১৮ অক্টোবর ২০১৯

অমিতের হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ

অমিত শাহ
অমিত শাহ - ছবি : সংগ্রহ

এবারের ১৪ সেপ্টেম্বর নাকি ভারতের হিন্দি দিবস। ভারতের অমিত শাহ এবার ‘হিন্দি’ নিয়ে হাজির হয়েছেন। ব্রিটিশেরা চলে যাবার পরে স্বাধীন ভারতের কনস্টিটিউশন যখন লেখা হচ্ছিল সেই ১৯৪৯ সালে ১৪ সেপ্টেম্বরকে একটা হিন্দি দিবস ঘোষণা করে রাখা ছিল। রাখা ছিল বলছি এ জন্য যে এটা রেখে কোনো লাভ হয়নি, হিন্দিই উধাও হয়ে গিয়েছিল। খুব একটা কিছু আগায়নি। কী আগায়নি?

ব্রিটিশ আমল থেকেই, রাজনীতি জিনিসটা কী- তা অস্পষ্ট বলে উচ্চারণে আধা-বুঝাবুঝির সময় থেকেই ভারতে রাজনৈতিক দল বলতে একমাত্র একটা ‘জাতীয়তাবাদী’ দলই বুঝা হতো। আবার এই জাতীয়তাবাদ বলতে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্ব ছাড়া আর অন্য কিছু হতে পারে না- এই অনুমান নিয়েই তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। যদিও একটা তফাত বা বিতর্ক ছিল যে, তারা রাজনীতি ও রাষ্ট্র বলতে যে একটা হিন্দুত্ব-রাষ্ট্র বুঝছেন তা স্পষ্ট করেই বলা হবে, না তা কৌশলে আড়াল রাখা হবে, এ নিয়ে কংগ্রেস-আরএসএসে ভিন্নতা ছিল। কিন্তু হিন্দু রাজনীতিক সবাই মানত যে, হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভিত্তি ছাড়া ভিন্ন কোনো রাজনীতি করা, রাষ্ট্র গড়া ও থাকা সম্ভব নয়। ঠিক এ কারণেই তারা অ-হিন্দু, বিশেষ করে ভোকাল মুসলমানদের সামনে নিজেদের হিন্দুত্ব চিন্তার ন্যায্যতা কী তা প্রতিষ্ঠা করতে না পারা থেকেই কংগ্রেসের জন্মের ২০ বছরের মধ্যেই মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল।

পরিণতিতে পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু তবু তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র ধারণার বুঝের মধ্যে কোনো প্রভাব পড়েনি। তারা হিন্দুত্ব আঁকড়ে ধরেই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবত ১৯৬৩ সালের মধ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র ও কনস্টিটিউশন বানানোর পরে শুরু হয় এর ডিজেনারেশন বা ভেঙে পড়া। অর্থাৎ হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের চিন্তা ও রাষ্ট্র বাস্তবায়ন শুরুর পর্যায়েই এরা টের পেতে থাকে যে সব ভেঙে পড়ছে।

অনেকের ধারণা যে, কোনো জনগোষ্ঠীর আশি-নব্বই পার্সেন্ট ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গড়তে কোনো সমস্যা হয় না। এ ধারণা ভুয়া, ভিত্তিহীন। এর মানে ভারতের মুসলমানেরা ভেঙে আলাদা নিজের রাষ্ট্র গড়ে বেরিয়ে গেলে তাতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র গড়তে আর অসুবিধা হবে না, পোক্ত হবে। তাই তো হওয়ার কথা, কিন্তু ভারতে তা হয়নি। মাত্র তেরো বছরের মধ্যে দক্ষিণের রাজ্যগুলো হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের নামে দক্ষিণের ওপর হিন্দি-বলয়ের কর্তৃত্ব উপড়ে ফেলে দিয়েছিল। কর্নাটকের প্রধানত কন্নড় ভাষা, কেরালার মালয়ালম ভাষা, অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু ভাষা, তামিলনাড়– তামিল ভাষা এদেরকে একসাথে দ্রাবিড়িয়ান ভাষা বলে। অনেকে তাই দক্ষিণের এই চার রাজ্যকে দ্রাবিড়িয় রাজ্য বলে। অনেকে আবার এটা বুঝাতে দাক্ষিণাত্য বা ইংরেজিতে ডেকান বলে থাকে। এরাই মূল লড়াকু যারা উত্তর ভারতের (হিন্দুভাষী বা হিন্দিবলয়ের) আধিপত্যের চরম বিরোধী।

এমনকি এই বিরোধিতার উৎস হিন্দু ধর্মের মতোই প্রাচীন। উত্তর ভারতে মানে মূলত এখনকার উত্তরপ্রদেশ, এখানে আর্যদের আগমনের পরে আশপাশের এলাকায় বিস্তার লাভের পরে দক্ষিণ দিকে অন্ধ্রপ্রদেশের পরে আর আগাতে পারেনি। দক্ষিণে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে সেই এলাকাটাই দাক্ষিণার্থ বা দ্রাবিড়িয় অঞ্চল। একইভাবে পুবদিকে আর্যদের বিস্তার ঘটেছিল মহারাষ্ট্র পেরিয়ে বিহার পর্যন্ত। এর পরেই বাংলা অঞ্চল। এখানেও আর্যরা এসেছিল বা আসেনি সে তর্ক ছাপিয়ে বলা যায়, বাংলার প্রতিরোধ অবশ্যই ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও দূরবর্তী হলেও ভাষা বা কালচারে আর্যদের প্রভাব বাংলায় ছিল বা আছে এ নিয়ে তর্ক নেই। এই ফ্যাক্টসটাই একালেও সব ঘটনার পেছনে কাজ করে থাকে। দেশ ভাগের পরের ভারত মূলত হিন্দি-বলয়ের ক্ষমতা হয়েই থেকেছে। এর পুরা ভারতের ওপর শাসন, যেটা নিজেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের পরিচয়ের আড়ালে কার্যকর থাকতে চেয়েছে। আর এরই প্রবল বিরোধী হল দ্রাবিড়ীয় ও বাংলা অঞ্চল।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই দুই অঞ্চল থেকেই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতা উঠে এসেছিল। হিন্দুধর্মের পক্ষে এর ন্যায্যতা দিতে গিয়ে এর সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো এর ব্রাহ্মণ-শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা ব্রাহ্মণ্যবাদ- এটা উদাম হয়ে যায়। এই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দ্রাবিড়ীয় ও বাংলা অঞ্চলের মিল পাওয়া যায়। বাংলায় সুলতান শাসন আমলের (১২০৫-১৫৭৬) শেষের দিকে নদীয়াকেন্দ্রিক চৈতন্যের ও পরবর্তীতে লালনের জাতপাতবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের কথা জানা যায়।

আর ওদিকে ব্রিটিশ আমল থেকেই সামাজিক সুযোগ সুবিধায় সরাসরি ব্রাহ্মণবিরোধিতার আন্দোলনের সূচনা করেছিল তামিল সমাজ। আজকের তামিলনাড়ুতে যে দুই স্থানীয় দলের হাতে এই রাজ্য পালটাপালটি শাসিত হয়ে আসছে সে মূল দলের নাম ডিএমকে। ইংরেজি আদ্যক্ষরে বলা এই দলের নাম দ্রাবিড়া মুনেত্রা কাজাঘাম (দ্রাবিড় প্রগেসিভ ফেডারেশন) থেকেই ডিএমকে। আর সেটা থেকে ভেঙে পরে অন্য আরেক অংশের দলের নাম এআইএডিএমকে। ডিএমকেই ব্রাহ্মণবিরোধিতার আন্দোলনের সূচনা করেছিল।

নেহরুর যুগে ভারতকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের পরিচয়ের ভারত বানানোর প্রচেষ্টা প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল দ্রাবিড়িয়দের বিশেষ করে ডিএমকের হাতে। দেশ ভাগের পরে পাকিস্তান পাবার পরে, মূল নেতা মুসলিম লীগের জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তানে ভিলেন হয়ে যান উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের প্রশ্নে। কিন্তু মজার কথা হলো, ঠিক একই চিন্তায় জিন্নাহর মতো একই কাজ করেছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তার আমলেই হিন্দিকে সরকারি ভাষা করা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই হিন্দি দিবস বলে একটা দিন চালু ও পালন করা হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর।

আর এর আইনটা লেখা হয়েছিল এভাবে, “জাতীয় ভাষা (ন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ) হিসাবে হিন্দি’, ‘প্রথম সরকারি দফতরের ভাষা (অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ), আর ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে চালু থাকবে।” তবে এখানে দুইটা কিন্তুও ছিল। প্রথমত, ভাষার নাম ‘হিন্দি’ তা বলা হয়নি। বলা ছিল ‘হিন্দুস্থানী ভাষা’। আরো ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছিল, তা দেবনাগরি অক্ষরে বা ফার্সি অক্ষরে হতে পারবে। আর দ্বিতীয় শর্ত ছিল, এই নিয়ম বা আইন, এটা ১৫ বছর পর্যন্ত চালু থাকবে। এরপর পার্লামেন্ট নিজে বসে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, এরপরে কী হবে।

এই হিসাবে ১৯৬৩ সালে হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ কায়েমের জোশে জিন্নাহর মতনই নেহরুও হিন্দিকে জাতীয় ভাষা ও একমাত্র অফিসিয়াল ভাষা ঘোষণা করে সংসদে পাস করা এক আইন জারি করেন। এর আগে অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে শিক্ষা কারিকুলামে হিন্দি ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ বিক্ষোভ সংগঠিত হতে থাকে অহিন্দি রাজ্যগুলোতে, বিশেষ করে দ্রাবিড়িয় অঞ্চলে। সেখানে ক্ষোভ প্রতিবাদ এতই তীব্র ছিল যে পাঁচজন মানুষ নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহুতি দিয়েছিল। সাথে দুজন পুলিশকেও তারা মেরে ফেলেছিল। কেরালায় বহু কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসে আগুন দেয়া হয়েছিল। বাধ্য হয়ে কংগ্রেস আইনটা প্রত্যাহার করে নিয়ে আন্দোলন থামিয়েছিল। ১৯৬৪ সালে নেহরুর মৃত্যু হয়। ১৯৬৫ সালে নতুন প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রীর আমলে আগের মতোই হিন্দি আর ইংরেজি সরকারি অফিসিয়াল ভাষা ফিরে করা হয়। তবে জাতীয় ভাষা কী হবে তা উহ্য রাখা হয়। আসলে এটাই ছিল দ্রাবিড়িয় রাজ্যগুলোর সাথে আপসনামা রফায় লেখা অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট ১৯৬৫। এ কালে ২০১০ সালে গুজরাট হাইকোর্টের এক রায়ে এটাই স্বীকার করা হয়েছে যে, ভারতে ‘জাতীয় ভাষা’ বলে কোনো কিছুই নেই।

এদিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্র গড়ার দাবিদারেরা বিশেষত নেহরুর কংগ্রেস এই প্রথম সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায়। আর তা থেকে হিন্দি ভাষা-জাতীয়তাবাদ করার উদ্যোগও প্রচণ্ড মার খেয়ে যায়। সেই থেকে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান এসবের জাতীয়তাবাদ আসলে হতভম্ব হয়ে বিভ্রান্ত ও ফিকে হয়ে যেতে থাকে।

বহুবার বলেছি, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান অথবা হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্রের কামনা কেবল কংগ্রেসের নয়, এটা হিন্দু মহাসভা বা পরে এদেরই আরএসএস-জনসংঘ বা একালের বিজেপির কামনা ছিল সবসময়। তফাত শুধু এই যে, হিন্দুত্বকে কংগ্রেস সেকুলার জামার আড়ালে রেখে ফেরি করতে চায়। আর বিজেপি হিন্দুত্বকে গর্ব করে প্রকাশ্যে বলতে চায়। তবে ১৯৬৫ সালের মধ্যেই কংগ্রেসের নেতৃত্বে যে হিন্দি ও হিন্দুত্বের মার খেয়ে যাওয়া- এ প্রসঙ্গটা কংগ্রেসের কাছে হতাশার কিন্তু কোনো বিকল্প করণীয় ছাড়াই।

আর ১৯৮৫ সালের পর থেকে কংগ্রেস ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা থেকেই হারিয়ে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। মনে রাখতে হবে ওই ১৯৬৩ সালে কংগ্রেসের প্রথম পরাজয়ের পর থেকে ডিএমকেই কংগ্রেসের পরে প্রথম (আঞ্চলিক) রাজনৈতিক দল, যারা নির্বাচনে এককভাবে রাজ্যে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর সেই থেকে দ্রাবিড় অঞ্চল থেকে হিন্দিভাষী দলের হারিয়ে যাওয়া শুরু। তামিলনাড়ূতে ডিএমকে অথবা আন্না-ডিএমকে রাজ্য সরকারে।

কিন্তু এই পরাজয় সম্পর্কে বা সাধারণভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্র কামনা সম্পর্কে আরএসএস-বিজেপির ভাষ্য ও মূল্যায়নটা হলো, কংগ্রেস লিবারেল বা দুর্বল ঈমানের হিন্দুত্ব করে বলেই হেরে গেছে। আগ্রাসী-হিন্দুত্ব নিয়ে আগালে হিন্দুত্ব কখনো হারত না।

এ কারণেই, মোদির দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জয়ী হওয়াতে বিজেপি এবার আস্তে ধীরে নিজেদের মূল্যায়নের ঝাঁপি খুলে ধরতে শুরু করেছে। কাজেই মোদি সরকার-টু, এটা আসলে (১৯৪৭-৬৩) সময়কালের কংগ্রেসের হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা হিন্দুত্বের ভারত রাষ্ট্রের স্বপ্ন ও দর্শন যে মিথ্যা, অকেজো ও অকার্যকর প্রমাণ হয়েছিল সেই হিন্দুত্বকেই এবার ধুয়ে মুছে কিন্তু আগ্রাসী-হিন্দুত্ব হিসেবে হাজির করতে সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে আসছেন মোদি-অমিত গোষ্ঠী। বলাই বাহুল্য, হাস্যকর জিনিস করার উদ্যোগে প্রথমবারের ব্যর্থতার পরও দ্বিতীয়বার নিলে সেটা এবার তামাসার পরিণতি নিয়েই ফেরে। এই হাস্যকর জিনিসটা হলো হিন্দুত্বের জাতীয়তবাদ- যা এখন জয় শ্রীরাম বলে পরিচিত!

হিন্দি দিবস এতদিন ধুলা ময়লা পড়ে কোথাও কোণে অবহেলায় গড়াগড়ি যাচ্ছিল। ওদিকে এতদিনে সরকারি দফতরের ভাষা, হিউম্যান রিসোর্স বা বিজনেস ম্যানেজমেন্টের ডিফল্ট ভাষা হয়ে উঠেছে ইংরেজি। কংগ্রেস হাত-পা ছেড়ে এটাই একবাক্যে মেনে নিয়েছিল। অমিত শাহ এবার হিন্দি দিবস পালন করে বসলেন। সেটা তেমন কিছু নয় কেবল এক টুইটার স্টেটমেন্ট তবে হিন্দিতে লেখা স্টেটমেন্টটাই গুরুত্বপূর্ণ। সেটার আনন্দবাজারের করা বাংলা অনুবাদটা হলো এরকম - ‘ভারতে বহু ভাষা রয়েছে।

প্রত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু দেশের একটি ভাষা থাকা প্রয়োজন, যাকে বিশ্ব স্বীকৃতি দেবে ভারতীয় ভাষা হিসেবে। যদি কোনো ভাষা দেশকে বাঁধতে পারে, তা হিন্দি।’

প্রথমত লক্ষণীয় হলো, অমিত শাহ কোনো প্রধানমন্ত্রী নন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যেটা তার মন্ত্রণালয়ের কাজও নয়। ভারতে হিউম্যান রিসোর্স বলে মন্ত্রণালয় আছে, সেই মন্ত্রী এই হিন্দি দিবস পালন করলেও একটা কথা ছিল! তাহলে অমিত শাহ কেন? একটা ভুয়া মানে করতে চাইবে অনেকে যে অমিত শাহ দলের সভাপতি, তাই। কিন্তু না। এর আসল অর্থ হলো, হিন্দি জাতীয়তাবাদ করতে গিয়ে ১৯৬৩ সালের কংগ্রেসের মতো এবার আগ্রাসী-হিন্দুত্ব যদি মার খেয়ে যায় তবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে যেন পশ্চাৎ-অপসারণটা ঘোষিত করার সুযোগ নেয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, প্রথমেই বলা হয়েছে, ‘ভারতে বহু ভাষা রয়েছে। প্রত্যেকটির গুরুত্ব রয়েছে।’ এর মানে হলো তারা ১৯৬৩ সালের পরাজয়টা আমল করেছেন। তাই প্রলেপ। কিন্তু আরএসএস-বিজেপির মূল যুক্তিটা জানা গেল পরের বাক্য - ‘দেশের একটি ভাষা থাকা প্রয়োজন’। এছাড়া খসড়া শিক্ষানীতি ২০১৯-এ দেখা গেছে, হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা আছে সেখানে- যেখানে স্বয়ং নেহরু পরাজিত হয়ে পিছু হটে গিয়েছিলেন।
অমিত আসলে বলতে চাইছেন ‘ভারতের একটা হিন্দি-হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ প্রয়োজন’।

কেন? সেই পুরন বেকুবি যুক্তি। সেটাকেই আনন্দবাজারে তার শিরোনাম করে লিখেছে- ‘ভারতকে বাঁধতে পারে হিন্দিই’, এক রাষ্ট্র, এক ভাষা চান অমিত শাহ।
এই যুক্তিটা আসলে রাষ্ট্র না-বুঝ এদের জন্য আর একই সঙ্গে যারা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের হিটলার একেকজন- জয় শ্রীরাম, এদের যুক্তি।

অমিতের কথা অনুযায়ী ভারতকে বাঁধতে পারে এমন ‘রশি’ বা ভালো ‘আঠা’ দরকার অমিতের। আচ্ছা নাগরিক কী বেধে রাখার জিনিস? অমিত মনে করেন হ্যাঁ, এজন্য দরকার একটা হিন্দুত্ব মানে, হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ।

অমিত শাহরা আসলে অসুস্থ। কোনো রাষ্ট্র গড়ার জন্য না হিন্দুত্বের মতো কোনো আদর্শ, না কোনো ধরনের জাতীয়তাবাদ- কোনোটার দরকার নেই। কোনো দিন ছিলও না। কিন্তু ভুল বুঝা হয়েছে- জাতি রাষ্ট্র বা নেশন-স্টেট বলে এক সোনার পাথরবাটি ধারণা এসেছে।

দরকার আসলে বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার, নাগরিক নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার, সমান সুযোগ, নাগরিকের অধিকার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি এবং এর বাস্তবায়ন। রাষ্ট্রে জুলুম বন্ধ করুন, নাগরিক নির্বিশেষে ভোগী সবাইকে একটা ইনসাফ দিন। এমন ব্যবস্থা কায়েম করুন। মানুষকে বেধে রাখতে হবে না, কোনো বাড়তি রশি, আঠা লাগবে না।

সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় শব্দটার নাম আসলে নেশন, জাতি বা জাতীয়তাবাদ।
আমেরিকা রাষ্ট্রটা আদর্শ নয়। অনেক খুঁত ও ব্যর্থতা আছে অবশ্যই। তবু খুঁটিয়ে দেখেন তো- আমেরিকান রাষ্ট্র গড়তে কোনো ধরনের জাতীয়তাবাদ আছে কিনা? আমেরিকানেরা কী ও কোন জাতি? পঞ্চাশ রাজ্যের সমাহার আমেরিকা। ভারতের চেয়েও বড়। তবু কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নেই কেন? নাগরিক বা রাজ্যের পালিয়ে যাওয়া ঠেকাতে ওখানে রশি বা আঠা বলে কিছু, কোনো জাতীয়তাবাদ কী আছে?

তাহলে রাষ্ট্রটা টিকে আছে কী করে? অনেক দুর্বলতা আছে এর, কিন্তু ভাঙার কথা নেই।
আর ভারতের বেলায় দেখেন, কংগ্রেসের নিজের পরাজয় আর দলটা এখন শুকিয়ে যাওয়াতে সে আর ভারত ভাঙার কারণ হওয়ার সুযোগ বা উসিলা নেই। বিপরীতে এ থেকে শিক্ষা না নিয়ে একই ভুল করতে হিটলারি আগ্রাসী হয়ে হিন্দুত্ব, এক জয় শ্রীরাম হাতে এগিয়ে আসছে মোদি-অমিতেরা।

এরা আসলে হিন্দুত্বে ডুবে অসুস্থ হয়ে গেছে, আর ততটাই রাষ্ট্র ধারণা ও চিন্তায় অবুঝ। এদের ধারণা হিন্দুর সব শত্রু হলো মুসলমান। আচ্ছা তাহলে দ্রাবিড়িয় যত নেতা আছেন, ডিএমকে এর নেতা স্টালিনসহ এরা কী মূসলমান? কলকাতার সিপিএম বা মমতা এরা? তা হলে? কথা হলো, দ্রাবিড়িয়রা বা বাঙালিরা হিন্দু হলেও তারা অমিত-মোদির বিরোধী হবেই। কারণ তারা হিন্দি বলয়ের ক্ষমতার নামে ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাটার বিরোধী। অমিত-মোদিরা চোরা ক্ষমতায় বিশ্বাসী, এটাই তো আসল সমস্যা।

যেমন কেন্দ্রের হাতে জমা হওয়া রাজস্ব কোন রাজ্য কত পাবে কিসের ভিত্তিতে- এটা রেখে দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর খেয়ালের হাতে, ব্যক্তি-ইচ্ছার বাইরে নিরপেক্ষতা রাখা হয়নি। যেমন মমতা মোদির দলের না হলে তিনি চাপ দিতে পারেন? এটা কি ইনসাফ? এর সোজা মানে এক রাজ্যের কাঁধে চড়ে আরেক রাজ্য খাচ্ছে। মোদির যাকে ইচ্ছা তাকে খাইতে দেবেন।

সিবিআই, ইডি, র- এসব প্রতিষ্ঠান তো আগেই ছিল। তাতেও মোদি সন্তুষ্ট নন। এখন বিজেপির প্রভাবে গড়ে নেয়া হয়েছে নতুন আরেকটা এনআইএ। এদের মোদি ব্যবহার করছেন বিরোধীদের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে মামলা হয়রানি করতে পারেন এমন হাতিয়ার হিসেবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে কাজের নিয়ম করে দেয়ার বদলে তা ব্যাহত করে নিজ স্বার্থে এদের ব্যবহার করছেন। গত পাঁচ বছরে বিরোধীদের সমর্থন ছাড়া রাজ্যসভায় কোনো বিল পাস করতে পারেননি। এবার সিবিআই, ইডি, র ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে বিরোধীদের বাগে এনেছেন। আর তা দিয়ে এবার প্রথম তিন মাসের আগেই ৩৭০ ধারা বাতিল পাস করে নিয়েছেন। বাগে এসেছে এটা টেস্ট করার জন্য এর আগে তিন তালাক বিল পাস করেছেন। অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্র একটা অন্ধকারের ক্ষমতা একটা দাগী ক্ষমতার রাষ্ট্র হিসেবে রেখে দিতে চান মোদি-অমিতের। আর হিন্দুত্বের জায়ীয়তাবাদ খুঁজে, রাষ্ট্র এক রাখবে!

মোদি-অমিত হিন্দি-হিন্দুত্বের আড়ালে যা করছেন এজন্যই ভারত ভেঙে যাবে। ভারত ভাংবার কারণ হবেই মোদি-অমিত। তাদের ‘অন্ধকারের ক্ষমতার’ প্রতি আগ্রহ।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]


আরো সংবাদ