২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ইন্টারনেটের অভাবে যেভাবে ডুবছে কাশ্মিরের অর্থনীতি

শালের অর্ডার কমেছে, ফলে তাঁতি ফায়াজ আহমেদের মজুরী অর্ধেক হয়ে গেছে। - ছবি : বিবিসি

‘গত চার মাসে কিছু না হলেও ১০ লাখ রুপির ক্ষতি হয়েছে আমার। ব্যবসা বাঁচাতে না পেরে শ্রীনগর ছেড়ে জম্মুতে আসতে হয়েছে’, জম্মু থেকে টেলিফোনে বিবিসিকে বলছিলেন শারিক আহমেদ।

‘এখানে ৭,০০০ রুপীতে একটি ঘর ভাড়া করতে হয়েছে। নতুন ব্রডব্যান্ড সার্ভিস নিতে মাসে ২ হাজার রুপী গুনতে হচ্ছে। এছাড়া, বাড়ি ছেড়ে বাইরে থাকার খরচ তো রয়েছেই।’

শ্রীনগরে একটি ট্যুর কোম্পানি চালাতেন শরিক। ইন্টারনেটের অভাবে ব্যবসা বন্ধ হওয়ার যোগাড় হয়েছিল। প্রায় এক মাস আগে শ্রীনগর ছেড়ে জম্মুতে এসে ব্যবসা বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।

স্ত্রী-সন্তানদের ফেলে নতুন অপরিচিত জায়গায় আসতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

গত ৫ আগস্ট সংবিধানে ৩৭০ ধারা রহিত করে জম্মু-কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা খর্ব করার পর থেকে কাশ্মির উপত্যকায় ইন্টারনেট যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে ভারত সরকার। পরিণতিতে, এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে ওঠার যোগাড় হয়েছে।

ইন্টারনেটের জন্য অপেক্ষা
শ্রীনগরে একটি বইয়ের দোকান চালান সানি হুসেন। ইন্টারনেটে নতুন বইয়ের অর্ডার দিতে পারছেন না বলে তাকে দিল্লি যেতে হয়েছিল।

বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘শ্রীনগর থেকে দিল্লি যাওয়া মানে সব মিলিয়ে ৩০ হাজার রুপীর ধাক্কা। এই টাকা তো আমার ব্যবসা থেকেই আয় হয় না। ৫ আগস্টের আগে এই কাজের জন্য কখনোই আমাকে দিল্লি যেতে হয়নি। সবসময় অনলাইনেই অর্ডার দিয়েছি।’

ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে হুসেন মানুষকে জানাতেন কী কী বই এখন তার দোকানে পাওয়া যাচ্ছে। অনলাইনে অ্যামাজনের সাইটে বইয়ের অর্ডার দিতেন।

ইন্টারনেট না থাকায় দুটো রাস্তাই এখন বন্ধ।

হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে শ্রীনগরের বাইরের দোকানদারদের কাছ থেকে বইয়ের অর্ডার আসতো। দেনা-পাওনার হিসাবও হতো হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে। সেটাও বন্ধ।

সম্প্রতি শ্রীনগরে ল্যান্ডফোন লাইন এবং পোস্ট-পেইড মোবাইল ফোনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রি-পেইড মোবাইল সার্ভিস এবং ইন্টারনেট এখনো বন্ধ।

ব্যবসা-বাণিজ্য ধুঁকছে
শ্রীনগরে শুকনো ফল এবং জাফরানের ব্যবসা করেন ওমর আমিন। দেশের বাইরে থেকেও ইন্টারনেটে তার কাছে অর্ডার আসতো। কাশ্মির উপত্যকায় এখন ইন্টারনেট না থাকায় দিল্লি থেকে তাকে তার অনলাইন অপারেশন চালাতে হচ্ছে। সেখানে লোক নিয়োগ করতে হয়েছে। ফলে বেড়ে গেছে ব্যবসার খরচ।

ওমর জানালেন দিল্লিতে বিকল্প ব্যবস্থা করার আগে প্রায় দেড় মাস তার ওয়েবসাইট বন্ধ রাখতে হয়েছিল। ফলে, তার ব্যবসার সুনাম এবং নির্ভরযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

মজুরী কমে অর্ধেক
ইন্টারনেটের অভাবে বিশেষ হুমকিতে পড়েছে কাশ্মিরের হস্তশিল্প। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মোবাইল ফোন এখন তাদের ব্যবসার বড় জায়গা। মানুষজন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে ছবি দেখে অর্ডার দেয়। সেই রাস্তা এখন পুরোপুরি বন্ধ।

কাশ্মিরের কারুশিল্পীরা এখন তাদের জীবিকা নিয়ে গভীর আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন।

শাল তৈরির কারখানায় কাজ করেন ফায়াজ আহমেদ। তিনি বলছেন, ‘লন্ডন থেকে যে ক্রেতা শালের অর্ডার দিতেন তিনি যদি মাঝপথে নকশায় কোনো পরিবর্তন চান, যোগাযোগের একমাত্র রাস্তা ছিল ইন্টারনেট। তার পাঠানো ছবি দেখে আমরা শাল বানাতাম। নকশা বদল করতাম।’ সেই সুবিধা এখন বন্ধ।

ব্যবসা কমায় মজুরীও কমছে। আগস্ট মাসের আগে ফায়াজের আয় ছিল মাসে কমপক্ষে ১০ হাজার রুপী। এখন পাচ্ছেন পাঁচ হাজার।

শ্রীনগরে হস্তশিল্পের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইয়াসিন মীর ভিন্ন এক সমস্যার কথা বললেন

‘যারা আমাদের পণ্য কিনতো, বা যাদের কাছ থেকে আমরা নানা জিনিস কিনতাম, সেসব লেনদেন বন্ধ। সম্প্রতি অমৃতসর থেকে টেলিফোন করে একজন আমাকে দুটো ইলেকট্রিক কম্বলের অর্ডার দেয়। কিন্তু আমি তাদের স্যাম্পল দেখাতে পারছি না। একজনকে সেখানে স্যাম্পলসহ পাঠানো অনেক খরচের ব্যাপার। ফলে আমি অর্ডার নিতে পারিনি।’

‘এখনকার অফিসাররা কথা শোনেন না’
তারা সরকারের কাছে সমস্যা সমাধানের আবেদন কেন করছেন না? এই প্রশ্নে, সব ব্যবসায়ীদেরই উত্তর ছিল প্রায় একই রকম।

‘এই সরকার আমাদের কথা শুনতে রাজী নয়। আগে আমরা নির্বাচিত সরকারের কাছে নানা আর্জি নিয়ে যেতাম, কিন্তু এখন যেসব অফিসার এখানে আছেন, কাশ্মিরিদের কথা তারা শোনেনই না। তারা আমাদের চেনেন না। আমাদের সমস্যা তারা বোঝেন না। সে কারণে আমরা তাদের কাছে যাই না। আমরা শুধু অপেক্ষা করছি পরিস্থিতি হয়তো একদিন ভালো হবে।’

ভারত-অধিকৃত কাশ্মিরের শিল্প ও বণিক সমিতি বলছে, ৫ আগস্ট থেকে ইন্টারনেট বন্ধ থাকার জেরে রাজ্যের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি রুপী।

সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ