১৫ জুলাই ২০১৯

কথার মাশুল চড়াই বটে

-

আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে এখন কারো সাথে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের কথা বলাও ঝুঁকিপূর্ণ। ভারাক্রান্ত মন হালকা করতে তেমন কাউকে পাওয়া দুষ্কর। তা না হলে কেউ কারো একান্ত ব্যক্তিগত আলাপচারিতা কি গোপনে রেকর্ড করে? কথার ছলে কথা বলায় কাউকে ফাঁসিয়ে দিতে হবে, এ কেমন মানসিকতা? এমন কাণ্ডে বেদনাহত না হয়ে পারা যায় না। এটি নিঃসন্দেহে অন্যায়। গাড়ির অভাবে ছেলের যাতায়াতের কথা বলায় কী এমন অপরাধ ছিল? এ কথার রেকর্ড মিডিয়ায় সরবরাহ করতে হবে? তবে এ কথাও ঠিক, যিনি এটি করেছেন, তিনি পেশাদারী জীবনে দীর্ঘ অভ্যাসবশে এমন করেছেন বলে মনে হয়। কথায় আছে, ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।’ 

কথা বলার এমন মাশুল দেখে বাজেটে এবার কথার দাম বাড়িয়ে দেয়ায় বিষয়টি উল্লেখ করতে হয়। মানে, মোবাইলের কলরেট বাড়ানো। এতে মানুষের কথা কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে মনের গহিনে জমা পড়তে পারে না বলা কথার স্তূপ। তবে এটাও সত্য, সস্তায় মোবাইলে কথা বলার সুযোগের হয়েছে যথেচ্ছ ব্যবহার। এর প্রভাব পড়েছে সমাজের পরতে পরতে। প্রেম-পিরিতিতে এসেছে সুপারসনিক গতি। বাই প্রডাক্ট হিসেবে কার মন কোথায় গিয়ে জোড়া লাগছে, তা ঠাওর করা মুশকিল। হচ্ছে সম্পর্কের ওলট-পালট। পরিণামে বিবাহবিচ্ছেদও গেছে বেড়ে। আমাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে এসেছে নতুন মাত্রা। কথার দাম বাড়লেও বাজেটে সুখবর আছে, আয়রোজগারে সাদা-কালোর ভেদরেখা উঠে যাওয়ায় অনেকে কথার পেছনে না ছুটে অর্থ কামাতে মনোযোগী হবেন।

কথাই কাল হলো দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের। পুলিশের আলোচিত ডিআইজি মিজানুর রহমানের সাথে তার চলছে অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগ। কেহ কারে নাহি জিনে সমানে সমান। পাবলিক এটা দর্শক হয়ে প্রাণভরে উপভোগ করছে। ঈদে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠানমালার চেয়ে বেশি উপভোগ্য যেন এটা। অনেকে বলছেন, পরিচালক সাহেবের সাথে ডিআইজি সাহেবের এমন কাণ্ড বস্ত্রহরণের শামিল। বস্ত্রহরণে শরমে মরে যাওয়ার উপক্রম হয়। সম্মানহারা হলে সমাজের চোখে হতে হয় হেয় প্রতিপন্ন। দু’টিই সমার্থক। 

মনে পড়ে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ কাহিনী। পৌরানিক মহাকাব্য মহাভারতের প্রধান নারীচরিত্র দ্রৌপদী। পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কণ্যা। দ্রুপদের কন্যা বলে নাম দ্রৌপদী। ছিলেন পঞ্চপাণ্ডবের স্ত্রী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষে যুধিষ্ঠির যখন হস্তিনাপুরের রাজা হন, তখন ফের ইন্দ্রপ্রস্থের রানী হন তিনি। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের কাহিনীটি বেশ চমকপ্রদ। তার বস্ত্রহরণের সাথে মহাভারতের আরেক চরিত্র, দুঃশাসন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। তবে গল্পটি অনেকেরই অজানা। দ্রৌপদী আর দুঃশাসনের বর্ণনা মহাভারতের পাতায় পাতায়। 

বাংলা ভাষার দৈনন্দিন কথোপকথন ও লেখালেখির বহু শব্দেরই ব্যুৎপত্তিগত একটি  প্রেক্ষাপট থাকে। দু-একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। যেমনÑ খাবারের দিক থেকে পোলাও আমাদের খুব প্রিয়। অতিথি আপ্যায়নে খাবারটি প্রায়ই পরিবেশন করে থাকি আমরা। এর ব্যুৎপত্তি পলাণ্ডু শব্দ থেকে; যার অর্থ পেঁয়াজ। আমাদের পোলাও খাবারের ইতিহাস দুই হাজার বছরেরও বেশি প্রাচীন। প্রাচীনকালে প্রচুর পেঁয়াজ সহযোগে খাবারটি রান্না করা হতো বলে কালক্রমে এর নাম হয়ে যায় পোলাও। অন্য দিকে সতেরো-আঠারো শ’ শতকের দিকে একটি শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। তারা মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে হাঁক দিত- দুধ চাই? দই চাই? কিংবা ঘি চাই? ইত্যাদি বলে। সে সময় তাদের পরিচিতি হয় ঘোষক। সেই থেকে এ শ্রেণীর লোকের পদবি হয়ে যায় ঘোষ। এখনো তারাই বাংলাদেশে সর্বোৎকৃষ্ট দই, মিষ্টি কিংবা ঘি তৈরি করে থাকে। এ রকম শত-সহস্র শব্দের রয়েছে ব্যুৎপত্তিগত সুন্দর ও চমৎকার ইতিহাস। শুধু শব্দের এ ব্যুৎপত্তিমূলক ইতিহাস নিয়েই গ্রন্থ রচনা করা যেতে পারে। 

দুঃশাসন শব্দটিরও ঠিক তেমনি রয়েছে ব্যুৎপত্তিগত একটি মজার ইতিহাস। একটু গোড়া থেকে শুরু না করলে পাঠকদের মন ও চিত্ত যে ভরবে না, এটি বলাই বাহুল্য। দুঃশাসন মহাভারতের অন্যতম প্রধান চরিত্র। হস্তিনাপুর রাজ্যের রাজা বিচিত্রবীর্যের দুই পুত্র ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু। ধৃতরাষ্ট্রের ছিল এক শ’ পুত্র ও এক কন্যা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুর্যোধন, দুঃশাসন ও দুঃশল্যা। সামগ্রিকভাবে তাদের সম্বোধন করা হতো কৌরব বলে। আর পাণ্ডুর ছিল পাঁচ পুত্র; যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব। পাণ্ডুর ছেলে বলে তাদের বলা হতো পাণ্ডব কিংবা পঞ্চপাণ্ডব। মহাভারতের সমস্ত হাঙ্গামা ঝক্কিঝামেলাই কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যে। কে হবেন হস্তিনাপুরের রাজা? যদিও প্রসিদ্ধ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হস্তিনাপুরের মসনদ নিয়ে নয় বরং পাণ্ডবের প্রতি কৌরবদের হিংসা, দ্বেষ ও নানা অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে। সেই যুদ্ধে অত্যাচারী, অন্যায়কারী ও উৎপীড়ক কৌরব বংশ সমূলে বিনাশ হয়। হস্তিনাপুরের রাজা হওয়া নিয়ে কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যে দ্বন্দ্ব যখন তীব্র, তখন বিচিত্রবীর্যের অন্ধ জ্যেষ্ঠপুত্র ধৃতরাষ্ট্র তাদের পুরো রাজ্যটি দু’ভাগ করে হস্তিনাপুর নিজপুত্র দুর্যোধনকে দিয়ে পাণ্ডবদের খাণ্ডবপ্রস্থ দান করেন। পাণ্ডবরা সেই বনভূমি সাফসুতরো করে সেখানে ইন্দ্রপ্রস্থ নামে নতুন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সাথে নানা দেশ জয় করে রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটান। পাণ্ডবদের এমন বিপুল সুখ ঐশ্বর্য দেখে দুর্যোধন নিদারুণ ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে মাতুল শকুনির পরামর্শে পাণ্ডবদের জ্যেষ্ঠভ্রাতা যুধিষ্ঠিরকে দ্যুতক্রীড়ায় (পাশা খেলা) আহ্বান করেন। শকুনির ষড়যন্ত্রে সেই পাশা খেলায় দুর্যোধন পাণ্ডবদের সমস্ত রাজ্য এবং তাদের স্ত্রী দ্রৌপদীকে জয় করে নেন। 

দুর্যোধন উৎফুল্ল হয়ে দ্রৌপদীকে সভাস্থলে উপস্থিত হতে আদেশ করেন। দ্রৌপদী সেখানে আসতে অস্বীকৃতি জানালে দুঃশাসন তার চুলের মুঠি ধরে টেনেহিঁচড়ে সেখানে নিয়ে আসেন। পাণ্ডবদের রানীকে কি অন্তঃপুর থেকে সভায় এভাবে আনা যায়? অনেকে লজ্জায় অধঃমুখ হয়ে থাকেন। আর দুর্যোধনের দল হৈ হৈ করে বলতে লাগল, ‘রানী কোথায়? জুয়ায় হেরে দ্রৌপদী তো এখন দাসী।’ পাণ্ডবরা এখন দাস। অতঃপর তাদের দাসের পোশাক পরতে হলো। সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, যেকোনো নারী তার সম্ভ্রম রক্ষা করতে অন্তঃপুরে গিয়ে পোশাক-পরিচ্ছদ বদলাবেন। সেজন্য দ্রৌপদীরও অন্তঃপুরে যাওয়া দরকার। কিন্তু দুঃশাসন সেই সৌজন্য-শালীনতার কোনো তোয়াক্কা না করে নিজের হাতে দ্রৌপদীর পোশাক টেনে খুলতে থাকেন। 

কথিত আছে, যে কৃষ্ণ একদা স্বয়ং বস্ত্রহরণ করেছিলেন গোপিনীদের, তিনিই এগিয়ে আসেন তার প্রিয় সখীর লজ্জা নিবারণে, অনন্ত বস্ত্র প্রদান করে কৌরব সভায় দ্রৌপদীর সম্ভ্রম রক্ষা করেন। এমন কথাই ‘মহাভারত’-এর মূল আখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ‘শিবপুরাণে’ পাওয়া যায় অন্য কথা। সেই আখ্যান অনুযায়ী, কৌরব সভায় দ্রৌপদীকে অনিবার্য অপমানের হাত থেকে যিনি রক্ষা করেছিলেন, তিনি কৃষ্ণ নন, দুর্বাসা মুনি। তাকে ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, পুরাণ এমনকি মহাকবি কালিদাসও উগ্রচণ্ডা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ‘রগচটা মুনি’ কী করে পাঞ্চালীর প্রতি এমন কোমল ও সহমর্মী আচরণ করতে পারেন, তা বিস্ময়ের। এ বিষয়ে ‘শিবপুরাণ’ যা জানায়, তা হলোÑ একদা মহামুনি দুর্বাসা গঙ্গায় অবগাহন করছিলেন। অসাবধানতায় নদীর স্রোতে তার অধঃবাসটি ভেসে যায়। সেই সময়ে দ্রৌপদীও সেখানে উপস্থিত হন। তিনি তার শাড়ির একটি অংশ ছিঁড়ে মুনির সম্ভ্রম বাঁচান। কৃতজ্ঞ দুর্বাসা তাকে এ মর্মে বর দেন যে, সঙ্কটকালে তার বস্ত্রের অভাব হবে না। সেই বরের কল্যাণেই নাকি এ লজ্জার হাত থেকে দ্রৌপদী রেহাই পান। দুঃশাসন এক সময় বস্ত্র টানতে টানতে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েন ভূমিতে। 

বাংলা ভাষায় দুঃশাসন শব্দটিও কৌরব বংশের দুর্যোধনের কনিষ্ঠ ভ্রাতা দুঃশাসন থেকে অনুসৃত। কারণ, তিনি প্রচলিত নিয়ম-প্রথা ভেঙে এক নারী ও রানীকে জনসমক্ষে বিবস্ত্র করতে চেয়েছিলেন। তখন দ্রৌপদীর আর্তচিৎকারে বাতাস ভারী হলেও তার স্বামী পঞ্চপাণ্ডবেরা কাপুরুষের মতো স্ত্রীর বস্ত্রহরণ দৃশ্য অবলোকন করেছিলেন। কারণ, তারা ছিলেন পরাজিত আর অক্ষম। দুর্যোধন, দুঃশাসনদের বিরুদ্ধে তাদের কিছুই করার ছিল না। দুর্যোধন, দুঃশাসনেরা শুধু মহাভারতের পাতায় নেই তাদের উপস্থিতি যুগে যুগে, আদিমকাল থেকে মধ্যযুগ এমনকি আধুনিক সময়েও। মধ্যযুগে যুদ্ধক্ষেত্রে জয়-পরাজয় যে পক্ষেরই হোকÑ এর প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী হতো দুর্বলেরা। ‘মহাভারতের’ জটিল ঘটনাক্রমের কেন্দ্রে রয়েছে পাণ্ডব-কৌরবের পাশা খেলা এবং তাতে পাণ্ডবদের পরাজয় এবং এর ফলস্বরূপ দুঃশাসন কর্তৃক দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ। কিন্তু এখন আমরা দেখছি, ‘সেয়ানে সেয়ানে’ যুদ্ধ। বাঘে-মহিষের লড়াই। ঈদ-উত্তর দেশবাসী দেখলেন বস্ত্রহরণের আধুনিক সংস্করণ।

ঘটনার সূত্রপাত : পুলিশের ডিআইজি মিজানুর রহমানের অবৈধ সম্পদের তদন্ত শুরু করেছিল দুদক। এটা করতে গিয়ে দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মিজান। তাকে ২ জুন বাছির জানান, তিনি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। তবে তাকে অব্যাহতি দিতে পারেননি; এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মিজানুর টাকা-পয়সা লেনদেনের কথা ফাঁস করে দেন। ‘প্রমাণ’স্বরূপ হাজির করেন বাছিরের সাথে কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ড। এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রচার করে টিভি চ্যানেল এটিএন নিউজ। এনামুল বাছির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, অডিও রেকর্ডটি বানোয়াট। তিনি টাকা-পয়সা নেননি। তিনি গত মাসের শেষ দিকে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন এবং মিজানুরের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছেন।

ডিআইজি মিজানুর রহমান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত জানুয়ারির শুরুর দিকে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়। বিয়ে গোপন করতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দ্বিতীয় স্ত্রীকে গ্রেফতার করানোর অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। এক সংবাদ পাঠিকাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়া এবং উত্ত্যক্ত করার অভিযোগে থানায় জিডি রয়েছে। গত বছরের ৩ মে অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে মিজানুরকে দুদক কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে মিজানুর ও তার প্রথম স্ত্রীর আয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ কোটি টাকারও বেশি সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুদক। সংস্থাটির বরাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। এ দিকে মিজানের কাছে তদন্তের তথ্য ফাঁস করার অভিযোগে দুদকের পরিচালক বাছিরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি।


আরো সংবাদ