১২ ডিসেম্বর ২০১৯

‘এখানে আকাশ নেই, এখানে বাতাস নেই’

‘এখানে আকাশ নেই, এখানে বাতাস নেই’ - ছবি : সংগ্রহ

‘আমরা ভালাই আছি,/বাতাস খাইয়া প্যাট ফুলাইয়া ড্যাংডেঙ্গাইয়া নাচি’- অনেক আগে একটি ব্যঙ্গাত্মক গানের এ ক’টি কলি শুনেছিলাম। কিন্তু এখন ঢাকাবাসী কোটি মানুষ আর নিশ্চিন্তে বাতাসও খেতে পারবেন না। এ দেশের প্রধান খাদ্যশস্য চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম দিন দিন কেবল বাড়ছে। বিশেষ করে পেঁয়াজের দাম তো কেজিপ্রতি ‘ডাবল সেঞ্চুরি’ অর্জন করে রেকর্ড গড়ে ফেলেছে। এতদিন কথায় কথায় বলা হতো, ‘বাতাস খেয়ে বেঁচে আছি।’ এখন আর তার ও উপায় রইল না।

ঐতিহাসিক দিল্লি নগরী গত কয়েক বছরে বায়ুদূষণে ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’। অবশ্য দিল্লি আর ঢাকা থেকে ‘হনুজ দূর আস্ত’ নয়। কারণ ভারতের রাজধানীতে বাতাসের দূষণের মাত্রা ১১৪ মাইক্রোগ্রাম; সেখানে বাংলাদেশের বাতাসের দূষণের মাত্রা একশ’র কাছাকাছি- ৯৭ মাইক্রোগ্রাম। ‘মসজিদের নগরী’ এখন কয়েকটি ‘দ’-এর নগরী। এই ‘দ’গুলোর মধ্যে আছে- দূষণ, দুর্নীতি, দখল, দুষ্কৃতি, দলবাজি প্রভৃতি।

১৬০৮ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে যে শহরটির নাম রাখা হয়েছিল ‘জাহাঙ্গীরনগর’, তাতে অতীত থেকে মনুষ্য সন্তানদের বসবাসের রেকর্ড রয়েছে। তবে এখন এই ঢাকা শহর বাসের অযোগ্যতার দিক থেকে বিশ্বে দ্বিতীয়। অর্থাৎ অল্পের জন্য ‘গোল্ড মেডেল’টা আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। আজকের পৃথিবীতে বসবাসের ক্ষেত্রে সর্বাধিক অযোগ্য হলো সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত রাজধানী দামেশক। বাংলাদেশ তেমন ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্র না হলেও এর রাজধানী ঢাকা বাসের অযোগ্য হিসেবে দামেশকের পরই দ্বিতীয় স্থানে। যেকোনো স্থানকে বায়ুদূষিত হয়ে পড়া বসবাসের অযোগ্য করে তোলে, তা বলা বাহুল্য।

বাতাসে ভাসমান, দূষিত ও সূক্ষ্ম পদার্থ কণাকে পিএম, অর্থাৎ পার্টিকুলেট ম্যাটার (Particulate Matter) বলা হয়ে থাকে। বায়ুদূষণের মাত্রা পরিমাপ করা হয় পিএম ২.৫ নামে, বাতাসে ভাসমান দূষিত কণাগুলোর পরিমাণ দিয়ে। সে মোতাবেক সর্বপ্রথম অবস্থান নয়াদিল্লি নগরীর। এই শহরে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে এর পরিমাণ ১১৪ মাইক্রোগ্রাম। আমাদের ঢাকায় তা ৯৭ মাইক্রোগ্রাম। ১১৪ আর ৯৭-এর ব্যবধানটাকে বিজ্ঞানীরা বেশি মনে করেন না, দূষণের ক্ষতির দিক থেকে। এ ক্ষেত্রে তৃতীয় স্থানে রয়েছে যুদ্ধবিক্ষত আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল। এখানে দূষণের মাত্রা ৬৭ মাইক্রোগ্রাম। দূষিত অন্যান্য রাজধানী শহরের মাত্রা এর কাছাকাছি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের একটি ইংরেজি দৈনিকের অনলাইন এডিশনে আন্তর্জাতিক পরিবেশ আন্দোলন ‘গ্রিনপিস’-এর প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এতে আলোকপাত করা হয়েছে ঢাকার বাতাসের ভয়াবহ দূষণ সম্পর্কে।

এবার চরম বায়ুদূষণের নগর দিল্লিতে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে বিষম বিপদে পড়েছিল বাংলাদেশের জাতীয় টিম। এ প্রসঙ্গে লেখক ও বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন, “আমাদের ক্রিকেট টিম যখন দিল্লিতে ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিল, তখন হঠাৎ দিল্লির ভয়ঙ্কর বায়ুদূষণের খবর আসতে শুরু করল। ছবিতে দেখতে শুরু করলাম দিল্লির ঝাপসা ছবি। দূষণের মাত্রা এতই ভয়ঙ্কর যে, এর ভেতর দিয়ে সামনে দেখা যায় না। ৩০টির মতো বিমানের ফ্লাইট রানওয়ে স্পষ্ট দেখতে না পেয়ে অন্য এয়ারপোর্টে গিয়ে অবতরণ করতে বাধ্য হলো। বায়ুদূষণসংক্রান্ত রোগবালাই এতই বেড়ে গেল যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলতে শুরু করলেন, ‘দিল্লি এখন একটা গ্যাসচেম্বার।’ দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ‘শহরটিতে বায়ুদূষণের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেছে।’ শহরে লাখ লাখ মাস্ক বিতরণ করা হলো; স্কুলগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হলো।”

আসলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘স্বচ্ছ ভারত’-এর অস্বচ্ছ রাজধানীর এহেন দুর্গতি এবারই প্রথম নয়। এমন অবিশ্বাস্য ও অবর্ণনীয় দূষণ বারবার ঘটছে। নিকট অতীতেও দিল্লিতে বাতাসে দূষণের দাপটে জনজীবন হয়ে পড়েছিল অচল। বন্ধ করে দিতে হয়েছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। তবুও দিল্লির বায়ুদূষণ বাড়ছেই। তা বাড়তে বাড়তে ‘আকাশ ছোঁয়া’র উপক্রম।

ফিরে যাই জাফর ইকবালের লেখায়। তার ভাষায়, ‘আমাদের ক্রিকেট টিমের জন্য মায়া হতে শুরু করল। ভাবতে লাগলাম, আমাদের এই ক্রিকেট টিম খেলতে গিয়ে কী রকম বিপদের মাঝে পড়ল, এই ভয়ঙ্কর পরিবেশে থেকে তাদের কী না কী হয়ে যায়। কখন তারা এই অভিশপ্ত শহর থেকে মুক্তি পাবে; নিঃশ্বাস নেয়ার যোগ্য একটি শহরের খোলা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারবে।’

দেখা যাচ্ছে, ভারতের রাষ্ট্রশক্তি যেমন তার জানের দুশমন পাকিস্তানের কাছে ‘ভয়ঙ্কর’ তেমনি ভারতের রাজধানী শহর বায়ুদূষণের দরুন ‘ভয়ঙ্কর’ হয়ে উঠেছে বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশের মানুষের চোখেও। যদি প্রকৃতির এমন দূষণ অব্যাহত থাকে, তাহলে মোদিজির ‘India First’ স্লোগান মুখ থুবড়ে পড়বে এবং এই ভারতকে Great বানানোর মোদি মিশন সফল করা কঠিন হয়ে যাবে। কিছু দিন আগেও দিল্লির বাতাস চরম দূষণের শিকার হয়ে পড়েছিল।

তখন শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট টিম ভারতে খেলতে এসে মাস্ক পরেও সামলাতে পারছিল না। তাদের কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন দূষিত বাতাসে।

আমাদের দেশে প্রতি বছর শীতকালে বাতাসে ধুলাবালু বেড়ে যায়। এতে হেমন্তকাল থেকেই বাড়তে থাকে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ- সর্দিকাশি থেকে হাঁপানি হয়ে ব্রঙ্কাইটিস পর্যন্ত। বিশেষ করে ঢাকার মতো বড় বড় শহরে বাতাস কত বেশি দূষিত আর ধূলিময়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এবারো গত কিছু দিন থেকে ঢাকার বাতাসে ধুলাবালু বাড়ছে। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তা অবিরাম টের পাচ্ছেন পথচারী, প্যাসেঞ্জার, যানবাহনের স্টাফসহ সবাই।

এ দেশের শহরগুলো কথিত উন্নয়নের জোয়ারে এবং নগরায়নের ঠেলায় দিন দিন যত বড় হচ্ছে, ততই বেড়ে যাচ্ছে এগুলোর জনজীবনের দুটি বড় সমস্যা- বায়ুদূষণ আর জলাবদ্ধতা। নগরের পথঘাট পানিতে ডুবে গেলে যখন ট্রাক-বাস ধরনের বড় কোনো যান রাস্তা দিয়ে যায়, এর ধাক্কায় বড় ঢেউ এসে দৈহিক উচ্চতা ভেদে হাঁটু, কোমর কিংবা বুক ভিজিয়ে দেয়। তেমনি পথঘাট ধুলায় ডুবে গেলে একটা গাড়ি যাওয়ার সাথে সাথে ধুলা ও ময়লায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। অনেকের নাকে মুখে চোখে এসব দূষিত পদার্থ ঢুকে পড়ে। এতে বিনাদোষেই বিষম বিব্রত ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় এ দেশের মানুষকে।

ঢাকার নীল আকাশ ধূসর ধুলায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। ঢাকার প্রকৃতি তার শ্যামল-স্বাভাবিক রূপ হারিয়ে ফেলছে। বিশেষত রাজধানীর এবং সাধারণভাবে সারা দেশের শহরাঞ্চলের পরিবেশ-নিসর্গের এই অস্বাভাবিকতা (‘বিকৃতি’ বলাই বেশি লাগসই) সৃষ্টি হয়ে থাকে প্রতি বছর শুকনা মওসুমে। আধুনিকতার দৌরাত্ম্যে ঢাকা মহানগরী থেকে সবুজ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। মাটির সাথে পাল্লা দিয়ে অপসৃত হচ্ছে আসমানের নীল রং।

একবারের কথা বলতে হয় বিশেষভাবে। সে বছর মাঘ মাস থেকে একটানা কয়েক মাসের প্রচণ্ড গরম ও খরা। লাখ লাখ ঢাকাবাসীর জীবন অতিষ্ঠ। সবাই একফোঁটা বৃষ্টির আশায় থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। সম্ভবত জ্যৈষ্ঠের শেষদিকে মফঃস্বলে যাওয়ার দরকার পড়েছিল। ইটপাথর ইস্পাত কংক্রিটের এই জটিল জঙ্গল ছেড়ে বাইরে গিয়ে মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলব- ভেবে যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। সেবার ট্রেনে টঙ্গি ছাড়িয়ে যাওয়ার পর উপলব্ধি করেছি, বাংলাদেশে আজও কিছু মায়াবী সবুজ আছে, যদিও দীর্ঘ খরায় শ্যামলী নিসর্গের বিপন্নতা সর্বত্র ছিল কম বেশি। আরেকবার রাজধানী থেকে দূরের এক জেলার একটি গ্রামে গিয়েছি পারিবারিক প্রয়োজনে। সেখানে বাড়ির পাশে ডোবায় একটা কঞ্চিতে বসে আছে মাছরাঙ্গা পাখি। সেদিন এর গায়ের বিচিত্রবর্ণের সৌন্দর্য শহুরে চোখকে শীতল করেছিল।

‘ঢাকা’ নগরীর ইতিহাস থেকে দেখা যায়, প্রাচীনকালেও এখানে শহুরে জনপদ ছিল। তখনো বুড়িগঙ্গা ‘বুড়ি’ হয়ে যায়নি বলে ব্যস্ত বাণিজ্য ও বন্দর নদীটির যৌবনের সাক্ষ্য দিচ্ছিল। ঢাকার নামকরণের কারণ সম্পর্কে সর্বসম্মত কোনো অভিমত নেই। কেউ বলেন, ‘ঢক্কা’ গাছের আধিক্য, কারো মতে ঢাকেশ্বরী দেবীর মন্দির থাকা, কেউ কেউ মনে করেন, ঢাকের আওয়াজের সিমাসরহদ, ইত্যাদির ভিত্তিতে শহরটা ‘ঢাকা’ নাম পেয়েছে।
নিজে শৈশবে মফঃস্বলে বাস করে ভাবতাম, ঢাকা শহরের মাটির রং আলাদা; বহু দিন ঢেকে রাখলে যেমন ঘাসের বর্ণও বদলে যায়। বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, ঢাকা নগরী বর্ষায় পানিতে আর শুকনা দিনে ধুলায় ঢাকা থাকে। এই পানি আর ধুলা, কোনোটাই স্বস্তিকর নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর এক কবি লিখেছিলেন ঢাকাকে ব্যঙ্গ করে। তিনি রাঢ় বঙ্গের উন্নাসিক ব্যক্তি। তাই ‘কাক-কুকুর নেড়ে,/এই তিনে ঢাকা বেড়ে’ লিখতে তার বাঁধেনি। স্মর্তব্য, তখন অনেকের মাথা ধর্মীয় কারণে ন্যাড়া থাকত বলে সাধারণত মুসলমানদের ‘নেড়ে’ বলে ঠাট্টা করা হতো। যা হোক, এখনকার দশা দেখলে সেই কবিপুরুষ হয়তো লিখতেন, ‘ধোঁয়া-ধুলা-কাদা,/ঢাকায় বড় বাধা।’

ক্রিকেটের কথায় ফিরে যাই। এবার না হয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা দিল্লির বায়ুদূষণ থেকে কোনোমতে রক্ষা পেলেন; কিন্তু ভবিষ্যতে? ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে ক্রিকেট খেলার আমন্ত্রণ জানাবার আগে সে কথা মনে রেখে সিডিউল বানানো উচিত। না হয়, সৌরভ গাঙ্গুলীরা কোনো দেশের কর্তাকর্ত্রীদের শত পদের খাবার খাইয়েও গৌরবের অধিকারী নাও হতে পারেন।

পাদটীকা : বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক বায়ুদূষিত তিন রাজধানীর তিনটিই এশিয়া মহাদেশে। এগুলো হচ্ছে, ভারতের নয়াদিল্লি, চীনের বেইজিং আর ইরানের তেহরান। ভারত ও চীন- হিমালয়ের দু’পাশের দেশ দু’টির সম্পর্ক যতই ‘বাঘে-মোষে’ হোক না কেন, অন্তত বায়ুদূষণের বেলায় এই ব্যাঘ্র ও মহিষের মিল এত বেশি যে, সে প্রবাদ বাক্যটিই প্রমাণিত হয়, ‘বাঘেমোষে এক ঘাটে পানি খায়।’

খ. দিল্লির বায়ুদূষণ কোন পর্যায়ে, এর সর্বশেষ প্রমাণ গত বৃহস্পতিবার সেখানে প্যানাসনিক ওপেনের গলফ খেলার দৃশ্য। খেলার চেয়ে দূষণ ছিল আলোচনার বড় বিষয়। বাংলাদেশের সিদ্দিকুর রহমানসমেত বেশ ক’জন মাস্ক পরে গলফ খেলার ছবি সেদিন মুহূর্তের মাঝেই ভাইরাল হয়ে গেছে। ধোঁয়াটে অবস্থার কারণে খেলা ৪ ঘণ্টা বিলম্বে শুরু করতে হলো।

 


আরো সংবাদ