২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব বিলে যা রয়েছে

ভারতে ঢোকা বাংলাদেশীদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে কোস্টগার্ড। পোর্ট ব্লেয়ার, ২০০৯ - ছবি : বিবিসি

ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা আজ সে দেশের বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল অনুমোদন করেছে - যে আইন বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু ও অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভারতের নাগরিকত্ব দেবে।

তবে বিবিসি জানতে পেরেছে, বিলটি নিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তীব্র প্রতিবাদের মুখে সেখানকার স্বশাসিত ও বিশেষ সুরক্ষাপ্রাপ্ত এলাকাগুলোকে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

আর নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘কাট-অফ ডেট’ ধরা হয়েছে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর - অর্থাৎ ওই তারিখের মধ্যে ভারতে এলে তবেই তারা ভারতের নাগরিক হতে পারবেন।

বেশ কয়েকটি বিরোধী দল এই বিলের বিরোধিতা করলেও এটি সরকার পার্লামেন্টে পাস করিয়ে নিতে পারবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

বস্তুত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে গত কয়েকদিনে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সব মুখ্যমন্ত্রী ও বিভিন্ন সংগঠনের সাথে ১১০ ঘন্টারও বেশি বৈঠক করেছেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।

আর এই দীর্ঘ আলোচনার পরিণতিতেই বিতর্কিত এই বিলের পরিধি থেকে শেষ পর্যন্ত বাদ দেয়া হয়েছে অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের ইনার লাইন পারমিট এলাকাসমূহ।

এখন এই ইনার লাইন পারমিট-ভুক্ত অঞ্চলে যেতে হলে ভারতের অন্য এলাকার নাগরিকদেরও বিশেষ অনুমতি লাগে।

তা ছাড়া আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় বা মিজোরামের আদিবাসী-প্রধান বহু এলাকাও সংবিধানের ষষ্ঠ শিডিউল অনুসারে স্বশাসনের অধিকার ভোগ করে, সেখানেও এই নতুন বিল প্রযোজ্য হবে না।

এদিন ক্যাবিনেট বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সরকারের মুখপাত্র প্রকাশ জাভড়েকর জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পৌরোহিত্যে মন্ত্রিসভা আজ বেশ কয়েকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার অন্যতম হল নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলে সম্মতি দেয়া।’

সংসদে পেশ করার পর এই বিলটি নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিলের বিষয়বস্তু নিয়ে জাভড়েকর বিশেষ কিছু প্রকাশ না-করলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রেই বিবিসিকে জানানো হয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের ভাবাবেগকে মর্যাদা দিয়েই প্রস্তাবিত বিলে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এদেশের গবেষকরাও বলছেন, ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সংজ্ঞাকেই চিরতরে বদলে দেবে এই বিল।

ভারতে গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে গবেষণা করে থাকে পিআরএস লেজিসলেটিভ, ওই সংস্থার সাবেক ফেলো তৃণা রায়ের কথায়, ‘এই বিলটার মূল কথা হল অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে বিশেষ একটা ক্যাটেগরি এখন ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হবেন।’

‘যারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ভারতে ঢুকেছেন কিংবা মেয়াদের পরেও এদেশে থেকে গেছেন তাদের সবাইকেই এতদিন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলা হত।’

‘কিন্তু এরা যদি আমাদের মুসলিম-প্রধান তিনটি প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা সংখ্যালঘু হন তাহলে তাদের আর সেটা বলা যাবে না’, জানাচ্ছেন তিনি।

কাশ্মিরে ৩৭০ ধারা বিলোপ বা অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের মতোই এটা ছিল বিজেপির বহু পুরনো অঙ্গীকার - বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা হলেও হিন্দুদের তারা ‘শরণার্থী’ বলেই বর্ণনা করে এসেছে।

নতুন বিলে সেই কথিত শরণার্থীদের নাগরিকত্বের মর্যাদা বা আইনি অধিকারটাই স্বীকৃতি পাচ্ছে।

বিজেপি এমপি রাকেশ সিনহার কথায়, ‘এই হিন্দু-বৌদ্ধদের আশ্রয় দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’

‘কংগ্রেসকে মনে করিয়ে দেব, নেহরু-লিয়াকত চুক্তির জেরেই কিন্তু পাকিস্তানে হিন্দুদের জনসংখ্যা শতকরা ১৩ ভাগ থেকে ১ ভাগে নেমে এসেছে, আর বাংলাদেশে হয়েছে ২৩ থেকে ৬ শতাংশ।’

‘কিন্তু ভারত এই হিন্দুদের হারিয়ে যেতে দেবে না, তাদের মর্যাদার সাথে ঠাঁই দেবে’, বলছেন রাকেশ সিনহা।

এই বিলটি আগামী সপ্তাহেই লোকসভায় পেশ হতে যাচ্ছে, তার আগে বিষয়টি নিয়ে তাদের দলেও আলোচনা হবে বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি কাকলি ঘোষদস্তিদার।

তিনি জানাচ্ছেন, ‘এর আগে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী তৈরির প্রস্তাব তো আমরা পুরোপুরি বিরোধিতা করেছি।’

‘এখন এই বিল নিয়ে ঠিক কী করা হবে তা আমরা লোকসভায় বিলটি পেশ করার আগেই চূড়ান্ত করে ফেলব।’

তৃণমূল ছাড়াও আরজেডি, কংগ্রেস, ডিএমকে-সহ অনেক বিরোধী দলই পার্লামেন্টে বিলটিতে বাধা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কিন্তু পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন লোকসভায় তো বটেই, এমন কী রাজ্যসভায় যেখানে শাসক জোটের গরিষ্ঠতা নেই - সেখানেও তারা বিলটি শেষ পর্যন্ত পাস করিয়ে নিতে পারবে।

সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ