২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

‘আখলাক হত্যা মামলার তদন্তের কারণেই খুন পুলিশ কর্মকর্তা’

নিহত পুলিশ ইনস্পেক্টর সুবোধ কুমার সিং - ছবি : সংগ্রহ

উত্তর ভারতের বুলন্দশহরে গোরক্ষক বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়া পুলিশ ইনস্পেক্টর সুবোধ কুমার সিং কোনও গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার কি না, সেই প্রশ্ন এখন ধীরে ধীরে উঠতে শুরু করেছে।

বাড়িতে গরুর মাংস রেখেছেন, এই অভিযোগে প্রায় সোয়া তিন বছর আগে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে মোহাম্মদ আখলাক নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে মারা হয়েছিল। গরু বাঁচানোর নামে ভারতের নানা প্রান্তে গত কয়েক বছর ধরে যে মুসলিমদের পিটিয়ে মারার হিড়িক পড়েছে, সেই তালিকায় প্রথম সাড়া জাগানো নাম ছিল মোহাম্মদ আখলাকের।

সেই হত্যা মামলায় অন্যতম তদন্তকারী কর্মকর্তা (ইনভেস্টিগেটিং অফিসার) ছিলেন সুবোধ কুমার সিং, রাজ্য পুলিশের চাকরিতে যিনি তখন ওই অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন। সোমবার বুলন্দশহরে মারমুখী জনতা তাকে গুলি করে ও পিটিয়ে নৃশংসভাবে খুন করার পর তার পরিবারের অনেকেই সন্দেহ করছেন, ওই মামলার তদন্তের জেরেই তাকে প্রাণ দিতে হল।

নিহত মি সিংয়ের বোন সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমার ভাই আখলাক হত্যার তদন্ত করছিল বলেই পুলিশে নিজেরাই ষড়য়ন্ত্র করে তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিল।’

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে তিনি আরও বলেছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী করছেনটা কী? সারাক্ষণ তো গরু, গরু গরু ছাড়া তার মুখে কোনও কথা নেই - অথচ সেই গরুর নামেই আমার ভাইকে জীবন দিতে হল!’

সুবোধ কুমার সিংয়ের স্ত্রী পর্যন্ত কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, তার স্বামী 'পূর্বপরিকল্পিত কোনও খুনের ষড়যন্ত্রের' শিকার বলেই তিনি মনে করছেন।

মোহাম্মদ আখলাক মামলায় তদন্ত করছিলেন বলে তার বাবার ওপর যে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের চাপ আসত, মঙ্গলবার সুবোধ সিংয়ের বড় ছেলেও সে কথা ক্যামেরার সামনে বলেছিলেন। আর শুধু পরিবারের সদস্যরাই নন - উত্তরপ্রদেশে বিজেপি মন্ত্রিসভার সদস্য রাজভর সিং পর্যন্ত বলেছেন তিনিও মনে করছেন সুবোধ কুমার সিংকে ষড়যন্ত্র করেই হত্যা করা হয়েছে।

সরাসরি বিভিন্ন কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের দিকে আঙুল তুলে রাজভর সিং বলেছেন, ‘বুলন্দশহরে যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে তা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল ও আরএসএসের লোকজন ষড়যন্ত্র করেই ঘটিয়েছে বলে আমি নিশ্চিত।’

বিরোধী দলগুলিরও সন্দেহ, মোহাম্মদ আখলাক মামলার তদন্তে অভিযুক্তদের ছাড় দিতে রাজি হচ্ছিলেন না বলেই কোনও কোনও মহল সুবোধ কুমার সিংকে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। নয়তো কথিত গো-হত্যার বিরুদ্ধে আয়োজিত একটি সাধারণ পথ অবরোধ থেকে জনতা কেন হঠাৎ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একজন নির্দিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে খুন করার জন্য ধাওয়া করবে - আপাতদৃষ্টিতে এর কোনও ব্যাখ্যা মিলছে না।

বিরোধী দল কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা ও ভারতের সাবেক আইনমন্ত্রী কপিল সিব্বালও দাবি তুলেছেন, ‘আখলাক মামলার তদন্ত করছিলেন বলেই সুবোধ কুমার সিংকে খুন করা হল কিনা, তার যথাযথ তদন্ত করতে হবে।’

২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে দিল্লির অদূরে দাদরির বিসহাডা গ্রামে মোহাম্মদ আখলাকের বাড়িতে হামলা চায় তারই প্রতিবেশীরা। ওই গ্রামবাসীদের অভিযোগ ছিল তার বাড়িতে গরুর মাংস আছে। ওই হামলায় প্রাণ হারান মোহাম্মদ আখলাক, গুরুতর জখম হন তার ছেলে। সেই হত্যার ঘটনায় অনেক গ্রামবাসী অভিযুক্ত হলেও আদালতে এখনও চূড়ান্ত চার্জশিট জমা পড়েনি।

আর এরই মধ্যে রহস্যময় পরিস্থিতিতে খুন হয়ে গেলেন মামলার অন্যতম তদন্তকারী কর্মকর্তা সুবোধ কুমার সিং।


আরো সংবাদ