০৭ ডিসেম্বর ২০১৯

পুলিশকে হতে হবে জনগণের বন্ধু

-

সরকার ও পুলিশ বিভাগ থেকে বিভিন্নভাবে প্রচারমাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে যে, ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু।’ ১৫৮ বছরের পুরনো ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি সংগঠন যার আনুষ্ঠানিক জন্ম ১৮৬১ সালে। বহুবার সংগঠনটির আকার, প্রকার, রকম পরিবর্তন, পরিবর্ধন, মার্জন, পরিমার্জন করা হয়েছে, এর পরও প্রশ্ন ওঠে- জনগণ কি পুলিশের ওপর আস্থাশীল, নাকি এখনো পুলিশ জনগণের আস্থাহীনতায়? আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্যার রবার্ট পিলকে আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থাপনার জনক বলা হয়। তিনি বলেছেন, 'The police are the public and the public are the police'। আধুনিক পুলিশ কেমন হওয়া বাঞ্ছনীয় এ সম্পর্কে তিনি ৯টি নীতিমালা দিয়েছেন, যা Peeling Principle নামে পরিচিত:
1. The basic mission for which the police exist is to prevent crime and disorder.
2. The ability of the police to perform their duties is dependent upon the public approval of police actions.
3. Police must secure the willing co-operation of the public in voluntary observation of the law to be able to secure and maintain the respect of the public.
4. The degree of co-operation of the public that can be secured diminishes proportionately to the necessity of the use of physical force.
5. Police seek and preserve public favor not by catering to public opinion, but by constantly demonstrating absolute impartial service to the law.
6. Police use physical force to the extent necessary to secure observance of the law or to restore order only when the exercise of persuasion, advice, and warning is found to be insufficient.
7. Police, at all times, should maintain a relationship with the public that gives reality to the historic tradition that the police are the public and the public are the police; the police being only members of the public who are paid to give full-time attention to duties which are incumbent upon every citizen in the interests of community welfare and existence.
8. Police should always direct their action strictly towards their functions, and never appear to usurp the powers of the judiciary.
9. The test of police efficiency is the absence of crime and disorder, not the visible evidence of police action in dealing with it.

পুলিশ, সরকার তথা রাষ্ট্রের একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সরকার প্রায় প্রায়ই কঠিন থেকে কঠিনতর আইন প্রণয়ন করে। বস্তুত ধারণা করা হয় যে, পার্লামেন্ট কঠিন আইন তৈরির যেন একটি ফ্যাক্টরি। কিন্তু সে আইন বাস্তবায়নের জন্য পুলিশের ওপরই সরকারকে নির্ভর করতে হয়। কিন্তু পুলিশ প্রকৃতপক্ষে ব্যবহার করা হচ্ছে সরকারকে রক্ষা তথা সরকারের অনৈতিক কাজকে পাহারা দেয়ার জন্য। তবে ক্ষেত্র বিশেষে কোনো কোনো পুলিশের ভালো উদ্যোগ রয়েছে বা ব্যতিক্রম হলেও অনেক পুলিশের দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকাও রয়েছে, তবে তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য নয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাজারবাগ পুলিশলাইন থেকে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অনেক পুলিশ শহীদ হয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে স্বাধীন রাষ্ট্রে পুলিশের ভূমিকা কতটুকু গৌরবোজ্জ্বল? সম্প্রতি একজন পুলিশ সুপারের ন্যক্কারজনক ঘটনা সিরিজ আকারে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হচ্ছে। সেখানে দেখা যায়, পুলিশ সুপার তার অধীনস্থ বড় বড় কর্মকর্তা সম্মলিতভাবে সংবাদ সম্মেলন করে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে যখন পারটেক্সের মালিক এম এ হাসেমের পুত্রবধূ ও নাবালক নাতিকে গুলশানের বাড়ি থেকে (সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজের দৃশ্য মতে) ধরে আনা হয়েছে, ফলে গাড়ি থেকে মদ, বিয়ার, গুলি উদ্ধারের পুলিশ সুপারের সাজানো নাটক মিথ্যা প্রমাণিত হলো। আরো প্রমাণিত হলো, জজ মিয়া নাটকের মতোই এটিও ছিল একটি অতিরঞ্জিত সাজানো নাটক। পেছনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যাপক অর্থের চাঁদাবাজি। পর্যাক্রমে এখন থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে। চাঁদাবাজিসহ ছাত্রাবস্থায় শিশু অপহরণের কথাও সামাজিক মিডিয়াতে আসছে, এর সত্যতা প্রমাণ সাপেক্ষ। কিন্তু প্রমাণিত হলো এটাই যে, পুলিশের অভিনব চাঁদাবাজি, এটা কোনো নতুন বিষয় নয়, বরং পুলিশই এখন শ্রেষ্ঠতম চাঁদাবাজ বলে জনগণ মনে করছে। অন্য দিকে, ইয়াবা দিয়ে বা অস্ত্র দিয়ে ধরিয়ে দিয়ে পুলিশের চাঁদাবাজির ঘটনা প্রতিনিয়তই পত্রিকায় আসছে। পরিবহনে চাঁদাবাজি এখন ওপেন সিক্রেট, তবে এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বও জড়িত রয়েছে। পরিবহন মালিক নেতৃত্ব কোনো দিনই বিরোধীদলীয় স্বাদ গ্রহণ করে না, বরং তারা সব সময়ই সরকারি দল। ফলে তারা পুলিশের মতোই বেপোরোয়া এবং নিয়ন্ত্রণহীন।

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আইয়ুব খান তার শাসন আমলে ‘প্রভু নয় বন্ধু’ নামকরণে একটি বই লিখেছিলেন, যা বাংলায় অনুবাদ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব বিডি মেম্বারসহ অনেক কপি বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছিল। কিন্তু আইয়ুব খানের মর্মকথা তথা পুস্তকে লিখিত বক্তব্য তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিশ্বাস করেনি। বাঙালিদের প্রতি পশ্চিমাদের আচরণ বন্ধুসুলভ ছিল না, বরং ছিল প্রভুসুলভ আচরণ। যদি পশ্চিমাদের আচরণ বন্ধুসুলভ হতো, তবে স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রয়োজন হতো না। ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’- কথাটি পুলিশ বিভাগের গাল ভরা বুলিতেই জনগণ মেনে নেবে না, বরং পুলিশের আচরণেই বন্ধুত্বের গভীরতা কতটুকু তা প্রকাশ পাবে। সার্বিক পর্যালোচনায় আচরণের ওপর বন্ধুত্ব নির্ভরশীল।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার জিহাদ ঘোষণা করেছে। অথচ সরকারের সব বিভাগ, অধিদফতর, দফতর দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। প্রতিনিয়তই পত্রিকায় সরকারের বিভিন্ন দফতরের অপচয়সহ নানাবিধ কেলেঙ্কারির কথা প্রকাশ পাচ্ছে। জাতি যখন দুর্নীতির কষাঘাতে নিমজ্জিত, সেখানে শুধু পুলিশ বিভাগ নিয়ে কথা বলা ওই আর্টিকেল লেখা মূল উদ্দেশ্য নয়। আমি বলতে চাই, পুলিশের একটি অংশ আইনকে ভিন্ন খাতে ব্যবহার অর্থাৎ ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেরা প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হচ্ছে এবং জনগণকে করছে আইনের শাসনের প্রতি আস্থাহীন। ফলে ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ কথাটি শত প্রচারের পরেও জনগণকে বিশ্বাস করাতে পারছে না। ইয়াবা বিক্রির মামলায় যখন পুলিশের সম্পৃক্ততার খবর পত্রিকায় প্রকাশ হয়, তখন জাতি তাদের ওপর কতটুকু আস্থাশীল থাকতে পারে? ক্ষমতা অপব্যবহারের জন্য সরকারই পুলিশকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। ৬ বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য, চিফ হুইপ থাকাবস্থায় জয়নাল আবেদীন ফারুককে দলীয় কর্মসূচি পালনরত অবস্থায় রাজপথে প্রকাশ্যে পিটিয়ে গুরুতর জখম করার পর ওই পুলিশ অফিসারকে সরকারের সুনজরে থাকার জন্য আর পেছনে তাকাতে হয়নি। নির্বাচন কমিশন গাজীপুর থেকে তাদের বদলি করার ১৩ দিনের মাথায় পুনরায় গাজীপুরে যোগদান করে জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে সরকার ঠুঁটোজগন্নাত বানিয়েছে। জমিদারদের লাঠিয়ালদের মতো সরকার পুলিশ বাহিনীকে পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করায় পুলিশের সুবিধাবাদী চক্রের জিব্বা অনেক বড় হয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার নিজেই বেকায়দায় পড়ে যায়। এ মর্মে স্ট্যান্ডরিলিজ ছাড়া অন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়া সরকারের জন্য দুরূহ হয়ে পড়ে। কারণ পুলিশ বিভাগের কিছু কিছু কর্মকর্তা রয়েছে, যারা সরকারের অনেক অপকর্মের সাক্ষী। কেউ তার সাক্ষীকে হস্টাইল করতে চায় না, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। অন্য দিকে, কারো পেছনে যদি মহামান্য কোনো ব্যক্তির রেফারেন্স থাকে, তবে তো দেশও তার পকেটে চলে যায়, চলমান দৃশ্যপটে ব্যতিক্রম কিছু হচ্ছে কি? জাতীয় পত্রিকার ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলন এবং ভিডিও ফুটেজে ভাইরাল হওয়া দৃশ্যে প্রতীয়মান হয়, পারটেক্স হাশেমের পুত্রবধূ ও নাতিকে গুলশান থেকে অপহরণ করে মিথ্যা ও বানোয়াট কাহিনী বানিয়ে পুলিশ সুপার শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার নয় বরং জাতির সাথে প্রতারণা করেছে। এ অপহরণ ঘটনার সাথে জড়িত সব পুলিশ কর্মকর্তাকে বিচারের মুখোমুখি করা আইনি শাসনব্যবস্থার দাবি হওয়া উচিত, কিন্তু তা কি সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে?

র‌্যাবের সাত খুনের মামলা ধামাচাপা পড়ে যেত যদি সেখানে হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ না করত। জনগণ পুলিশের বন্ধু হওয়ার আগে পুলিশকে মনে করতে হবে যে, জনগণের অর্থে তাদের বেতন-ভাতা চলে। অতএব পুলিশের চেয়ে জনগণের মর্যাদা ছোট নয় বরং ন্যূনতম সমান্তরালের চেয়েও ঊর্ধ্বে। ‘পুলিশ হত্যা করলে হবে অ্যানকাউন্টার, পক্ষান্তরে কোনো নাগরিক হত্যা করলে হবে মার্ডার’ সিনেমার এ ডায়লগের পরিবর্তে আইন ভঙ্গকারী, অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য জনগণকে সহযোদ্ধা মনে করতে হবে। পুলিশকে মনে রাখতে হবে, তারা আইনের ঊর্ধ্বে নয় বরং আইনের প্রতি তারা আরো বেশি দায়বদ্ধ। এ কথাটি পুলিশকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য সরকারের একটি স্বচ্ছ ও কঠিন ভূমিকা থাকা প্রয়োজন, যা বাস্তবায়নে সরকার ব্যর্থ হওয়ায় পুলিশের হাত এখন অনেক লম্বা, বিভিন্ন কারণে যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে কি? হালে পুলিশি কার্যক্রমে জনগণের চেয়ে সরকারই বেশি লাভবান, তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। কারণ ভোটারবিহীন ভোটবাক্স ভর্তি ও গায়েবি মামলা দিয়ে প্রতিপক্ষকে এলাকা ছাড়া করার দায় সরকারকে ভোগ করতেই হবে, যদি সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় না হয়।

লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ
[email protected]


আরো সংবাদ