১৯ জুন ২০১৯

বিদেশী টেলিকম প্রযুক্তি ব্যবহার করবে না যুক্তরাষ্ট্র

-

বিদেশী প্রতিপক্ষগুলোর হাত থেকে দেশের কম্পিউটার নেটওয়ার্কগুলোকে রক্ষা করতে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ লক্ষ্যে তিনি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। এই আদেশের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বিদেশী টেলিকম প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে না। তবে এই আদেশে সুনির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির নাম উল্লেখ না করলেও ধারণা করা হচ্ছে চীনের কোম্পানি হুয়াওয়েকে রুখতে এই আদেশ জারি করা হয়েছে। এর ফলে হুয়াওয়ে টেকনোলজিস কোম্পানি লিমিটেড ও এর অন্তর্ভুক্ত ৭০টি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুমোদন ছাড়া মার্কিন কোনো প্রযুক্তি কিনতে পারবে না। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি দেশ হুয়াওয়ের পণ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তাদের ধারণা এই প্রযুক্তির মাধ্যমে চীন দেশগুলোতে গোয়েন্দাগিরি করতে পারে। সে কারণে ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মের ফাইভজি নেটওয়ার্কে হুয়াওয়ের পণ্য বর্জন করারও আহ্বান জানান।
চীনা প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ে বলছে, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা এবং কোম্পানিগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যে নতুন করে এই নিষেধাজ্ঞা দেশ দুটির মধ্যে আরো উত্তেজনা বাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান
হুয়াওয়ের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং পাল্টা ব্যবস্থা নিলে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এমনকি কিছু মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি হতে পারে বিপর্যয়কর। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে অ্যাপল।
সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কায় দেশের বাইরের কোনো কোম্পানির তৈরি টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম ক্রয়, সংযোজন অথবা ব্যবহার নিষিদ্ধ করে এক নির্বাহী আদেশে গত বুধবার স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই আদেশে হুয়াওয়ের নাম উল্লেখ না করা হলেও লক্ষ্য যে এই চীনা প্রতিষ্ঠান, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ ব্যাপারে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটিভ স্ট্র্যাটেজিস ইনকরপোরেশনের বিশ্লেষক টিম বাজারিন বলেন, এ নির্বাহী আদেশ যে হুয়াওয়েকে লক্ষ্য করেই, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যদিও হুয়াওয়ের গুপ্তচরবৃত্তির কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্য নিষিদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ সত্য হতেও পারে। কিন্তু চীন-মার্কিন পণ্য নিষিদ্ধ করে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। এটা অনেক মার্কিন প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতি হতে পারে, যাদের চীনে বড় বাজার রয়েছে।
বাণিজ্যযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে উভয় দেশ বিপুল পরিমাণ পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়েছে। এর মধ্যে কিছু মার্কিন পণ্যের ওপর চীন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে। যদিও আগামী মাসে জাপানে অনুষ্ঠেয় জি২০ সম্মেলন সামনে রেখে এ নির্বাহী আদেশকে ট্রাম্পের হুমকি বলে মনে করছেন ওয়েডবুশ বিশ্লেষক ডন আইভস। এ হুঙ্কার যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি বিনিয়োগকারীদের শঙ্কায় ফেলতে পারে। চীনের পাল্টা ব্যবস্থা এনভিডিয়া, কোয়ালকম ও ইন্টেলের মতো চিপ নির্মাতাদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যদিও এ ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন বার্নস্টেইন বিশ্লেষক স্ট্যাসি রাসগোন। তিনি বলেন, হুয়াওয়ে সেমিকন্ডাক্টরের বড় ক্রেতা। কিন্তু হুয়াওয়ে মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর কেনা বাদ দিলে নতুন সাপ্লাই চেইন দাঁড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ এর ফলে প্রযুক্তি সরঞ্জামের আন্তর্জাতিক বাজারে অন্য কোম্পানির কাছে চীনা কোম্পানিগুলো অংশীদারিত্ব হারাবে। তবে অন্তর্বর্তী সময়টা খুব বাজেভাবে যাবে। এসব কিছুর পরও চীনের পাল্টা ব্যবস্থার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান প্রযুক্তি কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাতে কোনো দ্বিমত নেই তার।
সবচেয়ে অরক্ষিত অবস্থায় আছে অ্যাপল। এমনকি অ্যাপলই চীনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে কি না সেটাই দেখার বিষয়। চীনা টেক জায়ান্ট হুয়াওয়ে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, এতে দেশটির ফাইভজি প্রযুক্তির অগ্রগতিই বাধাগ্রস্ত হবে।
চীন বা হুয়াওয়ে নিয়ে কেন উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র হুয়াওয়েকে নিয়ে উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে তাদের নেক্সট-জেনারেশন ফাইভজি মোবাইল নেটওয়ার্ক। ফাইভজি মোবাইল ব্যবহারকারীদের অনেক বেশি উন্নত ইন্টারনেট সেবার পাশাপাশি চালকবিহীন গাড়ি ইত্যাদির মতো যন্ত্রকে পরস্পর সংযুক্ত করবে।
যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডসহ বেশ কিছু দেশ টেলিকম কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যাতে তারা হুয়াওয়ের সামগ্রী ব্যবহার না করে, কারণ এর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কানাডা ও ইউরোপে এ বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।
হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেই একসময় চীনের পিপলস আর্মি অর্থাৎ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। তার হাত ধরে হুয়াওয়ের ব্যবসার প্রসার হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। হুয়াওয়ের ব্যবসার প্রসার পশ্চিমা দেশগুলোতে এই আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে যে তাদের প্রযুক্তি যেভাবে বিভিন্ন জায়গায় ঢুকে পড়ছেÑ তাতে তা চীনের গুপ্তচরৃত্তির জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। যেহেতু অত্যাবশ্যকীয় যোগাযোগ নেটওয়ার্কের একাংশ হুয়াওয়ে নিয়ন্ত্রণ করে, তাই তার ক্ষমতা আছে গুপ্তচরবৃত্তি করার এবং ভবিষ্যতে কোনো বিবাদের সময় যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করার। এ কারণে হুয়াওয়ের সামগ্রী ব্যবহারকারী দেশগুলো এ ঝুঁকির ব্যাপারটি সতর্কতার সাথে বিবেচনা করে।

 


আরো সংবাদ