২২ আগস্ট ২০১৯

মশাবিষয়ক ‘প্রেসনোট’

-

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। দেশে তুমুল আলোচিত এক ব্যক্তিত্ব। নানা কারণে গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত খবরের শিরোনাম হয়ে থাকেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত সেসব খবর কৌতূহল নিয়ে পাঠ করেন পাঠক। না পড়লে তো আর পত্রিকাগুলো বিনা কারণে ছাপে না। সংবাদমূল্য আছে বলেই তো ছাপানো হয়।

প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সদস্য তিনি। বড় ভাই সেলিম ওসমান জাতীয় পার্টির এমপি। অন্য ভাই মরহুম নাসিম ওসমানও ছিলেন সংসদ্য সদস্য। বাবা এ কে এম শামসুজ্জোহাও ছিলেন সংসদ সদস্য। পিতামহ খান সাহেব ওসমান আলী। ছিলেন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই নারায়ণগঞ্জে প্রভাবশালী।

অনেকে তাদের প্রভাব বলয়ে থাকতে পছন্দ করেন। স্থানীয় রাজনীতির দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতে গণমাধ্যমে তার নাম উঠে আসে যখন তখন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা: সেলিনা হায়াৎ আইভীর সাথে তার দ্বন্দ্ব বহু পুরনো। নিজের ছোট চাচা চিত্র প্রযোজক বাবু সারোয়ারের সাবেক স্ত্রী জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও সাবেক এমপি সারাহ বেগম কবরীর সাথেও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এ ছাড়া আলোচিত ত্বকী হত্যার ঘটনার খবরে তার এক ভাতিজার নাম বারবার উচ্চারিত হয়েছে।

সেই তিনি এবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী বক্তব্য দিয়ে। তার সাম্প্রতিক বক্তব্য মশাবিষয়ক। দেশে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে তিনি চিত্তাকর্ষক কথা বলেছেন। সেই কথামৃতের স্ক্রিন শট ইন্টারনেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে দ্রুতগতিতে। ত্বরিত ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকারদের আইডিতে।

রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নেয়ার পরও এ বিষয়ে কোনো প্রেসনোট দেয়নি সরকার। সাংবাদিকতার ভাষায়, প্রেসনোট হলো- রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নাগরিকদের কাছে স্পষ্ট করতে চাইলে সে সম্পর্কে গণমাধ্যমে পাঠানো সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য। তবে ডেঙ্গু নিয়ে সরকার কোনো কথা না বললেও শামীম ওসমানের সাহসী বক্তব্যে তিনি বাহবা পেতে পারেন। এটাকে তার মশাবিষয়ক ‘প্রেসনোট’ হিসেবে ধরে নেয়া যায়।

কেন চাই, সে জন্য তার বক্তব্যের চুম্বক অংশ তুলে ধরছি। ৩০ জুলাই দুপুর। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা মিলনায়তন। সেখানে উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন পরিষদে ফগার মেশিন ও মশক নিধন ওষুধ বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রধান অতিথি শামীম ওসমান এমপি। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘মশা বিনা কারণে আসে না। এই মশার উদ্ভব নমরুদের সময়। নমরুদ তখন অনাচার করছিল দুনিয়াতে। একটা মশা এসে তার নাক দিয়ে ঢুকে গিয়েছিল। মশার অত্যাচারে সে তার মাথায় বাড়ি দিতে বলছিল। মশা দিয়ে আল্লাহ তাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। যখন কোনো দেশে পাপাচার হয়, এটি ন্যাচারাল গজব। পাপ করে কিছু লোক আর ভোগে সমস্ত জাতি।’

শামীম ওসমান হককথা বলেছেন। তার বক্তব্য একদম সহি। পাপাচার বাড়লে প্রাকৃতিক নিয়মে মানুষের ওপর গজব নেমে আসাই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। এতে পাপে নিমজ্জিত মানুসের হুঁশ ফেরার সম্ভাবনা থাকে। এটি আল্লাহ তায়ালার শাশ্বত নিয়ম। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে শামীম ওসমান মশাবিষয়ক যে গল্পটি বয়ান করেছেন, পবিত্র কুরআনে সে সম্পর্কে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কুরআনের সূরা বাকারার ২৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ মশার উদাহরণ দিতেও কোনো কার্পণ্য করেন না।’ পবিত্র কুরআনে নমরুদ নামে কোনো চরিত্রের উল্লেখ নেই। মিসরের অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের সম্প্রদায়কে উদ্দেশ করে আল্লাহ বলেছেন, ‘অতঃপর আমি তাদের ওপর ঝড়-তুফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্তবৃষ্টি পাঠালাম, এর সব কয়টিই সুস্পষ্ট নিদর্শন। এরপরও তারা বড়াই করতে থাকল। আসলেই তারা ছিল অপরাধী জাতি’ (সূরা আরাফ, আয়াত-১৩৩)।

আসল কথা হলো- শামীম ওসমান যে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ কি না। জনগুরুত্বপূর্ণ হলে আমলে নেয়া অতীব জরুরি। পাপাচারে নিমজ্জিত হলে আল্লাহর গজব আপতিত হওয়া স্বাভাবিক। তা ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক, যা-ই হোক না কেন। অতএব, বর্তমানে মশা বেড়ে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু মহামারীতে রূপ নেয়ায় আমাদের দায়, মানে পাপাচারটি কী, তা শনাক্ত করা প্রয়োজন। এর সাথে শাসক শ্রেণীইবা কতটুকু জড়িত?

দীর্ঘ দিন ধরে তারা উন্নয়নের নামে যা করেছেন, তা পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে। আর আমরা বিনা প্রতিবাদে তা মেনে নিয়েছি। এর কুফল তো ভোগ করতেই হবে। একটু দৃষ্টি দেয়া যাক বিদেশী গণমাধ্যমের দিকে। তাতে মশার বাড়বাড়ন্ত দশায় আমাদের অপরাধ কী তা পরিষ্কার হয়ে যায়। মনোজগতে এখনো উপনিবেশবাদী চিন্তার ঘরবসতি থাকায় আমাদের বিদেশপ্রীতি দৃষ্টিকটু হলেও অব্যাহত। তাই বিদেশী বয়ান তুলে ধরা। মশা বেড়ে যাওয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো মওসুমি বায়ুর দেশে ব্যাপক আকারে ডেঙ্গু জ্বর ছড়িয়ে পড়ার পেছনে অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ন। জলাবদ্ধতা, নির্মাণাধীন ভবন এবং বড় বড় প্রকল্প এলাকায় নিয়মিত জমে থাকা পানি থেকে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে; যা এডিস মশা ও অন্যান্য মশার অন্যতম প্রজনন কেন্দ্র। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিচ্ছে। অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাস আসার পর এখানকার উপযোগী পরিবেশে তা টিকে থাকছে।

বাসায় অনুপ্রবেশকারী মশা এখন আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। ঘনিষ্ঠতম ঘাতক হলো মশা। কীটটি ঢাকাবাসীর নিত্যসহচর। কিন্তু মশক প্রজাতির জনক কে? অপরিকল্পিত নগরায়নের হোতা যারা, তারাই এর ‘বাবা’। ডেঙ্গু মহামারীর জন্য মশা দায়ী হলেও বিশেষ করে এডিস মশার জন্য দায়ী অপরিকল্পিত ও অমানবিক নগরায়ন। রাজধানী হলো দেশের মুখচ্ছবি। সেই ‘মুখ’টি তেমনই হয়, যেমন হয়ে থাকেন সে দেশের শাসকেরা। অতি বাড় ভালো না জেনেও বাড়তে বাড়তে সীমা ছাড়াচ্ছে রাজধানী। অতিকায় রাজধানী আবাদ-বন-জলা গিলতে গিলতে জোড়া লাগাতে চাইছে বৃহত্তর ঢাকার ধানী জমি। ঢাকাকে ‘মহানগর’ বানানো হয়েছে বটে, মহানাগরিক সেবাব্যবস্থা বানানোর দরকার বোধ করেনি কোনো সরকার।

ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, হাইরাইজ বিল্ডিং ইত্যাদি বানানো হচ্ছে। এখন জানা গেল, এসব নির্মাণকাজে জমা পানি, অস্বাস্থ্যকর আবাসন প্রভৃতি ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া রোগের ‘উর্বর খামার’। জনবিমুখ উন্নয়ন আর মহামারী হাত ধরাধরি করে চলে। এমন অদূরদর্শী কাণ্ডে জনগণের এ দুর্দশা। অবশ্য, শাসকশ্রেণীর তেমন দুশ্চিন্তা নেই। দেশে বড় বড় প্রকল্প নিলেই তাদের পোয়াবারো। তাদের সাধের বউ-বাচ্চারা বিদেশে আয়েশি জীবন কাটাতে পারে অনায়াসে; নিরাপদ বিদেশবিভুঁইয়ে। যোজন যোজন দূরে।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ না করায় ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই কোটিতে। বস্তি আর সুরম্য অট্টালিকার আবর্জনায় ভরে গেছে পুরো মহানগরী। এত বিপুল জনঘনত্বের রাজধানীর জনস্বাস্থ্য সুশৃঙ্খল রাখা খুবই কঠিন কাজ। ঢাকা যখন খুব ছোট ছিল, সেই পঞ্চাশের দশকে মশার জ্বালায় লোকে দিনেও মশারি খাটাত। কেবল একজনই এ শহরকে মশামুক্ত করতে পেরেছিলেন। তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মরহুম হাবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী।

আমাদের অসতর্কতা মশা বেড়ে যাওয়া আর এদের রোগ ছড়ানোর মূল কারণ। মশা হলো প্রাণঘাতী জীবগুলোর অন্যতম। প্রতি বছর ৭০ কোটি মানুষ মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয় পৃথিবীতে। এর মধ্যে ১০ লাখ মৃত্যুবরণ করে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে এডিস মশার বংশবিস্তার এবং ডেঙ্গুর প্রকোপ ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করেছে। ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আহাজারি করছে। হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। বিভিন্ন কারণে ডেঙ্গু, জিকা ভাইরাস, চিকুনগুনিয়াসহ এ জাতীয় নানা রোগ ছড়ানো এডিস প্রজাতির মশা খুব মারাত্মক। একটি বড় কারণ- এসব রোগ সংক্রমণের ভাইরাস বহনকারী মশা যে ডিম পাড়ে, তা-ও এসব রোগের ভাইরাস বহন করে। এ জন্য এডিস মশা সব সময় ডেঙ্গু রোগীর রক্ত চুষে ডেঙ্গু ভাইরাস বহনের প্রয়োজন পড়ে না। হয়তো এ জন্যই ডেঙ্গুর বিস্তার খুব সহজে হচ্ছে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে এডিস মশার দ্বারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রোগের বিস্তার ঘটছে। ডেঙ্গুতে প্রতি বছরই ১০ কোটির মতো মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশে অনেক বছর ধরে মূলত বর্ষা মওসুমে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিচ্ছে।

মশক নিধন নিয়ে যে লঙ্কাকাণ্ড ঘটছে; তা সত্যিই হতাশাজনক। এখন কীটনাশক ব্যবহার ছাড়াও অন্যান্য সফল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দেশে মশার বিস্তাররোধে সফলতা পেয়েছেন। সফলভাবে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন তারা। রাসায়নিক বা কেমিক্যাল ব্যবহারের জটিলতা, মশার প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়া এবং পরিবেশগত বিপর্যয়কে বিবেচনায় নিয়ে প্রতীয়মান হয়, এসব প্রযুক্তি অনেকটা টেকসই। যেমন চীনা বিজ্ঞানীরা ‘পতঙ্গ প্রযুক্তি’ ব্যবহার করে দু’টি দ্বীপ শহরের এডিস এলবোপিক্টাস প্রজাতির মশার বিস্তার দ্বিতীয় বছরে ৯৪ শতাংশ কমিয়ে আনতে পেরেছেন।

অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরাও এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কুইন্সল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের একটি অঞ্চলের এডিস এজিপ্টি প্রজাতির মশা ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনার সফলতা দেখিয়েছেন। তাই বাংলাদেশে মশা নিয়ে এ সঙ্কটে বিজ্ঞানীদের সঠিক ও সমন্বিত দমনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে মশা দমনের যে ব্যর্থতার উপাখ্যান রচিত হয়েছে, তার অবসান ঘটিয়ে নাগরিকদের পরিচ্ছন্নতা, সরকারের পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও আর্থিক সহায়তা এবং দেশের বিজ্ঞানীদের একাগ্রতায় সফলতার উপাখ্যান গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।
[email protected]


আরো সংবাদ