২৩ নভেম্বর ২০১৯

জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকিতে বাংলাদেশও

-

ক্লাইমেট চেঞ্জ, আমাদের ভাষায় জলবায়ু পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তন তথা অস্বাভাবিক পরিবর্তন এখন বিশ্বব্যাপী এক ভয়াবহ সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবতা দেখে অনেকে একে ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ না বলে ‘জলবায়ু সঙ্কট’ বলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন এবং অন্যদের প্রতিও আহ্বান রেখেছেন একে ‘জলবায়ু সঙ্কট’ নামেই অভিহিত করতে। এই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এখন বিশ্বের সর্বত্র। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ বা অঞ্চলের নাম করা যাবে না, যেটি জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিরূপ প্রভাবের আওতার বাইরে। কার্যত গোটা বিশ্ব এখন জলবায়ু পরিবর্তন সঙ্কটের মুখে। বিশ্বের প্রত্যেক মানুষ এর প্রভাবে ক্রমবর্ধমান দুর্ভোগের শিকার। প্রকৃতি যেন মানুষের ওপর প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছে। সবখানে এ নিয়ে নানা আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক। সবাই বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যার সমাধান জরুরি। আর এটাও বলা হচ্ছে, কোনো একটি দেশ তা পরাশক্তি হলেও এককভাবে কিছুতেই এ সঙ্কটের সমাধান টানতে পারবে না। প্রয়োজন বিশ্ববাসীর সম্মিলিত প্রয়াস। কিন্তু সমস্যাটি এখানেই। যাদের এই সঙ্কট নিরসনে মুখ্য ভূমিকা পালন করার কথা, এবং যেসব দেশ এই সমস্যা সৃষ্টিতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখে চলেছে; তারাই এ নিয়ে জারি রেখেছে এক নোংরা রাজনীতি। আর এই নোংরা রাজনীতি এ সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করে তুলছে। এরা যেমন নানা ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে যাচ্ছে, তেমনিভাবে নতুন কোনো চুক্তি সই করতেও অনীহ। আন্তর্জাতিকভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন রোধে কোনো প্রয়াসেও এদের পাওয়া যাচ্ছে না। এরাই এ সঙ্কট সমাধানে সম্মিলিত প্রয়াসের সব পথ বন্ধ করে রেখেছে।

আমাদের পৃথিবী জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে চরমভাবে তেতিয়ে উঠছে। আগামী বছরগুলোতে পৃথিবীর উষ্ণায়ন প্রক্রিয়া আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে মনে হয়। কারণ, উষ্ণতার অবসানে এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ফলে আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে এর ভয়াবহ প্রভাব-পরিণতির জন্য। নিশ্চিত ধরে নেয়া হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে বিশ্বের সব দেশে। তবে সব দেশে এর প্রভাব সমান হবে না। কিন্তু নানামুখী হুমকির কারণে কিছু কিছু দেশ বা অঞ্চলে এর প্রভাব পড়বে তুলনামূলক বেশি। যেসব উন্নয়নশীল দেশে ব্যাপকভিত্তিক দারিদ্র্য বিরাজমান এবং যেসব দেশে অভাব রয়েছে কার্যকর সরকারের, সেসব দেশ জলবায়ু বিপর্যয়ের শিকার হবে বেশি। বলা হচ্ছে, বিশ্বের ছয়টি দেশে জলবায়ু সঙ্কট সবচেয়ে বেশি বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এই দেশগুলো হচ্ছে- হাইতি, নাইজেরিয়া, সংযুক্ত আরব-আমিরাত, ইয়েমেন, ফিলিপাইন ও কিরিবাতি। সে যা-ই হোক, এতে আমাদের স্বস্তি পাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। নতুন যেসব গবেষণা প্রতিবেদন আসছে, তাতে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বড় ধরনের উদ্বিগ্ন হওয়ার সমূহ কারণ রয়েছে। তা ছাড়া, বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিপুলসংখ্যক মানুষ এই জলবায়ু সঙ্কটের ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ঝুঁকিতে থাকা এশিয়ার অন্য পাঁচটি দেশ হচ্ছে- চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড। বলা হচ্ছে, এ ছয়টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছে চীনে। এদের সংখ্যা ৯ কোটি ৩০ লাখ। একইভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে ভারতের তিন কোটি ৬০ লাখ লোক, ভিয়েতনামের তিন কোটি ১০ লাখ, ইন্দোনেশিয়ার দুই কোটি ৩০ লাখ ও থাইল্যান্ডের এক কোটি ২০ লাখ লোক।

সাম্প্রতিক সময়ে এক নতুন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূলীয় বন্যার আঘাতের শিকার হবে বাংলাদেশের চার কোটি ২০ লাখ মানুষ। এর অর্থ দাঁড়ায়, আগে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর যতটুকু পড়বে বলে ভাবা হয়েছিল, প্রকৃতপক্ষে এই প্রভাব হবে আরো অনেক বেশিমাত্রার। আর বাংলাদেশে এই প্রভাবের শিকার মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটি ৭০ লাখে গিয়েও পৌঁছতে পারে- এ কথা বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা গোষ্ঠী ‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। গত মঙ্গলবার ব্রিটিশ বিজ্ঞান জার্নাল ‘ন্যাচার’-এ এই সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এর আগে এই গবেষণাগোষ্ঠী তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছিল, চলতি শতকের মাঝামাঝি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ৫০ লাখের মতো মানুষ বন্যার শিকার হবে। অন্য আরো কিছু রিপোর্টে বলা হয়ছিল, এই সংখ্যা হতে পারে দুই কোটি থেকে তিন কোটি। কিন্তু নতুন সমীক্ষা বলছে, গবেষকরা আগের চেয়ে আরো উন্নততর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন বড় বড় অঞ্চলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা যথাযথ পরিমাপ করার ব্যাপারে। তারা এর মাধ্যমে জানতে পেরেছেন, সমুদ্রের উপরিতলের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার ফলে এ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বব্যাপী তিন কোটি লোক হুমকির মুখে পড়বে জলবায়ুর পরিবর্তন-প্রভাবের ফলে। আগে যেমনটি ভাবা হতো তার চেয়ে তিনগুণ বেশি মানুষ এখন সমুদ্রের উপরিতলের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে হুমকিতে পড়বে। তাদের গবেষণা এমনটিই নির্দেশ করে।

এই সমীক্ষা প্রতিবেদনের সহপ্রণেতা ও ‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’-এর প্রধান নির্বাহী ও প্রধান বিজ্ঞানী বেন স্ট্রাউস বলেছেন, ‘আমরা যখন আমাদের নতুন এলিভেশন ডাটা ব্যবহার করি, তখনই আরো বেশি লোককে দেখতে পাই এই জলবায়ু পরিবর্তন-প্রভাবের শিকারের কাতারে।’ বাংলাদেশের প্রখ্যাত জলবায়ু বিশেষজ্ঞ সেলিমুল হক এই সমীক্ষায় পাওয়া ফলাফলের সাথে একমত। তবে তিনি বলেন, আমাদের জাতীয় পর্যায়ে এ নিয়ে আরো গবেষণা দরকার। তখন হয়তো আমরা জানতে পারব জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটবে। প্রভাব কী মাত্রায় চলতে পারে, কোন কোন এলাকায় এর প্রভাব বেশি থাকে। আগাম সেসব তথ্য জানতে পারলে, তা মোকাবেলায় প্রস্তুতি নেয়া আমাদের পক্ষে সহজ হবে।

নতুন এই সমীক্ষা প্রতিবেদনে ১৩৫টি দেশের পরিবেশচিত্র তথা জলবায়ুর পরিবর্তন চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব দেশে ভয়াবহ ধরনের ঝড় ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টিসহ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব মানুষ এর শিকার হবে, এর দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ বসবাস করে এশিয়ার কিছু দেশে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এসব দেশের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড। রিপোর্টটিতে বিশেষ করে এশিয়ার এসব দেশের নাম উল্লেখ করা হয়।

‘নিউরাল নেটওয়ার্ক’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে একটি মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। এই মানচিত্রে দেখানো হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু উপকূলীয় শহর বড় ধরনের জলোচ্ছ্বাসের সময় পানির নিচে তলিয়ে যাবে। এসব দেশের এই শহরগুলোতে বসবাসরত লাখ লাখ মানুষ তাদের দেখতে পারবে, তারা যেন একটা বন্যাকবলিত অঞ্চলে বসবাস করছে। এসব শহর হচ্ছে ঢাকা, ব্যাংকক, হংকং, সাংহাই, তাইজহু, সুরাবিয়া, মুম্বাই, হো চি মিন সিটি এবং ওসাকা।

এই পর্যবেক্ষণ থেকে আন্দাজ করা যায়, আমাদের ওপর কতটা জোরাল হবে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব। এর ওপর নির্ভর করে আমাদের ভেবেচিন্তে বিনির্মাণ করতে হবে আমাদের উপকূলীয় শহর-কাঠামো ও অর্থনীতি। এ কাজে এখনই হাত না দেয়ার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। বিশ্বের বেশির ভাগ উপকূলের অবস্থা মোটামুটি একই। তারাও ভাবছে জলবায়ু সঙ্কটের বিষয়টি মাথায় রেখে তাদের উপকূলীয় শহরগুলো ও অর্থনীতি নতুন করে ঢেলে সাজাতে। আমাদেরকেও এ ব্যাপারে সজাগ হতে হবে বৈকি!

গবেষকরা একটি মডেল ব্যবহার করেছেন, যার নাম ‘কোস্টালডিইএম ডিজিটাল এলিভেশন মডেল’। ‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’ এই নতুন ডিজিটাল এলিভেশন মডেলটি উদ্ভাবন করেছে এই সমীক্ষার জন্য। এর আগে গবেষকরা ব্যবহার করেছেন নাসার শাটল রাডার টেলিগ্রাফি মিশন (এসআরটিএম)। এর মাধ্যমে জানা যায়, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের অনুমিত সংখ্যা।

এ দিকে গত মাসে প্রকাশ হয়েছে ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি)-এর ষষ্ঠ রিপোর্ট। এই রিপোর্ট মতে, এই শতাব্দী শেষে সমুদ্রের উপরিভাগের উচ্চতা আরো এক মিটার বেড়ে যাবে। কিন্তু উল্লিখিত নতুন রিপোর্ট মতে তা বাড়বে কমপক্ষে দুই মিটার; অর্থ চার হাতেরও বেশি। তখন আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের অবস্থা কী হবে তা এখন থেকেই ভাবতে হবে।

এই যে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বলি, তা আসলে কী? আসলে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বলে একটি বহুল উচ্চারিত পদবাচ্যের কথা আমরা অনেকেই জানি। বংলায় আমরা একে বলি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। কেউ কেউ আবার একে ভূমণ্ডলীয় উষ্ণায়ন বলে থাকে। এই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনেরই একটি ঘটনা। বিষয়টি সময় বা কালনিরপেক্ষ হলেও আজকের দিনের উষ্ণতা বা তাপমাত্রা বেড়ে চলা নির্দেশ করতেই এ কথাটি ব্যবহার করা হয়। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন সরল অর্থে হচ্ছে বিশ্বের তাপমাত্রা অসহনীয় মাত্রায় বেড়ে চলা, যা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আমাদের সবার উদ্বেগ। আর এই তাপমাত্রা বেড়ে চলছে ভয়াবহভাবে। প্রকৃতির ওপর মানুষের দুর্বিনীত আচরণের প্রভাবেই এই তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বেড়ে চলা। ইউএনএফসিসিসি বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ুর পরিবর্তন বলে উল্লেখ করে। আর জলবায়ুর বিভিন্নতাকে অন্য কারণে সৃষ্ট জলবায়ুর পরিবর্তন বোঝাতে ব্যবহার করে। অপর দিকে কিছু কিছু সংগঠন মানুষের কারণে জলবায়ুর পরিবর্তনগুলোকে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন বলে। উল্লেখ্য, ইউএনএফসিসিসি (ইউনাইটেড ন্যাশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ) হচ্ছে জাতিসঙ্ঘের পরিবেশসংক্রান্ত একটি বৈশ্বিক চুক্তি। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের হার এমনভাবে কমিয়ে এনে এমন অবস্থায় স্থিতিশীল রাখা, যাতে জলবায়ুগত মানবিক পরিবেশের জন্য তা বিপত্তিকর না হয়।

এবার তাকানো যাক উষ্ণায়নের ইতিহাসের দিকে। যন্ত্রে ধরা পড়া তাপমাত্রা অনুযায়ী, ১৮৬০-১৯০০ সময় পরিধিতে ভূভাগ ও সমুদ্র উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্ব তাপমাত্রা তথা উষ্ণতা বেড়েছে ০.৭৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা ১.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট। ১৯৭৯ সাল থেকে ভূভাগের তাপমাত্রা মহাসাগরের তাপমাত্রার তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুততায় বেড়েছে। অপর দিকে কৃত্রিম উপগ্রহের ধারণ করা তাপমাত্রা মতে, নি¤œ টপোমণ্ডলের তাপমাত্রা ১৯৭৯ সাল থেকে প্রতি দশকে বেড়েছে ০.১২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থেকে ০.২২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে। ১৮৫০ সালের এক বা দুই হাজার বছর আগে তপমাত্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। তা ছাড়া, সম্ভবত মধ্যযুগীয় উষ্ণ পর্বে কিংবা ক্ষুদ্র বরফ যুগের মতো কিছু আঞ্চলিক তারতম্য ঘটেছিল। নাসার স্যান্ডার্ড ইনস্টিটিউট ফর স্পেস স্টাডিজের দেয়া অনুমিত হিসাব অনুযায়ী, ১৮০০ শতকের শেষের দিকে তাপমাত্রা মাপার নির্ভরযোগ্য যন্ত্রের বিস্তার লাভ ঘটে। এর পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সাল ছিল সবচেয়ে উষ্ণ বছর। এর আগে লিপিবদ্ধ উষ্ণতম বছর ১৯৯৮ সালের তুলনায় ২০০৫ সালের উষ্ণতা ছিল এক ডিগ্রির কয়েক শতাংশ বেশি। শেষ ৫০ বছরের সবচেয়ে বিস্তারিত উপাত্ত মজুদ আছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণা সবচেয়ে স্পষ্ট।

আমাদের জানা দরকার, কী কারণে সময়ের সাথে পৃথিবীর উষ্ণতার এই বেড়ে চলা। বলা হয়, জলবায়ুর এই পরিবর্তনের তথা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পেছনে ৩৬-৭০ শতাংশ দায়ী গ্রিনহাউজ গ্যাসের প্রভাব, কার্বন-ডাই-অক্সাইডের উদগিরণ দায়ী ৯-২৬ শতাংশ, মিথেন গ্যাস দায়ী ৪-৯ শতাংশ এবং ওজোন দায়ী ৩-৭ শতাংশ। বাষ্পীভূত পানি, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, কার্বন-মনোক্সাইড, সালফার-ডাই-অক্সাইড ও সালফারের অন্যান্য অক্সাইডগুলো, নাইট্রাস-অক্সাইড, ক্লোরোফ্লোরো কার্বন, মিথেন এবং ওজোন ইত্যাদি হচ্ছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পাওয়া প্রথমিক গ্রিন হাউজ গ্যাস। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, যদি আমাদের পৃথিবী পুরোপুরি এসব গ্রিনহাউজ গ্যাসমুক্ত থাকত, তবে পৃথিবীপৃষ্ঠের তাপমাত্রা হতো মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড, কিন্তু এসব গ্রিনহাউজ গ্যাসের কারণে এই তাপমাত্রা গড়ে ১৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। অতএব সহজেই অনুমেয়, গ্রিনহাউজ গ্যাসের প্রভাব জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কতটা দায়ী। গ্রিনহাউজ গ্যাসগুলো পৃথিবী থেকেই তাপ বিকিরণ করে। এই তাপ অবলোহিত বিকিরণ রূপে গ্রহের বায়ুমণ্ডলে ও ভূপৃষ্ঠে বাড়তি তাপের সৃষ্টি করে উষ্ণায়নে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। অপর দিকে, সূর্যালোকের পরিবর্তনও সরাসরি জলবায়ু ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। তবে সূর্যের শক্তি পৃথিবীতে পৌঁছানোর পরিমাণে তেমন কোনো ঊর্ধ্বগতি নেই। তাই এই সূর্যালোকের পরিবর্তন বর্তমান উষ্ণায়নের জন্য দায়ী নয়।

এই যদি হয় জলবায়ু বদলে যাওয়ার কারণ, তবে এর সমাধানও চিহ্নিত করতে পারি সহজে। ঠিক করতে পারি আমাদের করণীয়- ১. জলবায়ু পরিবর্তনের গোটা প্রক্রিয়াটি জেনে মানুষকে সে অনুযায়ী সজাগ ও সচেতন হতে হবে; ২. কলকারখানায় কালো ধোঁয়া নির্গমন কমিয়ে আনতে হবে; ৩. সিএফসি নির্গত হয়, এমন যন্ত্রপাতির ব্যবহার কমাতে হবে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে হবে; ৫. বনভূমি ধ্বংস বন্ধ করতে হবে; ৬. দেশে দেশে বৃক্ষরোপণ ও বনায়ন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে; ৭. সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, ৮. নবায়নযোগ্য জ্বালানির সন্ধান করতে হবে; ৯. জলবায়ু পরিবর্তন রোধে দেশে দেশে কর সংস্কার করতে হবে: ১০. প্রয়োজনে কার্বন-ট্যাক্স আরোপ করতে হবে; ১১. প্রকৃতির ওপর মানুষের দুর্বিনীত আচরণ বন্ধ করতে হবে এবং ১২. সর্বোপরি জলবায়ু সঙ্কট সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়তে হবে।


আরো সংবাদ