২৩ নভেম্বর ২০১৯

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তি

-

আবরার আজ জাতীয় বীর। যে কথা কোটি কোটি মানুষের মনে ছিল, বুয়েটের এই ছাত্র সে কথা প্রকাশ করেছিলেন একটি ফেসবুক পোস্টে। বঞ্চিত মানুষের কথা যখন ভাষা পায়, সেটি এমনই জোরালো হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মানুষ অতীতে সামান্য কয়েক দিনের জন্য কলকাতা বন্দরের সুবিধা চেয়েছিল। আমাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ও প্রতিবেশী দেশটি আমাদের সামান্য সময়ের জন্য সে সুযোগ দেয়নি। তাই আবরার লিখেছিলেন, ‘৪৭-এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোনো সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ছয় মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পারমর্শ দিচ্ছিল। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সেই মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।

কয়েক বছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তর ভারত কয়লা-পাথর রফতানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দেবো। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে, সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে ‘বন্ধুর বাতি জ্বালাব।’ এরপর তিনি লিখেছেন, হয়তো এ সুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন- ‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও, তার মতো সুখ কোথাও কি আছে, আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’

ফেনী নদীর পানি, বন্দর সুবিধা প্রদান এবং গ্যাস সরবরাহ করার সুযোগ বড়ভাইকে দিয়েছে ছোট রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এগুলোর অভাবে ভারতের মানুষের দিন চলে না এমন নয়; কিংবা এগুলো ভারতের জন্য অত্যাবশ্যকীয়, তা-ও নয়। তারপরও অকাতরে এগুলো তারা পেয়েছেন। কিন্তু ভারতের কাছে বাংলাদেশের যে দীর্ঘ দিনের অনেক চাওয়া রয়েছে, সেগুলোর কোনোটি পূরণ হয়নি। আমরা প্রথমে তাদের মূল প্রয়োজনীয় চাওয়াগুলো পূরণ করেছি। পরে তাদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির চাওয়াগুলোকেও মিটিয়ে দিয়েছি। বঞ্চনার বেদনা তাই বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের মনে থাকাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবরার সেটাকে অত্যন্ত চমৎকার কায়দায় তুলে ধরেছেন। সে জন্য এ স্ট্যাটাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের একটা অংশ রয়েছে, যাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেদের ক্ষমতাচর্চা। তারা ক্ষমতাসীন দলের ব্যানারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজত্ব কায়েম করেছে। তাদের মনে হতে পারে, বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতের ‘করুণার দৃষ্টি’ প্রয়োজন। তাই যেকোনোভাবে হোক, বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ ভারতকে খুশি রাখতে হবে। দরকার হলে সব দিয়ে হলেও। ফেসবুকে আবরারের পোস্ট ছড়িয়ে পড়াকে তাদের কাছে তাই ‘হুমকি’ মনে হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যম কতটা জোরালো অনুভূতি তৈরি করে, এই ঘটনা তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। আবরারের মনের জোরালো ভাষা প্রকাশের পথ করে দিলো ফেসবুক। এটি যখন মানুষের মনের পুঞ্জীভূত বেদনা স্পর্শ করল, বারুদের স্তূপে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন তাই এই স্ট্যাটাসকে তাদের ‘রাজত্ব হারানো’র উপলক্ষ মনে করছে। তারা এটিকে বড় পৈশাচিক কায়দায় মোকাবেলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ফলে আবরারকে নির্মম কায়দায় পিটিয়ে হত্যা করা হলো। ঘাতকরা নিজেদের অঙ্গনে এভাবে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করেছে। কিন্তু এই নিষ্ঠুরতা পুরো ঘটনাকে ভিন্ন একটি মাত্রা দিয়েছে।

কিছু মানুষের মনোবেদনাকে ছড়িয়ে দিয়েছে সবার মধ্যে। সবার মধ্যে সৃষ্টি করেছে এ ব্যাপারে সহানুভূতির। এ দিকে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কটি এক রহস্য হয়ে রয়েছে। ভারতের সাথে কী চুক্তি-সমঝোতা হবে, এটা কেন একটা গোপনীয় বিষয়? জনসাধারণের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনার সুযোগ রাখা হয় না। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমও খুব একটা কিছু অগ্রিম জানাতে পারে না এ বিষয়ে। কিছু জানাতে পারলেও সেগুলোর পক্ষপাতহীন গভীর বিচার-বিশ্লেষণ থাকে না। সরকারের পক্ষ থেকে যেমন রাখঢাক, একইভাবে মিডিয়া অনেকটা লজ্জাকাতরতা দেখায়। এমনকি বাংলাদেশের পার্লামেন্টও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে রহস্যজনকভাবে চুপচাপ।

ভারত আমাদের তিন দিক দিয়ে ঘিরে রেখেছে। তারা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী। দেশটির সাথে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আমাদের চলাকে মসৃণ করে। তাই এ দেশটির সাথে সম্পর্কের মাত্রা আমাদের জনসাধারণকে সবচেয়ে বেশি ভাবায়। যতই ঢেকে বা চেপে রাখা হয়, এ নিয়ে মানুষের মধ্যে গুজব ডালপালা গজায়। ভারতের চাওয়া-পাওয়া একের পর এক আদায়, অন্য দিকে বাংলাদেশের প্রাপ্তির খাতা শূন্য থেকে যাচ্ছে, এ নিয়ে মানুষের মধ্যে মনোযাতনাও তাই বেশি। দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা হতাশায় রূপ নিয়েছে। আবরারের মতো বুদ্ধিদীপ্ত তরুণদের মাধ্যমে এটি যখন ভাষা পায়, সেটি খুব জোরালো বার্তা তৈরি করে। এর ভার সহ্য করতে পারেনি বুয়েটে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন। এ কারণে উত্তেজিত হয়ে আবরারকে নির্মম কায়দায় হত্যা করে তারা শোধ নিয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে আবরারের দেয়া পোস্টটি তার মৃত্যুর পর আরো জোরালো হয়েছে। মানুষ যখন তিস্তা নদীর পানির হিস্যা পাওয়ার জন্য উদগ্রীব, তখন জানতে পারল, এবার ফেনী নদীর পানি ভারতকে দেয়া হয়েছে। আর তিস্তার পানি প্রাপ্তি নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগও পাওয়া যায়নি। আবরারের পোস্ট এ ইস্যুটি জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছে। তার পৈশাচিক মৃত্যুর খবরের সাথে সাথে তার পোস্টটিও অনেক বেশি বেগে শেয়ার হয়েছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যাদের ভাবায়নি, তারাও এর সাথে পরে যুক্ত হয়েছেন।

এ ব্যাপারে তাদের আবেগ আরো বলিষ্ঠ হয়েছে। এটাকে জনমতের একটা ‘বিস্ফোরণ’ বলা যেতে পারে। এই চাপের অন্যতম ফল হচ্ছে তড়িঘড়ি করে আবরারের খুনিদের বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া। এটা সাধারণত ঘটতে দেখা যায় না এ দেশে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের খুন-জখমের ঘটনা যেন স্বাভাবিক ব্যাপার। সংগঠনটির বেপরোয়া ভাব সীমাহীনভাবে বাড়ার পরও ক্ষমতার বলয় তাদের দুধ-কলা দিয়ে পুষে চলেছে বলেই দেশবাসী দেখে আসছে। সম্ভবত ছাত্র ছাত্রীরা যাতে সরকারের বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারে, সে জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের অনেকটাই ‘স্ট্যান্ডবাই’ রাখা হয়েছে। আর এ সুযোগকে তারা কাজে লাগাচ্ছে মন্দভাবে।

আবরারের ফেসবুক পোস্ট, এরপর তার খুন হওয়া এবং হত্যাকারীদের ত্বরিত বিচারের আওতায় আনা-প্রতিটি পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুরুত্ববহ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটি পর্যায়ের ক্রিয়াকাণ্ডের গতিকে সামাজিক মাধ্যম অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে খবরের কাগজ, রেডিও এবং টেলিভিশনের ওপর নির্ভরশীলতার মাত্রা ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। এগুলোতে মানুষের প্রতিক্রিয়া জানানোর সুবিধা সীমিত। একটি ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পাঠক যখন পত্রিকায় চিঠি পাঠান, সেটি না-ও পৌঁছতে পারে। পৌঁছলেও সেটি যে ছাপা হবে, তা নিশ্চিত নয়। একইভাবে রেডিও-টেলিভিশনে দর্শক-শ্রোতার মতামত জানানো কিংবা প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করার সুযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তুলনায় একেবারে সীমিত।

সামাজিক গণমাধ্যম চালু হওয়ার ফলে সংবাদ জানার অনেক পথ খুলে গেছে। যেকোনো খবর মানুষ তৎক্ষণাৎ জেনে যাচ্ছে। সাথে সাথে তার মতামতও জানিয়ে দিতে পারছেন। আগে মিডিয়া যে প্রভাব তৈরি করছিল, সেটিই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম করছে আরো বহুগুণে। কিছু ক্ষেত্রে এর প্রভাব ও গতি অনেক বেশি জোরালো। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ তাই অনেক ক্ষেত্রে নির্বিকার থাকতে পারছে না। এতে বড় স্বৈরাচারীরাও ধরাশায়ী হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন এর দ্বারা বেগবান হয়েছে। বাংলাদেশেও বেশ কিছু ঘটনায় সরকারকে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হয়েছে একই কারণে। লোকদেখানো পদক্ষেপ নিলেও, অন্তত সেটি নিতে হচ্ছে।

সামাজিক মাধ্যম জনসমাজে ঘূর্ণিঝড় বা সুনামির শক্তি নিয়ে যেন আবির্ভূত হচ্ছে। এতে অনেক ‘হিসাব-নিকাশ’ এলোমেলো করে দিচ্ছে। সব জায়গায় ক্যামেরা ছড়িয়ে পড়েছে। যে কেউ ধরাশায়ী হতে পারে এর দ্বারা। যেমন জামালপুরের সাবেক ডিসি ছিটকে পড়েছেন। অবশ্য এর নেতিবাচক দিক রয়েছে; উসকানিমূলক ঘটনাও ঘটছে। ফলে সাম্প্রদায়িক ও অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে এ ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসির নগর ও সম্প্রতি ভোলায় এমন ঘটনা ঘটেছে। এতে বেশ কিছু মানুষের প্রাণহানি, ক্ষতি ও বিপুল সম্পদের বিনাশ হয়েছে। বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তিন কোটি। বিশ্বের অনেক দেশের জনসংখ্যাও এত বেশি নয়। ভবিষ্যতে সামাজিক মাধ্যম দেশ ও জাতির ভাগ্য গড়তে পারে।
[email protected]


আরো সংবাদ