২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

এনআরসি প্রশ্নে নীবর কেন অমিত শাহ

অমিত শাহ
অমিত শাহ - ছবি : সংগৃহীত

গত বছর লোকসভা নির্বাচনের প্রায় আট মাস আগে যখন এনআরসির খসড়া প্রকাশিত হয়েছিল, তখন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। অবৈধ অভিবাসীদের উইপোকা হিসেবে অভিহিত করে বাংলাদেশ থেকে আসা প্রতিটি অবৈধ অভিবাসীকে চিহ্নিত করে বহিষ্কার করার হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি এমনকি ভারতের প্রতিটি রাজ্যেই এনআরসির আয়োজনের কথা বলেছিলেন। তার বেশ কয়েকজন সহকর্মীও একই ধরনের কথা বলেছিলেন।

কিন্তু গত সপ্তাহে এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ সতর্কভাবে নীরব রয়েছেন। উত্তরপূর্ব ভারতে তার বিশ্বস্ত সহকারী হিমন্ত বিশ্বশর্মা (তিনি আসামের অর্থমন্ত্রী হিসেবে কাজ করছেন) প্রকাশ্যেই এনআরসি প্রস্তুতির পদ্ধতির সমালোচনা করেছেন, নতুন কোনো পন্থায় বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করা যায় কিনা তা অনুসন্ধান করতে বলেছেন। তিনি বলেন, প্রশ্নবোধক নথিপত্র ও নাগরিকদের বিষয়গুলো অনুসন্ধান করার দায়িত্ব সীমান্ত পুলিশের আছে। তা অব্যাহত থাকবে।
মজার ব্যাপার হলো এনআরসির চূড়[ন্ত তালিকা প্রকাশের পর ওইসব লোকই এখন খুশি হয়েছে যারা এত দিন পর্যন্ত এ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিল, এর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। কারণ এটি প্রকাশের আগে মুসলিমবিরোধী ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। তাদের কাছে মনে হয়েছিল কার্যত এটি তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার একটি প্রয়াস।

এমপি ও অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই—ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি বলেন, এনআরসির মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসীর মিথটির অবসান হয়েছে। এখন কি অমিত শাত বলবেন, কোথা থেকে তিনি ৪০ লাখ অনুপ্রবেশকারীর কথা জেনেছিলেন? উল্লেখ, খসড়া এনআরসিতে ৪০ লাখ লোককে বাদ রাখা হয়েছিল। চূড়ান্ত তালিকায় এই সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সূত্রগুলোর উপর ভরসা রাখা গেলে বলা যায়, চূড়ান্ত এনআরসিতে বাদ পড়া ১৯ লাখের মধ্যে ৩৬ ভাগ তথা মাত্র সাত লাখের মতো।
এই পরিসংখ্যান বিজেপিকে নার্ভাস করে ফেলেছে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের এক মাস আগে আসাম সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়ই এনআরসি তথ্য নতুন করে যাচাই করার আবেদন জানিয়েছিল। কিন্তু প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ (তিনি প্রক্রিয়াটি তদারকি করছেন এবং এই উদ্যোগের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন তিনিই) তা গ্রহণ করেননি। সরকার এখন এ নিয়ে আবার আপিল করবে।

আসাম সরকার যে সংখ্যাটি নতুন করে যাচাই করতে চাইছে, সে কারণেও অমিত শাহ নীরব রয়েছেন। এনআরসির খসড়া তালিকা প্রকাশের এক মাস আগে আসামের পার্লামেন্টবিষয়ক মন্ত্রী চন্দ্র মোহন পাটায়ারি কিছু সংখ্যার উদ্ধৃতি দিয়ে নতুন করে যাচাই করতে বলেছিলেন তালিকাটি। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন জেলাগুলোতে বাদ পড়ার হার অনেক কম। এতে বোঝা যাচ্ছে, এনআরসিতে ভুলভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
চূড়ান্ত এনআরসি খসড়ায় মোট আবেদনকারীর ১২.১৫ ভাগ বাদ পড়েছিল। এদের মধ্যে সীমান্তবর্তী সাউথ সালমারা, ধুবরি ও করিমগঞ্জে ছিল যথাক্রমে ৭.২২ ভাগ, ৮.২৬ ভাগ, ৭.৫৭ ভাগ। এসব জেলায় প্রধানত মুসলিমদের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ছিল অস্বাভাবিক। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ধুবরিতে জনসংখ্যা বেড়েছে ২৪ ভাগ, করিমগঞ্জে ২২ ভাগ। অথচ রাজ্যের গড় জনসংখ্যা বৃদ্ধি হলো ১৬ ভাগ। আসামের বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এসব এলাকায় কম সংখ্যকের বাদ পড়াটা বিস্ময়কর নয়। তাদের মতে, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, সাবেক রাজনৈতিক বলয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় (তারা তাদেরকে ভোট ব্যাংক বিবেচনা করেছে) তারা ভারতে এসেই কাগজপত্র তৈরী করে নিয়েছে।

অন্য দিকে স্থানীয় লোকজন তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রস্তুত করার গরজ অনুভব করেনি। এ কারণেই উপজাতীয় প্রাধান্যপূর্ণ কারবি আঙলঙ (১৪.৩ ভাগ) ও তিনসুকিয়ায় (১৩.২৫) এত বেশি লোক বাদ পড়েছে।
তবে বিজেপির অন্দরমহল কিন্তু আরো যাচাইবাছাই করা হলেও এনআরসি তথ্যে ‘ইতিবাচক’ ফলাফল পাবে না বলে মনে করছে। বাস্তবে আসামে এনআরসির দাবিতে সোচ্চার অনেকেই এখন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। তারা কিন্তু শুরুতে এনআরসির এই পদ্ধতি নিয়ে কথা বলেনি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণনা করার বদলে আসামের সব লোককে তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিয়ে আবেদন করতে বলা হয়। এটা আবেদনকারীদের জন্য কঠিন বিষয় ছিল। ওই সময় এনআরসির সমর্থকেরা এটা তাদের অনুকূল হবে বলে মনে করেছিল।
ভারতের সংবিধানের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে, যে লোকের মা-বাবা বা তাদের মা-বাবা ভারতবর্ষের লোক, তিনি পাকিস্তানসহ অন্য যেকোনো এলাকা থেকে ভারতে এলে তিনি ভারতের নাগরিক বিবেচিত হবেন।
তবে এক্ষেত্রে ভারতে আসতে হবে ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাইয়ের মধ্যে। নাগরিকত্ব আইন ২০০৪ সালে সংশোধন করা হয়। এতে ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তি অন্তর্ভুক্ত করে অনুচ্ছেদ ৬এ গ্রহণ করা হয়। এতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে যারা ভারতের প্রবেশ করেছে, তাদেরকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে।

তবে আরএসএস ১৯৫১ সালকেই ভারতে প্রবেশের শেষ তারিখ হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়ে আসছিল। হিমন্ত শর্মাও ব্যক্তিগতভাবে ওই দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ২০১২ সালে আসাময়ি মুসলিম মতিউর রহমান সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন দাখিল করেছিলেন। তিনি ছিলেন বিভিন্ন জাতিগত ও আদিবাসী সংস্থার জোট অসম সম্মিলিত মহাসংস্থার (এএসএম) কার্যকরী সভাপতি। তিনি দাবি জানিয়েছিলেন যে ১৯৫১ সালই করা হোক নাগরিকত্ব প্রদানের শেষ তারিখ। ১৯৭১ সালের তারিখটি বজায় রাখা হলে তা আদিবাসী লোকজনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
এসব আইনি জটিলতার মধ্যেই অমিত শাহ তার গেম প্লান তৈরি করেছিলেন। গত বছর খসড়া এনআরসি প্রকাশিত হওয়ার পর আসাম সরকার বাদ পড়াদের নিয়ে কী করা হবে তার একটি নির্দেশিকা চায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে। বেশ কয়েকটি জটিল প্রশ্ন ছিল : এনআরসি থেকে বাদ পড়েছে, কিন্তু তাদের মালিকানায় জমি আছে তাদের কী হবে? কোনো লোক যদি সরকারি চাকরি করে তার কী হবে? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্থিতিবস্থা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়ে এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বলে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, এনআরসি থেকে বাদ পড়া লোকজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে সুবিধা ভোগ অব্যাহত রাখতে পারবে। তারা আইনি সুবিধাও পাবে তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য।
বিজেপি আশা করেছিল, এসবের মধ্যেই তারা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস করিয়ে নিতে পারবে। এতে করে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে যাওয়া হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টানদেরকে ভারতের নাগরিকত্ব প্রদান করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিলটি পাস হলে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া যেসব হিন্দু এনআরসিতে বাদ পড়েছে, তারা ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে যাবে।
কিন্তু শর্মা স্পষ্টভাবে তার বিবৃতিতে বলেছেন, ১৯৭১ সালের আগে উদ্বাস্তু হিসেবে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন করা অনেক ভারতীয় নাগরিকের নাম এনআরসিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, কারণ কর্তৃপক্ষ তাদের উদ্বাস্তু সনদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এই কাজটি হয়ে গেলে সরকার সম্ভবত বাদ পড়াদের নিয়ে তাদের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করে ফেলবে।

এ কারণেই অমিত শাহ কথাবার্তায় বেশ সাবধানতা অবলম্বন করছেন। আসামসহ পুরো উত্তরপূর্ব ভারত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেছে। তবে বিজেপি যেভাবে অনুচ্ছেদ ৩৭০ ও তিন তালাক বিলুপ্ত করেছে, তাতে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস হওয়াটাই বাস্তবতা। তার আগে পর্যন্ত এনআরসি নিয়ে সংশয়ই থেকে যাবে।
ইন্ডিয়া টুডে/এসএএম


আরো সংবাদ