০৭ ডিসেম্বর ২০১৯

ডাকসুর গণতন্ত্র

-

গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে ডাকসুর সুনাম ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ডাকসুর একটি ঐতিহ্যবাহী ভূমিকার কথা সর্বজন স্বীকৃত। যখনই কোনো স্বৈরশাসক গণতন্ত্রকে পদদলিত করতে চেয়েছে, তখনই জেগে উঠেছে ডাকসু। সে ইতিহাস ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত বিস্তৃত। ২৭ বছর পর মৃত ডাকসু যখন জীবিত হয়েছে, তখন পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় গড়িয়ে গেছে অনেক পানি। দেশ হারিয়েছে ‘নির্বাচনী গণতন্ত্র’। সুতরাং দেশের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন, ক্ষমতাসীনদের ‘শক্তির সংস্কৃতি’ দিয়েই সম্পন্ন হয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম ডাকসু ভিপি নুরুল হক। সবেধন নীলমণি অথবা হারাধনের একটি ছেলে। লোকে বলে নিরঙ্কুশ জনপ্রিয়তা হজম করা সম্ভব হয়নি। অন্যরা বলে সমগ্রকে জায়েজ করার কেরামতি। নির্বাচিত ভিপি নুরুল হক তার স্বীকৃত মর্যাদা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত।

যেখানেই যায় সেখানেই শাসক দলের সোনার ছেলেরা তাকে মারধর করে। এসবের মধ্যেও ‘আগুনমুখা গাঙপাড়ের সাহসী ছেলেটি’ এগিয়ে যাচ্ছে। যা হোক, নির্বাচনী কেরামতির পর এখন ডাকসু স্বস্বীকৃত বৈধতার সঙ্কটে নিপতিত। তথাকথিত নির্বাচিত ডাকসু জিএস একই সাথে ছিলেন ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। অতি সম্প্রতি তিনি চাঁদাবাজি এবং অন্যান্য অপরাধে ক্ষমতার সর্বোচ্চ কেন্দ্র থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। তিনি সঙ্গতভাবেই ডাকসুর জিএস হিসেবে পদে অধিষ্ঠিত থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে পদত্যাগ করাই ছিল সঙ্গত। তবে তিনি আসছেন না। ডাকসুর কোনো কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন না। ডাকসুর অন্য পদাধিকারীরাও প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের অনেকেই নিয়মানুগভাবে ছাত্রত্ব অর্জন করেননি। যে কায়দায় দেশ চলছে, সেই কায়দায় তারা ভর্তি হয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে আইন-কানুন, নিয়ম-রীতি এবং ন্যায়ানুগতার কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। এ হেন ডাকসু গত সপ্তাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্তটি নিয়ে এখন তর্কবিতর্ক চলছে। এটি তাদের সীমা-পরিসীমার বিষয় কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর বর্তমান ডাকসুর তৃতীয় কার্যকরী পরিষদের সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর আগে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন নিয়ন্ত্রিত তথাকথিত পরিবেশ পরিষদ ক্যাম্পাসে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। উল্লেখ্য যে, দীর্ঘকাল ধরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ধর্মভিত্তিক ছাত্রসংগঠনকে প্রকাশ্যে কাজ করতে দিচ্ছিল না ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনটি। এবার তারা নির্বাচিত ডাকসুকে ব্যবহার করে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করল। এ বিষয়ে ডাকসুর এজিএস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘ধর্মভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের বিষয়টি আমাদের কার্যনির্বাহী সভার এজেন্ডায় ছিল। সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্তটি পাস হয়েছে।’ সর্বসম্মতির কথা বলা হলেও ডাকসু ভিপি পরে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে ভিন্নমত পোষণ করেন। জাতীয় পার্টির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রসমাজও নিষিদ্ধ করা হয় বলে ভিপি নুরুল হক জানান।

তিনি তার বিবৃতিতে বলেন, ‘সাধারণ ধর্মভিত্তিক রাজনীতি যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেটা নয়।’ তিনি তার ব্যাখ্যায় বলেন, ‘সিদ্ধান্ত হয়েছে ধর্মীয় উগ্রবাদী, সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধ’। দৃশ্যত দুই নেতার বক্তব্যে নীতিগত সামঞ্জস্য থাকলেও প্রয়োগিক ভিন্নতা রয়েছে। নুরুল হক যা বোঝাতে চান তা হলো, ধর্মভিত্তিক সব সংগঠনই সাম্প্রদায়িক, উগ্রবাদী ও মৌলবাদী নয়। ধর্মের শাশ্বত আবেদন রয়েছে। যে কেউ ধর্মের বাণী প্রচার ও প্রকাশ করতে পারে। তা ছাড়া এর একটি মানবিক ও আধ্যাত্মিক দিক রয়েছে। তবে ধর্মকে ভর করে যদি কেউ হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ায় তা ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। একই সাথে যে সংগঠন সহজ-সরল, নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পথ না নিয়ে চরম পথ নেয় অথবা উগ্রতা ছড়ায় তা সমাজের সাধারণ স্বভাববিরোধী। সুতরাং