২২ আগস্ট ২০১৯

সন্ত্রাস খবরদারি ও মানবাধিকার

-

সারা বিশ্ব এবং যেকোনো রাষ্ট্র এখন শতধাবিভক্ত। এই বিভক্তির প্রতিটি অংশ একে অন্যের সাথে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েছে এবং পড়ছে নানা সঙ্ঘাত-সংঘর্ষে। আর তার মাশুলও প্রায় সর্বক্ষেত্রেই দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।

এই সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের মূলে কে? এই প্রশ্ন সবাইকে তাড়িয়ে বেড়ায়। প্রত্যেকেই নিজের মতো করে এর কারণ এবং জবাব খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করেন। যেহেতু জবাবগুলো বিভিন্ন, তাই এই বিরোধিতার শেষ হয় না।

তবে কিছু সন্ধানী এর মূলে প্রধানত তিনটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন। তারা বলেন, সন্ত্রাস, খবরদারি এবং মানবাধিকারকে অগ্রাহ্য করাই এর মূল কারণ। তারা এ কথাও বলেন, নিরপরাধীরাই এর শিকার।

প্রশ্ন উঠবে- ‘সন্ত্রাস কারা করে?’ এক কথায়, সব সন্ত্রাসের নায়কেরা ক্ষমতাবান। পশ্চিমা বিখ্যাত এক অনুসন্ধানী আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রের অবহেলা বা সহায়তা ছাড়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অসম্ভব। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, এসব কর্মকাণ্ডের জন্য যে সংগঠন, অর্থ এবং যোগাযোগ প্রয়োজন; তার নিয়ন্ত্রণে অথবা প্রস্তুতকরণে সর্বদাই রাষ্ট্র উপস্থিত। ‘রাষ্ট্র’ বলতে তারা এর নিয়ন্ত্রক বা প্রদায়কদের উল্লেখ করেছেন।

এখন খবরদারি সারা বিশ্বে শাসক এবং ক্ষমতাবানদের প্রধান অস্ত্র। অবশ্য বিশ্বের ইতিহাসে দেখা যায়, এরা তাদের প্রজাদের সব তথ্য জানার সব উদ্যোগ নিত। এমনও দেখা গেছে, তারা এর জন্য বিশেষ অশ্বারোহী খবর সংগ্রহকারী নিযুক্ত করত। কথিত আছে, এই ঢাকা শহরের প্রশস্ত রাস্তা হওয়ার মূলে ছিল অশ্বারোহী খবরদাতার অশ্ব চলাচলের প্রয়োজন। এটা নাকি এসেছিল সুদূর প্যারিসের ক্ষমতাবানদের প্রশস্ত রাস্তা তৈরি করার ধারণা থেকে। সেখানে অশ্বারোহীদের জন্য বিশেষ রাস্তা ছিল, যেখান দিয়ে ঘোড়সওয়ার কর্মচারীরা খবর নিয়ে রাজা এবং মোসাহেবদের দিত।

এই খবরদারির আকার এবং অনুপ্রবেশের আকার এখন এমন ব্যাপক যে, তা সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে। যেমন, কোনো ব্যক্তি শুধু মোবাইল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোল। ক্ষমতাবানেরা ইচ্ছে করলেই সে ব্যক্তি কোথায় এবং কী কথা বলছে, তা জানতে পারেন। তবে এই অবস্থা এখন সীমিত অনুসন্ধানকারীদের মধ্যে। তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি এখনো অনুসন্ধানপর্যায়ে এবং তারা নিজেরাই অভিভূত যে, প্রযুক্তি এমন সুবিধা এনে দিতে পারে। এ সুবিধার জন্য অতীত কাল থেকে মানুষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আধ্যাত্মিক ক্ষমতা লাভ করেছেন বলে দাবিও করে অনেক অনুসারীর সৃষ্টি করতেন।

বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া এই ব্যবস্থা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে শীর্ষে। এরা প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি ও পন্থার উদ্ভাবন ঘটাচ্ছে। আগেই বলা হয়েছে, মোবাইলে ব্যবহৃত সিমে এমন ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে, যা দিয়ে এর প্রস্তুতকারী এবং তাদের সহযোগী রাষ্ট্রীয় ও গোষ্ঠীগত ক্ষমতাবানেরা সব কিছুই জানতে সক্ষম। কেউ কেউ এর জন্য ৯/১১-কে দায়ী করলেও পশ্চিমা প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশগুলোর সাম্রাজ্য বিস্তার এবং সংরক্ষণে এই প্রযুক্তি বহুলাংশে সাহায্য করেছে।

এখন এই খবরদারি ‘গণতান্ত্রিক’ বলে পরিচিত দেশগুলোও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশে অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এটা ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রচারে প্রযুক্তি একটা সুবিধা দেয়। প্রচার প্রযুক্তি ক্ষমতাবানদের হাতে, তাই সত্য এবং সঠিক তথ্য তারা বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ আর প্রচার করতে পারে- অনেক ক্ষেত্রে বিকৃত করেও।

এখন এর ব্যবহার হচ্ছে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ যুদ্ধের নামে। যে দেশগুলোতে এর ব্যবহার চলছে, সেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা অধিকার বলে কিছু নেই। যেমন লেবানন, তিউনিসিয়া, মিসর ও ফ্রান্সে। এখানে তথাকথিত আইএস নির্মূল করার নামে অভিবাসীদের সব স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছে এবং তার সাথে সাথে নাগরিকদের অধিকারও। এসব দেশের সরকার এবং তাদের একশ্রেণীর কর্মচারীর অবাধ ক্ষমতা অভাবনীয়। রাজতন্ত্রের কর্মচারীরাও এমন সুবিধা ভোগ করে না কিংবা তাদের ক্ষমতা প্রয়োগের অতুলনীয় ব্যবস্থাও নেই।

এ অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। তারা প্রতিদিন একটি নতুন খবরদারির ব্যবস্থা তৈরি করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের বিশাল ব্যবসা ফেঁদেছে। সরকার তাদের অনৈতিকভাবে ব্যবহার করে প্রতিবাদী সব প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করছে খুব সহজে। এই খবরদারি করার কোম্পানি বা সরকারি সংস্থাগুলোর ক্ষমতা অসীম।

কখনো কখনো রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থাও এদের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনএসআই (ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি), এফবিআই (ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন)- এরা প্রধানত অনুসন্ধানের জন্য দায়ী থাকলেও তারা প্রায়ই শক্তি বা এমন প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ব্যবস্থা ব্যবহার করে, যার সামনে সাধারণ মানুষ কোনো বিচার পায় না বলে অনেক অনুসন্ধানে এসেছে। মজার কথা, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রযুক্তিসমৃদ্ধ কৌশল বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই অনুসরণ করে থাকে, বিশেষ করে যে দেশগুলো স্বৈরশাসনের অধীনে।

তাই খবরদারির সব ব্যবস্থাকে প্রায়ই ‘স্বাধীনতাবিরোধী অস্ত্র’ বলে বর্ণনা করা হয়। স্বৈরশাসিত দেশগুলোতে এগুলো অত্যন্ত প্রিয়। এর ভয়াবহতার এক চমৎকার চিত্র সর্বপ্রথম এঁকেছেন এডওয়ার্ড স্নোডেন ২০১৩ সালে তার এক লেখায়। এই লেখা স্বাভাবিকভাবেই সারা বিশ্বের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক সহায়ক শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তিনি সরকার এবং ক্ষমতাবানদের কোপানলে পড়েন।

বিখ্যাত অনুসন্ধানী সংস্থা প্রাইভেট ইন্টারন্যাশনাল ২০০৭ সালে এক নিরীক্ষা চালায় ৪৭টি দেশে। তারা দেখতে পান, প্রতিটি দেশেই সরকার আড়িপাতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করে চলেছে। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিস ইউনিয়ন (এসিএলইউ) ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের প্রথম রিপোর্টে বলেছিল, ‘আমরা এখন সম্ভবত খবরদারির সমাজে চলে যাচ্ছি।’ এরপর সাম্প্রতিক রিপোর্টে তারা বলেছেন, এই খবরদারির সীমানা সাধারণ মানুষের ধারণার মধ্যে নেই।

‘রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডার’ বলে খ্যাত অনুসন্ধানী সংস্থা তাদের প্রথম রিপোর্টটি ২০১৩ সালে প্রকাশ করেছে। তারা দেখতে পায়, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ সব দেশেই হচ্ছে। তবে চীনসহ পাঁচটি দেশ এই নেতৃত্বে। এই খবরদারি শুধু টেলিফোনে আড়িপাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে তারা উল্লেখ করেন। তাদের প্রযুক্তির নাম ডিপ প্যাকেট টেকনোলজি, যা দিয়ে তারা সব আইপি ঠিকানা অতি সহজেই নির্ণয় করে ফেলেন। চীনের এই আড়িপাতা প্রযুক্তিগুলোর নাম দেয়া হয়েছে ‘গ্রেট ফায়ারওয়াল অব চায়না’।

বিশ্বের কোনো ইন্টারনেট-ভিত্তিক বা টেলিফোন-ভিত্তিক কথাবার্তা এই প্রযুক্তিকে এড়িয়ে চলতে পারে না। তারা ইচ্ছে করলেই যেকোনো মেসেজে প্রণেতার সব তথ্য একনিমেষেই জেনে যেতে পারেন। যেমন, বিখ্যাত স্কাইপি ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মকে গভীরভাবে অবলোকন করা হয়। অপেননেট ইনিসিয়েটিভ (অএনআই) চালু করা হয়েছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইন্টারনেট কেমন করে ব্যবহার করছে তার তথ্য জানার জন্য। তারা দেখতে পায়, সবাই সরকারি গভীর অবলোকনে। ফলে ২০১৪ সালে তারা তাদের কর্মকাণ্ডের উপসংহার টানে এ কথা বলে, ‘সব তথ্য সরকারি নিয়ন্ত্রণে আছে’। তাদের এই রিপোর্টে তথ্য সব সময় পাওয়া যাবে বে তারা ঘোষণা করেছে।

আসলে আন্তর্জাতিক এবং ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদানে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা সারা বিশ্বের মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। সরকারগুলোও চাইছিল এমন একটি স্রোত, যেখান থেকে বেশির ভাগ তথ্য পাওয়া যাবে। তাই তারা নানা প্রযুক্তি নির্মাণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বলাবাহুল্য, চীন-রাশিয়া-আমেরিকা-ব্রিটেনসহ সব প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশ এই নির্মাণের দৌড়ে রয়েছে। যারা যতখানি সাফল্য অর্জন করতে পেরেছেন, তারা ততখানি ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের অধিকারী হয়েছেন।

তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, সন্ত্রাসেরও অন্যতম বাহন হয়ে পড়েছে এই প্রযুক্তি। সন্ত্রাসের ব্যাপকতা সৃষ্টি করেছে এই প্রযুক্তি। আর ঢাকা পড়ে যাচ্ছে প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার। জাতিসঙ্ঘে মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য নানা আইন ও নীতি এখন এই প্রযুক্তির কারণে যেমন সফল প্রয়োগ সম্ভব, ঠিক একইভাবে সেসব আইন এড়িয়ে চলাও সম্ভব হচ্ছে।

প্রযুক্তি যেমন সাধারণ মানুষের জীবনধারাকে সুন্দরভাবে উপভোগ করার সুযোগ দিয়েছে, এটা আবার জীবনের ধারাকে ব্যাহত করছে। তাই এ জন্য সবার আগে প্রয়োজন সতর্কতা। কারণ, প্রযুক্তিকে আর এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। এটাও সত্য, প্রযুক্তি নিজে নিজে উদ্ভূত হয়নি। মানুষ তা তৈরি করেছে। কিন্তু ব্যবহার করতে গিয়ে মানুষ একে নিয়ন্ত্রণ করতে ভুলে গেছে। এখনই সতর্ক না হলে হয়তো বা সেই কথিত মহাধ্বংস আসবে এই প্রযুক্তির মধ্য দিয়েই।


আরো সংবাদ

নদীপথে নাব্যতা থাকলে বছরে ১৪০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে তিন দশক পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, চীন-রাশিয়ার হুঁশিয়ারি প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘে অভিযোগ পাকিস্তানের ফেসবুকে নতুন সুযোগ : মুছে ফেলা যাবে সব ডিজিটাল অ্যাকটিভিটি ভয়ঙ্কর আতঙ্কে কাশ্মিরি মেয়েরা চিদম্বরমকে গ্রেফতার করে অমিত শাহের বদলা! হজযাত্রীদের ৪০ শতাংশ ষাটোর্ধ্ব ৭৫-এর পরিকল্পনাকারীদের বিচারে জাতীয় কমিশন গঠনের দাবি রাজধানীতে জেএমবির চার সদস্য গ্রেফতার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে : প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারে ফিরে না গেলে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানো হবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

সকল