১০ ডিসেম্বর ২০১৯

কাশ্মির : ভারতের অগ্নিপরীক্ষা

-

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে মরিয়া ভারতের সরকার ও প্রশাসন। গত ৫ আগস্ট এ রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নেয়া ও দ্বিখণ্ডিত করার সিদ্ধান্তের পর আড়াই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু যত সহজে ভারত ইস্যুটি সামলে নেবে মনে করেছিল, তেমনটি ঘটছে না। সরকার ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে’ বলে বারবার প্রচারণা চালালেও কোনো কাজ হচ্ছে না। পর্যটকদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে, কিন্তু মানুষ সেখানে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। ল্যান্ডফোন এবং পোস্ট-পেইড মোবাইল সেবা চালু করা হয়েছে, কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর মতো নিরাপত্তা আছে বলে মনে করছেন না বাবা-মা ও অভিভাবকরা।

পরিস্থিতি সামলাতে জম্মু-কাশ্মিরের একাধিক সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ সব রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্টজনকে আটক করে রাখা হয়েছে আজো। কোনো প্রতিরোধ গড়া তো দূরের কথা, কাশ্মিরিরা যাতে মুখ খুলে একটি শব্দও উচ্চারণ করতে না পারে, সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে পুরো উপত্যকায়।

গত আড়াই মাসে সেখানে একটি মাত্র প্রতিবাদ সমাবেশের খবর প্রকাশ পেয়েছে। সেটির আয়োজক ছিলেন কাশ্মিরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী, সাবেক প্রধান বিচারপতি- এ রকম বিশিষ্টজনের স্ত্রী, বোন বা স্বজনেরা। রাজধানী শ্রীনগরের প্রাণকেন্দ্র লাল চকের অদূরে প্রতাপনগরে গত ১৫ অক্টোবর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহর স্ত্রী ও বোন এবং রাজ্যের প্রধান বিচারপতি বশির আহমেদ খানের স্ত্রী হাওয়া বশিরসহ সমাজের বিশিষ্ট নারীরা রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার ও খণ্ডিতকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।

বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ছিলেন ফারুক আবদুল্লাহর বোন সুরাইয়া, মেয়ে সাফিয়া ও রাজ্যের হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি বশির আহমেদ খানের স্ত্রী। তাদের সাথে ছিলেন রাজ্যের বিশিষ্ট লোকজনের পরিবারের বেশ কয়েকজন নারীসদস্য। শান্তিপূর্ণ ওই প্রতিবাদের সময় তাদের হাতে ছিল আলোচ্য সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে লেখা পোস্টার। পুলিশ কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়; সেখান থেকে জেলখানায়। ওই বিক্ষোভ ও গ্রেফতারির খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। উপত্যকার পরিস্থিতি যে স্বাভাবিক নয় এবং সরকারি সিদ্ধান্ত যে সেখানকার জনগণ মেনে নিচ্ছেন না, ওই বিক্ষোভে তা স্পষ্ট হয়ে যায়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসা নিয়ে সরকারের দাবি যে অসার, সেটিও প্রমাণ হয়ে গেছে।

বিশিষ্ট নারীদের একটি মাত্র সমাবেশ সেখানকার ভারতীয় প্রশাসনকে এতটাই উদ্বিগ্ন করে তোলে যে, তারা উপত্যকাজুড়ে স্বাভাবিক অবস্থা না ফেরা পর্যন্ত কোথাও কোনো রকমের প্রতিবাদ সমাবেশ, বিক্ষোভ, এমনকি শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। উপত্যকার পুলিশ এই নির্দেশ জারি করেছে। কথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতে এ ধরনের নির্দেশ জারি করা দেশটির সংবিধানের গুরুতর খেলাপ। কিন্তু জাতীয়তাবাদের মুখোশ পরা, হিন্দুত্ববাদী সরকার সংবিধান কেন, কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করছে না।

জম্মু-কাশ্মির পুলিশের মহাপরিচালক দিলবাগ সিং বলেন, নারী বিক্ষোভকারীদের হাতে এমন কিছু পোস্টার ছিল যা আপত্তিজনক ও প্ররোচনামূলক। তার ব্যাখ্যা, মানুষ শুধু ভাষণেই প্ররোচিত হয় না, পোস্টার প্ল্যাকার্ড দেখে-পড়েও হতে পারে। তাই এই সাবধানতা।

এ দিকে, কাশ্মিরের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতাদের সবাই এখনো বন্দী। ধরপাকড় চলছে নিত্যদিনই। রাজ্যের কোথাও কাশ্মিরি জনগণের নিরাপত্তা আছে বলে কেউ মনে করছেন না। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে দোকান-বাজার খোলা রাখতে কেউ সাহস পাচ্ছেন না। পর্যটকদের আসতে বলা হচ্ছে। বড় বড় বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে। তারপরও পর্যটকের সংখ্যা হাতেগোনা।

একটি পত্রিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে, উপত্যকার সর্বত্র গাছে গাছে এখন লাল আপেল। ব্যবসায়ীরা রফতানির প্রতীক্ষায়। অথচ তারা আতঙ্কে। তিনজন ট্রাকচালক খুন হয়েছেন। বাইরে থেকে ট্রাক আসতে চাইছে না। চালকদের নিরাপত্তার জন্য সাম্প্রতিকতম দাওয়াই, বড় ট্রাক মূল সড়কে থাকবে। গ্রাম থেকে ছোট ছোট গাড়িতে আপেল এনে বড় রাস্তায় ট্রাকে বোঝাই করা হবে। পুলিশের নিরাপত্তায় সেগুলো কাশ্মির উপত্যকার বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে। বাইরের রাজ্যের শ্রমিকদেরও সন্ত্রাসবাদীরা খুন করেছে। প্রশাসনও ‘সন্ত্রাসবাদী’দের হত্যার কথা জানাচ্ছে। ছোট-বড় যেকোনো ঘটনা ঘটলেই সেনা ও পুলিশ গোটা অঞ্চলকে মুড়ে দিচ্ছে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে। আজ যে এলাকা শান্ত, কাল যে তা অশান্ত হয়ে উঠবে না, তার নিশ্চয়তা নেই।

তবে এসব উদাহরণ দেয়ার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। যে ভূখণ্ডে সোয়া কোটি মানুষকে বশে রাখার জন্য কোনো রাষ্ট্রশক্তিকে আট লাখ সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করতে হয়, সেখানে কেমন শান্তি বিরাজমান তা বোঝার জন্য বিশেষ বুদ্ধির দরকার হয় না।

কাশ্মিরের কোনো খবর বাইরে আসতে দিচ্ছে না পুলিশ। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি আছে বহু আগে থেকেই। সম্প্রতি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের হস্তক্ষেপে তা আরো কঠোর করা হয়েছে। কাশ্মিরের মানুষের স্বাভাবিক প্রতিবাদ-বিক্ষোভকেও ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে। আর ‘সন্ত্রাসবাদ’ দমনে সংবাদপত্রের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে নীতিগত শিক্ষাদান করেছেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মনে করা যেতে পারে, উপত্যকা স্বাভাবিক করার স্বার্থে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করাকে সরকার বাড়াবাড়ি বলে মনে করছে না। মানবাধিকার হরণ বলেও মনে করবে না। কিছু দিন আগে দিল্লিতে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে দুই দিনের এক আলোচনা সভায় যোগ দিয়ে দোভাল বলেন, সন্ত্রাসবাদ দমনে সংবাদপত্রের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সেই ভূমিকা তাদের পালন করা উচিত।’ কী সেই ভূমিকা? অজিত দোভাল বলেছেন, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার তা ব্যাখ্যা করেছেন। থ্যাচার বলেছিলেন, সন্ত্রাসীরা নাশকতা করলে মিডিয়া যদি তা না ছাপায়, প্রচার না করে, তাহলে সন্ত্রাসবাদ শেষ হয়ে যাবে।’

এর ব্যাখ্যা দিয়ে দোভাল বলেন, সন্ত্রাসবাদীরা অপকর্ম করে প্রচার পাওয়ার জন্য। সেই প্রচার, যা মানুষকে ভয় পাইয়ে দেবে। আতঙ্ক সৃষ্টি করবে। সন্ত্রাসবাদীদের খুনখারাবির খবর, বিস্ফোরণের খবর, সহিংসতার খবর সংবাদপত্র প্রকাশ না করলে, সংবাদমাধ্যম প্রচার না করলে মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হবে না। ওরা প্রচার পাবে না। ওদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ হবে না। সন্ত্রাসবাদও খতম হয়ে যাবে। দোভাল এ প্রসঙ্গে বলেন, মিডিয়াকে আস্থায় নিতে হবে। খবর জানাতে হবে; যাতে তারা জল্পনার আশ্রয় না নেয়।

যে প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে ব্রিটিশরা রাস্তায় রাস্তায় জমায়েত হয়ে ‘ডাইনির মৃত্যু হয়েছে’ বলে স্লোগান দিয়েছিল, উল্লাস প্রকাশ করেছিল; সে ‘ম্যাগি’রই থিওরি এখন কথিত স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। এই মন্তব্যে স্পষ্ট, কাশ্মিরিদের আশা-আকাঙ্ক্ষা গুঁড়িয়ে দেয়া এবং উপত্যকায় স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সরকার যে চরম নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যা, খুন-গুমের কৌশল চালিয়ে যাচ্ছে, তা মিডিয়ায় কিছুমাত্র প্রচার পাক, সরকার তা চায় না। সেখানে ভেতরে ভেতরে চলছে হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর কায়দায় নৃশংস অভিযান। বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে দিনে-রাতে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্রশাসনের সন্দেহভাজন তরুণ, যুবা ও কিশোরদের। তাদের অনেককে আর কখনোই ফিরে পাচ্ছে না তাদের বাবা-মা অথবা পরিবার।

এরই পাশাপাশি, ভারত সরকার আন্তর্জাতিক বিশ্বেও কাশ্মির ইস্যুতে নিজের একগুঁয়ে অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে। সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে কথা বলেছে তুরস্ক। তাতেই গোস্সা করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রস্তাবিত তুরস্ক সফর বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে কাশ্মির নিয়ে মোদি সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান। তিনি বলেন, কাশ্মির ইস্যুকে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি থেকে কোনোভাবেই আলাদা করা যায় না। তাই আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা দরকার। সংঘর্ষের মাধ্যমে এ সমাধান সম্ভব নয়। এরদোগানের এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ভারত চলতি বছরের শেষ দিকে নরেন্দ্র মোদির প্রস্তাবিত তুরস্ক সফর বাতিল করে দিয়েছে। কাশ্মির ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে একাত্ম হয়েছে আরো বেশ কিছু দেশ, যার মধ্যে মালয়েশিয়া ও চীন উল্লেখযোগ্য।

মোদি কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে একই নীতি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। মাত্র গত সপ্তাহেই চীনের প্রেসিডেন্ট ভারত সফর করে গেছেন এবং মোদি বড়ই খোশ মেজাজে তাকে স্বাগত জানান, বৈঠক করেন, একসাথে ভোজও করেছেন। তুরস্ক ও চীনের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির এই দ্বিচারিতা ভারত সরকারের কুৎসিত চেহারাই বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করে দেয়।

সর্বশেষ যে খবর তা হলো, কাশ্মির সীমান্তে ভারত-পাকিস্তানের সেনাদের গুলি বিনিময়। এতে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন পাকিস্তানের আর তিনজন ভারতের বলে দুই দেশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। গত রোববার ভারতের কুপওয়ারা জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে এ ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিতর্কিত এলাকায় নয়াদিল্লির আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পরই এমন ঘটনা ঘটল। এ জন্য উভয় দেশের কর্মকর্তারা পরস্পরকে দোষারোপ করছেন। এর আগে কাশ্মিরে সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হন। সব মিলিয়ে বলা যায়, কাশ্মির কখনোই সিকিমের মতো নির্বিবাদে নিজেকে ভারতের সাথে বিলীন হয়ে যেতে দেবে না। এটি হবে ভারতের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা।


আরো সংবাদ