১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মহররমের বাণী : ত্যাগের আহ্বান

-

মহররম এবং অভিন্ন হিজরি ক্যালেন্ডার
চারটি বুধবার কলাম লিখতে পারিনি; তার জন্য দুঃখিত। নতুন হিজরি বছরে আবার লেখা শুরু করলাম। মহররম এসে গেছে। পাঠক এই কলাম পড়ছেন বুধবার ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে। বাংলাদেশের হিসাবে ৪ মহররম, ১৪৪১ হিজরি। সৌদি আরব ও অন্য অনেক দেশে, বাংলাদেশের সাথে, হিজরি বা ইসলামী ক্যালেন্ডারে এক-দুই দিনের পার্থক্য আছে। বিজ্ঞানের তথা অ্যাসট্রোনোমির বা জ্যোতিবিজ্ঞানের বা নভোমণ্ডলের বিজ্ঞানের উৎকর্ষের যুগে, আমাদের এই বিষয়টির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশের অনেক মনীষী প্রস্তাব দিয়েই চলছেন যে, মুসলিম বিশ্বে এক ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা উচিত। আবার কিছু মনীষী এর বিপক্ষে। তাই এ বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন এবং সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

ইবাদতের জন্য মুসলমানদের সময়সূচি
পৃথিবীতে যতগুলো দেশ আছে তথা যতগুলো দেশ জাতিসঙ্ঘের সদস্য, তাদের বেশির ভাগ দেশেই মুসলমান আছে- কম হোক বেশি হোক। কিছু দেশ আছে যার জনসংখ্যায় মুসলমানদের প্রাধান্য, যেমন ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া প্রভৃতি। এ গুলোকে ‘মুসলিমপ্রধান’ দেশ বা মুসলিম রাষ্ট্র বলা হয়। আর কিছু দেশ আছে যেগুলোতে মুসলমান জনসংখ্যা বিরাট কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ বা মেজরিটি নয়; এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ ভারত। এগুলো ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কম বা বেশি সংখ্যক হোক, মুসলমান জনসংখ্যা আছেই। সুতরাং সব দেশের সব মুসলমানকেই, দ্বীন ইসলামের বড় বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা দিবসগুলো পালন করার জন্য ক্যালেন্ডারের শরণাপন্ন হতে হয়। মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর তারিখ বা ইবাদতের দিন-রাতগুলোর তারিখ বা পবিত্র দিন-রাতগুলোর তারিখ স্থির হয় চান্দ্র পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডারের ওপর ভিত্তি করে। অপরপক্ষে মুসলমানদের কিছু দৈনিক ধর্মীয় কাজ তথা ইবাদত সূর্যের সময়সূচির ওপর নির্ভর করে হয়; যথা- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও রমজান মাসের ও অন্য যেকোনো সময়ের রোজা। ইসলামের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের অন্যতম বা চতুর্থটি হলো হজ। এটি অনুষ্ঠিত হয় চান্দ্রবর্ষের শেষ মাস তথা জিলহজ মাসের ৯ তারিখ।

১০ মহররম
এই মহররম মাসের ১০ তারিখ দ্বীন ইসলামের ইতিহাসের নিরিখে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকারের আঙ্গিকেও গুরুত্বপূর্ণ। সত্য ও মিথ্যার সঙ্ঘাতের দিক দিয়েও গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের কল্যাণে আত্মত্যাগের আঙ্গিকেও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অনেকেই এই দিকগুলো প্রসঙ্গে সচেতন নই। তাই সংক্ষিপ্তভাবে শুধু একটি আঙ্গিক উপস্থাপন করছি; যথা ১০ মহররম কারবালার ময়দানের ঘটনা। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত মহররম কবিতাটি, যাদের পক্ষে সম্ভব, তাদের পড়ার আহ্বান জানাচ্ছি। স্থানের অভাবে এখানে এই কলামে সেই বিখ্যাত মর্মস্পর্শী কবিতাটি উদ্ধৃত করছি না।

জিলহজের পর মহররম : শোকের মাস
খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের ৩১ ডিসেম্বর নিয়ে আমরা অপ্রয়োজনীয় হই চই করি, অথবা বাংলা বর্ষপঞ্জির পহেলা বৈশাখকে নিয়ে আমরা যতটুকু আনুষ্ঠানিকতা করে থাকি, সেই তুলনায় আমরা হিজরি বছরের আগমন ও প্রস্থান নিয়ে বলতে গেলে কোনো আওয়াজই দিই না। এ বিষয়ে আমার মন্তব্য হলো, এটা চাপিয়ে দেয়ার কোনো বিষয় নয়, মনের আগ্রহের বিষয়। যার ইচ্ছা ডিসেম্বরের শীতের রাতে জেগে থাকবেন, যার ইচ্ছা বৈশাখ মাসের গরমের দিনে ব্যস্ত থাকবেন, যার ইচ্ছা মহররমের রাতে ইবাদত করবেন, বা যার ইচ্ছা সচেতনভাবে ইতিবাচকভাবে সবগুলো দিনে বা রাতেই কোনো না কোনো অবদান রাখবেন। চলমান মাসটি হলো ১৪৪১ হিজরি সালের প্রথম মাস, মহররম; শোকের মাস। বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মানসপটে শোকের মাস হচ্ছে মহররম। বিদ্যমান সরকার কর্তৃক উৎসাহিত, পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত ধর্মনিরপেক্ষ আবহে, বাংলাদেশের মুসলমানেরা এই শোকের মাস তথা মহররমকে কিভাবে বরণ করবে বা কিভাবে পালন করবে বা শোকের ঐতিহাসিক ঘটনাবলিকে কিভাবে স্মরণ করবে, সেটা মুসলমান জনগণের নিজস্ব ব্যাপার। আমার প্রস্তাব, আমাদের আগ্রহী এবং সক্রিয় হওয়া খুব প্রয়োজন।

আমাদের আহ্বান : প্রসঙ্গ মহররম
আমার লেখা (বাংলা ভাষায়) একটি বইয়ের নাম ‘ব্যাটেলস অব ইসলাম’ অর্থাৎ ইসলামের যুদ্ধগুলো। এখানে ১৩টি অধ্যায় আছে, অর্থাৎ ১৩টি যুদ্ধের আলোচনা বা বিশ্লেষণ আছে। সর্বশেষ অধ্যায়টি ‘কারবালার যুদ্ধ’ প্রসঙ্গে। অতি সম্প্রতি বইটির সরবরাহ শেষ হয়ে গেছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে বইটির নতুনভাবে দেয়া প্রচ্ছদসহ বাঁধাই করা সংস্করণ বাজারে আসবে, নতুন প্রকাশকের কাছ থেকে। বইটি একান্তভাবেই আমার পক্ষ থেকে মুসলিম উম্মাহর প্রতি খেদমত হিসেবে নিবেদিত। বইটি থাকলে পাঠক অধ্যায়টি পড়তে পারতেন। আহ্বান জানাব, অন্ততপক্ষে এই কলামের পাঠকদের প্রতি আহ্বান রাখব এবং তাদের মাধ্যমে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, শুভাকাক্সক্ষীদের কাছে আহ্বান রাখব, যেন তারা এবং আমরা সবাই ১০ মহররম সম্পর্কে সচেতন হই। ১৩৮১ চন্দ্রবর্ষ (তথা হিজরি বর্ষ) আগে, তথা ৬১ হিজরি সালের মহররম মাসের ১০ তারিখ, ইরাকের কারবালার প্রান্তরে যে শোকাবহ ঘটনা ঘটেছিল, সেটা যেন আমরা স্মরণ করি, তা নিয়ে আমরা আলোচনা করি, সেটা থেকে আমরা যেন শিক্ষা নেয়ার চেষ্টা করি। নিরেট ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা স্মরণ করতে চেষ্টা করি যে, মহান আল্লাহ তায়ালার প্রিয়তম বন্ধু, বিশ্ব মানবতার কাণ্ডারি, কল্যাণের ধারক, বাহক ও প্রতীক, হজরত মুহাম্মদ সা:-এর আপন দৌহিত্র ইমাম হুসাইন রা: ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ৭২ জন পারিবারিক সদস্য (আহলে বাইত) একই স্থানে শত্রুর হাতে প্রাণ দিয়েছিলেন, তথা শাহাদত বরণ করেছিলেন। এ ঘটনার জাগতিক বা শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গিগত বিশ্লেষণ যেমন আছে, তেমনি আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গিগত বিশ্লেষণও আছে। আমরা জাগতিক বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ থাকব।

কারবালা নিয়ে কিছু কথা ও সফর
ইমাম হুসাইন রা: ইরাকের তৎকালীন কুফা নগরীর মানুষের আহ্বানে কুফার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু কুফাবাসী, তৎকালীন স্বৈরাচারী অত্যাচারী শাসক ইয়াজিদের প্রলোভনে বা নিপীড়নের মুখে, ইমাম হুসাইন রা:-এর পাশে এসে দাঁড়াতে পারেননি বা দাঁড়াননি। ইয়াজিদের পক্ষ থেকে কারবালার ময়দানে উপস্থিত সেনাপতি, ইমাম হুসাইন রা:কে বারবার আহ্বান জানান, ইয়াজিদের বশ্যতা স্বীকার করতে বা ইয়াজিদকে খলিফা মেনে বায়াত নিতে এবং এর বিনিময়ে বহু জাগতিক সম্পদ ও মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারসমূহ গ্রহণ করতে। কিন্তু রাসূল সা:-এর দৌহিত্র, এই আহ্বান ও প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করেন; তিনি সত্যের পথে অটল থাকেন; এবং তাঁর সঙ্গী শিশু থেকে প্রবীণ পর্যন্ত সবাই একে একে শাহাদত বরণ করেছিলেন। ২০০২ সালে দুইবার, তৎকালীন ইরাক সরকারের আমন্ত্রণে, দু’জন সহকর্মী বা বন্ধুসহ ইরাক সফর করার সুযোগ পেয়েছিলাম; মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি এ জন্য অশেষ শুকরিয়া। মুসলিম বিশ্বের কাছে বিশেষত দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায়, আওলিয়াকুল-শিরোমণি বা বড়পীর হিসেবে সম্মানিত ও পরিচিত, গাউসুল আজম হজরত শেখ মহিউদ্দিন আবদুল কাদির জিলানী রহ:-এর সমাধি জিয়ারত, নাজাফ শহরে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী রা:-এর সমাধি জিয়ারত এবং কারবালায় শহীদদের সমাধি জিয়ারতের সুযোগ পেয়েছিলাম; শোকর আলহামদুলিল্লাহ। জিয়ারতের মাধ্যমে আত্মোপলব্ধির সুযোগ এসেছিল। ৬১ হিজরির কারবালার ময়দান ফোরাত নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। ২০০২ সালের কারবালা একটি বড় শহর, ফোরাত নদীর তীরেই। ২০০৩ সালে আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করেছিল, এর জের ধরে পরে সাদ্দাম নিহত হয়েছিলেন। ২০০২ সালের ইরাক এবং আজকের ইরাক এক নয়।

মুসলিম বিশ্বের হালচাল
এবার নতুন হিজরি বছর আসার আগেই আমরা বলতে পারি যে, বিশ্বের মুসলমানেরা যদি উম্মাহ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে সেই উম্মাহ কোনো মতেই শান্তিতে ও আনন্দে নেই। মুসলিম বিশ্বের চারটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ যথা সৌদি আরব ও ইরান, সৌদি আরব ও কাতার এবং সৌদি আরব ও ইয়েমেন পরস্পরের সাথে কঠোর বৈরী সম্পর্কে লিপ্ত। সৌদি আরব ও ইয়েমেন নামক দুটি দেশ পারস্পরিকভাবে যুদ্ধে লিপ্ত। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ মিলিতভাবে কাতার নামক আরেকটি মুসলমান আরব দেশের সাথে বৈরী সম্পর্কে লিপ্ত। তুরস্ককে কেন্দ্র করে মুসলিম দেশগুলো দ্বিধাবিভক্ত; একভাগ মনে করছে তুরস্কের প্রতি সহানুভূতি দেখালে আমেরিকা অসন্তুষ্ট হবে; অন্য ভাগ মনে করছে, তুরস্কের প্রতি সহানুভূতি দেখানোই ঈমানী দায়িত্ব। গত ৭০ বছরে বিশেষ করে গত ৩৮ বছরে ইসরাইলের প্রতি মুসলমান দেশগুলোর মনোভাব ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়ে ইসরাইলের অনুকূলে চলে যাচ্ছে; সর্বশেষ, সৌদি আরব ইসরাইলকে বন্ধু হিসেবে মেনে নিয়েছে। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি বিবিধ প্রকারের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমস্যা মোকাবেলা করতে করতে এ পর্যন্ত এসেছে। ফিলিস্তিনের মুসলমানেরা ইসরাইলি আগ্রাসনের এবং নির্যাতনের চরম শিকার। অতি সম্প্রতি কাশ্মিরকে নিয়ে ভারতের আনুষ্ঠানিক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে; কাশ্মিরের জনগণ চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের মুখে পড়েছে; কাশ্মিরি জনগণের স্বাধীন দেশ হিসেবে বেঁচে থাকার প্রকাশ্য বা সুপ্ত সব ধরনের আকাক্সক্ষা এখন দমনের মুখে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি মুসলিম বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রের সাথেই নিবিড়ভাবে জড়িত নয়, আবার দৃশ্যমানভাবে দূরত্বেও নয়; পাকিস্তান ছাড়া। বস্তুত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার প্রতি নিবদ্ধ এবং দৃশ্যমান কোনো বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে নেই। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা মুসলমান। মালয়েশিয়া নামক রাষ্ট্রটি ১৮ বছর আগে মুসলিম বিশ্বের অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্ব দিয়েছিল; এখন সেই স্থানটি তুরস্ক পূরণ করার চেষ্টা করছে। পৃথিবীব্যাপী, পাশ্চাত্যে দেশসমূহে এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতে ঘোষিতভাবে হোক বা অঘোষিতভাবে হোক মুসলিমবিদ্বেষী আবহ বিরাজমান। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ১১ তারিখ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক মহানগরীতে আত্মঘাতী প্রচণ্ড হামলায় টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর থেকে মুসলিমবিদ্বেষী পরিবেশ সৃষ্টি হতে থাকে এবং মুসলমানদের অতি ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্ন একটি অংশ, তাদের প্রতিক্রিয়ায়, অনেক ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক বা উগ্র হতে থাকে। ফলে পরিস্থিতি ঘোলাটে ও উত্তপ্ত। বাংলাদেশও ‘গরম-ঠাণ্ডা-গরম-ঠাণ্ডা’ এরকম ধারাবাহিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সময় কাটিয়েছে বা কাটাচ্ছে। বাংলাদেশ কেন ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ রাষ্ট্র হচ্ছে না, এজন্য বহুলোকের প্রাণান্তকর প্রশ্ন আছে। অথবা সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম ঘোষিত হওয়ার পরও, ইসলামী রেওয়াজের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বহু কিছু রাষ্ট্রীয় আচার-আচরণে কেন বিদ্যমান, এটা নিয়েও প্রাণান্তকর প্রশ্ন আছে। এ ক্ষেত্রে সন্তোষজনক ভারসাম্য আনয়নের প্রচেষ্টা দৃশ্যমান নয়।

আমি, আমরা এবং বাংলাদেশের রাজনীতি
আমার ব্যক্তি পরিচয়ে ছয়টি আঙ্গিক প্রণিধানযোগ্য। এক. মহান আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে আমি মানবজাতির অংশ হিসেবে একজন মানুষ তথা আরবি পরিভাষায় তথা কুরআনের পরিভাষায় একজন ইনসান; এটা আমার প্রথম পরিচয়। ইনসান হিসেবে আমার দায়িত্ব দ্বিমুখী, সৃষ্টিকর্তার প্রতি এবং সৃষ্টির প্রতি। দুই. আমার দ্বিতীয় পরিচয় হলো- আমি একজন মুসলমান; মুসলমান হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন গুরুত্বপূর্ণ। তিন. আমার তৃতীয় পরিচয় আমি একজন বাঙালি; বাঙালি জাতির একজন সদস্য হিসেবে, আমার আবেগ ও অনুভূতি লঙ্ঘনের অবকাশ নেই। চার. আমার চতুর্থ পরিচয়, আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আনয়নের লক্ষ্যে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধা; ওই সুবাদে আমার অন্তরে লালিত মুক্তিযুদ্ধের আদি ও অকৃত্রিম চেতনাগুলো এখনও পৃষ্ঠপোষকতার দাবি রাখে। পাঁচ. আমার পঞ্চম পরিচয় আমি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত ও প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের একজন নাগরিক তথা একজন বাংলাদেশী; বাংলাদেশী হিসেবে বাংলাদেশের খেদমতে ও সেবায় নিজেকে অতীতে যেমন নিয়োজিত রেখেছি তেমনি বর্তমানে নিয়োজিত রাখতে চেষ্টা করছি। ছয়. এভাবে নিজেকে নিয়োজিত রাখার প্রক্রিয়াতেই, আমার পরিচয়ের ষষ্ঠ আঙ্গিক হলো, আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী এবং বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান। এর ঘোষিত নীতিবাক্য (ইংরেজি পরিভাষায়, মটো) হলো : ‘পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি’। আমরা দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন চাই। তার জন্য আমাদের বিকশিত হতে হবে, জনগণের কাছে আমাদের পরিচিত হতে হবে এবং আমাদের নেতাকর্মীদের প্রস্তুত হতে হবে; এ জন্য মানুষের কাছে আমাদের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা প্রকাশ করতে হবে। এ পরিবর্তন শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আনতে চেষ্টা করতে হবে। তার জন্য গণতান্ত্রিক সব কর্মকাণ্ডে তথা রাজনৈতিক সব ধরনের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে হবে আমাদের দলকে এবং আমাকে। এ গুণগত পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়ায়, বাংলাদেশের জন্য আগামী মাসগুলো অতীব তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পক্ষগুলো যেন এই তাৎপর্য উপলব্ধি করে, সেই কামনা করছি। সেই কামনার সপক্ষে ভবিষ্যতে আরো বলার চেষ্টা করব।

সাংস্কৃতিক আহ্বান
নিকট অতীতে হঠাৎ বিখ্যাত হয়ে ওঠা শাহবাগ বা গণজাগরণ মঞ্চ এবং এর মাধ্যমে মুসলমানদের ঈমান-আকিদার ওপর আক্রমণ প্রসঙ্গে বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখেছি। ১৮ মার্চ ২০১৩ দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় লেখা কলামের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সভ্যতার সঙ্কট’! বাংলাদেশের তরুণ সমাজের একটি অংশ কী নিয়মে ধীরে ধীরে ধর্মবিরোধিতায় নেমেছে বা নাস্তিকতার পথে পা দিয়েছে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আজকে সময় এসেছে বাংলাদেশের সচেতন জনগণের (যাদের মনে ধর্মীয় মূল্যবোধের চেতনা কাজ করে), তাদের সবার একটি সমন্বিত চিন্তার মঞ্চে এক হওয়ার। বাকস্বাধীনতার নামে দ্বীন ইসলামের মূলনীতি সম্পর্কে এবং পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষদের প্রধানতম ব্যক্তিত্ব, হজরত মোহাম্মদ সা:কে নিয়ে কটুবাক্য করার কু রেওয়াজ বন্ধ করতে হবে। এই আন্দোলনে বা প্রচেষ্টায় আলেম সমাজ অগ্রণী ভূমিকা নেবেন এটাই আমাদের কামনা। আশা করি, আলেম সমাজের মধ্যে বিভিন্ন কারণে যে মতপার্থক্য আছে সেটাকে স্বাভাবিক মনে করে মেনে নিয়েই, অন্তত এ ইস্যুতে নিজ নিজ মঞ্চ থেকেই আন্দোলনে শরিক হওয়া যায় বা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায় অথবা জনগণের কাছে আবেদন রাখা যায়। সম্মানিত বিভিন্ন পীর-মাশায়েখের সম্মানিত মুরিদরা মহানবী সা:কে ভালোবাসেন। ‘বারো আউলিয়ার দেশ’ চট্টগ্রামে বা ৩৬০ আউলিয়ার দেশখ্যাত সিলেটে লাখ লাখ লোক তাদের মাজার সফর করেন শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিয়ে। খুলনা, রাজশাহী, রংপুর এবং ঢাকা মহানগরেও আল্লাহর আউলিয়াদের সমাধি আছে। লাখ লাখ মানুষের মনে যে রাসূলপ্রেমের শিখা জ্বলন্ত, সেটা বলার কোনো অপেক্ষা রাখে না। অতএব আমি (সাধারণ শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিত ব্যক্তি হলেও) মনে করি, ধর্মীয় মূল্যবোধের চেতনাকে বক্ষে ধারণ করতেই হবে। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও ধারণ করি। কিন্তু ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি যে, মুক্তিযুদ্ধ ও দ্বীন ইসলাম পরস্পরবিরোধী। অতএব, চিন্তার জগতে পথভ্রষ্ট তরুণ সমাজকে সঠিক ও সৎপথে ফেরত আনার জন্য চেষ্টা করতেই হবে এবং পথভ্রষ্টদের মধ্যে যারা আগ্রাসী, তাদের প্রতিরোধ করতে হবে- এটাই স্বাভাবিক। এই কাজ করতে গিয়ে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের চেতনা, দ্বীন ইসলামের মূল্যবোধের চেতনাকে এবং নেতৃস্থানীয় আলেম-ওলামাদের মধ্যে মতের পার্থক্যকে এলোমেলোভাবে মিশিয়ে ফেলা সমীচীন হবে না।

নতুন হিজরি বছরে পবিত্র কুরআনের আহ্বান
পবিত্র কুরআন এবং মহান আল্লাহর প্রিয়তম বন্ধু রাসূলুল্লাহ সা:-এর জীবনী অধ্যয়ন সম্পর্কে দু’টি কথা লিখছি। পবিত্র কুরআন আরবি ভাষায় লিখিত। কুরআনের ভাষাটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত। যেদিন পবিত্র কুরআনের প্রথম বাক্য নাজিল হয়েছিল, সেদিন থেকেই হুবহু আরবি ভাষায় কুরআন তেলাওয়াতের রেওয়াজ চালু হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা:-এর আমলেই অনেক কুরআনে হাফেজ ছিলেন। বর্তমানেও পবিত্র কুরআন হিফজ করার রেওয়াজ বহুল প্রচলিত এবং একটি সম্মানিত কাজ। কিন্তু পবিত্র কুরআন বুঝে বুঝে পড়ার তথা বোঝার জন্য অধ্যয়ন করার রেওয়াজ অনেক বেশি পুরনো নয়। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে, পবিত্র কুরআনের অনেক বঙ্গানুবাদ ও তাফসির গ্রন্থ পাওয়া যাচ্ছে। আমার মতো অনভিজ্ঞ লোকের পক্ষে সেসব বঙ্গানুবাদ বা তাফসির গ্রন্থ প্রসঙ্গে কোনো সমালোচনা করা অসম্ভব এবং অনাকাক্সিক্ষত। আমার কাছে সব অনুবাদই এবং সব তাফসির গ্রন্থই সম্মানজনক ও প্রিয়। বছরের কোনো না কোনো সময় মানুষ, কোনো না কোনো নতুন কর্মসূচি চালু করে; ব্যক্তি-জীবনের জন্য হোক বা পরিবারের জন্য হোক বা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য হোক। হিজরি নববর্ষের প্রাক্কালে, একটা আহ্বান রাখছি। যারা পবিত্র কুরআনের বঙ্গানুবাদ পড়েননি, তারা যেন আরবি ভাষায় তেলাওয়াতের পাশাপাশি বঙ্গানুবাদ পাঠ করেন এবং যাদের দ্বারা সম্ভব কোনো গুরুত্বপূর্ণ আয়াত পড়ার সময়, ওই আয়াতের তাফসির পাঠ করেন। ব্যক্তিগতভাবে নিজে বেশ কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থ ও তাফসির গ্রন্থের সাথে পরিচিত; কিন্তু কোনো একটিকে আমি এই মুহূর্তে সুপারিশ করছি না; যেটি হাতের কাছে পেতে সুবিধা, সেটা নিয়েই অধ্যয়ন শুরু করা ভালো। অধ্যয়নের অভ্যাসটি অন্তত চালু হোক। ১৪৪১ হিজরির প্রারম্ভে, দ্বিতীয় একটি আহ্বান রাখছি। বিশ্বনবী, মহানবী সা:-এর জীবনী পাঠ করা প্রসঙ্গে। সাম্প্রতিক দু’তিন দশকে বাংলা ভাষায় অনেক জীবনীগ্রন্থ রচিত হয়েছে; বিদেশী ভাষায়, যেমন আরবি বা ইংরেজি বা ফার্সি ভাষায় রচিত জীবনীগ্রন্থের অনুবাদ তো আছেই। এই কলামের যেসব সম্মানিত পাঠক, এ পর্যন্ত কোনো সময় রাসূলুল্লাহ সা:-এর জীবনীগ্রন্থ পাঠ করেননি, তাদের কাছে আমার আহ্বান, যেকোনো একটি জীবনীগ্রন্থ সংগ্রহ করুন এবং পাঠ করুন। সর্বশেষ সহায়ক প্রস্তাব; সম্পূর্ণ কুরআনের অনুবাদ, মাঝে মধ্যে তাফসিরসহ মনোযোগসহকারে পড়তে, এক বছর থেকে দুই বছর লেগে যেতে পারে, ব্যক্তিগত ব্যস্ততার ওপর নির্ভর করে। যে কোনো একটি জীবনীগ্রন্থ (সিরাত) মনোযোগসহকারে পড়তে পনেরো দিন থেকে দুই মাস লেগে যেতে পারে, ব্যক্তিগত ব্যস্ততার ওপর নির্ভর করে। তাই সময় ‘ম্যানেজ’ করে পড়ার আহ্বান রাখছি।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.);
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com


আরো সংবাদ

প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে, বাংলাদেশের টি-২০ স্কোয়াডে বড় পরিবর্তন কারমাইকেল কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন প্রশ্নে হাইকোর্টের রুল রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী এনআইডি : ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা অবশেষে ১৩ দিন পর ফিরছে বিএসএফের গুলিতে নিহত বাবুলের লাশ সন্তান জন্মের পর মানসিক সমস্যায় ভোগেন পুরুষরাও ভিকারুননিসার অধ্যক্ষ হিসেবে ফওজিয়ার যোগদানে বাধা নেই ময়মনসিংহে তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত শোভনকে নিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা মামুনের ফেসবুক স্ট্যাটাস সাঁতার কাটার পর সংক্রমণ, মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো শিশুটি আত্মহত্যা ঠেকাতে কীটনাশক নিষিদ্ধ চন্দনাইশে প্রতিবন্ধী যুবককে বলাৎকারের অভিযোগে মসজিদের ইমাম গ্রেফতার

সকল