২০ নভেম্বর ২০১৯

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এ কোন পরিণতি?

-

বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে অদম্য গতিতে। সরকারি দলের নেতাকর্মীরা সুযোগ পেলেই নানাভাবে এই প্রচারটি চালিয়ে থাকেন। তারা এ ক্ষেত্রে তাদের শাসনামলে হাতে নেয়া কিংবা সম্পন্ন করা বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হার ও মাথাপিছু জাতীয় আয় বেড়ে যাওয়ার কথা বলে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক নানা দিক থেকে নানা সমালেচনার সুযোগ অবশ্যই আছে। যেমন : যে হারে মাথাপিছু আয় বেড়েছে, তা কি আমাদের জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে চলার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আর মাথাপিছু যা বেড়েছে তা কি দেশের সব মানুষের মধ্যে সমহারে বণ্টিত হয়েছে? দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যতটুকু হয়েছে তা কি ভয়াবহভাবে বৈষম্যমূলক নয়? এক ধরনের বৈষম্যমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কি দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমেই বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে না? ধনীরা আরো ধনী, আর গরিবেরা কি আরো গরিব হচ্ছে না? আমরা কি প্রতি বছর বিদেশী ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়িয়ে তুলছি না? প্রতিদিন জন্ম নেয়া একজন শিশু কত টাকা বৈদেশিক ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে, সে হিসাব কি আমরা রাখছি? আর আজ প্রবৃদ্ধি বেড়ে চলাই যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, সে কথা অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সে খবরকি আমাদের আছে? এমনি আরো অসামঞ্জস্যের কথা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলা যাবে। তবে এ লেখার বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটের।

আমরা জানি, একটি জাতির উন্নয়নের প্রথম শর্ত হচ্ছে শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন। এ ক্ষেত্রে হাত দিলেই আমাদের সীমাহীন দৈন্যই প্রকাশ পায়। শিক্ষার সব দিক নিয়ে আলোচনার অবকাশ হয়তো এখানে পাব না, তবে উচ্চশিক্ষা তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার করুণ পরিণতি সম্পর্কে দু-একটি কথা বলার প্রয়াস পাব। প্রথমেই প্রশ্ন আসে, আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষাকে এ কোন পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছি?

পাঠক সাধারণের হয়তো মনে আছে, গত সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশ করা হয়েছে ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিং ২০২০’ শীর্ষক প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদনে বিশ্বের ৯২টি দেশের ১৩৯৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বিশ্বের সেরা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও স্থান করে নিতে পারেনি। এমনকি এক সময়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটি খুঁজে পাওয়া যায়নি এই সেরা ১০০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়। কিন্তু এই তালিকায় রয়েছে ভারতের ৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয় ও পাকিস্তানের ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। আজকের ‘সেরা হাজার’ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম না থাকলেও ২০১৬ সালে এর অবস্থান ছিল ৬০০ থেকে ৮০০-র মধ্যে। এই চার বছরে এর অবস্থান ১০০০-এর বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনা থেকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্রমাবনতির প্রাবল্য সহজেই অনুমেয়।

এর কারণ কিছুটা প্রকাশ পেয়েছে এই প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্তে। প্রতিবেদন মতে, টিচিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেয়েছে ১০০ পয়েন্টের মধ্যে মাত্র ১৬ পয়েন্ট, সাইটেশনে ১৬.৬ পয়েন্ট, ইন্টারন্যাশনাল আউটলুকে ১৬.৬ পয়েন্ট, ইন্ডাস্ট্রি আউটকামে ৪০.৮ এবং রিসার্চে ৮.৮ পয়েন্ট। এ থেকে অনুমান করা যায়, শিক্ষাদানে ও গবেষণায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনীহা কতটুকু উদ্বেগজনক। বিবেকবান মানুষ অবশ্যই স্বীকার করবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চেয়ে রাজনীতিতেই তাদের মনোনিবেশ অনেক অনেক বেশি। আজ বিশ্ববিদ্যালয় যেসব শিক্ষক চালান তারা মনে করেন, এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যাতে সরকার নাখোশ হয়। তা না হলে পদ-পদবি, পদোন্নতি ও সরকারি সুবিধা কিছুই মিলবে না। এই মনোভাব শিক্ষক সমাজকে ঠেলে দিয়েছে অনৈতিক রাজনীতি চর্চার দিকে। একই কথা খাটে শিক্ষার্থীদের বেলায়ও। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনৈতিক রাজনীতি যে একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল করে দিতে পারে, তার উদাহরণ বাংলাদেশে ভূরি ভূরি, তবে এর সর্বসাম্প্রতিক জায়মান উদাহরণ হচ্ছে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি। সেখানে আজ প্রবল দাবি উঠেছে ভিসিকে পদত্যাগ করতে হবে, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে।

সম্প্রতি বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড ঘটনা নিয়ে সেখানকার দলবাজি রাজনীতির যে নোংরা চিত্র পত্রপত্রিকায় প্রতিনিয়ত প্রকাশ পাচ্ছে, তা সত্যিই ভয়াবহ। এই হত্যার দায় ভিসিসহ আরো দলবাজ কিছু শিক্ষক এড়াতে পারেন না, সে কথাই আজ উচ্চারিত হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে।

গত ৯ অক্টোবর একটি পত্রিকার খবরে জানা গেল বুয়েটের তিনটি হলে রয়েছে ছাত্রলীগের ৭টি টর্চার সেল। এসব টর্চার সেলে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী। তুচ্ছ ঘটনায়, এমনকি সালাম না দেয়ার অজুহাতে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। পত্রিকাটি বিভিন্ন হলের টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহৃত কক্ষগুলোর নম্বর পর্যন্ত প্রকাশ করেছে। ভিসি কিংবা অন্যান্য দায়িত্বশীল শিক্ষকেরা এসব কি জানতেন না? পত্রপত্রিকায় তো মাঝেমধ্যেই এসব খবর আসত। এর পরও কেনো ভিসি এর বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করেননি, এর জবাব সহজবোধ্য। এর পরও প্রশ্ন উঠেছে বুয়েটের ভিসির নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে। কথা উঠেছে নানা শর্ত ভঙ্গ করেও তিনি ভিসি পদে বহাল, এমন খবরও আমরা দেখেছি গণমাধ্যমে। গত আড়াই বছরে তিনি বিদেশ ভ্রমণ করেছেন অন্তত ২২ বার। আজ যখন ছাত্র ও শিক্ষক সমাজ তার পদত্যাগের দাবিতে অনড়, তখন তিনি পদত্যাগ না করার ব্যাপারে অনড়। নিশ্চয় তার রাজনৈতিক খুঁটির জোর খুবই প্রবল।

সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা দেখলাম ভিসিদের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের লাল কার্ড দেখানোর আন্দোলন। সে বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা অনেক আমরা শুনেছি, কিংবা এখনো শুনছি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমরা কোথায় নামিয়ে এনেছি তার আরেকটি উদাহরণ এখানে উল্লেখ করতে চাই, যা ঘটেছে গোপালগঞ্জের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগে।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর একটি ইংরেজি দৈনিক জানিয়েছে- এই বিশ্বিবিদ্যালয়ের একটি বিভাগের চেয়ারম্যানই ছিলেন সে বিভাগের প্রথম ছাত্র। আর এই বিভাগটি হচ্ছে : কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং তথা সিএসই। ঘটনাটিকে এ যুগের কততম আশ্চর্য হিসেবে চিহ্নিত করব, তা বোধে আসছে না। জনৈক আক্কাস আলী ছিলেন এ বিভাগের চেয়ারম্যান, বর্তমানে সে দায়িত্বে তিনি নেই। তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান থাকার সময় ছিলেন এই বিভাগের প্রথম ও একমাত্র ছাত্র। তিনি সেখান থেকে কোর্সটিও যথারীতি সম্পন্ন করেছেন। তিনি সেখানে এই কোর্সের শেষ সেমিস্টারটি সম্পন্ন করেন। কারণ, তিনি এই কোর্সের অন্য তিনটি সেমিস্টার সম্পন্ন করেছিলেন বুয়েট থেকে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ই তাকেই ক্ষমতা দেয় তার এই সেমিস্টার কোর্সের আউটলাইন নির্ধারণের। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাগজপত্র ঘেঁটে এমনটিই জানিয়েছে এই ইংরেজি দৈনিকটি। কাগজপত্র থেকে আরো জানা যায়, আক্কাস আলী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার পদের জন্য আবেদন করেছিলেন। এর সার্কুলার প্রকাশ করা হয়েছিল ২০১৫ সালের ৭ ডিসেম্বর। সার্কুলার অনুসারে ২২টি সহকারী অধ্যাপক ও লেকচারারের শূন্যপদের জন্য দরখাস্ত আহ্বান করা হয় ১৩টি বিভাগের জন্য। এর মধ্যে সিএসই বিভাগটিও রয়েছে।

সার্কুলারে লেখা ছিল, লেকচারার পদের জন্য যোগ্যতা হচ্ছে একটি মাস্টার ডিগ্রি। তা সত্ত্বেও, এই মাপকাঠি শিথিল করা হয় শুধু ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের লেকচারার পদের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় বিএসসি (ইঞ্জিনিয়ারিং) ডিগ্রিধারীদের এ পদে আবেদনের সুযোগ দেয়। সে সময়ে আক্কাস আলী ছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১১ সালের সিএসই বিষয়ে বিএসসি ডিগ্রিধারী এবং বুয়েটে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। কিন্তু এর পরও তিনি কী করে গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার পদে চাকরি পেলেন, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সহজেই বোধগম্য এখানে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।

এ ব্যাপারে আক্কাস আলীর বক্তব্য হচ্ছে : বিএসসি (ইঞ্জিনিয়ারিং) ডিগ্রিধারীও সিএসই বিভাগে লেকচারার পদে আবেদন করতে পারত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তাকে লেকচারার পদে নিয়োগ দেয়। তিনি আরো জানিয়েছেন, তিনি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় খুবই ভালো করেন। নিয়োগ কমিটি ও ভিসি তার ব্যাপারে খুবই সন্তুষ্ট হয়ে তাকে নিয়োগ দেন।

তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে- তার এ পদে যোগদানের চার মাসের মাথায় তিনি পদোন্নতি পেয়ে হন সহকারী অধ্যাপক। এর মাত্র তিন মাস পর তাকে করা হয় সিএসই বিভাগের চেয়ারম্যান। আক্কাস আলীর মতে : ‘আমাদের ভিসি আমাকেই এ পদের জন্য উপযুক্ত মনে করেন।’

প্রশ্ন ওঠে, ভিসি এগুলো কী করে করলেন? এ দিকে গত ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভিসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ- যৌন হয়রানি, শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও উন্নয়ন প্রকল্পের নামে দুর্নীতি। এর মধ্যে শহীদ মিনার ও ক্যাম্পাসে বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল নির্মাণসংশ্লিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। গত এপ্রিলে আক্কাস আলীকে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কাজ থেকে বাদ দেয়া হয়। এই আদেশ আসে যৌন হয়রানির অভিযোগের পর।

তার মাস্টার প্রোগ্রাম নিয়ে রয়েছে অবাক করা সব কাণ্ড। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই ডিপার্টমেন্ট খোলা হয় ২০১৭ সালের প্রথম দিকে। আক্কাস আলী নিজেই ছিলেন এ প্রোগ্রামের প্রথম ছাত্র। অভিযোগ, এটি খোলা হয় শুধু তারই জন্য। এমনটি জানিয়েছেন তারই একজন সহকর্মী, তবে নাম না প্রকাশের শর্তে। ইংরেজি দৈনিকটি তার মাস্টার্স প্রোগ্রামের ভর্তি ফরম, জীবনবৃত্তান্ত ও অ্যাকাডেমিক রেকর্ডের প্রতিলিপি সংগ্রহ করে জানিয়েছে : তার মাস্টার্স প্রোগ্রামে এই সেমিস্টার শুরু হয় ২০১৭ সালের এপ্রিলে। ভর্তি ফরমের নিচ দিকে হাতে লেখা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় তার বুয়েটে সমাপ্ত ৬০ শতাংশ ক্রেডিট গ্রহণ করেছে। এর নিচেই স্বাক্ষর রয়েছে বিভাগের চেয়ারম্যান আক্কাস আলীর। তিনিই তার এই প্রোগ্রামে ভর্তির অনুমোদন দেন। এই প্রোগ্রাম পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো: নাসিরউদ্দিন আহমেদ ২০১৭ সালে ২ এপ্রিল এক অফিস আদেশে বলেন, বিভাগের চেয়ারম্যান ডিপার্টমেন্টের সিলেবাস অনুযায়ী কোর্সের বিভাগের লেকচারারের ব্যাপারে আউটলাইন তৈরি করবেন। প্রতিটি লেকচারের সময় নির্ধারণ করা হয় ১ ঘণ্টা এবং এর সম্মানী নির্ধারণ করা হয় ১০০০ টাকা। এই আদেশ রেজিস্ট্রার নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির পরিচালক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান ভূঁইয়াকে মাস্টার্স প্রোগ্রামের পার্ট টাইম টিচার হিসেবে নিয়োগ দেন। মোহাম্মদ নুরুজ্জামান এই পত্রিকাটিকে জানিয়েছেন, তিনি চার মাসের এই সেমিস্টারে মোট চারটি ক্লাস নিয়েছেন।

অপর দিকে রেজিস্ট্রার অধ্যাপক নাসিরউদ্দিন বলেছেন, ভিসি তাকে আদেশ দিতে বলেছেন, তাই তিনি এ আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, এটা চেক করে দেখা তার দায়িত্ব নয়- কে চেয়ারম্যান আর কে পরীক্ষার্থী। এ ধরনের পদক্ষেপ বিভাগের শিক্ষকদের অবাক করে। এটি সত্যিই মজার ব্যাপার, আক্কাস আলী চেয়ারম্যান হিসেবে নিজেই ঠিক করে দিয়েছেন তার এই কোর্সে তাকে কী পড়াতে হবে। বিশ্বের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনা খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষায় তিনজন শিক্ষক প্রশ্নপত্র তৈরি করেন ও আক্কাস আলীর পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করেন। সহকারী অধ্যাপক নুরুজ্জামান তাদের মধ্যে একজন। অন্য দু’জন হলেন পার্ট টাইম লেকচারার- মৌসুমি বালা এবং হুসনুল আজরা, যারা প্রশাসনিকভাবে আক্কাস আলীর অধস্তন। আক্কাস আলী নিজেই অনুমোদন দেন ৬ সদস্যের পরীক্ষক কমিটি, যারা ২০১৭ সালের ৪ মে আক্কাস আলীর ফাইনাল টেস্ট নেন। হুসনুল আজরাকে করা হয় এই কমিটির চেয়ারম্যান। ১৪ মে ভিসি এই পরীক্ষক কমিটিকে অনুমোদন দেন।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক গোলাম হায়দার বলেছেন, তার দায়িত্ব হচ্ছে সিএসই বিভাগের নির্দেশ মতো কাজ করা। পরীক্ষক কমিটির চেয়ারম্যান হুসনুল আজরা বলেছেন, তিনি অনুসরণ করেছেন আক্কাস আলীর আদেশ।
আক্কাস আলীর মাস্টার্সের কাগজপত্রের প্রতিলিপি মতে, তাকে মাস্টার্স ডিগ্রি দেয়া হয় ২০১৭ সালের জুলাইয়ে। তিনি ২০১২ সালে বুয়েট থেকে চার সেমিস্টারের প্রথম দুটিতে পান ৪-এর মধ্যে জিপিএ-৩.৫। ২০১৩ সালে তৃতীয় সেমিস্টারে পান জিপিএ-৪ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি থেকে তিনটি কোর্সের সব ক’টিতে পান জিপিএ-৪। কিন্তু তার বুয়েটের প্রভিশনাল গ্রেডশিটে ভিন্নরূপ ফল দেখতে পাওয়া যায়। এতে দেখা যায়, বিভিন্ন সেমিস্টারে তার গ্রেড পয়েন্ট ছিল প্রথম সেমিস্টারে জিপিএ-৩, দ্বিতীয় সেমিস্টারে জিপিএ-৩.২৫, তৃতীয় সেমিস্টারে জিপিএ-৪ এবং চতুর্থ সেমিস্টারে জিপিএ-২.৫।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কতটা নিচে নামতে পারেন, এ ঘটনা হচ্ছে এ সময়ের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এ ধরনের নানামাত্রিক ঘটনার মাধ্যমে কিছু নীতি-নৈতিকতাহীন শিক্ষক নিজেদের তো নিচে নামিয়ে আনছেনই সেই সাথে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড় করাচ্ছেন, যার করুণ পরিণতি আমরা আজ স্বচক্ষে দেখছি। এ কারণেই আজ আমাদের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও বিশ্বের সেরা হাজারের তালিকায় স্থান পায় না। এই লজ্জাজনক অবস্থান থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটাতেই হবে। আবরার হত্যাকাণ্ডের পর আজ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নানা দুর্বলতার কথা আলোচনা-সমালোচনায় এসেছে, বিশেষ করে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছে শিক্ষকদের বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়টি। অথচ শিক্ষক সমাজই পারে রাজনৈতিক দুর্র্বৃত্তদের হাত থেকে বাঁচিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আগের মর্যাদায় ফিরিয়ে নিতে। এ জন্য প্রয়োজন শিক্ষক সমাজকে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শপথ নিতে হবে- আমরা প্রতিটি বিভাগে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে থেকে মেধাবী শিক্ষকদের নিয়োগ দেবো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বহুল আলোচিত নিয়োগবাণিজ্য বন্ধ নিশ্চিত করব, হলগুলোতে টর্চার সেল কালচার ও গেস্টরুম কালচার বন্ধ করব, রাজনৈতিক বিবেচনায় হলে সিট বণ্টন চলবে না, ছাত্র ভর্তির ব্যাপারে মেধাবীদের ভর্তি নিশ্চিত করব, ছাত্রনেতাদের সব ধরনের অনৈতিক দাবি প্রত্যাখ্যান করব, প্রতিটি ছাত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। সে জন্য প্রয়োজন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানো। জানি না, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ সে সাহস দেখাতে পারবে কি না। তা না পারলে আজকের বিশ্ববিদ্যায়গুলোর করুণ পরিণতির অবসান কখনোই ঘটবে না।


আরো সংবাদ