২৩ নভেম্বর ২০১৯

ছাত্ররাজনীতির ক্রান্তিকাল

ছাত্ররাজনীতির শিকার আবরার ফাহাদ -

ব্যাঙের রূপান্তর প্রক্রিয়ার মতো আমাদের জাতীয় রাজনীতিও দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছে। কিন্তু এই রূপান্তর ইতিবাচক না হয়ে হয়েছে নেতিবাচক পরিসরে। ফলে জাতীয় রাজনীতি গণমুখী চরিত্র হারিয়ে রীতিমতো গণবিরোধী হওয়ার অভিযোগ বেশ জোরালো। সঙ্গত কারণেই বৃহত্তর রাজনীতির কুপ্রভাবের ঢেউ আছড়ে পড়েছে ছাত্ররাজনীতির ওপর। শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেধা, মনন, সুকুমার বৃত্তি ও সুস্থধারার রাজনীতি চর্চার পরিবর্তে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য ও অবৈধ প্রভাব বিস্তারই প্রাধান্য পাচ্ছে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তা খুনখারাবির অনুষঙ্গও হয়ে পড়েছে। দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার পরিবর্তে চলছে প্রভাব বিস্তার ও শক্তি প্রদর্শনের অশুভ মহড়া। আদর্শিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমত দমন করা হচ্ছে পেশিশক্তির মাধ্যমে। ছাত্র রাজনীতি এখন রীতিমতো বিষবৃক্ষের রূপ নিতে চলেছে।

আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতি যে কল্যাণমুখী চরিত্র হারিয়ে লেজুড়বৃত্তি ও সন্ত্রাসনির্ভর হয়ে পড়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সম্প্রতি বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী থেকে। অভিযুক্তরাও মেধাবী শিক্ষার্থী এবং তারা প্রত্যেকেই ছাত্ররাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। এই হত্যাকাণ্ডের আসামিদের মধ্যে এ পর্যন্ত আটজন হত্যার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছে। জবানবন্দীতে বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার আদালতে যে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো।

জবানবন্দীতে সে অবলীলায় বলেছে, ‘সিনিয়র-জুনিয়র যেই হোক, আমরা তাদের এভাবেই পেটাতাম। আমাদের মতের সাথে না মিললে কাউকে পিটিয়ে বের করে দিতে পারলে; ছাত্রলীগের হাইকমান্ড আমাদের প্রশংসা করত। ছাত্রলীগের এ সিস্টেমটাই আমাদের এমন নিষ্ঠুর বানিয়েছে।’ আদালতে সে আরো বলেছে, ‘আবরারের মৃত্যুর জন্য সবাই আমাকে দোষ দিচ্ছে। কিন্তু আমি তো সিনিয়রদের নির্দেশনা মতো কাজ করেছি মাত্র। সিনিয়ররা আমাকে ভয়ও দেখাচ্ছিল, ব্যর্থ হলে আমাকে এর ফল বহন করতে হবে। বুয়েটে ছাত্রলীগ এভাবেই কাজ করে।’ আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়া অন্য সাতজন আসামির জবানবন্দীও প্রায় অভিন্ন। আর এটিই আমাদের দেশের সাম্প্রতিক ছাত্ররাজনীতির চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে।

ছাত্ররাজনীতিসহ জাতীয় রাজনীতির এই অধঃপতন জাতির জন্য অশনিসঙ্কেত। বস্তুত রাজনীতি এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কিছুসংখ্যক ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত কোনো গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। রাজনীতি কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তিতে সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে গঠিত। রাজনীতিকে অন্য ভাষায় একটি যুদ্ধ হিসেবেও আখ্যায়িত করা যায়। যেখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, বুদ্ধির মারপ্যাঁচে অন্যকে পরাভূত করার মানসিকতা, সব সময় নিজের অবস্থানকে দৃঢ় করার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার তৎপরতা সক্রিয় থাকে। উদ্দেশ্য মানবতার কল্যাণ। তাই রাজনীতি বলা যায়, ‘ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের দ্বন্দ্বের সাথে জড়িত। আর ছাত্ররাজনীতিও এ থেকে আলাদা নয়।

বস্তুত রাজনীতি হলো বিশেষ রাজত্ব-কেন্দ্রিক নীতি বা রাজার নীতি; একটি বিশেষ চেতনা বা আদর্শ। আর এই চেতনা ধারণ করে যখন ছাত্রসমাজ কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন তাকে ছাত্ররাজনীতি বলা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতাসীনদের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে ছাত্ররাজনীতি লক্ষ্যচ্যুত হলেও আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আমাদের জাতীয় জীবনের বড় অর্জনগুলো ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে এসেছে। ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও এ দেশের ছাত্ররাজনীতির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা।

রাজনীতিতে মন্দাভাবের কারণে আমাদের ছাত্ররাজনীতিও ইতিবাচক পথে নেই, বরং সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির অশুভ বৃত্তেই আটকা পড়েছে। আগের দিনের ছাত্ররাজনীতিতে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য, অবৈধভাবে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের দূষণ পরিলক্ষিত হয়নি। মেধাবী শিক্ষার্থীরাই সে সময় নেতৃত্বে আসতেন এবং তারা সমাজে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা ও সম্মান পেতেন। ব্যক্তিস্বার্থ বা আর্থিক সুবিধার জন্য কেউ ছাত্ররাজনীতি করতেন না। ছাত্ররাজনীতি নিবেদিত ছিল আত্মগঠন, দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণ ও আর্তমানবতার মুক্তির জন্য।

ছাত্ররাজনীতির মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হচ্ছে সমাজ, দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বদানে নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা। পৃথিবীর অনুন্নত ও তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে যেখানে রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল, সেখানে ছাত্ররাজনীতি জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে আসছে। যেহেতু ছাত্ররা সমাজের অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ সচেতন অংশ, সেহেতু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ছাত্রসমাজের বিশেষ ভূমিকা অনিবার্য হয়ে পড়ে। ১৯৪৮ সালে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার বিপ্লবের মূলশক্তি ছিল ছাত্রসমাজ। ‘জার’ আমলে রাশিয়ায় ছাত্ররাই বিভিন্ন বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা ঘটায়। এমনকি ১৯৫৫ সালে আর্জেন্টিনায়, ১৯৫৮ সালে ভেনিজুয়েলায়, ১৯৬০ সালে কোরিয়ায় ছাত্রসমাজ পালন করে ঐতিহাসিক ভূমিকা। ১৯৬৪ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও বলিভিয়ার ক্ষেত্রেও জাতীয় সঙ্কটে ছাত্রসমাজের অবদান ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিবেচিত।

আমাদের দেশে গত তিন দশকে ছাত্ররাজনীতির চারিত্রিক ও গুণগত মানের ব্যাপকভাবে অবনমন ঘটেছে। ফলে ছাত্ররাজনীতি তার চিরায়ত গণমুখী বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতামুখী দৃষ্টিভঙ্গি দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছে। ছাত্ররাজনীতির অনুষঙ্গ হয়েছে হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক সেবন ও বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, হলে বাণিজ্য, ইভটিজিং, নারী নির্যাতন। সর্বোপরি আদর্শিক প্রতিপক্ষকে যেকোনো মূল্যে প্রতিহতকরণ।

সঙ্গত কারণেই বর্তমানে ছাত্ররাজনীতির সাথে সম্পৃক্তদের সাধারণ মানুষ আদর্শহীন, অর্থলোভী, মস্তান, চাঁদাবাজ, অস্ত্রবাজ, মেধাহীন সর্বোপরি সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর মানুষ বলে মনে করতে শুরু করেছে।

১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ১১ দফা কর্মসূচি ভিত্তিক ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত গণবিস্ফোরণে রূপান্তরিত হয় এবং সেটাই ছিল বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ড্রেস রিহার্সেল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগে ১ মার্চ ইয়াহিয়া খানের ঘোষণার পর প্রথম বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল ছাত্রসমাজ। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বপ্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ৭ মার্চ রেসকোর্সে শেখ মুজিবের সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা তো এ দেশের ছাত্রসমাজের ধারাবাহিক আন্দোলনের পরিণতি। সে সময় ‘ছাত্র’ ধারণাটি ছিল স্নেহমিশ্রিত এবং ধরে নেয়া হতো প্রতিটি ছাত্রের ব্যক্তিত্ব হলো শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন। তাই তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের ছিল অপরিসীম ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধাশীল মনোভাব।

কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হওয়া বা পক্ষে-বিপক্ষে মত প্রকাশের অধিকার স্বাধীন-সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব নাগরিকেরই মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। আর বিশ্ববিদ্যালয়কে মনে করা হয় মুক্ত জ্ঞানচর্চার উন্মুক্ত ক্ষেত্র। কিন্তু আমরা ক্রমেই ধৈর্যহীন, অসহনশীল ও অপরিণামদর্শী হয়ে উঠেছি। কারো মত প্রকাশ ও রাজনৈতিক অবস্থানকে যৌক্তিক মানদণ্ডে মূল্যায়ন না করে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেই সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ছাত্ররাজনীতির ওপর। আর এর মধ্যমণি হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন।

সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্ররাজনীতি আরো বেশি সহিংস হয়ে উঠেছে। আগের দিনে ছাত্ররাজনীতি বিশেষত ছাত্রদের স্বার্থেই বেশি কথা বলত। এখন ছাত্ররাই ছাত্রদের প্রতিপক্ষ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই। কিন্তু সরকার সমর্থিত ছাত্রসংগঠন এসব আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে যা হওয়ার হয়েছে।

সম্প্রতি বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে একটি ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে তার সহপাঠীরাই তাকে পিটিয়ে হত্যা করে। আবরার ফাহাদের বক্তব্য ছিল, ’৪৭-এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোনো সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ছয় মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিচ্ছিল। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আজ ইন্ডিয়াকে সেই মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।’

তিনি লেখেন, ‘কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েক বছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চায় না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড় লাখ কিউসেক মিটার পানি দেবো।’ ভারতকে গ্যাস দেয়ার সমালোচনা করে বুয়েটের এই শিক্ষার্থী লেখেন, ‘কয়েক বছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রফতানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দেবো। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে, সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।’

আবরার ফাহাদের বক্তব্যে দেশ ও জাতিস্বত্বাবিরোধী কোনো বক্তব্য ছিল না; বরং প্রতিটি কথায়ই ছিল দেশপ্রেম ও জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে। হয়তো তার বক্তব্য সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে সক্ষম হয়নি। মূলত ভিন্নমতের কারণেই আবরার ফাহাদের মতো মেধাবী শিক্ষার্থীকে নেতিবাচক ছাত্ররাজনীতির নির্মম বলি হতে হয়েছে। ছাত্ররাজনীতির এমন স্খলন ও ক্রান্তিকাল আর কী হতে পারে?

[email protected]


আরো সংবাদ