২০ আগস্ট ২০১৯

জাতিসঙ্ঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির সুপারিশমালা

-

জাতিসঙ্ঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি জেনেভা যুদ্ধ কনভেনশনের (১৯৪৯) পর একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্যোগ। এই নীতিমালা বা কনভেনশনে অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা, শাস্তি ও অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে এই প্রস্তাবাবলি বা কনভেনশন গৃহীত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় ২০টি দেশ এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। ২০১৯ সালের জুন নাগাদ ১৬৬টি দেশ এই কনভেনশনে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়। এটি হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি। ১৯৪৮ সালে ১০ ডিসেম্বর ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের পরিপূরক এবং হালনাগাদ ঘোষণা এটি। জাতিসঙ্ঘ এই চুক্তির পর্যবেক্ষণ ও কার্যকারিতার দায়িত্ব পালন করে থাকে। ১৯৮৭ সালের ২৬ জুন থেকে এই দিনটি ‘নির্যাতনবিরোধী দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এই কনভেনশনের অনুসৃত নীতিমালা আন্তর্জাতিক আইনের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। পৃথিবীব্যাপী সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে পরিচালিত অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা ও অমর্যাদা প্রতিরোধই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। এই কনভেনশনের ১৭-২৪ ধারা অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও পক্ষ প্রতিকার বা বিচার চেয়ে গঠিত কমিটির কাছে দরখাস্ত বা প্রতিবেদন পেশ করতে পারেন। ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশ এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। 

নির্যাতনবিরোধী এই কমিটি সারা বিশে^র নির্যাতনমূলক কার্যকলাপ পর্যালোচনার জন্য মাঝে মধ্যেই বৈঠক আহ্বান করে। এ ধরনের একটি বৈঠক গত মাসের ৩০ থেকে ৩১ জুলাই জেনেভায় অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো নির্যাতনসংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হলো। এই প্রথমবারের মতো আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্বে ১৯ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছে। সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর চার বছর পরপর প্রতিবেদন থাকলেও ১৯৯৮ সালে সনদ অনুস্বাক্ষরের পর বাংলাদেশ কোনো প্রতিবেদন দেয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমবারের মতো পেশ করা, এবারের প্রতিবেদনে দেশে নির্যাতনবিরোধী যেসব আইন তৈরি করা হয়েছে এবং যেসব কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলোর বিবরণ কমিটির কাছে পেশ করা হয়েছে। অপরপক্ষে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষে ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার ফোরাম’ আরেকটি প্রতিবেদন দাখিল করে। এ সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র্র, বাংলাদেশ লিগাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট, মহিলা পরিষদ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-টিআইবি প্রভৃতি। সরকারের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কমিটির পর্যালোচনার জন্য কোনো প্রতিবেদন পেশ করেনি। বিদেশী মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষে ওয়ার্ল্ড কোয়ালিশন অ্যাগেইনস্ট ডেথ পেনাল্টি, রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটস এবং ওডিআরআই ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নাগরিক নির্যাতন সম্পর্কে আলাদা আলাদা প্রতিবেদন পেশ করেছে।

বাংলাদেশের পক্ষে আরো একটি প্রতিবেদন অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দায়ের করা হয়। ওই সব প্রতিবেদনে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশদ বিবরণ দেয়া হয়েছে। এই প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ২০৮৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ২০১৮ সালেই নিহত হয়েছেন ৪৬৫ জন। একই সময়ে, মোট ৫২৬ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের হাতে গুম হয়েছেন। এই প্রতিবেদনে আলোকচিত্রী শহীদুল আলম, কোটাবিরোধী এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী ছাত্রদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার ও পুলিশের রিমান্ডে নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের পদক দিয়ে পুরস্কৃত করার কথা জানানো হয়। একই সাথে, মানবাধিকার ফোরাম নিপীড়ন নির্যাতনের আরো একটি বিস্তারিত বিবরণী পেশ করেছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটানো, হাত-পা বেঁধে দুই টেবিলের মাঝখানে শুইয়ে পায়ের তলায় পেটানো, ছাদে ঝুলিয়ে নির্বিচারে পেটানো, মাটিতে ফেলে মুখে ভেজা কাপড় ঢুকিয়ে নাক-মুখে পানিঢালা, পুরুষাঙ্গে ইট বেঁধে ঝুলিয়ে দিয়ে হাঁটতে বলা এবং ধাতুর তৈরি আংটিতে আঙুল ঢুকিয়ে বৈদ্যুতিক শক দেয়া। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব তথ্য প্রমাণ আকারে দাখিল করে।

এ ছাড়া সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর অত্যাচারে বাংলাদেশী নাগরিদের অব্যাহত মৃত্যুর বিষয়ে উল্লেখ করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে ওই সব অভিযোগ অস্বীকার করে সরকারের গৃহীত নানা ধরনের আইনি ব্যবস্থার বর্ণনা দেয়া হয়েছে।

উভয়পক্ষের বক্তব্যের পর নির্যাতনবিরোধী কমিটি সম্মেলনে তাদের গৃহীত প্রস্তাব ও সুপারিশ প্রকাশ করে। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অসদাচরণের ব্যাপকভিত্তিক অভিযোগ, অভিযোগগুলোর অর্থবহ তদন্ত ও অপরাধীর জবাবদিহির অনুপস্থিতি, অঘোষিত আটক ও গুমের ঘটনাগুলোর বিষয়ে সরকারের তথ্য প্রকাশের ব্যর্থতায় উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি। তারা অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেন। বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে তারা অন্তত আরো ৭৭টি সুপারিশ দাখিল করেছেন। সনদ স্বাক্ষরের পর বাংলাদেশের প্রাথমিক প্রতিবেদন দিতে দীর্ঘ ২০ বছর সময় লাগায় কমিটি দুঃখ প্রকাশ করে। 
কমিটি তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী বছরের ৯ আগস্টের মধ্যে এসব বিষয়ে অগ্রগতি জানানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বিষয়গুলো হচ্ছে ১. হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ বিষয়ে ম্যাজিস্ট্রেট ও আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষগুলোর হাইকোর্টের নির্দেশনা পুরোপুরি অনুসরণ নিশ্চিত করা। ২. আটক রাখার স্থানগুলো স্বাধীন কর্তৃপক্ষ এবং বেসরকারি সংগঠন বা এনজিও প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং নির্বিচারে আটক ব্যক্তিদের অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। ৩. যেসব এনজিও কমিটিকে সহযোগিতা করেছে, তাদের হয়রানি ও প্রতিশোধ থেকে সুরক্ষা দেয়া। কমিটি তার পর্যবেক্ষণের শুরুতেই মানবাধিকারবিষয়ক অনেক সনদ ও প্রটোকল স্বাক্ষর বা অনুমোদনের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক সনদ, নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য অবসানের বর্ধিত সনদ, শিশু অধিকারবিষয়ক একাধিক সনদ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতবিষয়ক রোম স্ট্যাটিউট, ইত্যাদি। কমিটি একই সাথে হেফাজতে নির্যাতন ও হত্যা নিবারণ আইন, ২০১৩; নারী ও শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিকার আইন; আইনি সহায়তাবিষয়ক আইন; মানবপাচার প্রতিকারবিষয়ক আইন; পারিবারিক সহিংসতা আইনসহ মোট আটটি আইন সংস্কার বা সংশোধনের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগকেও স্বাগত জানিয়েছে। রাষ্ট্র যুদ্ধাবস্থায় আছে বা যুদ্ধের হুমকির মুখে আছে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিকে নির্যাতনের যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না বলে জাতিসঙ্ঘের নির্যাতনবিরোধী সনদের ধারা ২ স্মরণ করিয়ে দিয়ে কমিটি বলেছে, স্বীকারোক্তি আদায় অথবা ঘুষ নেয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে যে বিপুলসংখ্যক অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে কমিটি উদ্বিগ্ন।

নির্যাতন ও নিষ্ঠুর বা অমানবিক আচরণকে নিষিদ্ধ করার সাংবিধানিক বিধান, ২০১৩ সালের নির্যাতন প্রতিরোধ আইন এবং সরকারের জিরো টলারেন্সের ঘোষণাকে স্বাগত জানালেও কমিটির প্রতিবেদনে এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। নির্যাতনবিষয়ক সাতটি সুপারিশের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নির্যাতন এবং অসদাচরণের বিষয়টিকে জরুরি উদ্বেগের বিষয় রূপে উল্লেখ করে বলা হয়, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রকাশ্যে এটা স্বীকার করে নিয়ে ‘কোনো অবস্থাতেই তা সহ্য করা হবে না’ বলে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে। ২০১৩ সালের হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু নিবারণ আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে যারা তালিকাভুক্ত রয়েছে, তার বাইরেও রাষ্ট্রের অন্য যেকোনো কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বিধানটি কার্যকর করা এবং নির্যাতনের জন্য তার ব্যক্তিগতভাবে অপরাধের দায় বহন নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও এতে বলা হয়েছে।

এতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায় বা ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ নিশ্চিত করারও আহ্বান জানানো হয়। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর বদলে অপরাধ তদন্তে বৈজ্ঞানিক বা ফরেনসিকস অনুসন্ধানকে গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়ে কমিটি হেফাজতে নেয়া স্বীকারোক্তিকে আইনগতভাবে গ্রহণ না করার কথাও বলেছে। নির্যাতনের অভিযোগ যথাযথ বা পর্যাপ্তভাবে তদন্ত না হওয়ার বিষয়ে কমিটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নির্যাতন ও গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবারের অভিযোগ গ্রহণে পুলিশ প্রায়ই অস্বীকৃতি জানায় বলে প্রকাশিত খবরগুলোয় উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিটি বলেছে, তারা আরো বেশি উদ্বিগ্ন এ কারণে যে, অভিযোগকারী পরিবারগুলোকে পরে হুমকি, হয়রানি ও প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের শিকার হতে হয়। ২০১২ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন যে ৭৭টি নির্যাতনের অভিযোগ পেয়েছে, সেগুলোর মধ্যে শুধু আলোকচিত্রী শহিদুল আলম ছাড়া আর কোনো অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার তথ্য দেয়নি বলে কমিটি হতাশা প্রকাশ করেছে। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা শহিদুল আলমের শরীরে বড় কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলায় তাঁকে নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত বন্ধ করে দেয়ায় কমিটি দুঃখ প্রকাশ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের বিষয়ে সরকার যেসব তথ্য দিয়েছে, তাতে সবচেয়ে গুরুতর শাস্তি চাকরিচ্যুতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে পদাবনতিকে গুরুতর অপরাধের জন্য প্রাপ্য সাজার ‘উপযুক্ত নয়’ বলে কমিটি মন্তব্য করেছে। কমিটি এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাইরে একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থা প্রতিষ্ঠা, নির্যাতনের শিকার এবং সাক্ষীদের কার্যকর সুরক্ষা দিতে দ্রুত আইন প্রণয়ন, নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের সময় বেঁধে দেয়া এবং নির্যাতনের অভিযোগে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য চিকিৎসকদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও ইস্তাম্বুল প্রটোকল অনুযায়ী নির্দেশনা অনুসরণের সুপারিশ করেছে। অঘোষিত আটক, যাকে কমিটি আনঅ্যাকনলেজড ডিটেনশন বা অন্তর্ধান হিসেবে বর্ণনা করেছে, সে ব্যাপারে কমিটি বলেছে, এ রকম ব্যক্তিকে হত্যা করা হোক অথবা তিনি আবার ফিরে আসুনÑ যেটাই হোক না কেন, তাকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘গুম’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অহরহই গুমের ঘটনা ঘটছে, এমন বক্তব্যকে সরকারের পক্ষ থেকে অস্বীকার করে এগুলোকে ভুয়া বা মিথ্যা অভিযোগ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

একমাত্র নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনাকে সরকারের প্রতিনিধি দল স্বীকার করে নিলেও কক্সবাজারের একরামুল হক, সাতক্ষীরার শেখ মোখলেসুর রহমানসহ অন্যদের গুম হওয়ার অভিযোগগুলো তদন্ত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরকার কোনো তথ্য দেয়নি বলে উল্লেখ করে কমিটি হতাশা প্রকাশ করেছে। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশনের গুমবিষয়ক কমিটি বাংলাদেশে গুমের ঘটনা অনেক ঘন ঘন ঘটছে বলে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, সে বিষয়টিও চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে। র্যাবের বিরুদ্ধে নির্যাতন, নির্বিচার গ্রেফতার, অঘোষিত আটক, গুম এবং তাদের হেফাজতে থাকাকালে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে বলে কমিটি উল্লেখ করেছে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটিকে ‘ব্যতিক্রম’ অভিহিত করে পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এ ধরনের আইন লঙ্ঘনের জন্য র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি তদন্ত ও বিচার হয়নি। কমিটি বলেছে, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর আইন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অ্যাক্টের ১৩ নম্বর ধারায় যে সরল বিশ্বাসের বিধান রয়েছে, তা কার্যত বাহিনীগুলোকে নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার ক্ষেত্রে দায়মুক্তি দিয়েছে। র্যাবের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠন এবং তদন্তকারীদের হয়রানি ও হুমকি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে কমিটির সুপারিশে। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য র্যাবে প্রেষণে পাঠানোর চর্চা বন্ধ করারও সুপারিশ করা হয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়া বা রিমান্ডের ক্রমবর্ধমান চর্চার বিষয়েও কমিটি উদ্বেগ জানিয়েছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর ওপর সহিংসতার বিষয়ে কমিটি স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। একই সাথে, তারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিধান বাতিলের সুপারিশ করেছে। ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বাইরের অন্য কারো সহিংসতার ঘটনাগুলোও তদন্ত ও বিচারের কথা এ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিষয়ে সরকারি প্রতিনিধি দলের ব্যাখ্যায় দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করা হলেও কমিটি ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের জন্য তাকে হয়রানি ও দেশত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নির্যাতন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সমালোচনা করার জন্য মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হওয়ার ঘটনায় কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিটির পর্যালোচনা সভায় আইনমন্ত্রী এ ধরনের কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার যে অঙ্গীকার করেছেন, তাকে স্বাগত জানিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং বিদেশী অনুদান আইনগুলোর রাষ্ট্রবিরোধী ও দেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করার মতো বিধানগুলো বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। নির্যাতনবিরোধী সনদের অপশনাল প্রটোকল অনুমোদন এবং বিভিন্ন বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন নয়জন বিশেষজ্ঞ বা স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ারকে বাংলাদেশে সফরের আমন্ত্রণ জানানোরও অনুরোধ জানিয়েছে কমিটি।

পত্রিকায় প্রকাশিত এসব সুপারিশের প্রতি নাগরিক সাধারণের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। ন্যায় ও সত্যের স্বার্থে সরকার সুপারিশগুলো গ্রহণ করবে বলে দেশের মানুষ আশা করে। 
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 


আরো সংবাদ