১৫ নভেম্বর ২০১৯

গণতন্ত্র গণমাধ্যম ও উন্নয়ন

-

“বর্তমান বিশ্বকে ‘গণতান্ত্রিক বিশ্ব’ মনে করা হলেও গণতন্ত্রের পথচলা এখনো নির্বিঘ্ন নয়। এ ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে স্বাধীন মত প্রকাশে প্রতিবন্ধকতা ও শৃঙ্খলিত গণমাধ্যম। মূলত সত্যকে আড়াল ও মিথ্যাকে ভিত্তি করে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও উন্নয়ন মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে না। তাই এই অশুভ বৃত্ত থেকে বিশ্বকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।” সম্প্রতি কানাডা ও যুক্তরাজ্যের যৌথ আয়োজনে লন্ডনে অনুষ্ঠিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এমন অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে। লন্ডনে গণমাধ্যম-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো এমন এক সময়, যখন বিশ্বের দেশে দেশে কর্তৃত্ববাদী সরকারের উত্থান স্বাধীন গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতার জন্য বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কেবল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি নয়, বরং গণমাধ্যমকর্মীদের হত্যা, জেল ও নানা হুমকি-ধমকি দিয়ে সত্য গোপন করার চেষ্টা এখন এক বৈশ্বিক প্রবণতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই মুদ্রাদোষ থেকে আমরাও মুক্ত থাকতে পারিনি।

গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের সাথে গণমাধ্যমের নিবিড়তম সম্পর্ক রয়েছে। সঙ্গত কারণেই আধুনিক গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। মূলত সংবাদপত্র আর সংবাদকর্মীর মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা, চাহিদা, জনমত সৃষ্টি ও সমাজের ভালোমন্দের প্রতিফলন ঘটে। তাই আধুনিককালে গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতাকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতিনিধিও বলা হয়। যেসব জাতিরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে এগিয়ে, তারাই বৈশি^ক প্রতিযোগিতায় অনেক ক্ষেত্রেই অগ্রগামী।

অতীতে সাংবাদিকতার পরিসর সীমিত থাকলেও বর্তমানে তা শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, আইসিটি, চাষাবাদ, ক্রয়-বিক্রয় থেকে শুরু করে নাগরিক জীবনের প্রয়োজনীয় সব চাহিদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কিন্তু নেতিবাচক ও গন্তব্যহীন রাজনীতির কারণেই আমাদের দেশে রাষ্ট্রের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গের পথচলা মোটেই নির্বিঘœ হয়নি। প্রতিটি জাতিরাষ্ট্রেই সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি মূল্যায়নের মানদণ্ড হলো উন্নয়ন। তবে এ ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অর্জনের পেছনে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে এবং এখনো রাখছে।

১৯৪৬ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত আমাদের জাতীয় উন্নয়নের তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল আধুনিকায়ন। যার মূল কথা হলো- তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো কাক্সিক্ষত উন্নতি না হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো সেকেলে সমাজ ব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তিতে পশ্চাৎপদতা এবং এতদবিষয়ক জ্ঞানের অপ্রতুলতা। আর এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহারে বৈশ্বিক মান নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে উন্নত বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অনুসৃত পদ্ধতির অনুসরণ করা দরকার। আর এ ক্ষেত্রে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা হবে গণতন্ত্রায়ন ও উন্নয়নের ইতিবাচক দিক।

শুধু আয়ের সংস্থানকেই উন্নয়ন বলা যুক্তিযুক্ত হবে না বরং সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা যথার্থ উন্নয়নের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। আমাদের দেশে সনাতনী প্রবৃদ্ধিনির্ভর উন্নয়ন কৌশল চালু আছে। প্রবৃদ্ধিনির্ভর উন্নয়ন কৌশলের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- প্রবৃদ্ধির ওপর জোর দেয়ার সাথে সাথে নাগরিকদের সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করা হয়। তবে উন্নয়ন আর ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ যেন সমার্থক হয়ে গেছে। কিন্তু অবকাঠামো সৃষ্টি উন্নয়নের সহায়ক মাত্র। সত্যিকারের উন্নয়ন হচ্ছে মানব উন্নয়ন, মানুষের অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তন। এ জন্য মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রয়োজন আইনের শাসন, উদারনৈতিক গণতন্ত্র, শাসন প্রক্রিয়ায় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা চর্চার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। আর এসব নিশ্চিত করার জন্য গণমাধ্যম উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ।

সঙ্গত কারণেই গণমাধ্যম প্রচলিত ধারার উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্বারোধ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে গণমাধ্যমগুলোর সীমাবদ্ধতাও রীতিমতো উদ্বেগের। কারণ, আমাদের দেশে গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। কিন্তু এ কথা আস্বীকার করা যাবে না যে, নানা বাধা-প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অর্জনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো নিয়ে শুরু হয় আমাদের অর্থনৈতিক যাত্রা।

এ ছাড়া সত্তরের দশকের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সদ্য স্বাধীন দেশটিকে বড় একটা ধাক্কা দিয়েছে। কিন্তু আশির দশকে বিনিয়োগে উদারীকরণ নীতি এবং নব্বইয়ের দশকে তৈরী পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে উদারনীতি গ্রহণ করায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের দেশের ক্রমান্নতি লক্ষ করা যায়। আর তাই এক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ছয় শতাংশ, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমাদের রয়েছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য, তৈরী পোশাক রফতানি খাত থেকে আয় চীনের পরই আমাদের অবস্থান। যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যর্থতার কারণেই এসব অর্জনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

আমাদের মাথাপিছু আয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে কম হওয়া সত্ত্বেও গড় আয়ু আমাদের বেশি এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও কম। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তান থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারতের সমান ৯৮ শতাংশ কন্যাশিশুর উপস্থিতি এবং তৈরী পোশাকশিল্পে নারী শ্রমিকদের আধিক্য সামাজিক অর্জনের সূচকে অগ্রগামী বাংলাদেশেরই প্রতিচ্ছবি বলে আমরা জোরালো দাবি করে আসছি। এত কিছুর পরও ২০১০ সালের হিসাব অনুযায়ী, ছয় কোটি ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা পরিচালিত জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, সামাজিক অগ্রগতি সূচকে ১৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার পরই আমাদের স্থান। অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানসহ অন্যদের থেকে সামাজিক সূচকে আমরা এগিয়ে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী- শিশু মৃত্যুহার, বিভিন্ন ছোঁয়াচে রোগ থেকে মৃত্যুহার কমে যাওয়া, শিক্ষাক্ষেত্রে মাধ্যমিকপর্যায়ে নারীর উপস্থিতি, বাল্যবিয়ে ও নারী পাচাররোধ এবং নারীর প্রতি সম্মানজনক ব্যবহারের কারণে প্রতিবেশী অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের এ অগ্রগতি। যদিও এসব নিয়ে দ্বিমতও পোষণ করছেন কেউ কেউ। অন্য দিকে, আমাদের দুর্বল দিক হচ্ছে- অধিক মাত্রায় সহিংস অপরাধমূলক ঘটনা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, লাগামহীন দুর্নীতি, আমলাতন্ত্রের বিচ্যুতি, নিয়ন্ত্রণহীন চাঁদাবাজি, বিরাজনীতিকরণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিচ্যুতি, আইন ও সুশাসনের অনুপস্থিতি এবং শৃঙ্খলিত গণমাধ্যমকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা আমাদের অর্জনগুলোকে ম্লান করে দিয়েছে।

জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকার বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের দেশের গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের অতীতে যেমন শৃঙ্খলমুক্ত ছিল না; এখনো নয়। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একদলীয় শাসন কায়েম করা হয়েছিল। The Newspaper (Announcment Of declaration) Act-1975 মাত্র চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত পত্রিকা রেখে সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রণীত হয়েছিল নানা ধরনের কালাকানুন। অবশ্য নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নিলে গণ-মাধ্যমকর্মীদের অব্যাহত দাবির মুখে আন্দোলনরত রাজনৈতিক জোটের ঘোষণা অনুযায়ী জরুরি ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ সংশোধন ও ১৬, ১৭ ও ১৮ ধারা বাদ দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তবে অতীব পরিতাপের বিষয়, পরে নানা ধরনের কালাকালুন প্রণয়নের মাধ্যমে সে অবস্থার বিচ্যুতি ঘটানো হয়েছে। উল্লেখ করা দরকার, বেসরকারি টেলিভিশনের যাত্রা শুরু ১৯৯৯ সাল থেকে হলেও এখন পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো স্বাধীন গণমাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারছে না। বরং তাদের পদচারণা একটা সঙ্কীর্ণ বৃত্তের মধ্যেই।
অবশ্য বর্তমান সরকার জাতীয় সম্প্র্রচার নীতিমালা-২০১৩ এর খসড়া প্রণয়ন করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞসহ সর্বসাধারণের মতামত প্রদানের সুযোগ দেয়ায় একটা নতুন আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের পিছু ছাড়েনি।

কারণ, সরকার যে বিষয়েই বিধি প্রণয়ন করছে বা করেছে, তা তাদের ক্ষমতার অনুকূলেই। দেশ, জাতি, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের বিষয়টি বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে মূলধারার গণমাধ্যমের পাশাপাশি অনলাইন সংবাদমাধ্যমসহ ব্যক্তিপর্যায়ে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বড় ধরনের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বিপ্লব ঘটিয়েছে বলা যায়। কিন্তু এসব ক্ষেত্রেও সরকারের ভূমিকা মোটেই ইতিবাচক নয়, বরং একট সঙ্কীর্ণ বৃত্তের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

স্মরণযোগ্য যে, সংসদ কার্যকর থাকা সত্ত্বেও ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ বলে ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার সংশোধনী কেবল অপরাধের সংজ্ঞায়, তদন্ত ও দণ্ডদানকেই দুরূহ করেনি, বরং জনগণের বাকস্বাধীনতা হরণ ও সাধারণের হেনস্তার একটি হাতিয়ার বলে সব মহলে জোরালো বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। এই সংশোধনীর কারণেই গণমাধ্যমকর্মীরা ব্যাপক হয়রানির শিকার হন। বিষয়টি নিয়ে সব মহলে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের পর সরকার ২০১৮ সালে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন করে। অভিযোগ রয়েছে, সে নতুন আইনে ৫৭ ধারার চেয়েও গুরুতর ধারা সংযোজিত হয়েছে। গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য এই আইন প্রযোজ্য হবে না বলে সরকারের পক্ষে বারবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও এই নতুন আইনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গণমাধ্যমকর্মী হয়রানির শিকার হয়েছেন বা এখনো হচ্ছেন। সঙ্গত কারণেই স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতাশ্যা ও প্রাপ্তি আমাদের কাছে আজো অধরাই রয়ে গেছে। তাই দেশে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবাধিকার ও কাক্সিক্ষত সুশাসন মজবুত ভিত্তি পাচ্ছে না।

নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ২০০৪ সালে বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে লিখিত 'What’s the Point of Press Freedom?' প্রবন্ধে ইংরেজ শাসনের শেষের দিকে ১৯৪৩ সালে সঙ্ঘটিত ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ যা তিনি বাল্য বয়সে দেখেছেন, তার কারণ হিসেবে গণতন্ত্র এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অনুপস্থিতিকেই দায়ী করেছেন। ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর অপ্রয়োজনীয় আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় ব্রিটেনের তৎকালীন পার্লামেন্ট এখানকার সত্যিকারের সমস্যা সম্পর্কে কিছুই জানত না।

ফলে ১৯৪৩ সালে যখন বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন কোনো সংবাদপত্রেই এ ব্যাপারে কিছু লিখতে সাহস পায়নি। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ব্রিটিশ মালিকানাধীন ‘স্টেটসম্যান অব ক্যালকাটা’ পত্রিকার সাহসী সম্পাদক ‘ইয়েন স্টিফেন্স’ ১৪ এবং ১৬ অক্টোবর দুর্ভিক্ষে বাংলায় কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার একটি আনুমানিক চিত্র তুলে ধরেন সংবাদ ও সম্পাদকীয়তে। একজন ইংরেজ সম্পাদক কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদের প্রতি তৎকালীন ভারতের ইংরেজ শাসকের নজরে পড়ে। একপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি ওয়েস্টমিনিস্টারে। ব্রিটেন থেকে আদেশ আসে সাধারণ মানুষের জন্য দ্রুত রিলিফের ব্যবস্থা করার।

কিন্তু ততদিনে খাদ্যাভাবে কয়েক লাখ ভারতীয় প্রাণ হারিয়েছেন, যা পরে ইংরেজবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করে। অমর্ত্য সেনের মতে, স্বাধীন ভারতে গণমাধ্যম অপেক্ষাকৃত স্বাধীনতা ভোগ করায় ইংরেজ শাসনামলের মতো অনুরূপ কোনো দুর্ভিক্ষ আর দেখা যায়নি। মূলত গণমাধ্যম জাতীয় উন্নয়ন, গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুশাসনের জন্য শক্তিশালী ও সহায়ক অনুষঙ্গ। তাই শৃঙ্খলিত গণমাধ্যম নয়, বরং স্বাধীন গণমাধ্যমই পারে আমাদের দেশ ও জাতিকে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যকর ও উপযোগী করে গড়ে তুলতে।
[email protected]


আরো সংবাদ