১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

মুসলিম বিশ্ব ও ইসলামের কাজ : আনোয়ার ইব্রাহিমের বক্তব্য

-

আনোয়ার ইব্রাহিমকে আমরা সবাই জানি। তিনি মালয়েশিয়া সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের পর একসময় উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সামনে তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। তিনি বিশ্বব্যাপী ছড়ানো ইসলামী সংগঠন ইনটারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থটের (আইআইআইটি) সভাপতি। তিনি কিছু দিন আগে আইআইআইটির ৪০তম বর্ষ পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে একটি মূল্যবান বক্তব্য দিয়েছেন। সে বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমি মনে করি তার এ বক্তব্য ইসলামের কাজের জন্য সবাইকে উৎসাহিত করবে। নিচে তার বক্তব্যটি দেয়া হলো।

‘প্রিয় সম্মানিত সহকর্মীবৃন্দ, আইআইআইটির ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বার্তা-
আজ আমরা একটি নতুন বর্ষ এবং নতুন একটি শতাব্দী শুরু করতে যাচ্ছি, যখন আইআইআইটি তার ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে। এটি প্রকৃতপক্ষে একটি ঐতিহাসিক সাফল্য এবং আমি আপনাদের সবার সাথে এর প্রতিষ্ঠাতাদের ঐতিহ্য ও স্বপ্নের বাস্তবায়নে সম্পর্কিত এবং এর জন্য কাজ করতে পেরে গৌরবান্বিত ও সম্মানিত বোধ করছি।

মুসলিম বিশ্ব অথবা আবদুল হামিদ আবু সুলাইমানের ভাষায়, মুসলিম মানস-আজ বিভিন্নভাবে বিক্ষিপ্ত। ঐতিহ্যগতভাবে এক রজ্জুবন্ধনে জড়িত মুসলিমরা আমাদের সময়কার বড় বড় চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করার সাথে সাথে আধুনিকতা আর উত্তর-আধুনিকতার বিপরীতে নির্ভরযোগ্য প্রতিক্রিয়ার তালাশ করছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলার জন্য আইআইআইটি উদ্ভাবনী চিন্তার খোরাক জোগানোর ক্ষেত্রে সর্বদাই কাজ করে আসছে এবং ভবিষ্যতেও করতে থাকবে। আইআইআইটির টিমের সদস্য হিসেবে ওই কর্মপ্রচেষ্টা চালু রাখাই আমাদের অঙ্গীকার।

আমরা ভাগ্যবান যে, চারটি দশকের মাথায় এসে আমাদের ভবিষ্যতের সাফল্যের ভিত্তিপ্রস্তর সঠিক স্থানেই গাঁথা হয়েছে। আমরা বিশ্বব্যাপী আস্থাযোগ্য, বহুমাত্রিক মুসলিম পণ্ডিতদের একটি মজবুত নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছি এবং একাডেমিক, ব্যবসা, পাবলিক সার্ভিস ও সিভিল সোসাইটির এক নতুন প্রজন্মের পণ্ডিত ও নেতৃবৃন্দকে প্রশিক্ষণ দিতে সহায়তা দিয়েছি। আমাদের দুনিয়াজোড়া স্বল্পসংখ্যক ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানের অন্যতম মনে করা হয়, যারা বহুমাত্রিক মতামতের জন্য খোলা মন ও মতামত গ্রহণকারী এবং যুক্তিপূর্ণ সংলাপের জন্য সুযোগদানে প্রস্তুত হিসেবে বিবেচিত।

কিন্তু এখন আত্মতুষ্টির সময় নয়। ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানানো প্রকৃতপক্ষে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাবাহিকতার অবিভাজ্য অংশ। কিন্তু এটিকে অন্ধ অনুকরণের সাথে মিলিয়ে দেখা যায় না, যাতে করে সেটি আমাদেরকে মুসলিম সমাজ এবং গোটা দুনিয়া বর্তমানে যেসব সমস্যা নিয়ে চিন্তিত, সে দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সেগুলোর সমাধানের পথ খুঁজতে নিরুৎসাহিত করে।

আজ আমরা এক বংশানুক্রমিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যাতে রয়েছে প্রশাসনের ভেঙে পড়া দশা, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার অভাব এবং পরিবেশগত সঙ্কট, যা আমরা জানি এই গ্রহের উপরের জীবনকে পরিবর্তনের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব দশকের পর দশক ধরে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, রাজনৈতিক দমনপীড়ন এবং বৈদেশিক হস্তক্ষেপের শিকার হয়ে আসছে।

মুসলিম সমাজগুলো দারিদ্র্য, শিক্ষার ক্ষেত্রে দৈন্যে জর্জরিত, তারা ধর্মীয় বাড়াবাড়ি ও বিপথগামী মতবাদের বিস্তারে সহায়ক হয়ে পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে কার্যকর মুসলিম সমাজ, প্রতিষ্ঠান, যোগ্য নেতৃত্ব এবং সঙ্কটকালীন পাণ্ডিত্যের অবর্তমানে সৃষ্টিকর্তায় সন্দেহ ও অবিশ্বাস এবং ধর্মত্যাগ উম্মাহর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।

সংক্ষেপে বলা যায়, আইআইআইটির শুরুর দিকে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে, তা আগের মতোই রয়ে গেছে মনে হবে। কিন্তু দুনিয়ায় বড় রকমের পরিবর্তন ঘটে গেছে। আমাদের এখন এমন এক অস্বাভাবিক দুনিয়াকে নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে যা অতিমাত্রায় আরো জটিল, গোলমেলে এবং এমনকি পরস্পরবিরোধী।

সামনের দিকে চলতে গিয়ে আমাদের চিন্তা এবং পদক্ষেপে সৃজনশীল এবং সাহসী হতে হবে। প্রয়োগধর্মিতা ও প্রভাবকে সম্প্রসারণ করতে হলে আইআইআইটিকে নিজের অবস্থানকে পুনঃস্থাপন করতে হবে, শুধু ঐতিহ্যের নীরব বাহক হিসেবে নয়, বরং উম্মাহ এবং মানবজাতির এসব চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করার উপযোগী উদীয়মান এবং উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন পণ্ডিত ও চিন্তাশীলদের একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে জেগে উঠতে হবে।

প্রত্যাশা করি না যে, আমরা এই কাজ কিভাবে করতে হবে, তা জেনে নিয়েছি। আমরা চাই যে, আপনারা আগামী বছরে শিক্ষা ও পরিবর্তনের একটি পর্যায়ে প্রবেশ করবেন, যাতে আমরা আরো শক্তিশালী এবং আমাদের মিশন বাস্তবায়নে যোগ্যতর হয়ে উঠে দাঁড়াব।

আমরা আমাদের কর্মকৌশলের কেন্দ্র হিসেবে জ্ঞানকে সুসংহতকরণের ওপর জোর দিয়েছি। যাতে তার শাখা-প্রশাখাকে এক কেন্দ্রে নিয়ে আসা যায় এবং আইআইআইটিকে জ্ঞান ও উদ্ভাবনী চিন্তার উৎস হিসেবে মানবতার কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। এ ব্যাপারে সাফল্যের জন্য আমার সহকর্মীদেরকে সাদাসিধা, রুটিনমাফিক কার্য সম্পাদনের গণ্ডি ভেদ করার, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্ভাবনী যোগ্যতা, বলিষ্ঠতা আর আমাদের মিশনের প্রতি আবেগপূর্ণ উৎসাহ সহকারে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ প্রদান করছি।

চার দশক ধরে আইআইআইটি জ্ঞান ও সত্যের সন্ধানে নিবেদিত এবং সব ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নিয়োজিত ছিল। আমি জানি, এত বছর আগে আইআইআইটির প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে এর মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রতিষ্ঠাতাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তারই প্রতিধ্বনি করেছি; আর তা-ই আজো যথাযথ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রয়ে গেছে।

তাদের লক্ষ্যের বাস্তবায়নে এবং পৃথিবীটাকে আরো ন্যায় ও মানবতাপূর্ণ করে তোলার জন্য আপনাদের সমর্থন, উৎসাহ উদ্দীপনা এবং অবদানকে স্বাগত জানাই।
ধন্যবাদ।
আপনাদেরই একান্ত,
আনোয়ার ইব্রাহিম

আশা করি পাঠকরা আনোয়ার ইব্রাহিমের বক্তব্য জেনে উপকৃত হবেন এবং ভবিষ্যতে আমাদের কী করতে হবে তার দিশা পাবেন।

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার


আরো সংবাদ

শরীয়তপুরে স্বামী-স্ত্রী হত্যা মামলায় পাঁচজনের যাবজ্জীবন বগুড়ায় বাস-অটোরিকশা সংঘর্ষে দুজন নিহত রাঙ্গামাটিতে ট্রাক্টর উল্টে চালক নিহত ‘শহীদ দিবসে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা নেই’ শাজাহান খানের ভাড়াটে শ্রমিকরা এবার মাঠে নামলে খবর আছে : ভিপি নুর লেখাপড়ার পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা করতে হবে : ড. গাজী হাসান জনগণ কচুরিপানা খাবে না, মন্ত্রীরা খাওয়ায়েই ছাড়বে : রাশেদ ট্রাম্পের নাকে যমুনার দুর্গন্ধ না যেতে ছাড়া হল ৫০০ কিউসেক পানি দুর্ধর্ষ তানজিদ, দুর্দান্ত আল-আমিন রাতারাতি বিদেশি! নাগরিকত্ব পেতে সব হারিয়ে একাকি লড়ছেন জাবেদা কোন দেশে কতজন করোনায় আক্রান্ত?

সকল