১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

রোহিঙ্গা সংকট: 'ইন্ধনদাতা এনজিওগুলোর তালিকা হচ্ছে’

রোহিঙ্গা সংকট: 'ইন্ধনদাতা এনজিওগুলোর তালিকা করছে বাংলাদেশ' - ফাইল ছবি

বিশ্লেষকরা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর সরাসরি চাপ না দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা উচিত। বাংলাদেশ সরকার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত কিছু দেশি-বিদেশী এনজিও'র তালিকা করে তাদের নজরদারির আওতায় আনছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বিবিসিকে বলেছেন, রোহিঙ্গারা যাতে দেশে ফেরত না যায়, সে ব্যাপারে কিছু এনজিও ইন্ধন যোগাচ্ছে এবং সেখানে রাজনীতি করছে।

রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় এবার দ্বিতীয় দফায় গত বৃহস্পতিবার তাদের ফেরত পাঠানোর সব প্রস্তুতি নেয়ার পরও তা শুরু করা সম্ভব হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার এখন রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেয়ার কথা বলছে।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর সরাসরি চাপ না দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা উচিত। নাগরিকত্ব বা নিরাপত্তার প্রশ্নসহ দাবি-দফার মীমাংসা ছাড়া রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারে ফেরত যেতে রাজি নয়, এর পিছনে দেশি-বিদেশী কিছু এনজিও'র হাত রয়েছে এবং এসব এনজিও সেখানে রাজনীতি করছে বলে বাংলাদেশ সরকার মনে করছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমন এনজিওদের একটি তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এছাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে তাদের কিছু নেতার ব্যাপারেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, সরকার কিছু এনজিওকে নজরদারির আওতায় আনার পাশাপাশি কিছু রোহিঙ্গা নেতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন দেশি-বিদেশী কিছু এনজিও ওদের ইন্ধন যোগাচ্ছে।

`তারা প্ররোচনা দিচ্ছে যে, তাদের না যাওয়া উচিত। আমরা তাদের ওপর একটু নজরদারি করবো। কারণ তারা টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন ভঙ্গ করছে,' বলেন একে আবদুল মোমেন। ‘আর এখানে অনেক মাঝি আছেন, যারা ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের নেতা। তাদের অনেকে বিভিন্ন রকম অপকর্মে লিপ্ত আছেন, আমরা তাদের শাস্তি দেবো।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেছেন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিডিয়াগুলোকে তারা রাখাইনে গিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেবেন। 'আমরা বাকি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে বলবো, যে বাংলাদেশে এখানে সারাক্ষণ হৈ-চৈ না করে, আপনারা বরং রাখাইনে গিয়ে কাজ করেন। ওখানে পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে কি-না, সেটা দেখেন। আপনাদের মিডিয়াও রাখাইনে যাওয়া উচিত।’

কোন রাখ-ঢাক না করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিছু কঠোর পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেছেন।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রবেশে বা কোন বেসরকারি সংস্থার কর্মকাণ্ড চালানোর ক্ষেত্রে আরও কড়াকড়ি করার বিষয় সরকারের আলোচনায় রয়েছে।

প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে তালিকা ধরে রোহিঙ্গাদের যাদের সাক্ষাৎকার এখন নেয়া হয়, তাতে মূলত তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার বিষয়ে জানার চেষ্টা করা হয়। এই স্বেচ্ছ্বায় ফেরত যাওয়ার প্রশ্ন বাদ দেয়া যায় কিনা, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ে।

রোহিঙ্গাদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টির একটা চিন্তাও কর্মকর্তাদের মাঝে রয়েছে।

তবে এটি ক্ষতিকর হবে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা আইওএম এর সাবেক কর্মকর্তা আসিফ মুনির। রোহিঙ্গাদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে কোন লাভ হবে না। যেটা করতে হবে যে, মিয়ানমারের ওপর শক্ত অবস্থান নিতে হবে, তিনি বলেন। যেটা আমরা দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দেখছি না। সবসময় মিয়ানমার বলছে, কীভাবে কী করতে হবে এবং বাংলাদেশ সেভাবেই মেনে নিচ্ছে। সেখানে কৌশলের পরিবর্তন আনতে হবে।

জুলাই মাসে মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসেন শরণার্থীদের ফেরত নেবার ব্যাপারে তাদের প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সৈয়দা রোজানা রশীদ বলছিলেন, বাংলাদেশের পক্ষে বাস্তবে কঠোর কোন অবস্থান নেয়া সম্ভব হবে না বলে তিনি মনে করেন। ‘আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের যে অবস্থান, তাতে বাংলাদেশ খুব বেশি কঠোর হতে পারবে না দু'টো কারণে। এর একটা মানবিক দিক আছে, এটি মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা। আর এটা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে কোনভাবেই ইতিবাচক দেখাবে না। এটা কোন পণ্য নয় যে, ঠেলে পাঠিয়ে দিলাম।’

কূটনৈতিকভাবেই সরকারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে," বলেন সৈয়দা রোজানা রশীদ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, তারা এখনও রোহিঙ্গাদের বুঝিয়ে উদ্বুদ্ধ করে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখছেন। সেজন্য রোহিঙ্গা শিবিরের নেতাদের রাখাইনে নিয়ে পরিবেশ দেখানোর জন্য তাদের একটি প্রস্তাব রয়েছে।

বিশ্বাসটা তৈরি করার দায়-দায়িত্ব মিয়ানমারের। সেটা আমরা মিয়ানমারকে জোরালোভাবে বলবো যে, তোমাদের প্রতি তোমাদের লোকেরা এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। ইউ শুড ডু মোর। তোমাদের নিরাপত্তা দেয়ার বিষয়ে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। 

তিনি বলছেন, সেজন্য বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রস্তাব হচ্ছে, যারা ওদের নেতা অর্থাৎ শিবিরগুলোর মাঝি, তাদের রাখাইনে নিয়ে যাওয়া হোক এবং সেখানকার পরিস্থিতি দেখানো হোক।

এদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগের বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আরও কঠোর অবস্থান নেয়ার চিন্তা রয়েছে বলে কর্মকর্তারা বলছেন।


আরো সংবাদ