২১ নভেম্বর ২০১৯

পিপলস অ্যাসেম্বলির ঘোষণায় বিশ্বপরিস্থিতি

-

গত ২৪-২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ইউএন চার্চ সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় পিপলস অ্যাসেম্বলি ২০১৯। এ সম্মিলনে অংশ নিয়েছিলেন ৮০টি দেশ ও ২০৩টি সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশন থেকে আসা ৩০০ জনেরও বেশি প্রতিনিধি, যারা নিজেদের পরিচিত করেন ‘পিপল’ অভিধায়। কারণ, এরা প্রকৃতপক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছেন বিশ্বের জনগণের। এসব প্রতিনিধির অনেকেই বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের সাথে জড়িত। এরা এসব আন্দোলনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে নানা ব্যাপারে ন্যায্যতার দাবি নিয়ে লড়াই করে আসছেন। উল্লিখিত পিপলস অ্যাসেম্বলিতে এরা বিশ্লেষণ করে একটি ডিক্লারেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন সরকার প্রধানদের প্রতি।

সামনে নিয়ে আসেন মানবাধিকার হরণ, জনগণের অবস্থান, আয়বৈষম্য, সম্পদের বৈষম্য, গণতন্ত্রহীনতা, পক্ষপাতমূলক নির্বাচন প্রতিষ্ঠান, সন্ত্রাস, জাতিগত নিধন, সম্প্রদায় বিশেষকে বিচ্ছিন্নকরণ, দখলদারিত্ব, জলবায়ু ও পরিবেশের বিনাশ, প্রকৃতির বিরূপ আচরণ ইত্যাদি সম্পর্কিত বিদ্যমান নানা সমস্যার কথা। তাদের দাবি এসবের অবসান ঘটিয়ে আমাদের পৃথিবীকে করে তুলতে হবে শান্তির এক লালন ক্ষেত্র। মানবজাতির স্বার্থে প্রতিটি দেশের সরকারকে এর পক্ষে ইতিবাচক সাড়া দেয়ার অনুরোধ রাখা হয়েছে পিপলস অ্যাসেম্বলির এই ঘোষণায়। সেই সাথে এ কাজে এই অ্যাসেম্বলি সরকারের সাথে মিলে কাজ করার প্রতিশ্রুতিও ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণায় অ্যাসেম্বলি যেসব সমস্যার কথা উল্লেখ করেছে, এর কোনটি কোন দেশে বিদ্যমান তা নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের অজানা নয়। পিপলস অ্যাসেম্বলি আশা করে, সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার তাদের নিজ নিজ দেশের দুর্বলতাগুলো অবসানে সুদৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করবে। তাহলে এই পৃথিবীতে নিশ্চয়ই শান্তি ফিরে আসবে।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এ সম্মিলনে একটি ঘোষণা প্রকাশ করা হয়। এতে বর্তমান বিশ্বের সামগ্রিক পরিস্থিতি উঠে এসেছে। বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরার পাশাপাশি এসব সমস্যা সমাধানে কিছু দাবিও উত্থাপন করা হয়। ঘোষণায় উত্থাপিত মুখ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে : শান্তি ও দ্বন্দ্ব, জলবায়ু ও আবহাওয়া, বৈষম্য, কাজে বৈষম্য, প্রতিবন্ধী সমস্যা ও জনগণের স্থান তথা সিভিক স্পেস। এই ঘোষণায় বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতির একটা বাস্তব চিত্র আমরা পাই, যা নিয়ে প্রতিটি দেশের সরকার ও জনগণকে গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে, অবস্থাদৃষ্টে নিতে হবে কার্যকর নির্মোহ পদক্ষেপ। তবেই যদি বিশ্ব থেকে অবসান ঘটে যাবতীয় অন্যায় আর অবিচারের, আর মানবজাতি রক্ষা পায় অস্তিত্ব হারানোর হুমকি থেকে।

পিপলস অ্যাসেম্বলি ডিক্লারেশনের শুরুর ব্যাখ্যাটি হচ্ছে : দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ অন ফায়ার। এর পর পরই এ ঘোষণায় আরো যা বলা হয়েছে তার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য এখানে তাদের ভাষায় তুলে ধরার প্রয়াস পাবো। ঘোষণায় তারা বলেছে- আমরা বসবাস করছি এমন এক দুনিয়ায়, যেখানে রয়েছে গভীর বৈষম্য, জলবায়ুর জরুরি পরিস্থিতি, মানবাধিকারের সঙ্কট, ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে বন্ধ হওয়ার পথে জনগণের স্থান এবং যেখানে সন্ত্রাস বেড়ে চলছে দীর্ঘ দিন ধরে ও একে ধরে নেয়া হয়েছে স্বাভাবিক এক বিষয় হিসেবে।

আমরা বসবাস করছি এমন এক দুনিয়ায়, যেখানে চলছে জবাবদিহি ও সুশাসনের সঙ্কট। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ২০১৯ সালের জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলন শেষে আমরা ব্যথিত হয়েছি এ কারণে যে, এসব সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অব্যাহত অভাব দেখে। এমনকি বিশ্বনেতৃত্ব এসব সমস্যা সমাধানের কাজটি এখনো শুরুই করেননি। এটি ভালো কোনো কাজ নয়। এটি একটি ব্যর্থতা।

ঘোষণায় আরো বলা হয়েছে- আমরা ৩০০ জনেরও বেশি প্রতিনিধি বিশ্বের হাজার হাজার গণ-আন্দোলন ও সংগঠনের এবং লাখ লাখ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমাদের প্রয়োজন নেই পিপলস অ্যাসেম্বলিকে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ, জলবায়ু সম্মেলন ও এসডিজি সম্মেলনের সমান্তরাল হিসেবে দাঁড় করানোর। আমরা বলছি, জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ ও এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উচিত তাদের জনগণের জন্য কাজ করা, শুধু সরকারগুলোকে শক্তিশালী করার কাজ তাদের নয়। আমরা একসাথে মিলে এখানে এসেছি, কারণ আমাদের কথা কেউ শোনে না। আমাদের প্রবেশাধিকার ও অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ অস্বীকার করা হয়। আমাদের সুপারিশগুলো সমন্বয় করা হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের তথ্য পাওয়ার অধিকার, মুক্ত গণমাধ্যম অথবা আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা পর্যন্ত নেই।

ঘোষণায় দাবি করা হয়- আমরা বসবাস করছি স্পর্ধিত ও নীতিবান সাহসী আন্দোলন ও সমাজের দুনিয়ায়। সুশীলসমাজ চলমান ব্যর্থতা ও সরকারের জবাবদিহিহীন ও বন্ধনহীন চুক্তি আর বরদাশত করবে না। এসব জবাবদিহিহীন অবস্থার ফলে একটি সুষ্ঠু পরিবর্তনের বদলে চলছে আজকের এসব অন্যায্য কর্মকাণ্ড। আমরা বলছি, আমরা সরকারগুলোর সাথে কাজ করতে চাই, সেই সাথে তাদের জবাবদিহির আওতায় আসার আহ্বানও রাখছি। আমরা আমাদের পৃথিবীকে আর পুড়তে দিতে চাই না। আমরা রক্ষা করব আমাদের শিশুদের এবং দাঁড়াতে চাই অধিকারের দাবিদারদের পাশে। আমরা সংরক্ষণ করতে চাই জনগণের স্থান, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ। এসব অর্জনের জন্য যুবসমাজের কণ্ঠ ও অ্যাজেন্সিগুলোর সক্রিয় ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কাজে লাগাতে হবে জনগণের সেবায়। বিশ্বকে ফিরিয়ে আনতে হবে আগের অবস্থায়।

ঘোষণায় আরো বলা হয়- এই ঘোষণা যখন মানুষ পড়ছে, তখন পরিবেশ ও মানবাধিকার রক্ষায় যারা সক্রিয় তাদের হত্যা করা হচ্ছে। বিশ্বের ফুসফুস আমাজন, মধ্য-আফ্রিকা ও সাইবেরিয়ার বনাঞ্চল তখন পুড়ছে। সম্পদের বৈষম্য, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও বিচ্ছিন্নকরণ চলছে একগুঁয়েমিভাবে। এখনো বিশ্বের ৭৩ কোটি মানুষ বসবাস করছে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে। এক কোটি ১০ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছেনি বিদ্যুৎ। দুই কোটি ৭০ লাখ মানুষ বিশুদ্ধ রন্ধনপ্রক্রিয়ার বাইরে। এখনো প্রতিদিন বিশ্বের ৮২ কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে। বর্ণ ও জাতি সম্প্রদায়গত কারণে বৈষম্য ও বিচ্ছিন্নকরণের শিকার বিশ্বের ২৬ কোটি মানুষ। এর বেশির ভাগ মানুষই নারী ও শিশু।

এরা আবার নিয়মিত শিকার হয় নারীর হাতে সন্ত্রাসের। আমাদের বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ। আমরা চাই কাঠামোগত ও ব্যবস্থাগত মৌলিক পরিবর্তন, যাতে অর্থনীতি অল্প ক’জনের বদলে অনেকে মানুষের সেবায় লাগতে পারে; এই পৃথিবীর মানুষকে করপোরেশনগুলোর লিপ্সা ও মুনাফার শিকার হতে না হয়।

পিপলস অ্যাসেম্বলির ঘোষণা মতে- পৃথিবী এখন জলবায়ু সঙ্কটের মাঝে অবস্থান করছে। আমরা এখন অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখোমুখি। আমরা অভাবনীয়ভাবে হারিয়ে ফেলছি বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য। এর ফলে মানুষের জীবনযাপনের এমন ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে, যা অপূরণীয়। এর প্রভাবে অনেক মানুষ পরিণত হয়েছে প্রান্তিকজনে। এর শিকার বিশেষ করে নারীসমাজ, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, কিশোর-কিশোরী ও প্রবীণ জনগোষ্ঠী। দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সেসব মানুষ, যারা এইচআইভি রোগে ভুগছে। আমাদের অবহেলার কারণেই এমনটি ঘটে চলেছে। বিশ্বব্যাপী পপুলিস্ট, ন্যাশনালিস্ট ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো দুর্বল জনগোষ্ঠীর ওপর আঘাত হানছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চাপের মুখে জাবাবদিহিহীন শক্তিধর শাসকদের কাছ থেকে।

এদের অভূতপূর্ব আঘাত আসছে গণমাধ্যম ও সমাজের ওপর- কখনো কখনো অতি নির্দয় সে আঘাত। জাতীয় গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির উন্নতি করতে সুশীলসমাজ হিসেবে আমরা চাই নির্বাচন ব্যবস্থার একটি নতুন প্রমিত মান নিশ্চিত হোক। প্রয়োজন সে ধরনের নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান, যেটি রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির আওতাধীন। নির্বাচনের সময়টা ভুল তথ্য দেয়া থেকে মুক্ত থাকতে হবে। পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া থাকবে অবৈধ হস্তক্ষেপমুক্ত।

ঘোষণায় আরো উল্লেখ করা হয়- বিশ্বজুড়ে মানুষ প্রতিটি দেশে প্রতিদিন ভুগছে সম্পদ-বৈষম্য, দারিদ্র্য, সন্ত্রাস, সামাজিক বৈষম্য, সামরিকায়ন, পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা এবং মানুষের অধিকার হরণের কারণে। এসব সমস্যার একটির নেতিবাচক প্রভাব আরেকটির ওপর উপরিপাত হচ্ছে। এতে দুর্ভোগের প্রাবল্য বাড়ছে। এটাকে আমরা আমাদের নিয়মনীতি হিসেবে মেনে নিতে পারি না। জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জন্য অস্তিত্ব সঙ্কটের হুমকি তৈরি করেছে। বিশ্বে যুবসমাজ আমাদেরকে বলছে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। আমরা জনগণের আন্দোলনকারীরা, সমাজ ও সুশীলসমাজ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি তাদের পাশে দাঁড়ানোর।

পিপলস আসেম্বলির ঘোষণায় আরো দাবি করা হয়- অর্থনৈতিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলোকে করে তোলা হয়েছে ক্ষমতাকেন্দ্রিক। ফলে সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে এবং হচ্ছে মুষ্টিমেয় লোকের হাতে। এ ব্যবস্থা মুষ্টিমেয় ব্যক্তি, দেশ ও ব্যবসায়ীর স্বার্থের পক্ষে কাজ করছে। আমাদের জীবনের সহায়ক ব্যবস্থা হচ্ছে প্রকৃতি। যখন প্রাকৃতিক অবস্থার অবনতি ঘটে, প্রকৃতিতে দূষণ সৃষ্টি হয়, প্রকৃতির ব্যবহার চলে অতিরিক্ত মাত্রায়, তখন আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, পানি সরবরাহ, বায়ুর মান ও অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।

পিপলস অ্যাসেম্বলি সবশেষে বিশ্বের সরকারগুলোর উদ্দেশে এ ঘোষণায় বলে- আমরা বিশ্বের সব দেশের সরকারেরর প্রতি আহ্বান জানাই, আমাদের দাবিগুলো রাজনৈতিক দৃঢ়তার সাথে জরুরি ভিত্তিতে মেনে নেয়ার। আমরা অনুরোধ করছি সরকারগুলোর প্রতি ২০১৫ সালের প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট, সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্ক ফর ডিজেস্টার রিস্ক রিডাকশন, ডব্লিউপিএস অ্যাজেন্ডা (১৩২৫) ও ২০৩০ অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। তাদের একটি যাচ্ঞা, সরকারগুলো এসব চুক্তির আন্তঃসংযোগের সমস্যাগুলো দূর করবে, সেই সাথে মেনে চলবে অর্থায়নের চুক্তিগুলোও।

ঘোষণায় পিপলস অ্যাসেম্বলি এও জানায়- আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আমরা সরকারগুলোর সাথে কাজ করব এসব দাবি পূরণে। আমাদের পৃথিবীটা আগুনে পুড়ছে। এই আগুন নেভাতে প্রয়োজনীয় সব কিছু করার প্রতিশ্রুতি আমরা দিচ্ছি, যাতে আমরা এই গ্রহের সীমানার
মধ্যে মর্যাদার সাথে শান্তিতে বসবাস করতে পারি।

যেকোনো বিবেকবান মানুষ স্বীকার করবেন, পিপলস অ্যাসেম্বলির চিত্রিত বিশ্বচিত্র পুরোপুরি বাস্তব এবং এই অবস্থা থেকে উত্তরণে বিশ্বের সরকারগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেই হবে। নিজেদের মুক্ত করতে হবে অতীতের সব ভুলভ্রান্তি থেকে।


আরো সংবাদ