২৩ নভেম্বর ২০১৯

রাঁধুনীদের মুশকিল আসান

-

সেই প্রাচীনকাল থেকে হাল আমলেও বাঙালি নারীদের মধ্যে একটি অসাধারণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা সত্যিই অদ্ভুত। বঙ্গসমাজে নারীরা বিয়েশাদির পর স্বামীগৃহের কর্তৃত্বে কাউকে ভাগ দিতে নারাজ। জীবন বিপন্ন হলেও এ অধিকার তাদের চাই-ই চাই। গৃহকোণের ক্ষমতাচর্চায় তারা মরিয়া এবং অতিমাত্রায় সচেতন। এ নিয়ে পুত্রবধূ আর শাশুড়ির ঝগড়াবিবাদ এ দেশে সাধারণ ঘটনা। বিশেষ করে রান্নাঘরের কর্তৃত্বের বেলায় তো কথাই নেই। এটি হাতছাড়া হলে গিন্নিপনাই বৃথা! পারতপক্ষে রান্নাবান্নার কাজ হাতছাড়া করতে চান না গৃহবধূরা। নিদেনপক্ষে তদারকি করে হলেও উপস্থিতির জানান দেন। যত কষ্টই হোক, রান্নার কাজটি বঙ্গদেশের নারীমাত্রই নিজেরা করতে পছন্দ করেন। তারা মনেপ্রাণে এক-একজন পাকা রাঁধুনী। রান্না করতে গিয়ে তারা যে ঝুটঝামেলায় পড়েন না, তা কিন্তু নয়। স্বামী এবং পরিবারের অন্যদের মন জোগাতে নিত্যদিন হরেক পদের সালুন; মানে তরকারি রাঁধতে গিয়ে কম ঝামেলা পোহাতে হয় না। তবে এ কথা ঠিক- ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’। গৃহকাজে ফাঁকিবাজ নয় আমাদের নারীসমাজ।

ঘরকন্নায় কিছু দিন ধরে আমাদের কন্যা-জায়া-জননীরা রয়েছেন ফুরফুরে মেজাজে। তাদের জীবনে যেন বইছে সুখের বাতাস। খোসা ছাড়াতে গিয়ে পেঁয়াজের ঝাঁজে তাদের চোখের জল আর নাকের পানি মিলেমিশে একাকার হওয়ার দিন শেষ হলো বুঝি। রান্নাঘর থেকে পেঁয়াজের বিদায়ঘণ্টা বাজল প্রায়। এটি ললনাদের জন্য খোশখবর বৈকি! সে দিন বন্ধু মজলিসে জম্পেশ আড্ডায় একজন বললেন, পেঁয়াজের দাম বেড়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছে তার জীবনে। ‘সোহাগী বউ’ ঝাঁজালো নয়; আহ্লাদিগলায় বলেছে, পেঁয়াজের ঝাঁজে এত দিন পরান যায় যায় অবস্থা ছিল। দাম বাড়ায় ভালোই হয়েছে; ব্যয়সাশ্রয়ী হতে গিয়ে পেঁয়াজ খাওয়ার পরিমাণ কমবে। এতে গিন্নী অর্থাৎ রাঁধুনীদের চোখের পানি একটু হলেও কম ঝরবে। সংসারের ব্যয়ভারে ন্যুব্জ যেকোনো স্বামীর এতে খুশিতে আটখানা হওয়ারই কথা। বন্ধুরাও সমস্বরে বললেন, ‘মারহাবা’।

স্বস্তির বাজারে অস্থির পেঁয়াজ। সব কিছু লোকাল ট্রেনে চললেও পেঁয়াজ যেন ননস্টপ সুবর্ণ এক্সপ্রেসের যাত্রী। তাই পেঁয়াজের ঝাঁজের চেয়ে এখন ‘বাজারের ঝাঁজ’ নিয়েই আলোচনা বেশি। এ সুযোগে অনেকে পেঁয়াজ ছাড়াই রান্নার কৌশল খুঁজছেন। রান্নাবান্নায় পারদর্শীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেঁয়াজবিহীন রান্নার পদ্ধতি বাতলে দিচ্ছেন। তবে গোল বেধেছে, পেঁয়াজের বেশ কিছু ঔষধি গুণ নিয়ে। তাই পেঁয়াজ খাওয়া ছেড়ে দিলে তা থেকে বঞ্চিত হতে হবে আমাদের। রক্তের ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রাচীনকালের গ্রিক ক্রীড়াবিদরা পেঁয়াজ খেতেন আর রোমান গ্লাডিয়েটররা দেহের মাংসপেশি শক্তপোক্ত করতে পেঁয়াজের রস লাগাতেন। মহাবীর আলেকজান্ডার সৈন্যদের বলতেন পেঁয়াজ খেতে। সুতরাং ‘পেঁয়াজ খাবো না’- এই দল ভারী না করাই ভালো। তা ছাড়া পেঁয়াজ ছাড়া রান্না কি মুখে রুচবে? পেঁয়াজ আসলে শুধু মসলা নয়, সেই সাথে সবজি। সবজি খেতে নিরুৎসাহিত স্বাস্থ্যগত কারণে ঠিক নয়, আর উৎপাদকদের কথা চিন্তা করলে অর্থনৈতিক বিবেচনায়ও উচিত নয়। বরং এর উৎপাদন কী করে বাড়ানো যায়, পেঁয়াজ চাষিরা কিভাবে লাভবান হবেন, সব মুনাফা মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যাতে না যায় সেটিও ভাবতে হবে। আবাদ বাড়লে ভোক্তারাও কম দামে পেঁয়াজ কিনতে পারবেন এবং এতে খুশি থাকবেন। এমন পরিকল্পনা করাই হবে যুৎসই অর্থনৈতিক চিন্তা। তবে গিন্নীদের পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর বিড়ম্বনা থেকে আপাতত মুশকিল আসান হয়েছে; বউ-ভক্তরা এতে মহাখুশি। তাদের কাছে এটি উপরি পাওনা। দুনিয়ায় স্ত্রৈণরাই সুখী। চলুক না; যে কয় দিন চালানো যায়। অন্তত ‘পেঁয়াজ খাওয়া মুসলমান’ অপবাদ ঘুচবে। এতে করে প্রতিবেশী দেশের সাথে দহরম-মহরম বাড়বে। মুখে পেঁয়াজের দুর্গন্ধ দূর হবে। তখন পরস্পরের আলোচনা জমবে ভালো।

এ তো গেল ঘরে-বাইরের কথা। আরেকটি দিক হলো- পেঁয়াজ এবার এক লাফে সাধারণ থেকে ‘অসাধারণ’ হয়ে উঠেছে। একই সাথে সমীহের আর মহার্ঘ বস্তু। কিভাবে পেঁয়াজের ইজ্জত বাড়ল, তা একটু বয়ান করতে হয়। দেশে এখন আপেল-কমলার দর আর পেঁয়াজের দাম সমানে সমান। ফলে পেঁয়াজ খাবেন, নাকি আপেল? পেঁয়াজ দিয়ে ডিম ভাজা খাবেন, নাকি ডিম দিয়ে পেঁয়াজ ভাজা? দামের দিক থেকে এই তিনটি পণ্য এখন একই কাতারে। বড় আকারের একটি পেঁয়াজের দাম এখন ১০ টাকার মতো। একটি আপেলের দামও একই। একটা ডিমের দাম ১০ টাকা।

পেঁয়াজের ইজ্জত বাড়ার নেপথ্য কাহিনী তাহলে কী? এক মাস আগে ভারত যখন পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিলো, দেশের ব্যবসায়ীরা রাতারাতি কেজি প্রতি ৩০ টাকা বাড়িয়ে ৯০ টাকার ওপর নিয়ে গেলেন এর দর। ভারত রফতানি বন্ধ করে দেয়ার পর সরকারের তরফ থেকে আশ্বাসবাণী শোনানো হলো, ‘দাম কমে যাবে।’ বাস্তবে হয়েছে উল্টো। দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। ভারতের রফতানি বন্ধের ঘোষণার পর ব্যবসায়ীদের পরের অজুহাত হলো বৃষ্টি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ- একশ্রেণীর ব্যবসায়ীর অতি মুনাফালোভী প্রবণতাই পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী। এর দাম বাড়াচ্ছেন মূলত ঢাকার শ্যামবাজার আর চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ীরা, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। অর্থাৎ দু’টি বাজারের কিছু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর কারণে প্রতিদিন বাড়তি দাম দিয়ে পেঁয়াজ কিনে খেতে হচ্ছে সারা দেশের মানুষকে।

কক্সবাজার উপকূলে ঘটেছে আরেক ঘটনা। এক মণ লবণের বিনিময়েও মিলছে না এক কেজি পেঁয়াজ। পর্যটন শহরটিতে গত শনিবার এক কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১৩৫ টাকায়, মিয়ানমার ও মিসরীয় পেঁয়াজ ১২০ টাকা। এ দিকে প্রতি মণ লবণ (কালো ও সাদা) বিক্রি হলো ১২০-১৫৫ টাকায়। প্রতি মণ লবণে অতিরিক্ত দিতে হয় (পানিতে নষ্ট হয় এমন অভিযোগে) আরো পাঁচ-সাত কেজি লবণ। এ হিসাবে এক মণ লবণ বিক্রির টাকায় মিলছে না এক কেজি পেঁয়াজ।

‘সেঞ্চুরি’ হাঁকা শেষে আরো হাফ সেঞ্চুরি যোগ হয়েছে পেঁয়াজের দামে। অবশ্য সেঞ্চুরির ঝাঁজেই পেঁয়াজের খোসা না ছাড়িয়েও ক্রেতাদের চোখে পানি। পেঁয়াজ এখন ‘পাগলা ঘোড়া’। এ ছাড়া আর কী বলা যায়! ‘পাগলা ঘোড়া ক্ষেপেছে, চাবুক ছুড়ে মেরেছে’। ছড়াটি ঘুরিয়ে বললে এমন দাঁড়ায়, ‘পাগলা পেঁয়াজ ক্ষেপেছে।’ ভোক্তারা এক কেজি পেঁয়াজ কিনছেন ১৫০-১৬০ টাকায়। আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও এ নিয়ে চিন্তিত, কিন্তু উপায়হীন। একের পর এক বৈঠক করে মন্ত্রণালয়টির কর্মকর্তারা ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। বাঙালির রান্নায় অত্যাবশ্যক পণ্য পেঁয়াজের সরবরাহ, মজুদ ও দর নিয়ে বৈঠক করা হয়; কিন্তু কোনো উপায় বের হয়নি। পেঁয়াজ তার দামের ঝাঁজ নিয়ে নিজের জায়গাতেই আছে সদম্ভে।

ডিম, কমলা, কলার মতো আরো কত কিছুই না বিক্রি হয় হালি দরে! কিন্তু এভাবে পেঁয়াজ বেচাকেনার খবর আগে কেউ শুনেছে কি না কে জানে। তবে এখন শুনতে হচ্ছে। দাম বাড়তে বাড়তে পেঁয়াজ এমন উঁচু জায়গায় পৌঁছে গেছে যে, স্বল্প আয়ের মানুষের আর উপায় নেই। কোথাও কোথাও পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে হালি দরে। এক হালি ২০ টাকা। কেজি হিসেবে কেনার সামর্থ্য যাদের নেই, তারাই কিনতে বাধ্য হচ্ছেন হালিতে।

পেঁয়াজ নিয়ে কিছু পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা যেতে পারে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপন্ন হয় চীনে। আর বেশি পেঁয়াজ রফতানি করে নেদারল্যান্ডস। শীর্ষ আমদানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। রফতানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে ভারত। তবে চলতি কথায় সেই যে শোনা যায়, ‘ছেলে ভালো, শুধু একটু পেঁয়াজ খায়’। এ ব্যাপারে শীর্ষ দেশ কোনটি, তা নিয়ে ধোঁয়াশা বিদ্যমান। সব মিলিয়ে বিশ্বে আট কোটি টনেরও বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। বিশ্বব্যাপী যে পেঁয়াজ উৎপাদন হচ্ছে, এর ২৫ দশমিক ৬ শতাংশই চীনে, ভারতে প্রায় ২১ শতাংশ। বিশ্বের মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের ১ দশমিক ৯ শতাংশ হয় আমাদের বঙ্গদেশে। বিশ্ববাজারে পেঁয়াজের গড় দর প্রতি কেজি ৬৯ সেন্টস, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৫৮ টাকা। গত বছরের তুলনায় দর বেড়েছে সাড়ে ১২ শতাংশ। এরপরও বলা যায়, পেঁয়াজের বর্তমান উচ্চ দর এ অঞ্চলের মানুষের জন্য সমস্যা। গরিব দেশের খেটে খাওয়া মানুষদের এই দামে কিনে খাওয়াও কষ্টসাধ্য। অথচ মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আমাদের জীবনে পেঁয়াজের ঝড়ো ইনিংস বইছে। ভারতের রফতানি বন্ধের আউট সুয়িং বলে ‘ব্যবসায়ী’ নামের ব্যাটসম্যানেরা নিশ্চিন্তে ছক্কার পর ছক্কা হাঁকাচ্ছেন। সেই হাঁকানিতে হয়তো নতুন মওসুম শুরুর আগে পেঁয়াজের দাম ডাবল সেঞ্চুরিতে গিয়ে ঠেকতে পারে। আর নতুন পেঁয়াজ বাজারে উঠলেই কেবল আশা করা যায়, পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা বোল্ড আউট হবেন। তখন পর্যন্ত ভোক্তাদের অপেক্ষা ছাড়া বিকল্প নেই। আর কে না জানে- ‘সবুরে মেওয়া ফলে।’ আমরা তো সর্বংসহা হয়ে গেছি।

[email protected]


আরো সংবাদ