২৫ আগস্ট ২০১৯

ইসলামে ঈদ ও উৎসবের নীতিমালা

ঈদ ইসলামের দু’টি প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। ঈদের শুরু কিভাবে হয়েছিল, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দু’টি ঈদের সূচনা হলো এভাবেÑ যখন রাসূলুল্লাহ সা: মদিনায় গেলেন তখন তিনি দেখলেন, মদিনাবাসী দুটি অনুষ্ঠান পালন করে। সেই দুটি অনুষ্ঠান বদলে দিয়ে তিনি বছরে দু’টি ঈদের ব্যবস্থা করলেন।

এর একটি হলো, সফলভাবে রোজা শেষ করার আনন্দ। আরেকটি হচ্ছে হজের অনুষ্ঠান যাতে বিশ্ব-মুসলিম শরিক হচ্ছে মক্কায়, তার পাশাপাশি সারা বিশ্বের মুসলিমদের যুগপৎভাবে ঈদ পালন। অর্থাৎ মক্কায় হজ হচ্ছে এবং সারা দুনিয়ায় ঈদ উৎসব উদযাপন হচ্ছে। এর সাথে ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হজরত ইবরাহিম আ:কে তাঁর ছেলেকে কোরবানি করতে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা যে মহাপরীক্ষা করেছিলেন, সেই পরীক্ষায় তাঁর যে বিজয়, সেটিকে সামনে রেখে এই ঈদের ও হজের অনুষ্ঠান চালু করা হলো।

এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে, রাসূলুল্লাহ সা: ওই দু’টি অনুষ্ঠান বদলে দিলেন কেন? আগের অনুষ্ঠানগুলোর ভিত্তি ছিল পারস্যের অনুকরণে। পারস্য তৎকালীন অন্যতম বৃহৎশক্তি ছিল। তাদের জাতির মধ্যে ওই অনুষ্ঠানগুলো প্রচলিত ছিল। এসব অনুষ্ঠান মূলত ছিল কিছুটা প্রকৃতিভিত্তিক। সেই কারণে রাসূলুল্লাহ সা: এসব অনুষ্ঠান তেমন পছন্দ করেননি। অনুষ্ঠানগুলোতে প্রকৃতিকে বেশি সম্মান দেখানো হচ্ছিল। সে জন্যই তিনি এ পরিবর্তন আনলেন। এর থেকে আমাদের মনে রাখতে হবে, মুসলিমদের যে অনুষ্ঠানমালা হবে তাতে এ মূলনীতির প্রতি আমাদের খেয়াল রাখা উচিত।

ইসলাম আনন্দ-উৎসবকে অস্বীকার করে না। যেমন- রাসূলুল্লাহ সা: সেসব অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে নতুন কোনো অনুষ্ঠান চালু না-ও করতে পারতেন; কিন্তু তিনি তা না করে তাদের ওই দু’টি অনুষ্ঠানের পরিবর্তে বিকল্প দু’টি নতুন অনুষ্ঠান দিয়েছেন। এ থেকে আরেকটি নীতি পাওয়া যায়। তা হলো- মানুষের যে সত্যিকার প্রয়োজন, সে প্রয়োজনকে উপলব্ধি করতে হবে। স্বীকার করতে হবে, মানতে হবে। সেটি করতে গিয়ে যদি দেখা যায়, প্রচলিত পদ্ধতিগুলো ভালো নয়, তাহলে তার বিকল্প দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ সা:-এর এই কার্জ থেকে প্রমাণ হয় যে, মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন পূরণ করতে হবে। প্রয়োজন হলে তার বিকল্পও দিতে হবে। এ বিষয়ও আমাদের চিন্তা করতে হবে।

মানুষের মধ্যে আনন্দের যে প্রয়োজন রয়েছে, তা রাসূল সা: স্বীকার করেছিলেন। স্বীকার করেই তিনি এ দু’টি অনুষ্ঠান দেন এবং তার নাম রেখেছেন ‘ঈদ’ তথা আনন্দ, উৎসব। তিনি এর অন্য নাম রাখতে পারতেন। অথচ তিনি ‘ঈদ’ নাম রাখলেন কেন? একে আনন্দ-উৎসবের সাথে সম্পর্কিত করলেন কেন? এটা আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। এটা প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ সা: নিজে বৈরাগ্যবাদী ছিলেন না। বৈরাগ্যবাদ তিনি কোনো দিন সমর্থন করেননি। সুস্থ স্বাভাবিক জীবনকে তিনি পছন্দ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সা:-এর বিখ্যাত হাদিস হচ্ছে, ‘ইসলামে কোনো বৈরাগ্যবাদ নেই।’ এ ছাড়াও কুরআন মাজিদে বৈরাগ্যবাদকে নিন্দা করা হয়েছে। কুরআন মাজিদের বিভিন্ন জায়গায় বলা হয়েছে, ইসলামে বৈরাগ্যবাদ গ্রহণযোগ্য নয় এবং ইসলাম বৈরাগ্যবাদের ধর্ম নয়। বৈরাগ্যবাদ কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন নয়।

আমাদের আনন্দ-অনুষ্ঠানের ভিত্তি হতে হবে, আল্লাহকে স্মরণ করা। সেটি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সালাত দিয়ে শুরু করার মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে। অন্যান্য অনুষ্ঠান শুরু করতে হবে আল্লাহর স্মরণে। তাই যেকোনো সুন্দর অনুষ্ঠান যদি আমরা করি, তার শুরু হওয়া উচিত আল্লাহ তায়ালাকে মনে করার মধ্য দিয়ে। এ বৈশিষ্ট্য আরো প্রমাণ করে, রাসূলুল্লাহ সা: যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন তাতে কুসংস্কারের কোনো স্থান নেই। এর মধ্যে কোনো অপসংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অবকাশ নেই। সেখানে সব কিছুই সুন্দর। আসলে সব কিছুই সুন্দর হতে হবে।

আজকাল টিভি চ্যানেলগুলোর ওপর অনেকে নির্ভর করছেন। ঘরের অনেকেই চ্যানেলগুলো দেখে সময় ব্যয় করছেন। নারীরা তা করছেন বেশি। যদি সেসব অনুষ্ঠান আরো ভালো হতো, শালীন হতো, সুস্থ ও কল্যাণকর হতো, তাহলে জাতির জন্য অনেক ভালো হতো। এগুলোর পরিবর্তনও দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার; কঠিন ব্যাপার-মানতে হবে। এ ক্ষেত্রে দাওয়াত ছাড়া মানুষের সংশোধনের কোনো পথ দেখছি না। মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করা, তাকে বোঝানো, ইসলামকে মানতে বলা ছাড়া কোনো পথ আমরা দেখছি না। আমাদের এ কথাও মনে রাখা উচিত যে, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব। তারপর যারা মানবে না বা ইসলামকে অনুসরণ করবে না, তাদের জন্য আল্লাহ তো বিচারক রয়েছেনই। সেটি আল্লাহ দেখবেন। আমাদের হাতে সব কিছু নেই।

এখানে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন। আমাদের আনন্দ-উৎসব কি দু’টি ঈদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, এর বাইরে কি কিছু করা যাবে না? করা যাবে। যেমন- স্বাধীনতা দিবস পালন করাই উচিত। আর ইতিহাসের বড় বড় ঘটনা, যেমন আমরা এখন ‘বঙ্গভঙ্গের শতবর্ষ’ পালন করছি, সেটি আমরা পালন করতেই পারি। আমাদের ভাষা নিয়ে আমরা সংগ্রাম করেছি। সেটি আমরা স্মরণ করতেই পারি। এ রকম অন্যান্য বড় ঘটনা বা দিবসকে আমরা অবশ্যই পালন করতে পারি। তবে ইসলামের মূলনীতিকে মনে রাখতে হবে। সেটি হতে হবে আল্লাহকে স্মরণ রেখে করা এবং ইসলামে যা কিছু অবৈধ বলা হয়েছে, তা না করা। তবে অনুষ্ঠান অনেক করা বা বাড়ানো ঠিক নয়।

রাসূলুল্লাহ সা: অনুষ্ঠান কেন মাত্র দু’টি করলেন, এটাও একটা চিন্তার বিষয়। তিনি কেন ইবরাহিম আ:-এর জন্মদিবস পালন করলেন না, তিনি কেন আদম আ:-এর জন্মদিবস পালন করলেন না- এই প্রশ্ন অবশ্যই আসে। কেন মাত্র দু’টি করলেন? এ থেকে এটাও প্রমাণিত হয় যে, অনেক বেশি অনুষ্ঠান করা ঠিক নয়। কেননা, তাতে মানুষের জীবন ভারী হয়ে যায়। কুরআনের সূরা আ’রাফের একটি আয়াতে রাসূলুল্লাহ সা: সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তিনি পিঠের বোঝা নামিয়ে দেন এবং পায়ের শিকল কেটে দেন।’ এর মানে, তিনি অহেতুক অনুষ্ঠানের বোঝা কমিয়ে দেন এবং অহেতুক সামাজিক বিধি-বিধান কমিয়ে দেন। তিনি মানুষের জীবনকে করে দেন সহজ। এ বিষয়ও আমাদের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে।

উপরে আলোচনা করেছি, ইবরাহিম আ:-এর জন্মদিবস পালন করতে পারতেন। রাসূল সা: কেন তা করেননি? অন্য দিকে সাহাবায়ে কেরাম রা: রাসূলুল্লাহ সা:-এর জন্মদিবসও মৃত্যুদিবস পালন করতে পারতেন; তারা তা করলেন না কেন? রাসূলুল্লাহ সা: নিজে কেন তার জন্মদিবস পালন করলেন না? আমাদের নেতা-নেত্রীরা নিজেদের জন্মদিবস পালন করেন। সাহাবায়ে কেরাম ইবরাহিম আ: বা রাসূল সা:-এর জন্ম-মৃত্যুদিবস পালন করলেন না কেন? এটা এ জন্য নয় যে, এগুলো অবৈধ; বরং আজকে বড় স্কলারদের অনেকেই বলেছেন, যদি আমরা রাসূলুল্লাহ সা:-এর জন্মদিন পালন করে ইসলামী শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করি তাহলে তা বৈধ হবে। তার পরও প্রশ্ন থেকে যায়, তখন সাহাবায়ে কেরাম রা: এসব কী কারণে পালন করলেন না?

আমার মনে হয়, তারা আমাদের চেয়ে বেশি বাস্তববাদী ছিলেন। তারা মনে করতেন, জন্মদিবস তো একটাই, যে দিন জন্ম নিয়েছি সেটি, আর কোনো জন্মদিবস আসবে না। মৃত্যুদিবস তো একটাই, সেই মৃত্যুদিবস আর কখনো ফিরে আসে না এবং জীবনকে অকারণে ভারী করার কোনো মানে হয় না। বাস্তবতার দাবি হচ্ছে, করণীয় কাজে ব্যস্ত থাকা এবং এসব পুরনো ব্যাপার নিয়ে ব্যস্ত না থাকা।
এই যে সাহাবায়ে কেরামের বাস্তবজীবন, বাস্তবতামুখী জীবন; এটা তাদের একটা মহান সভ্যতা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। তারা যে বিশ্ব জয় করেছিলেন তার একটা বড় কারণ ছিল এটা। তারা ছিলেন খুবই বাস্তববাদী মানুষ। আমাদের এসব দিক মনে রাখতে হবে।

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার


আরো সংবাদ