১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সুদানে ক্ষমতা ভাগাভাগির পর কী?

সুদানে ক্ষমতা ভাগাভাগির পর কী? - ছবি : সংগ্রহ

মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশ, সুদানে ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি সম্পন্ন করেছে সম্প্রতি ক্ষমতা দখলকারী ট্রানজিশনাল মিলিটারি কাউন্সিল বা অন্তর্বর্তীকালীন সামরিক পরিষদ (টিএমসি) এবং গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনকারী অ্যালায়েন্স ফর ফ্রিডম অ্যান্ড চেঞ্জ বা গণতন্ত্র ও পরিবর্তনকামী জোট। তিন বছরের একটি অন্তর্বর্তী সময়ে ১১ সদস্যের সামরিক-বেসামরিক প্রতিনিধি সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি সার্বভৌম পরিষদ গঠনের ব্যাপারে তারা একমত হয়েছেন। ইতোমধ্যে ১১ সদস্যের ‘সার্বভৌম’ পরিষদের পাঁচজন বেসামরিক সদস্য মনোনীত করেছেন আন্দোলনকারী প্রফেশনাল গ্রুপগুলো, যার মধ্যে একজন নারী ও একজন সাংবাদিক রয়েছেন। আর পাঁচজন সদস্য নির্বাচন করবে সামরিক পরিষদ যাদের সবাই সশস্ত্রবাহিনী শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা। একজন কপ্টিক খ্রিষ্টান বিচারপতি উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। প্রথম দেড় বছর পরিষদের নেতৃত্ব দেবেন সামরিক কাউন্সিল প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আবদেল রহমান বুরহান। এ সময় অর্থনীতিবিদ আবদুল্লাহ হামদুক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ৩ বছর সময়ের শেষার্ধে সরকারের নেতৃত্ব দেবেন বেসামরিক ব্যক্তি। তখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন সামরিক প্রতিনিধি।
প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকবে সামরিক প্রতিনিধিদের হাতে।
সামরিক কাউন্সিলের পক্ষে এর প্রধান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আবদেল রহমান বুরহানের উপস্থিতিতে দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি মুহম্মদ হামদান ‘হেমতি’ দাগোলো এবং গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারীদের স্বাধীনতা ও পরিবর্তনের জোটের পক্ষে আহমেদ আল-রাবি এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। সুদানের সবচেয়ে কার্যকর শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত সৌদি-আমিরাত ঘনিষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা মুহম্মদ হামদান ‘হেমতি’ দাগোলো চুক্তির শর্তাবলি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি ১১ সদস্যের পরিষদের অন্যতম সদস্য।

সুদানে সামরিক-বেসামরিক প্রতিনিধিদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির এই চুক্তি সম্পাদনে আন্দোলনকারীরা আপাতত তাদের সাফল্যই দেখতে পেয়েছেন। তবে সামরিক পরিষদে নেতৃত্ব দানকারীরা অতীতে যেসব প্রতিশ্রুতি আন্দোলনকারীদের দিয়েছিলেন তার বেশির ভাগই রক্ষা করেননি, বরং মিসরের ‘রাবা স্কোয়ার’ স্টাইলে শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমাতে গিয়ে শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটিয়েছেন। ফলে আফ্রিকান ইউনিয়ন ও অন্যান্য কূটনৈতিক অংশীদারদের মধ্যস্থতায় ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি সম্পন্ন হলেও তিন বছরের অন্তর্বর্তী সময়ের পর সত্যিকার অর্থে সুদানে গণতন্ত্র আসবে কি না তাতে সংশয় রয়ে গেছে।

প্রায় তিন দশক ধরে উত্তরপূর্ব আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ দেশ সুদানে ওমর আল বশির ক্ষমতায় ছিলেন। ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি আঞ্চলিক শক্তি সৌদি আরব ও তুরস্কের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। এমনকি সৌদি আরব ইয়েমেনে হাউছি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করলে সুদান সেখানে সামরিক বাহিনী দিয়ে সহায়তাও করেছে। তবে জেনারেল বশির সৌদি-আমিরাতের পরামর্শে দেশটির ইসলামিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে সম্মত হননি। মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ সিসি ক্ষমতা দখলের পর মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক দমনপীড়ন শুরু করেন। এতে ব্রাদারহুডের অনেক নেতাকর্মী সুদানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। সৌদি আরব-আমিরাত ও মিসরের চাপ ছিল ব্রাদারহুড নেতাকর্মীদের মিসরের হাতে তুলে দেয়ার জন্য। জেনারেল বশির তাতে সাড়া না দেয়ায় সৌদি-আমিরাত বলয়ের সাথে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এই অবনতি আরো জোরালো হয় তুরস্কের সাথে সুদানের বেশ ক’টি কৌশলগত চুক্তি সম্পাদনের পর। এর পর থেকে সৌদি-আমিরাত-মিসর বলয় ইসরাইলের সহযোগিতায় সুদানে বশিরের দীর্ঘদিনের সরকার পরিবর্তনের জন্য কাজ শুরু করে। গত ১১ এপ্রিলের সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়ার একটি পর্ব সম্পন্ন হয়েছে।

এই অভ্যুত্থানে জেনারেল বশির ক্ষমতাচ্যুত হলেন। কিন্তু তাতে প্রাথমিকভাবে সৌদি-আমিরাত বলয় যাদের ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছিলেন, তারা সামনে আসেননি। কয়েক দিনের মধ্যে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ বুুরহান ক্ষমতা দখলকারী সামরিক পরিষদের নেতৃত্বে আসেন। তখন ইসলামিস্ট হিসেবে পরিচিত শতাধিক সামরিক কর্মকর্তাকে তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। পাল্টা অভ্যুত্থানের প্রথম দফা এই পরিবর্তনের পর আরেক দফা সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার খবর প্রচার করা হয়েছিল। এই অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত বলে উল্লেখ করে আরো কয়েক শ’ সেনা কর্মকর্তাকে সশস্ত্রবাহিনী থেকে সরিয়ে দেয়া হয়।

তবে সুদানি সেনাবাহিনীতে সৌদি-আমিরাত-মিসর বলয়ের কর্মকর্তারা ক্ষমতা সুসংহত করতে সক্ষম হলেও রাজপথে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে তারা দমন করতে পারেননি। জেনারেল বশিরের তিন দশকের শাসন চলাকালে সুদানের পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব চলে যায় বাম সংগঠনগুলোর হাতে। বশিরের শাসনের বিরুদ্ধে যে গণ-আন্দোলন ও সড়ক অবস্থানের আয়োজন করা হয়, তাতে উম্মাহ পার্টির মতো কিছু ডান ঘরানার দলের অংশগ্রহণ থাকলেও নেতৃত্ব ছিল কমিউনিস্ট পার্টিসহ বাম ঘরানার রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর হাতে। তারা ক্ষমতা থেকে বশির ও তাকে সমর্থনকারী ইসলামী দলকে বিদায় করার পাশাপাশি আবার যাতে সামরিক একনায়কত্ব চেপে না বসে সে জন্যও সক্রিয় ছিল। এ কারণে বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সামরিক পরিষদ তিন বছরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বেসামরিক শাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তাতে আস্থা স্থাপন করেনি আন্দোলনকারীরা; বরং তারা অন্তর্বর্তী বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দাবি জানায় এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখে।

সৌদি-আমিরাতপন্থী সেনা কর্মকর্তারা ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে চলে আসার পর থেকে দেশ দু’টি পরিস্থিতি আরো নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে সুদানের সেনা নেতৃত্বকে উদারভাবে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সহায়তা দিতে থাকে। অন্য দিকে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বাম পেশাজীবীদের পাশাপাশি ইসলামিস্টদের অংশগ্রহণও বাড়তে থাকে। এতে করে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চলার মতো অভিযান চালানোর পরও আন্দোলন দমন করা সম্ভব হয়নি। আর শেষ পর্যন্ত সামরিক পরিষদ আন্দোলনকারীদের সাথে একটি চুক্তিতে আসতে বাধ্য হয়। এই চুক্তিতে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী, আফ্রিকান ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ এবং আঞ্চলিকভাবে প্রভাবশালী দেশগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। সৌদি-আমিরাত-মিসরের প্রতিনিধির পাশাপাশি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও খার্তুমে ছিলেন এ সময়।

অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সৌদি আরব-আমিরাত-মিসর তাদের সমর্থনপুষ্ট সেনা কর্মকর্তাদের দিয়ে দেশটির সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন থেকে ইসলামিস্টদের প্রভাব মুছে দেয়ার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বাম পেশাজীবীদের প্রাধান্য থাকলেও খুব সহজে সেটা সম্পন্ন করা যাবে কি না সন্দেহ রয়েছে।
তবে সার্বভৌম পরিষদ ক্ষমতাচ্যুতে ওমর বশিরের দলকে নিষিদ্ধ করতে পারে। তার বিচার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। কিন্তু এই দলের নেতাকর্মী-সমর্থকেরা নতুন দল গঠন অথবা পুরনো কোনো দলে যোগদান করে রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে যেতে পারেন। এর মধ্যে সুদানের সামনে যে অর্থনৈতিক সঙ্কট ও ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব রয়েছে, তাতে অন্তর্বর্তী সরকারের জনসমর্থন একপর্যায়ে কমতে শুরু করবে। এতে ইসলামী দলগুলো আবার তাদের প্রভাব সৃষ্টির সুযোগ পেতে পারে। আর এতে করে পরবর্তী নির্বাচনে ইসলামিস্টরা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন।

আরব দেশগুলোর সাধারণ জনমতের মধ্যে ইসলামিস্টদের বিশেষ প্রভাব সব সময় সক্রিয় বিদ্যমান। তবে ওমর আল বশিরের আমলে, ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল দক্ষিণ সুদান স্বাধীন হয়ে যাওয়ার কারণে অর্থনৈতিকভাবে বেশ চাপে পড়ে যায় দেশটি। এটি ওমরের গ্রহণযোগ্যতাকে বেশ খানিকটা কমিয়ে দেয়। অন্য দিকে, সুদানের সাথে মিসরের সীমান্ত বিরোধের পাশাপাশি নীল নদের পানি বণ্টন নিয়েও বিরোধ রয়েছে। এই বিরোধে ইথিওপিয়া ও সুদানের অবস্থান মিসরের বিপরীতে। ফলে সুদানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে জনগণের মতামত মিসর-সৌদি-আমিরাতের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা কমই। এ কারণে সৌদি-আমিরাত বলয় সুদানে নির্বাচনের পরিবর্তে সামরিক একনায়কত্বের ক্ষমতা সুসংহত করার ব্যাপারে অধিক আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এ প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ভবিষ্যতে সফল হবে, এমন লক্ষণও নেই।
এর ফলে সুদানে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ থাকলেও সম্ভাবনাও একেবারে কম নয়। এ ক্ষেত্রে তিউনিসিয়ায় গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ব্যাপারে যে ইতিবাচক উন্নয়ন ঘটছে সেটি উদাহরণ হিসেবে কাজ করতে পারে। এর বিপরীতে, মিসরে জেনারেল সিসি যে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন দেশটিতে চাপিয়ে দিয়েছেন, সেটিকে সুদানের জনগণ ইতিবাচকভাবে দেখে না।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সুদানের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশটির অভ্যন্তরীণ নানা ফ্যাক্টরের ভূমিকা থাকলেও আঞ্চলিক রাজনীতিরও রয়েছে বড় প্রভাব। সুন্নি আরব দেশগুলোতে ক্ষমতার প্রধানত দু’টি কেন্দ্রবিন্দু সৃষ্টি হয়েছে। একটির নেতৃত্বে রয়েছে সৌদি আরব-সংযুক্ত আরব আমিরাত। আর অন্যটিতে রয়েছে তুরস্ক-কাতার। ওমান-কুয়েতের মতো কয়েকটি দেশ আরব রাজনীতির ব্যাপারে কিছুটা মধ্যবর্তী অবস্থান বজায় রাখে। এর বাইরে ইরানের নেতৃত্বাধীন শিয়া মুসলিম শক্তিরও বিরাট প্রভাব রয়েছে। সৌদি-আমিরাত-ইসরাইল বলয়ের সাথে ইরানের বৈরিতা প্রত্যক্ষ হলেও তুরস্ক-কাতারের সাথে বন্ধুত্ব ও বৈরিতার মাঝামাঝি এক ধরনের সম্পর্ক রয়েছে।

এসব হিসাব-নিকাশের মধ্য দিয়ে সুদানের দ্বিতীয় পর্বের আরব বসন্তের যে আপাত সাফল্য দেখা যাচ্ছে, তা টেকসই হলেও বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। আর মধ্যপ্রাচ্যে কার্যকর গণতন্ত্র দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিকে নিশ্চিত করতে পারে। তবে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কেউ কেউ কোনোভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের চর্চা দেখতে চায় না। সামরিক বা অন্য কোনো অবয়বে একনায়কত্বের মধ্যে তারা নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত হতে পারে বলে মনে করেন। আর এটিই হতে পারে সুদানে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পথে প্রধান প্রতিবন্ধকতা।
[email protected]

 


আরো সংবাদ