২৪ অক্টোবর ২০১৯

জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও সু চি

১৫৫৪-৫৫ সালে ‘কালিমা তাইয়্যিবা’ খচিত আরাকান রাজ্যের সরকারি ধাতব মুদ্রা - ছবি : সংগ্রহ

মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি, যিনি সে দেশে ‘মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রবক্তা’ অভিধায় খ্যাত, রোহিঙ্গা জাতিগত নিধনযজ্ঞে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতিসঙ্ঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন। তার সেনাদের গণহত্যার দায় তাকে কতটা বহন করতে হতে পারে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মিশনের প্রধান মারজুকি দারুসমান। সরাসরি জড়িত না থাকলেও তাকে ‘বিচারের মুখোমুখি’ হতে হবে। কারণ পার্লামেন্টে সুচির দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় আইন প্রণয়ন বা সংশোধনীর মাধ্যমে তিনি গণহত্যা ঠেকাতে পারতেন বলে মনে করা যায়। জাতিসঙ্ঘের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানায়, এখনো সে দেশের রাখাইনে যেসব রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন তারা করুণ পরিণতির শিকার। নিয়মিত সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছেন। অবাধে চলাচল করতে পারেন না। খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, জীবিকা ও চাকরির ক্ষেত্রে তাদের কোনো সুবিধা নেই বললেই চলে। স্যাটেলাইটের ছবিতে ৩৪টি শিবির নির্মাণের দৃশ্য দেখা গেছে। এগুলো কী উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছে বা হচ্ছে তা অস্পষ্ট। দৃশ্যত মনে হচ্ছে মিয়ানমারে অবস্থানকারী রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশে থেকে যারা ফিরে যাবেন তাদের সেখানে কার্যত আটক রাখা হবে। স্যাটেলাইটের ছবিতে উত্তর রাখাইনে ছয়টি সামরিক ঘাঁটির নির্মাণকাজ দেখা গেছে। রোহিঙ্গাদের ৩৯২টি গ্রাম ধ্বংস করে সেখানে ঘাঁটিগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে। এ তৎপরতার পেছনে অং সান সু চির হাত সক্রিয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। নীরবে ও ঠাণ্ডা মাথায় তিনি গণহত্যা ও রোহিঙ্গা উচ্ছেদে কলকাঠি নাড়ছেন বলে অভিযোগ। আরাকানে নৃশংস মুসলিম গণহত্যা রোধে তাকে কোনো জোরালো বক্তব্য বা ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি। মুসলিম নেতারা তার সাথে সাক্ষাৎ করে এ ব্যাপারে তার হস্তক্ষেপ কামনা করলেও তিনি দায়সারা গোছের একটি বিবৃতি দিয়ে ‘দায়িত্ব সম্পন্ন’ করেন। অথচ আরাকানসহ মিয়ানমারের বহু মুসলিম তার রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির সদস্য।

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন (২০১০-২০১৬) তার স্মৃতিকথা ‘ফর দ্য রেকর্ড’ এ বিরক্তি প্রকাশ করে যে কথা বলেছেন এতে রোহিঙ্গাদের প্রতি অং সান সু চির বিদ্বেষপূর্ণ মানসকিতার পরিচয় মেলে। আলাপচারিতায় রোহিঙ্গাদের ‘বাংলাদেশী নাগরিক’ বলে দাবি করেছেন তিনি। ২০১৩ সালে লন্ডনে দ্বিতীয়বার সু চির মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ক্যামেরন স্মরণ করেন এভাবে, ‘বিশ্বের নজর তখন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের দিকে। তাদের বের করে দেয়া হচ্ছে বৌদ্ধ সংখ্যাগুরু রাখাইন থেকে। সেখান থেকে আসছে ধর্ষণ, খুন ও জাতিগত নিধনের খবর। এসব কথা তাকে (সু চি) বললাম। তার জবাব ছিল, ‘তারা আসলে বার্মিজ নয়, তারা বাংলাদেশী।’

প্রায় ১৫ বছর অং সান সু চি ছিলেন কারাবন্দী। তার মুক্তির দাবিতে যারা রাজপথে অন্দোলন করেছিলেন তাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল মুসলমান। তাদের প্রত্যাশা ছিল- সু চি মুক্তি পেলে সামরিক স্বৈরশাসনের অবসান ঘটবে এবং সর্বস্তরের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাবে; অবসান ঘটবে মুসলমানদের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন নিপীড়ন। বৌদ্ধরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও মিয়ানমার বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ। ৬,৭৬, ৫৭৮ কিলোমিটার আয়তনের এ দেশে মোট জনসংখ্যা ২০১০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ছয় কোটি দুই লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর অনুপাত হচ্ছে ৬৮ শতাংশ বর্মি, ৯ শতাংশ শান, ৭ শতাংশ কারেন, ৪ শতাংশ রাখাইন, ৩ শতাংশ চীনা, ২ শতাংশ ভারতীয়, ২ শতাংশ মন এবং ৫ শতাংশ রোহিঙ্গা।

ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৬৬ অব্দ থেকে ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আরাকান ছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য। অষ্টাদশ শতকে বর্মি রাজা বোধাপায়া (১৭৮২-১৮১১) সশস্ত্র আক্রমণের মাধ্যমে আরাকানকে বার্মা বা মিয়ানমার অন্তর্ভুক্ত করে নিলে দেশটি তার স্বাধীনতা হারায়। একপর্যায়ে এ রাজ্য ব্রিটিশ শাসনে চলে যায়। অষ্টম শতাব্দী থেকেই আরাকানের সাথে আরব ও মুসলিম দেশের যোগাযোগ। ইসলামের অভ্যুদয়ের মাত্র অর্ধ শতাব্দীর মধ্যে সুফি, সাধক, মুবাল্লিগ ও আরব বণিকদের মাধ্যমে আরাকানে ইসলাম ধর্ম প্রচারিত হয়েছে। ১৫৫৪-৫৫ সালে আরাকান রাজ্যের কালিমা ও বিসমিল্লাহখচিত নিজস্ব মুদ্রার নিদর্শন পাওয়া যায়।

অং সান সু চি বিগত কয়েক বছরে সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড, ব্রিটেন, ফ্রান্স- ইউরোপের এই পাঁচটি দেশ সফর সম্পন্ন করেছেন। এ সফরে তিনি শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালে নোবেল পুরস্কার পেলেও গৃহবন্দী থাকার কারণে সে সময় তা গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি যখন ইউরোপের বিভিন্ন শহরে রাষ্ট্র্রীয় মর্যাদায় ও আতিথ্যে বক্তৃতা করছিলেন, তখন কিন্তু তার দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ আরাকানের রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী নৃশংস গণহত্যার নির্মম শিকার। জাতিসঙ্ঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের মতে, বিগত দুই বছরে ৭০ হাজার মুসলমান (রোহিঙ্গা) মগ দস্যুদের (রাখাইন) হাতে প্রাণ হারিয়েছে।

বাড়িঘর, দোকানপাট ও ক্ষেতের ফসল জ্বালিয়ে দেয়া হয়। শত শত যুবতী মেয়েকে অপহরণ করা হয়। গোটা রাজ্যজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করার পর এখনো স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি। দলে দলে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ নৌকায় আশ্রয়ের আশায় বঙ্গোপসাগরে ভাসতে থাকে। আফসোসের বিষয়, মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক নেত্রী আরাকানের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত পৈশাচিকতার তাণ্ডব রোধে প্রত্যাশিত কোনো মন্তব্য ও উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। এমনকি জোরালো নিন্দা পর্যন্ত জানাননি। জেনেভায় সংবাদকর্মীদের বারবার প্রশ্নের মুখে তিনি যেসব জবাব দেন, তা কেবল দুঃখজনক নয়, বরং হতাশাব্যঞ্জকও বটে। Burmese opposition leader Aung San Suu Kyi said that she was not sure about the status of Rohingya Muslims in Arakan State and added that Burma needed to clarify citizenship laws to help resolve the issue. Asked whether around 800,000 Rohingyas living in the state bordering Bangladesh should be regarded as Burmese, she replied: ÔI do not know.Õ She added that some claim that many who call themselves Rohingyas are actually more recent immigrants from Bangladesh. The trouble, she said, is that there are no clear-cut rules regarding who qualifies as a citizen.

এর অর্থ, ‘আরাকান রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্ট্যাটাস (সামাজিক ও রাষ্ট্র্রীয় মর্যাদা) সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন। সমস্যা সমাধানে বার্মা সরকারের উচিত নাগরিকত্ব আইনকে ব্যাখ্যা করা। তাকে প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে আরাকানে বসবাসকারী প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা কি বর্মী (বার্মার অধিবাসী)? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না’। তিনি বলেন, ‘অনেকে দাবি করে থাকেন যে, যারা নিজেদের রোহিঙ্গা বলে মনে করেন তারা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে আগত অভিবাসী। সমস্যা হচ্ছে, নাগরিক হওয়ার যোগ্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বিধি নেই।’
তার নির্লিপ্ততা রোহিঙ্গাদের আশাহত করেছে। মূলত তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুর প্রতি আন্তরিক নন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি যে মন্তব্য করেছেন তা আরো বিস্ময়কর। ‘আপনি যখন রোহিঙ্গাদের নিয়ে কথা বলেন, আমরা তখন নিশ্চিত নই, কাদের সম্পর্কে আপনি কথা বলছেন’ (‘When you talk about the Rohingya, we are not quite sure whom you are talking about, Aung San Suu Kyi said.)
আরাকানের রোহিঙ্গা জনগণের নিরাপত্তা প্রদানে তিনি কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেননি। শান্তির জন্য তার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিটাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রইল। মনে হয়, রোহিঙ্গা প্রশ্নে সামরিক জান্তা সমর্থিত মিয়ানমার প্রেসিডেন্ট থাইন সেইন এবং অং সান সু চির মানসিকতা অভিন্ন। তা হলো আরাকান থেকে রোহিঙ্গাদের নির্মূল করে এক প্রকার ‘বৌদ্ধরাজ’ কায়েম করা।

আসল তথ্যউপাত্ত সংগ্রহের জন্য মিয়ানমার সরকার কোনো বিদেশী সাংবাদিক ও ত্রাণকর্মীকে আরাকানে যেতে দিচ্ছেন না। এমন কি আরাকান রাজ্যে কর্মরত এনজিও কর্মীদের চলাফেরায়ও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা যাতে ‘তথ্য পাচার রোধ করা যায়’। জানা যায় যে, সেখানে বহু গ্রাম পুরুষশূন্য। যাকে ধরে নেয়া হয়, সে আর নিজ ভিটায় ফিরে আসে না। গ্রামে মহিলা ও শিশুদের আধিক্য দেখা যায়। রাত নামলে রাজ্যজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করে। আশ্রয়হীন রোহিঙ্গাদের জরুরি খাবার, ত্রিপল, মশারি ও কম্বল জাতিসঙ্ঘ (UNHCR) সরবরাহ করলেও তা অপ্রতুল। মিয়ানমারের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বিশ্লেষক এবং সোফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেন স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর কি নেমোতো বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত একটি তৃতীয় পক্ষ দাঁড় করান, যাতে তারা একটি কাঠামোর মাধ্যমে দুই পক্ষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারে।

ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) মহাসচিব অব্যাহত রোহিঙ্গা গণহত্যা ও নির্যাতনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অং সান সু চির কাছে লিখিত এক পত্রে বলেছেন,

‘As a Nobel Peace Laureate, we are confident that the first step of your journey towards ensuring peace in the world would start from your own doorstep, Ekmeleddin Ihsanoglu, the head of the Organization of Islamic Cooperation (OIC), said in a letter to Suu Kyi cited by AFP. He said the pan-Muslim body was confident Suu Kyi "would play a positive role in bringing an end to the violence that has afflicted Arakan (Rakhine)state. He asked the newly elected lawmaker to work to convince the government to accept 'an international inquiry into the recent violence, granting free access to humanitarian aid groups and international media' in Arakan (Rahkine) State, which saw deadly clashes last month between Muslims and Buddhists.The head of the 57-member pan-Muslim body called for the quick return of the victims to their respective areas, expressing his 'deep concern about the unabated and continuous violation of Rohingya rights in Myanmar.’

‘নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে আমরা আস্থাশীল যে, বিশ্বে শান্তি নিশ্চিত করার পথে আপনার অভিযাত্রার প্রথম পদক্ষেপ আপনার ঘরের দুয়ার থেকে শুরু হবে। বিশ্ব মুসলমানের এ সংস্থা গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে, আরাকান (রাখাইন) রাজ্যে সহিংসতা বন্ধে সু চি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবেন। ওআইসি মহাসচিব আরাকান রাজ্যে আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও মানবিক ত্রাণ সাহায্য গ্রুপের প্রবেশাধিকার প্রদান এবং সাম্প্রতিক সহিংসতা তদন্তে আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিটি অনুমোদন করতে মিয়ানমার সরকারকে চাপ সৃষ্টি করার জন্য নেত্রীর প্রতি আহ্বান জানান’

আরাকানের পরিস্থিতি বিস্ফোরণোন্মুখ; একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠির স্পর্শে মুহূর্তে আবারো দাউ দাউ করে জ্বলে উঠতে পারে হিংসার আগুন। ২০১৭ সালে সাত লাখ, এর আগে চার লাখ, অর্থাৎ মোট ১১ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়েছে। আরো ছয় লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামগুলো অবরোধ করে রাখা হয়েছে। দাঙ্গাসহ সহিংসতায় অস্থির হয়ে পড়েছে পুরো জনপদ। এ সহিংসতা বন্ধ করা না গেলে এবং রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করা হলে বহুল প্রতীক্ষিত ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রক্রিয়া’ ব্যাহত হবে এবং সামরিক শাসন ফিরে আসতে পারে।

১৯৮২ সালে মিয়ানমারে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব হরণ করা হয়। দেশটির সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের ‘অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী’ এবং সু চির দল ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা এখন রাষ্ট্র্রবিহীন নাগরিক, ভাসমান এক জাতিগোষ্ঠী। ১৯৬২ সাল থেকে ধর্মচর্চা, শিক্ষা, চাকরি, চিকিৎসা সেবা ও অবৈধ চলাফেরার অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের স্বদেশ থেকে বিতাড়ন বা জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা পরিচালিত আশ্রয় শিবিরে পাঠানোই রোহিঙ্গা সমস্যার ‘একমাত্র সমাধান’ বলে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা উদ্বেগজনক এবং ইতিহাস অস্বীকার করার শামিল। থেইন সেইনের মতে, রোহিঙ্গা সমস্যা তার দেশে চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার ও গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রার হুমকিস্বরূপ। অপর দিকে, জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের প্রধান বলেছেন, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন বা দায়িত্ব নেয়া ইউএনএইচসিআরের কাজ নয়। এসব মন্তব্য পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে এবং জন্ম দিয়েছে গুরুতর প্রশ্নের। আরাকানে ১২ শ’ বছর ধরে বসবাসরত, ১৬ লাখ রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব অস্বীকার করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। সারা জীবন আশ্রয় শিবিরে থাকা অথবা বিতাড়ন রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হতে পারে না।

২০১২ সলের ১২ জুলাই ইউএনএইচসিআরের প্রধান অ্যান্টনিও গার্টারের কাছে প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন যে মন্তব্য করেছিলেন তা প্রণিধানযোগ্য :

‘We will take responsibility for our ethnic people but it is impossible to accept the illegally entered Rohingyas, who are not our ethnicity, The government was prepared to hand over the Rohingyas to the camps of UNHCR and then resettle the ethnic group in any third country “that are willing to take them”.This is what we are thinking is the solution to the issue.’ :

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে বলা যায়, মিয়ানমার বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আর ফেরত নেবে না। বাংলাদেশ আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বোঝা কি বহন করতে পারবে? নতুন করে শরণার্থী নেয়ার প্রশ্ন চিরদিন অবান্তর। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর চাপ না থাকায় মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট এমন ঘোষণা দিয়েছেন। মিয়ানমারের এ পদক্ষেপে বাংলাদেশ সঙ্কটের মুখে পড়েছে। তাই রোহিঙ্গা ইস্যুটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তোলা এবং এর ন্যায়সঙ্গত সমাধান দাবি করা উচিত। এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘ, আসিয়ান এবং ওআইসির সহযোগিতা কামনা করে জোর কূটনৈতিক-কার্যক্রম চালানো দরকার। নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতা সত্ত্বেও বহু দেশে বহু জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থান মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে। কোনো জাতিগোষ্ঠীকে নিজ দেশ থেকে বিতাড়ন নিঃসন্দেহে অসভ্যতার পরিচয়।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ওমরগণি এম.ই.এস ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম।


আরো সংবাদ