২৪ অক্টোবর ২০১৯

কী হতে যাচ্ছে ভারত সফরে?

-

সব সরকারপ্রধানই বিদেশ সফরে কিছু না কিছু আনতে যান। অভিযোগ আছে, ভারত সফরে গিয়ে আমাদের নেতানেত্রীরা সব কিছু উজাড় করে দেন। আর তাই, তারা সফরে গেলেই দেশের মানুষের উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়। ‘এবারও না জানি কী কী দিয়ে আসেন?’

যা হোক, প্রধানমন্ত্রীর বিগত ভারত সফরগুলোতে আমাদের প্রাপ্তি তেমন না হলেও ভারত পেয়েছে তাদের চাহিদামতো প্রায় সব কিছুই। ট্রানজিট, ব্যবসা, কানেক্টিভিটি, সাত রাজ্যের নিরাপত্তা, নদী ও সমুদ্রবন্দর, প্রতিরক্ষা চুক্তি, সামরিক চুক্তি, পুরনো অস্ত্র বিক্রয় ইত্যাদি। বৃহৎ রেমিট্যান্স প্রাপ্তির পাশাপাশি ২০ লক্ষাধিক অবৈধ ভারতীয় নাগরিকের উপার্জন। তা ছাড়া, একচ্ছত্র রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তো আছেই।

দেশের মানুষের উৎকণ্ঠার একটা কারণ হচ্ছে, ভারতের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিষয়বস্তু অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। অথচ আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তির আগে পার্লামেন্ট বা জাতীয় সংসদে এসব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। জনগণের জানা কিংবা সংসদে আলোচনা তো দূরের কথা; ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষনেতারাও কিছুই জানতে পারেন না!

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দিল্লি সফরে গেছেন। এবারো দৃশ্যত ডজনখানিক চুক্তি হবে। আর ডজনখানিক সমঝোতাস্মারকে সই করার কথা। ভারতের জন্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের বিধি-বিধান (স্টান্ডার্ড অপারেশন প্রসিডিউর-এসওপি) সই করা এ সফরের প্রধান কর্মসূচি মনে করা হচ্ছে।

এটা এখন নিশ্চিত, এবারো তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো চুক্তি হচ্ছে না। তবে, সান্তনামূলকভাবে ফেনী, ধরলা, দুধকুমার, মনু, খোয়াই, গোমতী ও মুহুরী নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ হতে পারে।

এবারো যথারীতি মমতা ব্যানার্জির ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে দিয়ে নরেন্দ্র মোদি নিজেকে ‘দায়মুক্ত’ প্রমাণ করবেন হয়তো। অথচ ভারতের সংবিধানের ২৫৩ অনুচ্ছেদ মতে, যেকোনো দেশের সাথে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার যেকোনো চুক্তি করতে পারে। দুর্গা পূজার সময় ধরে আয়োজন এই সফরটি করা হয়েছে। এবারের শীর্ষ বৈঠকে মমতা থাকবেন না। কারণ পূজার কারণে তিনি এ সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যেতে পারবেন না। অনেকেই বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকার মমতাকে দিয়ে খেলছে। মমতাও মোদি সরকারকে নিয়ে খেলছে। ফল হলো, সবাই মিলে বাংলাদেশকে নিয়ে খেলছেন।

এই সফরের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটা হবে, ত্রিপুরার আগরতলায় বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যদি বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহারের কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বরাবরের মতো এটাও গোপন রাখা ঠিক হবে না। তারপরও যদি সিদ্ধান্তটি হয় তাহলে এ নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, ‘বাংলাদেশের ভূমি নয়, বিমানবন্দরের লাইট ব্যবহার করা হবে...’!

সফরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো অগ্রগতির নিশ্চয়তা পাওয়া সম্ভাবনা নেই। তবে কোনো মন্ত্রীকে হয়তো বলতে শোনা যাবেÑ ‘বিষয়টি ভারত সরকার গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছে।’

আসামের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) বিষয়ে বলা হতে পারে, ‘ভারত আমাদের আশ্বাস দিয়েছে- এটি তাদের ইস্যু। তাদেরই হ্যান্ডেল করতে দিন। এনআরসি নিয়ে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।’ অথচ ইতোমধ্যে তাদের ১৯ লাখ নাগরিককে ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী’ বলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার খবর বেরিয়েছে। তারপরও কেন আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই!

বলা যায়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মভিত্তিক ফিচার ফিল্ম তৈরির প্রতিশ্রুতি পালন করবে ভারত সরকার। বাংলাদেশের সরকার প্রধানকে সম্মানসূচক ‘পদক’ দিয়ে সম্মান জানাতে পারে। কিন্তু সফর শেষে প্রায় শূন্য ঝুড়িতে আন্তরিকতা, আতিথেয়তা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ ‘ফলপ্রসূ’ সফরের বার্তা নিয়ে আসাই কি বাংলাদেশ সরকারের জন্য যথেষ্ট?

অন্য দিকে ‘বিশাল অর্জনের’ এই সফরে সীমান্ত হত্যা বা বাণিজ্য ঘাটতির মতো গুরুতর ইস্যুগুলো স্থান পাবে না বলেই ধরে নিতে হয়।
ক্ষোভের সাথে বলাই স্বাভাবিক, তিস্তার পানি খাওয়ার দরকার নেই, নিত্যনতুন ইস্যু তো খেয়েই চলেছে এ জাতি।

লেখক : আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ


আরো সংবাদ

সকল