২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর ১৪৩৯

উন্নয়নের নমুনা : ২২ থেকে ২৫৫

-

একসময়ের ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এখনকার স্বাধীন বাংলাদেশ। গত শতকের ষাটের দশকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি ধনীদের শোষণ-বঞ্চনায় বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। সেই ক্ষোভ ধূমায়িত হয়ে তীব্র গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। ফলে স্বৈরশাসক আইয়ুব শাহীর তখতে-তাউস তছনছ হয়ে যায়। পরিণামে তার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানে ২২টি কোটিপতি পরিবারের কথা জানা যায়। ২২ পরিবারের হাতে কুক্ষিগত ছিল দেশের বেশির ভাগ সম্পদ। ওই তালিকার মধ্যে দু’টি পরিবার ছিল পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে। একটি বাঙালি পরিবার। অন্যটি অবাঙালি। এর বাইরে আরো অর্ধশতাধিক ধনাঢ্য পরিবার ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। ব্রিটিশ আমল-পরবর্তী পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের সম্পদ ফুলে-ফেঁপে ওঠে। বাংলাদেশে এসব পরিবারের প্রভাব-প্রতিপত্তি থাকলেও বর্তমানে আগের সেই জৌলুশ-শানশওকত আর নেই।

১৯৭১-এ আকণ্ঠ জুলুম বৈষম্যের অবসানে মুক্তির ডাক আসে। কাক্সিক্ষত স্বাধীনতাই ছিল সবার লক্ষ্য; একমাত্র চাওয়া। এর পরিসমাপ্তি ঘটে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। স্বপ্নচারী জাতি পুরো ৯ মাস ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে শত্রুর মোকাবেলায় কোমর বেঁধেছিল। ফলে লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। মুক্তির সুফল সবার মধ্যে সমভাবে বণ্টিত হয়ে ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল জন-আকাক্সক্ষা। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে গুটিকয় ব্যক্তি রাতারাতি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়ে গেলেন। তারাই ‘রাজকপালে’। মানে আঙুল ফুলে কলাগাছ। দেশবাসী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখে লুণ্ঠন অর্থনীতির স্বরূপ; যে বণ্টন ব্যবস্থায় প্রায় ৯৫ ভাগ থাকে বঞ্চিত। বেশির ভাগের অর্থনৈতিক অবস্থা যেমন ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে যায়। ভাগ্য বদলায় না। বরং দুর্ভাগ্য জেঁকে বসে। সবার প্রাণ হয়ে ওঠে ওষ্ঠাগত। দৃশ্যত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল আমজনতার ‘হাতছাড়া’ হয়ে যায়। মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী যেনতেনভাবে নিজেদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে ন্যায়-অন্যায়ের হিতাহিত জ্ঞানটুকুও লোপ পায় তাদের।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অতীতের ২২ পরিবারের দুষ্টচক্রের যে বৃত্ত ভাঙতে ছিল বদ্ধপরিকর, স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরে সেই আশা মরীচিকা হয়ে দুরাশায় পরিণত হয়েছে। সমতা প্রতিষ্ঠার বদলে রাষ্ট্রযন্ত্র পক্ষপাতহীন না হয়ে ঝুঁকে পড়েছে গোষ্ঠীস্বার্থের দিকে। এ ধারাবাহিকতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে দেশবাসীকে। তা না হলে প্রায় ১৬ কোটি মানুষের দেশে কিভাবে মাত্র ২৫৫ ব্যক্তির কাছে বেশির ভাগ সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়? সৌভাগ্যবান এসব ব্যক্তি কি কোনো আলাদিনের প্রদীপ পেয়েছেন, যাতে ঘষা দিলেই দৈত্যকায় জিন এসে বলবেÑ ‘মালিক আমি হাজির, বলুন আপনার কী চাই?’ আর অমনি মুঠি মুঠি হীরা-জহরত এসে হাজির! বিষয়টি কিন্তু মোটেও সে রকম নয়। আসল কথা হলোÑ হাল আমলে বিপুল অর্থবিত্ত হাতাতে কোনো দৈত্যের প্রয়োজন হয় না। থাকতে হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে ‘কার্যকর’ যোগাযোগ। অন্য অর্থে, হতে হয় খয়ের খাঁ। মোসাহেব তো বটেই। তাহলে কপালে জোটে বৃহৎ সব প্রকল্পের ঠিকাদারি। এতেই সুড়সুড় করে হাতের মুঠোয় আসে বিপুল মালকড়ি। এই কলার নামই আধুনিক সংস্করণে ‘আলাদিনের চেরাগ’।

এহেন বৈষম্যের হাটে হাঁড়ি ভেঙেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম। সম্প্রতি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক সেমিনারে তিনি মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আয় বৃদ্ধির হার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। মাত্র ২৫৫ ব্যক্তির কাছে দেশের বেশির ভাগ সম্পদ আটকে আছে। বছরে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ ও কানাডায় গড়ে উঠছে ‘বেগম পাড়া’।

দেশবাসীর কপাল ভলো, পাচারকারীরা শুধু অর্থ পাচার করে ক্ষান্ত হচ্ছেন। তারা যে ইটভাটা মালিকদের মতো জমির উপরিভাগের মাটি তুলে পাচার করছেন না, সেটিই আমাদের সৌভাগ্য। ব্যবসার নামে বিদেশে মাটি রফতানি করলে কী যে হতো, তা আল্লাহ মালুম। এমনিতেই দেশে আবাসন ব্যবসায়ীদের দাপটে অভাবী জমির মালিকেরা থাকেন রীতিমতো তটস্থ।

অধ্যাপক মইনুলের ভাষার, ‘বৈষম্যমূলক আয় বাড়ায় রিয়েল এস্টেট, নির্মাণশিল্প, টিভি চ্যানেল, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক-বীমা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, হাসপাতালসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা খাত দ্রুত বর্ধনশীল এ দেশে। এগুলোতে ভর করে কিছু মানুষের পোয়াবারো। জনমানুষের অবস্থার সাথে এগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। আয়বৈষম্যের কারণেই এত দুর্নীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

অধ্যাপক মইনুলের বক্তব্যে ব্যবহৃত ‘পোয়াবারো’ শব্দটিতে আমাদের চোখ আটকে যায়। এর অর্থ জানতে আগ্রহ জাগে। বইপুস্তক ঘেঁটে মানে জানা গেলÑ অতিরিক্ত সৌভাগ্যের অধিকারী যারা তাদের বেলাতেই ব্যবহার করা হয় ‘পোয়াবারো’ শব্দটি। কথাটির প্রচলন হয়েছে পাশা খেলার চাল থেকে। আর অঢেল সম্পদের মালিক হতে হলে পাশার সর্বোচ্চ চালটাই জানা দরকার, যা এখনকার মিলিয়ন-বিলিয়নিয়াররা ভালোভাবেই রপ্ত করেছেন।

বছরখানেক আগে থেকে এমন খবরের হদিস জনসমাজে চাউর আছে। তা-ও বিদেশী সংস্থার বদৌলতে। অনুসন্ধান তাদেরই। বিদেশপ্রীতির কারণে আমরা এতে অনায়াসে আস্থা রেখে থাকি ষোলআনা। তবে শুধু বিদেশীরাই এমন খবর দিচ্ছে তা নয়, স্বদেশী খবরও এর সমর্থন জোগাচ্ছে। ফলে বিষয়টি এখন পোক্ত। খবরটি আর কিছু নয়Ñ ‘অতি ধনী’র বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম।

এটি বাসি খবর। এখন দেখা যাচ্ছে, ‘ধনী’ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক থেকেও বাংলাদেশ এগিয়ে, বিশ্বে তৃতীয়। দু’টি তথ্যই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদগবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্সের। সংস্থাটি বলছে, আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশে ধনী মানুষের সংখ্যা ১১ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাড়বে। ১০ লাখ থেকে তিন কোটি মার্কিন ডলারের সম্পদের মালিককে (সাড়ে আট কোটি থেকে ২৫০ কোটি টাকা) এ তালিকায় রেখেছে ওয়েলথ-এক্স। প্রতিবেদনে দেশে ধনী ও অতি ধনীর সংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধির চিত্র উঠে এলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদনে দরিদ্র মানুষের আয়ে বড় ধরনের বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার বিপরীত চিত্রও রয়েছে। আবার অনেকে মনে করছেন, এ ধনীদের বড় অংশের উত্থান ঘটছে স্বজনতোষী পুঁজিবাদ বা ক্রোনি ক্যাপিটালিজম, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি কাজ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানে পরিবর্তন আসছে, এটা ঠিক। কিন্তু একটা শ্রেণীর হাতে বড় অংশের সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ফলে বৈষম্য অনেক বাড়ছে। দেশে স্বজনতোষী পুঁজিবাদের কারণে অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যাংকের মতো বড় আকারের ব্যবসা পাচ্ছেন সরকারের কাছের লোকেরাই। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের পরিসর ছোট হয়ে আসছে। এতেই একটা শ্রেণীর হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

বাতির নিচেই আছে অন্ধকার। তার প্রমাণ মিলছে আরেকটি প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্রুত মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি বা ধনী হওয়ার যাত্রায় বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও ‘অতি গরিব’ মানুষের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। অতি গরিব মানুষের সংখ্যা বেশি, এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। বিশ্বব্যাংক ‘পোভার্টি অ্যান্ড শেয়ার্ড প্রসপারিটি বা দারিদ্র্য ও সমৃদ্ধির অংশীদার-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি হতদরিদ্র মানুষ আছে, এমন ১০টি দেশের তালিকা তৈরি করেছে। ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুসারে (পিপিপি) যাদের দৈনিক আয় এক ডলার ৯০ সেন্টেরও কম, তাদের ‘হতদরিদ্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি আন্তর্জাতিক ‘দারিদ্র্যরেখা’ হিসেবে বিবেচিত। বিশ্বব্যাংক ২০১৬ সালের মূল্যমান ধরে পিপিপি ডলার হিসাব করেছে। বাংলাদেশে প্রতি পিপিপি ডলারের মান ধরা হয়েছে সাড়ে ৩২ টাকা। সেই হিসাবে বাংলাদেশের দুই কোটি ৪১ লাখ লোক দৈনিক ৬১ টাকা ৬০ পয়সাও আয় করতে পারেন না। তারাই হচ্ছেন অতি গরিব জনগোষ্ঠী।

আমরা শোষণ-বৈষম্যমুক্ত যে সমাজের প্রত্যাশায় দেশ স্বাধীন করেছিলাম, তা এখনো অপূর্ণই রয়ে গেছে। দেশ-রাষ্ট্র-সমাজের অভিমুখ কল্যাণ ও গণমুখী হওয়ার লক্ষণ ধোঁয়াশাপূর্ণ। সে জন্যই আমাদের কাছে উন্নয়নের নমুনা হয়ে এখনো ২২ পরিবার থেকে ২২৫ ব্যক্তির মধ্যেই আটকে আছে। কল্যাণরাষ্ট্র বিনির্মাণে দেশের শাসকশ্রেণীর আদৌ কোনো ইচ্ছা রয়েছে কি না তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, মানবিক রাষ্ট্র গঠনের আলামত সাধারণের কাছে এখনো সোনার পাথর বাটিই রয়ে গেছে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়, ‘সব ভেঙে করি চুরমার।’ মূলত পশ্চাৎমুখিতাকে ভেঙে চুরমার করতে না পারলে মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা সম্ভব নয়। আমজনতার কাছে কোনোকালে এর বিকল্প কিছু খোলা ছিল না। তবে মনে রাখতে হবে, নিজেদের তাগিদে পশ্চাৎমুখিতা টিকিয়ে রাখতে কাজ করে কায়েমি স্বার্থ এবং শাসকশ্রেণী। এ দুইয়ের রাসায়ন মিলেমিশে সমাজ-রাষ্ট্রে পশ্চাৎমুখিতার লালন-পালনে থাকে তৎপর। তাই অর্থহীন অতীতচারিতা থেকে মুক্তিই পারে সাধারণের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে। এর অর্থ দাঁড়ায়, কল্যাণমুখী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় যার যার জায়গা থেকে নিরলস চেষ্টায় রত হওয়া। সেখানে স্বার্থ থাকবে, তবে তা হবে নিয়ন্ত্রিত; কোনো অবস্থাতেই লাগামহীন নয়।
[email protected]


আরো সংবাদ