধরে এবং বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ ও কোমল হৃদয়ের মানুষকে টার্গেট করে নিজেদের আর্থিক ও পাশবিক লালসা চরিতার্থ করে। ভারতের সাম্প্রতিককালের রাম-রহিম নামের ভণ্ড গুরু এই শ্রেণীর লোকদের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

পাণ্ডিত্যের বদহজম হলে তার প্রতিক্রিয়া অর্থ ও বুদ্ধির বদহজমের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে থাকে। কারণ দুশ্চরিত্র পণ্ডিত সব সময় রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিবর্গ, আর্থিক জগতের সফলতম মানুষ অথবা সামাজিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় সাধারণ বুদ্ধির লোকজনকে টার্গেট করে কুকর্ম শুরু করে। বুদ্ধি বা অর্থবিত্তের বদহজম দিয়ে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর প্রতিক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কিন্তু বদ পণ্ডিতের সৃষ্ট সমস্যার কারণে কোনো কোনো জাতিকে শত শত বছর দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এই শ্রেণীর লোকেরা নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধি-ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা এবং পছন্দ-অপছন্দ দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রধানতম ব্যক্তিকে মাদকাসক্তের মতো মোহগ্রস্ত বানিয়ে ফেলে। ফলে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা ওই ধরনের দুর্জন পণ্ডিতের সাহচর্য ছাড়া এক মিনিটও চলতে পারেন না। ইতিহাসে এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে যখন কোনো রাজা-বাদশাহ কিংবা আমির-ওমরাহ অথবা সেনাপতিরা দুর্জন পণ্ডিতের কবলে পড়ে স্ত্রীকে ত্যাগ করেছেন অথবা প্রাণপ্রিয় পুত্র কিংবা মান্যবর পিতাকে হত্যা করেছেন। এসব কারণে দুনিয়ার সর্বত্র দুর্জন বিদ্বানকে পরিহার করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

দুর্জন পণ্ডিতদের কারণে গত শতাব্দীতে পৃথিবীকে দু-দু’টি বিশ্বযুদ্ধ মোকাবেলা করতে হয়েছে। পাক-ভারতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিভক্তি ও সীমানা সমস্যাও যেমন পাণ্ডিত্যের বদহজমের ফল, তদ্রূপ বঙ্গভঙ্গ রদ, লাহোর প্রস্তাবের শেষ সময়ে সংশোধন এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্নের ব্যর্থতা এবং তৎকালীন পূর্ববঙ্গকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার মাস্টারপ্ল্যানও দুষ্ট ও দুর্জন বিদ্বানদের পরিকল্পিত কুকর্ম। এমনকি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির করুণ অবস্থা, গণতন্ত্রের কবরযাত্রা এবং অনিশ্চিত ও অস্থির জাতীয় জনজীবনের নেপথ্যেও দুষ্ট বিদ্বানদের কারসাজি রয়েছে।

আমরা আজকের আলোচনার শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। এ পর্যায়ে ক্ষমতার বদহজম নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা শেষে উপসংহারে গিয়ে নিবন্ধের ইতি টানব। সাধারণত দুর্বল চরিত্রের মেধাহীন মানুষ যখন রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী হয়, তখন সেখানের ক্ষমতাকেন্দ্রিক বদহজম শুরু হয়। ক্ষমতার বদহজমের প্রথম উপসর্গ শুরু হয় ক্ষমতাবান মানুষের কান থেকে। অর্থাৎ এই শ্রেণীর শাসকেরা কানকথায় প্রভাবিত হন সবচেয়ে বেশি। তাদের দ্বিতীয় মুদ্রাদোষ হলো- তাদের জিহ্বা-ঠোঁট, স্বরযন্ত্র এবং অঙ্গভঙ্গির অশ্লীলতা, কর্কশতা এবং আচার-আচরণের ভারসাম্যহীনতা। বদহজমে আক্রান্ত ক্ষমতাবান পুরুষেরা প্রায়ই নারীর মতো আচরণ করেন। অন্য দিকে, নারীরা পুরুষের মতো দাপট দেখানোর অপচেষ্টা করেন। তাদের পোশাক-আশাক, খাদ্য, আহার-নিদ্রা এবং কথাবার্তার মধ্যে কোনো ধারাবাহিকতা থাকে না এবং প্রায়ই তারা চমক সৃষ্টির জন্য অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা করে বেড়ান।

বদহজমের শিকার ক্ষমতাবানদের অজীর্ণতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাদের সঙ্গী-সাথীদের যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা, চরিত্রহীনতা ও মনুষ্যত্বের নিকৃষ্টতার সর্বনিম্ন স্তরের ধরন-ধারণের ওপর। তারা বহু যত্ন করে সর্বনিকৃষ্ট দুর্জন পণ্ডিত, ধড়িবাজ ও অসৎ বুদ্ধিমান, ডাকাত প্রকৃতির বিত্তবান এবং তেলবাজ ও অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী জোগাড় করে এবং এসব লোক দিয়ে নিজেদের চার পাশে দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরি করে। তারা নিজেদের তৈরি দেয়ালের অভ্যন্তরে ভোগবিলাস, বিত্তবৈভব এবং অশ্লীল কুকর্মের বালাখানা পরিচালনা করে এবং দেয়ালের বাইরে হাহাকার, আর্তনাদ, জুলুম-অত্যাচার, খুনখারাবি, ধর্ষণ-লুটতরাজ, জোর-জবরদস্তি, চুরি-ডাকাতি ইত্যাদির মহোৎসব ঘটিয়ে নিজেদের বালাখানার জন্য সুর-তাল-লয় পয়দা করতে থাকে। এই শ্রেণীর ক্ষমতাবানদের আরো একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো- এরা সব সময় মানুষকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ লাভ করে এবং প্রতিপক্ষকে অপমান এবং সঙ্গী-সাথীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে গর্ব অনুভব করে। ক্ষমতাধরেরা যদি বদহজমের শিকার হয় তবে জমিনে যে মহাবিপর্যয় নেমে আসে, তা সামাল দেয়ার মতো পরিস্থিতি তখন নিরস্ত্র ও সাধারণ মানুষের হাতে থাকে না।
জ্ঞান-বুদ্ধি-অর্থ এবং ক্ষমতার বদহজম পরিহার করা কোনো সহজসাধ্য বিষয় নয়। বদহজমের কারণ, পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর এই রোগের নিরাময় নির্ভর করে।

এতদসংক্রান্ত বদহজমের রোগীর কর্ম যদি অন্যায় দিয়ে শুরু হয় তবে একমাত্র মৃত্যু বা ধ্বংস ছাড়া রোগী তার রোগ থেকে রক্ষা পেতে পারে না। অন্য দিকে, চরিত্রবান বুদ্ধিমান, বিবেকবান জ্ঞানী সৎ ব্যবসায়ী, নিষ্ঠাবান কর্মচারী ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ কেবল তখনই বদহজম থেকে রক্ষা পেতে পারেন, যখন তিনি সত্যিকার অর্থে খোদাভীরু হন এবং তার অর্জিত জ্ঞান-বুদ্ধি অথবা অর্থবিত্ত, ক্ষমতাকে আল্লাহপ্রদত্ত নেয়ামত মনে করে বিনয়ী হওয়ার অবিরত চেষ্টা চালান। এ ছাড়া কঠোর পরিশ্রম, কাজকর্মের ধারাবাহিকতা রক্ষা, ওয়াদার বরখেলাপ না করা, সব মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং হৃদয়কে কৃতজ্ঞতা দিয়ে পরিপূর্ণ করতে না পারলে বদহজমের ভাইরাস থেকে শরীর-মন-মস্তিষ্ককে রক্ষা করা যায় না। চারিত্রিক দৃঢ়তা, স্থির ও অবিচল থাকার ইচ্ছাশক্তি এবং পরোপকার করার দুর্দান্ত আকাক্সক্ষা জ্ঞানী-গুণী-বুদ্ধিমান এবং ধনী ও ক্ষমতাবানদের শরীর-মন ও মস্তিষ্কে বদহজমের অ্যান্টিবায়োটিক, সেফগার্ড অথবা সার্কিট ব্রেকার হিসেবে কাজ করে থাকে।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য


আরো সংবাদ