২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

স্থান কাল পাত্রভেদে পরিবর্তনের স্বপ্ন

-

যারা বড় হয়েছিলেন, তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন
আজকের এই কলামে স্বপ্নের গুরুত্ব নিয়ে লিখছি। রাতে বা দিনে ঘুমে দেখার স্বপ্ন নয়, জীবন গড়ার স্বপ্ন, দেশ গড়ার স্বপ্ন প্রসঙ্গে বলব। আমি নগণ্য ব্যক্তি, এখন কী স্বপ্ন দেখি এবং সেটি কালক্রমে এই পর্যায়ে কিভাবে এলো তার একটু বর্ণনা দেবো। আরেকজন ব্যক্তি যিনি অতি বিখ্যাত, তার জীবনের হাজার কথা থেকে মাত্র দু’টি কথা উপস্থাপন করব। স্বপ্ন দেখা পাপ নয়, এটা বরং পুণ্য। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন বাঙালি জাতি তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীনতা এনে দেবেন। শহীদ জিয়া স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশকে গড়ে তুলবেন, নবতর রূপ দেবেন, জনগণকে জাগিয়ে তুলবেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা, চীনে মাও সে তুং, ইরানে ইমাম খোমেনি, ইসরাইলে মোশে দায়ান, কেনিয়ায় জোমো কেনিয়াত্তা, ভারতে মহাত্মা গান্ধী, ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্নÑ তারা সবাই স্বপ্ন দেখেছিলেন। নিজের কথা দিয়ে শুরু করি।

১৯৬২ সালে একজন কিশোরের স্বপ্ন
চিটাগং পোর্ট নর্থ কলোনির ভেতরে অবস্থিত প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস ফাইভ বা পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার জন্য অল্প দূরে চট্টগ্রাম বন্দর হাইস্কুলে ভর্তি হলাম। হাইস্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬০ সালে। জানুয়ারি ১৯৬২-তে ক্লাস এইটে প্রমোশন পেয়েছিলাম। ফেব্রুয়ারিতে তখনকার আমলের একমাত্র ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলাম। মার্চে লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। জুন মাসের কোনো একদিনে চূড়ান্ত ভাইভা (মৌখিক ইন্টারভিউ) ও মেডিক্যাল (অর্থাৎ শারীরিক) পরীক্ষার জন্য ক্যাডেট কলেজের হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রের পশ্চিমে বা সামনে উন্মুক্ত বাগানে শামিয়ানার নিচে উপস্থিত ছিলাম। পরীক্ষার্থীদের সবার বয়স ছিল ১১ থেকে ১৩-এর মধ্যে। অনেকের সাথেই অভিভাবক গিয়েছিলেন। সবাই শামিয়ানার তলায় ছিলাম। ওই আমলের কিশোর ইবরাহিমের দৃষ্টিতে ভীষণ স্মার্ট বা কেতাদুরস্ত, দুইজন সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ পোশাক পরা ভদ্রলোক সেখানে উপস্থিত হয়ে সবার সাথে আলাপচারিতা করলেন।

পরে জেনেছি, তারা ওই সময় একাদশ শ্রেণীতে পড়–য়া দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন ছিলেন। আমাদের মতো কিশোরদের জিজ্ঞেস করে করে যাচ্ছিলেন : বড় হলে তুমি কী হতে চাও বা তোমার জীবনের লক্ষ্য কী, ইত্যাদি। যে যার মতো উত্তর দিয়েছিল, সব এখন মনে নেই, এমনকি আমার নিজেরটাও সন্দেহাতীতভাবে মনে নেই। একজন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আই ওয়ান্ট টু বি দি প্রেসিডেন্ট অব পাকিস্তান’। ওই কিশোর উত্তরদাতা আমাদেরই ব্যাচে ক্যাডেট কলেজে ঢুকেছিলেন, আমরা একসাথে ছয় বছর লেখাপড়া করেছিলাম। তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স এবং মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন, পিএইচডি করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং আরো দায়িত্ব পালন করেন। উনি বর্তমানে আমার মতো প্রবীণ, কিন্তু প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ সামনে আসেনি।

রাষ্ট্র কর্তৃক লালন-পালন
ক্যাডেট কলেজে পড়ার সময়, প্রতি ক্যাডেটের জন্য মাথাপিছু কত খরচ হতো, সেটা হুবহু কোনো দিন জানতে পারিনি। একটি বছরের মোট চলতি খরচ অর্থাৎ স্থায়ী নির্মাণকাজের ইত্যাদি খরচ বাদে যে খরচ থাকে, ওই খরচকে বছরের মোট ক্যাডেট সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা হলে, মাথাপিছু খরচ বের হবে। সেটি কোনো সময় মাসিক ৩৫০ টাকা হতো, কোনো সময় কিছু বেশি হয়ে ৪০০ টাকা পর্যন্ত যেত বলে শুনেছি। কিন্তু যেকোনো ক্যাডেটের জন্য প্রদেয় সর্বোচ্চ মাসিক ফি ছিল ১৫০ টাকা। অর্থাৎ, যে ক্যাডেট কোনো বৃত্তি পায়নি এবং যার অভিভাবক সচ্ছল, সে ১৫০ টাকা দিত সরকারকে। ক্যাডেটদের মেধা এবং অভিভাবকের মাসিক আয়- এই দুইয়ের সমন্বয়ে নির্ধারিত হতো ক্যাডেট-প্রতি মাসে কত দেবে। আমাদের ক্লাসে বেশ কয়েকজন ছিল, যারা কোনো টাকাই দিত না।

আমি এবং আমার মতো আরো কয়েকজন মাসে পঁচিশ টাকা করে দিতাম। এই তথ্যগুলো দেয়ার উদ্দেশ্য একটাই, এটা সাক্ষ্য দেয়া যে, তৎকালীন সরকার চেষ্টা করেছিল কিছু ভালো মেধাবী ছাত্রকে ভালো পরিবেশে উন্নতমানের সার্বিক শিক্ষা প্রদান করতে, যেন ওই শিক্ষার্থীরা কালক্রমে দেশের উন্নয়নে তথা সার্বিকভাবে প্রশাসনে বা জনকল্যাণে অবদান রাখতে পারে। ১৯৬০ সাল থেকে ২০১৯ সালের মে-জুন পর্যন্ত কতজন ক্যাডেট ফৌজদারহাট থেকে বের হয়েছে কিংবা দেশের সব ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হয়েছে, সেটি আমি হুবহু বলতে পারব না। কিন্তু যে তত্ত্ব বা থিওরি এখানে প্রকাশ করলাম, সেটি গত ৫৯ বছর ধরেই প্রযোজ্য।

‘প্রযোজ্য’ বলা এক জিনিস, এর প্রয়োগ হয়েছে কি না বা বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, এটা আরেক জিনিস। ক্যাডেট কলেজে উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতা হতো। নিজেও আমার ভবন বা হাউজের পক্ষ থেকে অনেকবারই এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি। রচনা প্রতিযোগিতা হতো। বক্তৃতা বা বিতর্ক বা রচনা ইত্যাদিতে অনেকবারই বিষয় হিসেবে আলোচনায় এসেছে একটি প্রশ্ন: তোমার জীবনের লক্ষ্য কী? তুমি কী হতে চাও? তোমার আশা-আকাক্সক্ষা কী ইত্যাদি। ক্যাডেট কলেজ যে পরিবেশ দিয়েছিল সেখানে, স্বাভাবিকভাবেই মনের অভ্যন্তরে জন্ম নেয়া জীবনের লক্ষ্য ছিল অতি সীমিত।

স্বপ্ন দেখতেও সময় লাগে
যে দিন আমি ক্যাডেট কলেজ ছাড়ি, সে দিনও শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম না যে, জীবনে কোন পেশাটি বেছে নেব। কারণ, যে সিদ্ধান্তই নিই না কেন, লেখাপড়া শেষ করতে হবে আগে। ১৯৬৮ সালের জুলাই মাসের কোনো একটি দিনে আমাদের এইচএসসির রেজাল্ট বের হয়েছিল। তখনই মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রশ্ন উঠেছিল। ভর্তির পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই তৎকালীন সূর্যসেন হলে একটি সিঙ্গেল সিটেড (এক বিছানার) কামরা পেয়েছিলাম, নিচের তলার উত্তর অংশে। সিঙ্গেল সিটেড রুম পাওয়ার একমাত্র কারণ ছিল আমার এইচএসসির খুব ভালো ফল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ‘এ’ ক্যাটাগরির বৃত্তি দিয়েছিল। পরিমাণ ছিল মাসিক ৯০ টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য মাসিক ফি মওকুফ ছিল। এই ৯০ টাকা থেকেই যাবতীয় খরচ মিটাতে হতো। এটাই ছিল স্বাভাবিক। ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় জীবনের লক্ষ্যবস্তুর কল্পনা বা আশা-আকাক্সক্ষার সীমারেখা আরেকটু বৃদ্ধি পেয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া বাদ দিয়ে ১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসের ৯ তারিখ পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলে যোগদান করেছিলাম। কাকুলে ৯ মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ গ্রহণকালে মনের মধ্যে আশা-আকাক্সক্ষা সৃষ্টির জন্য উদ্যোক্তা বা পৃষ্ঠপোষক বা প্রশিক্ষকেরা চেষ্টা করতেন। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনে যখন ব্যস্ত ছিলাম, তখন নিশ্চয়ই উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য আরেকটু প্রস্ফুটিত হয়েছিল। কিন্তু সেটি ছিল একান্তভাবেই শুধু দেশকে নিয়ে এবং নিকটবর্তী লক্ষ্য তথা শত্রুকে পরাজিত করে দেশকে স্বাধীন করা।

১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ১৫ জুন ১৯৯৬ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে চাকরিরত থাকা অবস্থায় মনের অভ্যন্তরে, চিন্তাজগতের গভীরে লক্ষ্যবস্তু চলাচল করছিল। পেশাদার সৈনিকের জন্য উল্লেখযোগ্য ‘ভদ্র’ লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে, পেশার সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া। দুর্ঘটনাক্রমে যখন ১৯৯৬ সালে বাধ্যতামূলক অবসরে গেলাম, তখন লক্ষ্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তায় বসলাম। একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কোথাও আর চাকরি করব না। কিন্তু আমার চিন্তাজগতের মোড় তথা জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলো ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরে ঢাকা মহানগরের বহুল প্রচারিত পত্রিকাগুলো এবং স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলো।

নিজের চিন্তা ও আগ্রহকে পরিশীলিত এবং প্রস্ফুটিত করতে সাহায্য করেছে ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত আমার নাগরিক জীবনের কর্মকাণ্ড এবং সাথীরা। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে সে লক্ষ্য স্থির হয়েছিল এরূপ : স্বীকৃত পন্থায় জনগণের খেদমত ও সেবা করার সুযোগ চাই। তাহলে আমার কণ্ঠকে, আমার আহ্বানকে, আমার বক্তব্যকে, আমার নিবেদনকে যত বেশি সম্ভব বাংলাদেশী নাগরিকের কাছে পৌঁছাতে হবে। মাহাথির মোহাম্মদ ২১-২২ বছর বয়সে যা চিন্তা করেছিলেন, আমি সেটা ৫৭-৫৮ বছর বয়সে চিন্তা করছিলাম। বলে রাখা ভালো, ৫৭-৫৮ বছর বয়সে মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়া নামক দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।

আমার আহ্বান ও স্বীকৃত পন্থা
আমার কথায় ফিরে আসি। যাদের কাছে আমার এই আহ্বান, বক্তব্য ও নিবেদন পৌঁছেছে এবং পৌঁছবে, তাদের মধ্য থেকেই সহকর্মী ও সহযোদ্ধা পেয়েছি এবং পেতে হবে। সাড়ে ছয় বছর ধরে পেয়ে আসছি, আরো পেতে হবে। একের বোঝা, দশের লাঠি- এটা একটা বাংলা প্রবাদ। আরেকটি প্রবাদ হচ্ছে, দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন এবং এই পরিবর্তন একা কোনো একজন ব্যক্তি পূর্ণভাবে আনতে পারবেন না, সমষ্টিগত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এই সমষ্টিগত প্রচেষ্টার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে রাজনীতি। আন্দোলন হচ্ছে রাজনীতির একটি অংশ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিগত বিভিন্ন দশকে তথা বিভিন্ন সময়ের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনগুলোকেও ওই দৃষ্টিতেই দেখতে হবে। প্রতি আন্দোলনের একাধিক পর্যায় থাকতে পারে, যেমন এক রকম হচ্ছে : শর্ট টার্ম বা নিকট মাত্রা বা তাৎক্ষণিক বা অতি সাম্প্রতিক। আরেক রকম হচ্ছে : দীর্ঘমেয়াদি বা দূরবর্তী মাত্রার। কিন্তু এ মুহূর্তে কোনো উল্লেখযোগ্য আন্দোলন চলমান না থাকলেও নতুন করে বা হঠাৎ কোনো আন্দোলন যে গড়ে উঠবে না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। যদি আন্দোলন হয়, তাহলে সে আন্দোলনেরও এরূপ দু’টি সময়ভিত্তিক মাত্রা থাকতে পারে। যেটাই হোক না কেন, দিনের শেষে তথা আন্দোলনের শেষে আমরা পরিবর্তন চাই। সরকার যারা পরিচালনা করবেন, তাদের মধ্যে যেমন দলীয় পরিবর্তন চাই, আবার পরিচালনাকারী ব্যক্তিদের মধ্যেও গুণগত পরিবর্তন চাই। তাহলেই আন্দোলন যথার্থ মর্যাদা পাবে।

মাহাথির মোহাম্মদ
এই কলামের প্রেক্ষাপটকে একটু বিস্তৃত করার জন্য, মাহাথির মোহাম্মদের বিশাল জীবনী থেকে অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ পর্যালোচনা করে উপস্থাপন করছি। স্থানাভাবে সাম্প্রতিক দু-তিন বছরের কথা আনব না। মোট ২২ বছর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডা: মাহাথির মোহাম্মদ। এই ২২ বছরে তিনি অনগ্রসর পশ্চাৎপদ কৃষিমুখী একটি দেশ ও সমাজকে পরিণত করেছিলেন শিল্পমুখী বা শিল্পের পথে অগ্রসরমান উন্নত দেশে, যে দেশটি পৃথিবীর সব দেশের তালিকায় ব্যবসার পরিমাপে ১৭তম বৃহৎ ব্যবসায়ী দেশ হয়ে উঠেছিল। তিনি প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে অবসর নেয়ার পর কয়েক বছর সময় নিয়ে তার আত্মজীবনী লিখেছেন। ইংরেজি ভাষায় লিখিত বইটি ৮৪৩ পৃষ্ঠা দীর্ঘ। প্রথম প্রকাশ হয়েছে ২০১১ সালে। ২০১২ সালের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে আমার একমাত্র ছেলে ওই কারণেই সিঙ্গাপুর গিয়েছিল। ঢাকা ত্যাগের আগে আমার ছেলের প্রশ্ন ছিল, ‘আসার সময় তোমার জন্য জরুরি কিছু আনব কি না।’

এরূপ একটি প্রশ্ন বা প্রস্তাব একজন পুত্রের পক্ষ থেকে পিতার প্রতি মায়ামমতা ও সৌজন্যের অতি স্বাভাবিক প্রকাশ। তাকে বলেছিলাম, যদি পারো তাহলে খুঁজে দেখবে, ডা: মাহাথির মোহাম্মদের আত্মজীবনীমূলক বইটি। যদি পাও, একটি কপি নিয়ে আনবে। আমার ছেলে কিনে এনেছিল। ওই বইয়ের নাম- ‘অ্যা ডক্টর ইন দ্য হাউজ : দি মেমোয়েরস অব তুন ডাক্তার মাহাথির মোহাম্মদ’। বইটি পড়ার পর একাধিকবার এই নয়া দিগন্ত পত্রিকাতেই এ বিষয়ে লিখি। আমার লেখা পড়ার পর, উৎসাহিত হয়ে চট্টগ্রাম মহানগরে অবস্থিত বিখ্যাত সুফিবাদী ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান ‘বায়তুশ শরফ’ প্রকাশনী থেকে ওই জীবনীগ্রন্থের চুম্বক অংশ অনুবাদ করে বাংলা ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে। চুম্বক অংশটিও তিন শ’ পৃষ্ঠার বেশি। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত মত হলো, ডাক্তার মাহাথিরের আত্মজীবনী এবং সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ-এর আত্মজীবনী এই বই দু’টি, বাংলাদেশ নিয়ে যারা চিন্তা করেন তাদের জন্য এখনো খুব উপকারী। মাহাথিরের বইয়ের দশম অধ্যায় হচ্ছে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি এবং ওই সময়ের গল্প। ১৯৪৭ সালে মাহাথির মোহাম্মদ ডাক্তারি পড়ার জন্য মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কলেজটি সিঙ্গাপুর শহরে। নাম ছিল : ‘কিং অ্যাডওয়ার্ড-৭ কলেজ অব মেডিসিন’।

মাহাথিরের স্বপ্ন এবং অনিচ্ছায় চিকিৎসক
পুস্তকের দশম অধ্যায়ে মাহাথির নিজে যা বলেছেন, সেখান থেকে দু-একটি কথা এখানে আমার ভাষায়, ভাবার্থ হিসেবে তুলে ধরছি। পুনরায় নিবেদন করছি, কথাগুলো মাহাথিরের, ইবরাহিমের নয়। এখানে ‘আমি’ শব্দ মানে মাহাথির, ইবরাহিম নয়। ‘নেতা হতে চেয়েছিলাম যেন আমি স্বপ্নের কাজগুলো করিয়ে নিতে পারি এবং আমার চিন্তাগুলো বাস্তবায়ন করতে পারি। আমার স্কুলজীবনের সহপাঠীরা আমাকে নেতা হিসেবে মেনে নিত, কিন্তু যারা একটু বয়স্ক তারা আমাকে সিরিয়াসলি গ্রহণ করতেন না। অতএব, বয়স্করা যেন অন্তত আমার কথা ও প্রস্তাবগুলো শোনেন, তার জন্য অন্যতম প্রয়োজনীয়তা হলো আমার ক্রেডেনশিয়ালস বা আমার জীবনের অর্জন বৃদ্ধি করা। জীবনে অর্জন বা পরিচিতি বৃদ্ধি করতে হলে অন্যতম কাজ হলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গুরুত্বপূর্ণ ডিগ্রি নেয়া। কারণ আমাদের এই সময়ে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া ডিগ্রিধারী ব্যক্তি গোটা দেশেই অতি নগণ্য সংখ্যক ছিলেন।

গভীর মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করা শুরু করলাম। আমি চেয়েছিলাম একজন আইনজীবী হতে কারণ, বিতর্ক পছন্দ করতাম এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রশংসা পেতাম। কিন্তু ওই সময় আইনজীবী হওয়ার জন্য যে ভালো ডিগ্রি প্রয়োজন, সেটি ইংল্যান্ড ছাড়া কোথাও পাওয়া যেত না। আমার পরিবারে আমাকে ইংল্যান্ডে পড়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। তাই আমি উচ্চশিক্ষার নিমিত্তে স্কলারশিপ বা বৃত্তির জন্য আবেদন করলাম। আমার অনেক বন্ধুই বৃত্তি পেয়েছিল, কিন্তু আমি পেলাম না। আমাদের সরকার, আমাকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাবিদ্যা গ্রহণের জন্য স্কলারশিপ দিলো। চিকিৎসা বিজ্ঞানে আগ্রহী কোনো দিনই ছিলাম না, কিন্তু নিয়তি আমাকে চিকিৎসাবিদ্যায় জড়িত করল। আমরা অনেকেই বিশ্বাস করতাম, আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। এ ক্ষেত্রেও ভাগ্য আমার উপকার করল। কারণ, পরবর্তীকালে যখন রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলাম তখন আবিষ্কার করেছিলাম যে, একটি দেশের প্রশাসন পরিচালনা এবং একজন রোগীর চিকিৎসা করার মধ্যে প্রচুর মিল আছে। একটি দেশ চালানো মানে শুধু পার্লামেন্টে তর্ক করা নয় বা শুধু আইন বানানো নয়।

একটি দেশ চালানো মানেÑ ওই দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসুস্থতাগুলো সারিয়ে তোলার জন্য চিকিৎসা করা। অন্তত নীতিগতভাবে, একটি দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যাধিগুলো চিকিৎসা করার যে প্রক্রিয়া বা প্রসিডিউর, সেগুলো কোনো একজন মানুষের দেহের অসুস্থতার চিকিৎসা করার জন্য প্রযোজ্য প্রক্রিয়া বা প্রসিডিউরের সাথে অনেকাংশেই মিলে যায়। আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখনো আমরা ব্রিটিশদের অধীন ছিলাম। ব্রিটিশরা মনে করত, ডাক্তাররা নিরীহ ও গোবেচারা; তারা শাসনকারী ব্রিটিশদের জন্য কোনো ঝামেলা করে না, কারণ তারা করতে জানে না। অপরপক্ষে, ব্রিটিশরা মনে করত, আইনজীবীরা একজন মানুষের শরীরে ঘাড় ব্যথার মতো, তারা শাসনকারী ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের জন্য সব সময়ই ঝামেলার একটি কারণ হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটেই ভাগ্য আমাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে জড়িত করে দিলো আমার ২২ বছর বয়সে। মেডিক্যাল কলেজে আমার সব ফি বা বেতন মওকুফ ছিল। সরকার থেকে পেতাম ১৫ ডলার এবং বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেতাম ১০ ডলার। এই মোট ২৫ মালয়ি ডলার দিয়ে আমার খরচ মিটাতাম। সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত ‘স্ট্রেইটস টাইমস’ এবং ‘সানডে টাইমস’ নামক দু’টি পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করলাম এবং এর মাধ্যমে ৪০-৫০ ডলার অতিরিক্ত উপার্জন করতাম। এই দিয়ে আমি মোটামুটি ভালোমতোই জীবন যাপন করছিলাম।’ সম্মানিত পাঠক, মাহাথির মোহাম্মদের নিজের জবানীতে আত্মজীবনীর অংশ বিশেষের ভাবার্থ এখানে শেষ।

উপসংহার ও আগামী কলাম
বিখ্যাত ব্যক্তি ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক মাহাথির মোহাম্মদের স্বপ্ন ছিল, তিনি নিজের দেশ ও সমাজের নেতৃত্ব দেবেন। ১৯৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কালো মানুষদের নেতা ও মানবাধিকার সংগ্রামী মার্টিন লুথার কিং একটি বিখ্যাত ভাষণ দিয়েছিলেন, যে ভাষণের শিরোনাম ছিল- ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’, অর্থাৎ আমার একটি স্বপ্ন আছে।

আজকের কলাম এই বলে শেষ করতে চাই, আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই যেন স্বপ্ন থাকে। সেনাবাহিনীর অফিসার ইবরাহিমের স্বপ্ন ছিল। রাজনীতিবিদ ইবরাহিমের স্বপ্ন আছে। রাজনীতিবিদ ইবরাহিমের স্বপ্ন দেশকে নিয়ে, জাতিকে নিয়ে। তবে সে স্বপ্ন পূরণের জন্য সহকর্মী, সহযাত্রী, সহযোদ্ধা প্রয়োজন; সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য সাংগঠনিক চেষ্টা প্রয়োজন, আন্দোলন প্রয়োজন। এখন যে আন্দোলনে ব্যস্ত সেটি শর্ট টার্ম বা নিকটমাত্রার। এই শর্ট টার্ম আন্দোলন সফল হলে, দীর্ঘমেয়াদি বা দূরমাত্রার দেশ গড়ার স্বপ্ন, সমাজ বদলের স্বপ্ন, পরিবর্তনের স্বপ্ন পূরণ করা সহজ হবে। এ প্রসঙ্গে আগামী বুধবারের কলামেও লিখব। ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে রাজনীতিবিদ ইবরাহিমের স্বপ্ন, ২০১৯ সালে এসে কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, সেটি নিয়ে আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ আগামী কলামে।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
ই-মেইল : [email protected]


আরো সংবাদ