২৩ অক্টোবর ২০১৯

প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ

-

প্রেসিডেন্ট জিয়াকে আমি প্রথম চাক্ষুষ দেখিছিলাম ১৯৭৮ সালে। সেবার তিনি আমাদের বিদ্যালয়ে এসেছিলেন একটি জনসভা করার জন্য। ফরিদপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী বাইশরশি শিব সুন্দর একাডেমিতে প্রেসিডেন্ট জিয়া আসবেন, এমন খবরে পুরো এলাকায় হইচই পড়ে গেল। রাস্তার পাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার হলো এবং দুই পাশের গাছগুলোতে চুনকাম করা হলো। রাস্তার খানাখন্দক ভরাটের পাশাপাশি আমাদের বিদ্যালয়ের মাঠটিকে যথাসম্ভব সংস্কার করা হলো। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মহাব্যস্ত। কেউ ব্যস্ত মানপত্র রচনা করার কাজে- কেউ বা আবার সেই মানপত্র পাঠের অনুশীলনে গলদঘর্ম হতে থাকলেন। বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা প্রেসিডেন্টকে গান শোনানোর জন্য সদলবলে রিহারসেল শুরু করে দিলো। শরীর চর্চার শিক্ষক, ধর্মশিক্ষক, প্রধান শিক্ষক এবং বিদ্যালয় কমিটির সভাপতি ঘন ঘন বৈঠক করে পুরো অনুষ্ঠানের জন্য যথাসম্ভব সুন্দর একটি ছক বানিয়ে প্রেসিডেন্টের আগমনের মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।

প্রেসিডেন্ট জিয়া তার সঙ্গী-সাথীদেরকে নিয়ে নির্ধারিত দিনের নির্ধারিত সময়ে আমাদের মধ্যে এলেন। আমাদের বিদ্যালয়ের সুবিশাল মাঠ- সামনের রাস্তা-আশপাশের ফসলি জমি এবং আম বাগানগুলো সকাল ১০টার মধ্যেই লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ল। কত লোক যে সে দিন এসেছিলেন তা বলতে পারব না- তবে আমার জন্মের পর থেকে আজ অবধি আমি সদরপুর-চরভদ্রাসন এবং ভাঙ্গাসহ ফরিদপুর জেলার কোনো সভা-সমাবেশে এত মানুষের সমাগম দেখিনি। বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক বাবু কেশব চন্দ্র দের রচিত মানপত্রটি যখন ইংরেজি শিক্ষক বলরাম বাবু পাঠ করলেন তখন লাখো লোকের সমাগম সেই মানপত্র শোনার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে নীরব হয়ে গেল।

একটি মানপত্রের ভাষা এবং সেই মানপত্রের পাঠকের গুরুগম্ভীর এবং ছন্দময় কণ্ঠস্বর আজো আমাকে বিমোহিত করে, যা আমি দেশ-বিদেশের কোথাও দ্বিতীয়টি দেখিনি। আমার চাচাতো বোন মুকুট আপার নেতৃত্বে বিদ্যালয়ের মেয়েরা প্রেসিডেন্টের প্রিয় গান ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ’সহ আরো কয়েকটি দেশাত্মবোধক গান যে মাধুর্যময়তা দিয়ে পরিবেশন করলেন, তা আজকের জমানায় কল্পনাও করা যায় না।

সেদিনের জনসভার প্রসঙ্গ দিয়ে আজকের নিবন্ধ শুরু করলাম এ কারণে যে, ওই জনসভাকে কেন্দ্র করে আমি প্রেসিডেন্ট জিয়ার রুচি-ব্যক্তিত্ব-দেশপ্রেম এবং সর্বোপরি তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের যে নমুনা পেয়েছিলাম; যা অন্য কারো মধ্যে কল্পনাই করা যায় না। প্রথমত, লক্ষাধিক লোকের একটি জনসভার সার্বিক দায়িত্ব তিনি দিয়েছিলেন একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এবং সভামঞ্চে তিনি এবং শিক্ষকমণ্ডলী ছাড়া কাউকে বক্তব্য দিতে দেয়া হয়নি। তিনি নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠানস্থলে এলেন এবং প্রায় এক কিলোমিটার দূরে তার প্রটোকলের গাড়ি এবং নিরাপত্তাবহর রেখে সম্পূর্ণ একাকী বীরদর্পে হেঁটে সভামঞ্চে উঠলেন। তিনি তার বক্তব্যে কোনো হতাশার কথা বললেন না- কারো গিবত করলেন না এবং নিজের বা অন্য কারো ব্যর্থতার কথাও বললেন না। তিনি উপস্থিত জনতাকে উজ্জীবিত করলেন পিতার মতো- সহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন অভিভাবকের মতো এবং উপদেশ দিলেন শিক্ষকের মতো। তিনি সবাইকে পরিশ্রম করার আহ্বান জানালেন এবং কৃষি-মৎস্য পালন এবং সেচপ্রণালী নিয়ে তার সরকারের পরিকল্পনার কথা বললেন।

জিয়াউর রহমান যখন আমাদের বিদ্যালয়ে গেলেন তখন আমার রাজনৈতিক বোধবুদ্ধিতে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো কিছু ছিল না। আমাদের এলাকার বেশির ভাগ মানুষ আওয়ামী লীগ করা সত্ত্বেও তারা সবাই সদলবলে প্রেসিডেন্ট জিয়ার জনসভায় এসেছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। জনসভার আগে কিংবা পরে আমরা কোনো কট্টরপন্থী আওয়ামী লীগের মুখ থেকে প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য শুনিনি। তখনকার জমানায় অনেক অভাব-অভিযোগ ছিল- তবে বর্তমানের মতো অসভ্যতা ছিল না। যে যার মতো করে রাজনীতি-ধর্মকর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি নিরিবিলি পারিবারিক জীবন যাপন করতেন। কারো কুৎসা করা, সম্মানিত লোককে অসম্মান করা এবং ছোটমুখে বড় কথা বলার রীতি আমরা প্রেসিডেন্ট জিয়ার জমানায় দেখিনি। তিনি নিজে ওই সব কর্ম করতেন না বলে ‘রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট’ প্রবাদের আদলে তখনকার জনগণের ইতর স্বভাব খুবই কম ছিল।

আপনারা যদি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটু চিন্তাভাবনা করেন তবে লক্ষ করবেন, তিনি কোনো দিন কারো গিবত করেননি। কাউকে অনুকরণ করেননি। কোনো কিছু নকল করা- ধারদেনা করা এবং অন্যের ধনে পোদ্দারি করে ফুটানি দেখানোর মতো বাঙালির কুস্বভাবগুলো তার মধ্যে ছিল না। তিনি কোনো কিছু না জেনে সবজান্তা সমশেরের মতো ভাব ধরে থাকতেন না। তিনি যা জানতেন তা তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন এবং নিজের সীমা-পরিসীমা সম্পর্কে সথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন। সময়ানুবর্তিতা-ভদ্রতা-সৌজন্যবোধ, পরিশ্রম, একনিষ্ঠতা ও সততার সমন্বয়ে তিনি সকাল থেকে গভীর রাত অবধি দেশ ও জাতির জন্য পরম মমত্ববোধ নিয়ে কাজ করতেন।

তার শাসনামলে তিনি সারা বাংলার আনাচে-কানাচে হেঁটে এত বেশি এলাকা পরিভ্রমণ করেছেন, যা তার পর্যায়ের অন্য কোনো শাসকের কাছ থেকে কল্পনাও করা যায় না। তার সহজাত মেধা-বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং গভীর দেশপ্রেমের কারণেই তিনি বাংলাদেশকে ভিন্ন আঙ্গিকে চিনিয়ে ছিলেন। তার চিন্তার গভীরতা-উদ্ভাবনী ক্ষমতা উচ্চমার্গের শিক্ষাদীক্ষা এবং এ দেশের মানুষের প্রতি মমত্ববোধের কারণে তিনি বুঝেছিলেন যে, বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে এই জাতির জাতীয়তাবোধকেও একক-স্বাধীন-সার্বভৌম এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে তুলতে হবে।

আমি প্রেসিডেন্ট জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা পলিটিক্যাল জিনিয়াসনেস নিয়ে যতই ভাবি, ততই অবাক হয়ে যাই। কারণ, ১৯৭১ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সে কথা কেউ ভাবেনি বা যে সমস্যার অন্তঃমূলে কেউ হাত দেননি, ঠিক সেই জায়গায় তিনি মনোনিবেশ করে বাংলাদেশ নামের এক রাষ্ট্রের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নটি কেন সবার আগে নিষ্পত্তি করার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন, তা ভাবলে আজো শিহরিত হয়ে পড়ি।

তার পূর্বসূরিরা যেখানে চাল নেই, ডাল নেই, ব্যাংকে টাকা নেই, চোরেরা সব চুরি করে নিয়ে গেছে, চাটার দলেরা সব চেটে খেয়ে ফেলেছে ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন অথবা তার পূর্বসূরিরা যেখানে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে সব রাজনৈতিক দল ও প্রতিপক্ষ নির্মূল, সেকুলারিজমের ভিত্তিতে জাতি গঠন এবং সমাজতান্ত্রিক ধ্যানধারণাকে মূলমন্ত্র করে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধানের মূল স্পিরিটকে কবর দিয়ে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদের ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে দিলেন; সেখানে তিনি কোনো কিছুর দিকে না তাকিয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এবং পরম করুণাময় আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও আস্থার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিলেন।

উল্লিখিত বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণা এবং এই জাতীয়তাবাদের ঝুঁকি সম্পর্কে দু-চারটি কথা বলা অবশ্যক। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণাটি আমাদরে এই ভূখণ্ডে প্রবল হয় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় থেকে। ব্রিটিশরা যখন বাংলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছিল তখন বাঙালি জ্ঞানী-গুণী, কবি-সাহিত্যিক এবং রাজনীতিবিদেরা ঐক্যবদ্ধ বাংলা তথা অবিভক্ত ভারতের দাবিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলন শুরু করেন, যা মূলত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মস্তিষ্ক থেকে এসেছিল। তিনি অবিভক্ত বাংলার দাবিকে জনপ্রিয় করার জন্য ‘আমার সোনার বাংলা- আমি তোমায় ভালোবাসি’ নামক গান রচনা করে কলকাতা-কেন্দ্রিক এমন এক আন্দোলন গড়ে তোলেন, যার কারণে ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয়।

আমরা হয়তো অনেকেই জানি না, বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলা তথা আজকের বাংলাদেশ এবং আসামের জনগণ ফুঁসে উঠেছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বঙ্গভঙ্গকে মোকাবেলার জন্যই ঢাকায় বসে পূর্ব বাংলার সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দ ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করে এক দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। সে দিন যদি পূর্ব বাংলার সব জনগণ মহান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার ভিত্তিতে গঠিত মুসলিম লীগকে সমর্থন না দিয়ে কবিগুরুর অবিভক্ত বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে অবস্থান নিত, তবে আমরা কোনো রকম বাগি¦তণ্ডা ছাড়াই অবিভক্ত ভারতের বঙ্গ প্রদেশ হতাম অথবা দেশ বিভাগের সময় অবিভক্ত বঙ্গরূপে ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়ে আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও বিহারের মতো প্রদেশে পরিণত হতাম।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর আমরা যখন পাকিস্তানের অংশে পরিণত হলাম তখন পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃবৃন্দের ভুল নীতি, জুলুম, অত্যাচার এবং শোষণ-বঞ্চনার কারণে রীতিমতো দিশাহারা হয়ে পড়লাম। এক দিকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় অত্যাচার, অন্য দিকে পাশের রাষ্ট্রের জটিল কূটচালে আমাদের মধ্যে সীমাহীন অস্থিরতা এমনভাবে বেড়ে গেল, যার কারণে আমরা স্বাধীনতা না স্বায়ত্তশাসন তা যেমন স্থির করতে পারলাম না- তেমনি দিল্লি না পিন্ডি তা না বুঝেই আগরতলা, গোহাটি, কলকাতা এবং দিল্লি চক্রান্তে বা ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পড়ে গেলাম। পরিস্থিতি আরো জটিল হলো যখন পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ চরম অস্থির হয়ে পড়ল, যার কারণে মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ল এবং ভারতীয় সৈন্যরা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস ঘোষণা করা হলো এবং ওই দিন ভারতীয় বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করল। আমাদের দেশে আমরা যেটিকে মহান মুক্তিযুদ্ধ রূপে ধ্যানজ্ঞান করি, সেটিকে ভারত ও পাকিস্তান তাদের নিজ দেশের দলিলপত্রে পাক-ভারত যুদ্ধ রূপে লিপিবদ্ধ করে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির জন্ম, নাগরিকদের জাতীয়তা এবং সার্বভৌমত্বের মূলে আশ্চর্যজনক চিহ্ন রেখে দেয়ার অপপ্রয়াস আজো চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যেন কোনোকালে সিকিম বা কাশ্মিরের মতো না হয়, সে জন্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিকদের জাতীয়তার পরিচয় রাষ্ট্রকেন্দ্রিক হবে এবং কেবল বাংলাদেশের ভূখণ্ডের লোকজনের জাতীয়তাবোধ- এ দেশের মাটি-মানুষ-কৃষ্টিকালচার এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যভিত্তিক হবে, এমন ইউনিক চিন্তা স্বাধীনতা লাভের সাত-আট বছর পর কেবল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাথায় কিভাবে এলো, তা ভাবলে সব বুদ্ধিমান মানুষের মাথা এমনিতেই প্রেসিডেন্ট জিয়ার প্রতি যেমন নত হয়ে যায় তেমনি দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা এবং মমত্ববোধও শহীদ জিয়ার প্রতি বিগলিত না হয়ে পারে না।

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের উদ্ভাবক তথা জনক হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়ার যে ভাবমূর্তি তা নিয়ে কারো কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। কারণ, গত ৪২ বছরের মধ্যে কেউ একটিবারের জন্যও এই দাবি করেনি যে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণা অমুকের মস্তিষ্ক থেকে এসেছে অথবা তমুকের স্বপ্নের মধ্যে ছিল। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের জনক নিয়ে কারো প্রশ্ন না থাকলেও এমন প্রশ্ন অনেকে করতে পারেন, একজন মিলিটারি জিনিয়াস কাম-পলিটিক্যাল জিনিয়াসের মাথায় সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত জটিল অনুসিদ্ধান্ত এলো কিভাবে! বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণা যেমন রবীন্দ্রনাথের মস্তিষ্কপ্রসূত তেমনি মহাকবি ইকবালের মাথা থেকেই পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ধারণা এসেছিল। অন্য দিকে প্রাচীন ভারতের মহাকবি বানভট্টই ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ধারণা প্রথম দিয়েছিলেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উল্লিখিত আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট নিয়ে যারা জানতে চান, তাদেরকে অবশ্যই জিয়ার জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং কর্মজীবন সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে হবে। তিনি এই ভূখণ্ডের খাঁটি ভূমিপুত্র। তিনি এবং তার পূর্বপুরুষেরা এখানেই জন্ম নিয়েছেন এবং এই মাটি, এই দেশ এবং এই দেশের মানুষকে ভালোবেসে এ দেশেই সম্মান ও মর্যাদার সাথে মারা গেছেন। তিনি বা তার পূর্বপুরুষেরা ইরান-তুরান থেকে আসেননি। তাদের রক্তেও রয়েছে ধর্মপ্রাণ খাঁটি মুসলমানের রক্ত। হালাল উপার্জনে পরিশ্রম করা এবং সৎভাবে জীবন যাপন করা জিয়া এবং তার পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য। তিনি এবং তার পূর্বপুরুষদের সুযোগ ছিল ভারতীয় নাগরিক হওয়ার অথবা চাইলে তারা পাকিস্তানি অভিজাত সমাজের প্রতিভূ হতে পরতেন। কিন্তু তারা সেটি না করে স্বেচ্ছায় বাংলাদেশী হয়েছিলেন।

প্রেসিডেন্ট জিয়ার বাবা মনসুর রহমান ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন এবং উপমহাদেশের প্রধানতম কালি ও কাগজ বিশেষজ্ঞ রসায়নবিদ ছিলেন। ভারত বিভাগের সময় তিনি ব্রিটিশ সরকারের সচিবালয় কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে কর্মরত ছিলেন। তখন সরকারি কর্মকর্তাদের ইচ্ছানুযায়ী তাদের চাকরি ও নাগরিকত্ব ভারত অথবা পাকিস্তান রাষ্ট্রে ন্যস্ত হতো। মনসুর রহমান বৃহত্তর ভারত ত্যাগ করে পাকিস্তান চলে এলেন। অন্য দিকে, ১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমানের যখন সুযোগ এলো পাকিস্তানি অথবা বাংলাদেশী হওয়ার তখন তিনি জীবন বাঁচাতে পাকিস্তানে না গিয়ে অস্ত্র হাতে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

তার এই বীরত্ব, তার মেধা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা তিনি তার পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এবং উন্নত কর্মপরিবেশ থেকেই পেয়েছিলেন। ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী জিয়াউর রহমান ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে নামকরা বিদ্যালয় হেয়ার স্কুলের ছাত্র ছিলেন- ছিলেন পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমির সবচেয়ে মেধাবী ও চৌকস ছাত্র। কর্মজীবনে তিনি একজন সামরিক কর্মকর্তারূপে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যে বীরত্ব দেখিয়েছেন এবং সেই বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ সে রাষ্ট্রীয় উপাধি পেয়েছেন তা অন্য কোনো সামরিক নেতার ভাগ্যে জোটেনি। সুতরাং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণা তার মস্তিষ্ক থেকে আসবে না তো কার মস্তিষ্ক থেকে আসবে!

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য


আরো সংবাদ