২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

‘মজনু’ সমাচার ও রাষ্ট্রের দায়

দেশে ধর্ষণের মচ্ছব চলছে। রেহাই পাচ্ছে না কোনো শ্রেণী, পেশা ও বয়সের নারীরা। এমনকি এই পাশবিক নির্মমতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশুরাও। যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে সেখানেই নরপশুরা কথিত পৌরুষের পাশবিকতা চরিতার্থ করছে। সম্প্রতি ঢাকার কুর্মিটোলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পর সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেফতারও করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে গ্রেফতার এই ব্যক্তিকে নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। আটক ব্যক্তি প্রকৃত ধর্ষক কি না, সে সন্দেহ করছেন অনেকেই। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার কারণেই এই বিতর্কের ডালপালা গজিয়েছে। কারণ, অতীতে এ ধরনের অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাও ঘটেছে। আর বিতর্কটা শুরু হয়েছে সে সূত্র ধরেই। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করছে, সরকারকে বিব্রত করতেই এই ইস্যুতে অনাকাক্সিক্ষতভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে এই বিষের বড়িও গিলতে রাজি হচ্ছেন না অনেকেই। কারণ, একটি ধর্ষণের ঘটনায় বিব্রত করা যাবে সরকারকে, এমন দৈন্যদশায় সরকার আছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।

কুর্মিটোলায় ছাত্রী ধর্ষণের পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মুখে র‌্যাব ‘মজনু’ নামে এক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে। র‌্যাবের দাবি, ধর্ষণের শিকার সেই ছাত্রীকে ছবি দেখিয়ে গ্রেফতার এই ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। সন্দেহকাতররা বলছেন, ধর্ষণের শিকার ছাত্রীকে উদ্ধৃত করে অভিযুক্ত সম্পর্কে অনেক বর্ণনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সেসব তথ্য-উপাত্তের সাথে গ্রেফতার ব্যক্তিকে কোনোভাবেই মেলানো যাচ্ছে না। দাবি করা হচ্ছে, অতীতে বিভিন্ন মামলায় আসল অপরাধীকে না ধরে অন্য নিরপরাধ ব্যক্তিকে গ্রেফতারের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে আমাদের দেশে। আর সে জন্যই সম্প্রতি ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতারকৃতকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার অনাকাক্সিক্ষতভাবে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সন্দেহবাদীদের দাবি, অভিযুক্ত না হয়েও ‘জাহালম’ নামের এক ব্যক্তিকে একটি মামলায় দীর্ঘদিন কারাভোগ করতে হয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে পুলিশ পেটানোর অভিযোগে। এ রকম উদাহরণ তো আরো আছে আমাদের দেশে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেয়েটির যে বক্তব্য পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে, সেখানে দাম্ভিক ব্যক্তির কথা এসেছে। কিন্তু গ্রেফতার মজনু মিয়ার সাথে তার কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এখানেই সন্দেহটা দানা বেঁধে উঠেছে। মূলত যেকোনো ধর্ষণের ঘটনায় ধরে নেয়া হয় যে, অভিযুক্ত সুঠাম দেহী ও শারীরিকভাবে সক্ষম ব্যক্তি। আর এমন দাবির যৌক্তিকতাও একেবারে উপেক্ষা করার মতো নয়। কারণ, শারীরিক প্রতিবন্ধীর বিরুদ্ধে পুলিশ পেটানোর অভিযোগ যেমন অবিশ্বাস্য, ঠিক তেমনিভাবে দুর্বল, ভগ্নস্বাস্থ্যের অধিকারীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগও অগ্রহণযোগ্য। আর অপরাধ সঙ্ঘটনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সেই অপরাধ করার ক্ষেত্রে সক্ষম কি না, সেটাও অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষে বলা হচ্ছে, অতীতে আসল অভিযুক্ত ধরা না পড়ার অনেক ঘটনা, উদাহরণ রয়েছে। মূলত ধর্ষণ মামলায় অল্প সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার ঘটনা হাতেগোনা এবং সেটিই এখন সন্দেহ সৃষ্টি করছে। এমন দাবিও করছেন কেউ কেউ।
মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইনের ভঙ্গুর প্রয়োগ এবং ক্ষেত্রবিশেষে অপপ্রয়োগের কারণেই দেশে ধর্ষণ, নারী নিগ্রহসহ অপরাধপ্রবণতা প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। কঠোর আইন, গণসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা এবং উচ্চ আদালতের নানাবিধ নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণের পরও থেমে নেই এসব অপরাধপ্রবণতা। বিভিন্ন সূত্রের পরিসংখ্যান থেকে সে ভয়াবহ চিত্রই আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আসক) দেয়া তথ্যমতে, শুধু ২০১৯ সালেই এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন নারী। ২০১৯ সালে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন নারী। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৭০ জন।

আর এই পাশবিক যৌন নিপীড়ন থেকে রেহাই পায়নি নারীত্বের বহিঃপ্রকাশহীন শিশুরাও। প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিদায়ী ২০১৯ সালে ৯০২ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩৫৬। শুধু ধর্ষণই নয়, ২০১৯ সালে যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুর সংখ্যাও বেড়েছে আগের বছরের তুলনায়। গত বছর যেখানে ৯৩ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, সেখানে ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৭। সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এই ভয়াবহ চিত্রই তুলে ধরেছে বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।

মূলত অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া ও আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে দেশে যৌন হয়রানি এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পাচ্ছে। রাজধানীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা তার প্রমাণ।

নারীর সম্ভ্রমসহ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই রাষ্ট্রকেই ধর্ষণবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেমন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই নীতি গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কিন্তু শুধু নীতি গ্রহণ করলেই চলবে না বরং তার যথাযথ বাস্তবায়নও জরুরি। অন্যথায় ২০১৯ সালে সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা যেমন ২০১৮ সালের চেয়ে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, তেমনি ২০১৯ সালের চেয়ে ২০২০ সাল বা আগামী দিনগুলোতে এ ধরনের ঘটনা আরো বহুগুণ বেড়ে গেলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না বরং তা আমাদের অনিবার্য নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে হবে।

নারী ধর্ষণ আমাদের দেশে অভিনব কোনো ঘটনা নয়। এর আগে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের সেঞ্চুরি অনুষ্ঠানও হয়েছে। অপরাধীর বিচার হয়নি বরং সংশ্লিষ্ট অপরাধীকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। অথচ দেশের সরকার ও বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের অবস্থান। তা সত্ত্বেও ধর্ষণকারীদের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক।

যৌন নিপীড়নের ঘটনার মামলা আদালতে পরিচালনাকারী আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিজ্ঞতা মতে, ধর্ষণ মামলায় ৩ থেকে ৪ শতাংশের শেষ পর্যন্ত সাজা হয়। অথচ আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে এসব মামলা শেষ করার কথা থাকলেও তা গড়ায় বছরের পর বছর পর্যন্ত। এমন পরিস্থিতিতে ধর্ষণ বাড়াটাই স্বাভাবিক। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, বরং ধর্ষণ সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। এ জন্য বিদ্যমান আইনের সংস্কার এবং তা দ্রæত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঢেলে সাজানোসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থায় গ্রহণ করতে হবে রাষ্ট্রকে। আর মজনুর মতো সন্দেহভাজনদের ধর্ষকদের নিয়ে যাতে আগামী দিনে কেউ অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিব্রত করতে না পারে সে পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবে ততই মঙ্গল।

[email protected]


আরো সংবাদ