২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ভারতে মানবতার জয়কে সমর্থন দিতে হবে

-

নতুন নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে ভারতজুড়ে এখন আন্দোলন চলছে। দেশটির সরকারও নানাভাবে চেষ্টা করছে এই আন্দোলন দমন করার। এই আইন যে বিশেষ করে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করা বা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করতে প্রণয়ন করা হয়েছে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ খুব কম। উত্তরপ্রদেশসহ বিভিন্ন স্থানে বেছে বেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর নিরাপত্তাবাহিনীর নির্যাতনের খবর প্রতিদিনই সাংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এসবের মধ্যে যে বিষয়টি আমাকে আশাবাদী করে তাহলো সভ্যতা থেকে মানবতা ও মুনষ্যত্ব একেবারে বিলুপ্ত হয়নি। কারণ আইনটির প্রতিবাদে মুসলমানদের পাশাপাশি আজ হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীও মাঠে নেমেছেন। সর্বস্তরের মানুষ আজ মুসলমানদের পাশে।

ভারতকে আমি মনে করি, মানবজাতির একটি মহামিলনের উৎস হিসেবে। এখানে অনেক সভ্যতার মিলন ঘটেছে। এত বৈচিত্র্যপূর্ণ জাতি, ভাষাভাষী ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমাবেশ বিশ্বে আর কোন দেশের ক্ষেত্রে ঘটেনি। নাগরিকত্ব আইনের মতো কিছু করে এই মিলনমেলা বিনষ্ট করা ঠিক হবে না। এতে ভারত ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। সেটি অনুধাবন করেই দেশটির সব শ্রেণীর মানুষ এই আইনের বিরোধিতা করছেন। বলিউডের নায়ক-নায়িকাদের মতো রাজনীতি-নির্লিপ্ত লোকজন রাস্তায় নেমে সোচ্চার হয়েছেন আইনটির বিরুদ্ধে। দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী-পুলিশ সংঘর্ষের পর এক অভিনেত্রী তাপসী পান্নু বলেন, ‘জামিয়ায় যা দেখেছি তা মোটেও মেনে নেয়া যায় না। আমার মনে হচ্ছে, বড় কিছু ঘটেছে বা বড় কিছু ঘটতে চলেছে।’ আরেক অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক দেশে প্রত্যেকেরই মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। এ জন্য সহিংসতার শিকার হওয়া পুরোপুরি অন্যায়। প্রত্যেকটি কণ্ঠস্বর গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোই ভারতকে বদলে দেবে।’ অভিনেতা অক্ষয় কুমার সিএএ ঘিরে হিংসার নিন্দা করে বলেন, ‘আমি হিংস্রতা পছন্দ করি না, সেটা যে দিকই হোক না কেন। হিংসা ছড়াবেন না। দূরে থাকুন।’ আমার এখানে বলিউড তারকাদের কিছু বক্তব্য তুলে ধরার কারণ হলো সমাজে সাধারণ মানুষের ওপর যাদের প্রভাব বেশি থাকে অভিনয় শিল্পীরা সেই শ্রেণীর মানুষ। কিন্তু এরা সাধারণত রাজনৈতিক কোনো ইস্যুতে মুখ খুলতে চান না। তাদের সোচ্চার হওয়ার মানে নাগরিকত্ব ইস্যুটি সবাইকে ছুঁয়ে গেছে। এরা কিন্তু সবাই মুসলিম নয়। কিন্তু তাদের কথা থেকে বোঝা যায় ভারতে মানবতা একেবারে লোপ পায়নি। একে আমরা সাধুবাদ জানাই।

অমর্ত্য সেনের মতো অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে এমন কোন শ্রেণী-পেশার মানুষ নেই যারা যারা আজ বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব আইনটির বিরুদ্ধে দাঁড়াননি। তারা কিন্তু ধর্মের কিছু বলছেন না, তারা মনুষ্যত্ববোধ ও মানবতার কথা বলছেন। সিসিএ একটি সামাজিক দুর্যোগ সৃষ্টি করেছে। এই দুর্যোগের বিরুদ্ধে সেখানে যে কণ্ঠগুলো আজ উচ্চকিত আমাদের উচিত হবে সেগুলোকে সমর্থন দেয়া, সাধুবাদ জানানো। কেরালায় একজন তো তথ্যাধিকার আইনে মোদির নাগরিকত্ব জানতে আবেদন করেছেন। মুকেশ আম্বানির মতো ধনকুবেরও সিএএ’র বিরুদ্ধে কথা বলছেন। অথচ ভারতের নেতাদের উচিত ছিল এসব বিভেদ সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ইস্যুগুলো দূরে সরিয়ে রেখে সমাজে যে আসল সমস্যাগুলো রয়েছে : ক্ষুধা, দারিদ্র্য, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, শিশুশ্রম, পরিবেশ দূষণ- এগুলো দূর করার দিকে নজর দেয়া।

অনেক সামাজিক সূচকে ভারত আজ বাংলাদেশের চেয়েও পিছিয়ে পড়েছে। তারা প্রতিরক্ষা খাতে ক্রমাগত খরচ বাড়িয়ে চলেছে। এসব করে হয়তো সাময়িক রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা যায় কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কোনো কল্যাণ লাভ হয় না। এই ফায়দা কতটা ক্ষণস্থায়ী সেই প্রমাণও দিয়েছেন ভারতের জনগণ। লোকসভায় বিপুল বিজয় লাভ করার পর ছয় মাসের মধ্যেই বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল হারতে শুরু করেছে। ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পেছনে কারণ এটাই বলে আমি মনে করি। মানুষ যখন অশান্তি দেখে তখন বিনিয়োগ করতে ভয় পায়। আর বিনিয়োগ না হলে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না। ভারতের মুসলমানদের সংখ্যা ২০ কোটির ওপরে। মুসলিম জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র হলো ভারত। এমন একটি বিশাল জনশক্তিকে পেছনে ঠেলে দিয়ে উন্নয়ন হবে না। তারা একটি প্রতিরোধক শক্তি তৈরি করতে বাধ্য হবে। ভারতের এই আচরণের ঢেউ শুধু পাকিস্তান, বাংলাদেশ বা আফগানিস্তানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই বিপুল মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে বৈষম্য করার মানে হলো বিশ্বের ১৯০ কোটি মানুষের সাথে বৈষম্য করা।

একটি দেশের উন্নয়নের জন্য তার প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্কটিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের নতুন আইনে যে তিনটি দেশকে টার্গেট করা হয়েছে তার একটি হলো বাংলাদেশ, যে দেশের সাথে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। অন্য দু’টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের সাথে শুধু সীমান্ত রয়েছে। আফগানিস্তানের সাথে নেই। বাংলাদেশ এমন একটি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে যা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সাথে ভারতের সংযোগ স্থাপনে ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক রাখা ভারতের জন্য অনেক বেশি জরুরি। ভারতের ক্ষমতাসীনরা দাবি করে আসছেন যে, বাংলাদেশের সাথে তাদের সুসম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিরাজ করছে। কিন্তু ভারতে হিংসার রাজনীতির কারণেই সেই সুসম্পর্কে ফাটলের আলামত দেখা দিয়েছে। এমনকি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলতে শুরু করেছেন যে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনটি অপ্রয়োজনীয় ছিল। কেন এটি করা হয়েছে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। এর আগে আমাদের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ভারত সফর বাতিল করেছেন। নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যে যা-ই দাবি করুন না কেন, বাংলাদেশের মানুষ যে ভারতের এসব কর্মকাণ্ডে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে তা কারো অজানা নয়।

ভারতের সুধী সমাজ মুসলমানদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এটা আসলে মমত্ববোধ ও মানুষের ভালোবাসার জয়। সভ্যতার জয়। আজ মনুষ্যত্ব ও মানবতাযদি হারিয়ে যায় তাহলে সমাজে কিছুই থাকবে না। আর সে কারণেই মোদি সরকারের হিন্দুত্ববাদী নীতির প্রতিবাদে রাষ্ট্রীয় পদক বর্জন করতেও আমরা দেখেছি। মুসলমানদের পক্ষে তারা কথা বলছেন। একটি দলের হিংসাত্মক রাজনীতি মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এটা একটি শুভ লক্ষণ। আমি ভেবেছিলাম ভারতে সভ্যতার মহামিলন না জানি শেষ হয়ে গেল। কিন্তু এসব ঘটনায় আমি অন্ধকারের মধ্যেও আলো দেখতে পাচ্ছি। মানব সভ্যতাকে রক্ষার জন্যই ভারতের এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে রক্ষা করা প্রয়োজন।

ঘৃণার রাজনীতি করে কি ভারতের কোনো লাভ হবে? কয়জন মুসলমানকে ভারত থেকে বিতাড়িত করা যাবে? ২০ কোটি মুসলমানকে ভারত থেকে তাড়ানোর ভাবনা সুস্থ মস্তিষ্কের কোনো ভাবনা নয়। ‘পিউ রিসার্চে’র গবেষণা উল্লেখ করে আমার আরেক লেখায় আমি বলেছি যে, এই শতাব্দী হবে মুসলমানের। আর কয়েক দশক পরেই মুসলমানরা হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী। সংখ্যায় বৃদ্ধিতে ভারতের মুসলমানরাও পিছিয়ে থাকবে না। হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা কমবে। মোদি এখন যা করছেন তা ওই বিলুপ্তিকে ত্বরান্বিত করছে কি না আমার মনে জাগে সেই সন্দেহ। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে প্রাকৃতিক নিয়মেই হিন্দু ধর্মের বিলুপ্তি ঘটবে। যে হারে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে তা বিবেচনায় নিয়ে সুদূরপ্রসারী কল্পনা করলেও তা অনায়াসে বলা যায়। একে সতর্কতা বাণী হিসেবে গ্রহণ করা উচিত হবে ভারতের। ইতিহাসে যারা ডুবে গেছে তারা কখনো ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেননি। মধ্য যুগের পর মুসলমানরা পিছিয়ে পড়লেও ১৯৬০’র দশক থেকে মুসলিম বিশ্বের যে পুনর্জাগরণ শুরু হয়েছে তা অভাবনীয়। তাদের মধ্যে অনেক দ্বন্দ্ব রয়েছে। যদিও এসব দ্বন্দ্ব পশ্চিমা বিশ্বের ষড়যন্ত্রের ফসল বলে অনেক মনে করেন। কিন্তু কেউ চাক বা না চাক মুসলমানদের এই জাগরণকে ঠেকানো যাবে না। তাই ইতিহাসকে সামনে রেখে ভারতের নেতাদের এগিয়ে চলা উচিত হবে।

আমি বলব রাজনীতি জ্ঞানভিত্তিক হওয়া উচিত। যারা সমাজ নিয়ে চিন্তা করেন, যারা মানুষের জন্য চিন্তা করেন তারা ইতিহাসের অনিবার্য ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করেন না। কারণ তারা জানেন এমনটা করা হলে তা হবে ঐতিহাসিক মহা অপরাধ। এই মহা অপরাধের কাজটি করছেন আজকের ভারতীয় নেতারা। অথচ তাদের উচিত ছিল খেটে খাওয়া মানুষ কিভাবে সস্তায় জীবন ধারণ করতে পারে সে দিকে নজর দেয়া। প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। তবে সেই সহযোগিতা হতে হবে দ্বিমুখী। শুধু নেয়ার মানসিকতা থাকলে সম্পর্ক বেশি দূর এগোবে না। ভারতের স্বার্থেই প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। ভারতের দুই দিকে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দু’টি রাষ্ট্রÑ পাকিস্তান ও চীন। কিন্তু তাদের সাথে বৈরিতা জিইয়ে রাখলে ভারতের লাভ নেই। ভারত কি পারবে পারমাণবিক অস্ত্রধারী এসব রাষ্ট্রকে পদানত করতে? আবার আধিপত্য বিস্তারের আশায় অস্ত্রভাণ্ডার বড় করে চললে উন্নয়নই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ভারত একটি বড় দেশ। তাই বদান্যতা তো তাকেই দেখাতে হবে। বড়রা বদান্যতা দেখায়, ছোটরা নয়। ছোটরা দেখাতে গেলে সেটি হবে দুর্বলতা। বড়রা ছাড় দিলে সেখানে মহানুভবতার প্রকাশ পায়। আর ছোট ছাড় দিলে তার দুর্বলতা প্রকাশ পায়। কেউই তার দুর্বলতাকে প্রকাশ করতে চাইবে না। সিএএ নিয়ে ভবিষ্যতে দুর্যোগের আশঙ্কা করছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ। নেপালের গুর্খারা আতঙ্কে রয়েছে। শ্রীলঙ্কার তামিলরা বৈষম্য হিসেবে দেখছে।

কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় বসে থাকা ছাড়াও বাংলাদেশের একটি বিশাল বাজার রয়েছে। এ দেশের মানুষ বিগড়ে গেলে, ভারতের আধিপত্যবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে সেটি নয়া দিল্লির স্বার্থের অনুকূলে যাবে না। দেয়ালে ঠেকে গেলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোকে যদি বাংলাদেশ পরোক্ষভাবেও সহযোগিতা করে সেটি কি ভারতের জন্য ভালো হবে? সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাব দেখিয়ে বাংলাদেশ সেটি করছে না। বরং এ ক্ষেত্রে বড় প্রতিবেশী দেশটির প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতেরও এর প্রতিদান দেয়া উচিত হবে।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড; সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, জেদ্দা
[email protected]


আরো সংবাদ