১৯ আগস্ট ২০১৯

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট কর্মক্ষেত্রে সম্ভাবনা নাকি হুমকি?

-

বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট নিয়ে আমাদের ভীতির শেষ নেই। সম্প্রতি টিভি, সিরিয়াল ও সিনেমায় যে ধরনের রোবট ব্যবহার করছে সেগুলো অনায়াসেই মানুষের কর্মসংস্থানের জায়গা দখলে নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে অনেকে। তবে এমআইটির টেকনোলজি রিভিউ বলছে ভিন্ন কথা; তাদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাধারী এসব রোবট নিয়ে এতটা শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তারা আমাদের জন্য অতটা ক্ষতিকরও নয়।
আধুনিক কালের রোবটের মধ্যে সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটিরও হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের এমন নিখুঁত কোনো কম্বিনেশন নেই যা থেকে মনে হতে পারে এসব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট মানব সমাজের জন্য হুমকির কারণ হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের দৈনন্দিন কাজকে সহজ করবে, বিভিন্ন প্রজেক্টে একান্ত সচিবের দায়িত্বও নিতে পারে কিন্তু অবশ্যই সেটা কর্মসংস্থান দখল করার মতো পর্যায়ে পৌঁছবে না এবং সেটা মানুষের বিকল্প হিসেবেও নয়।
বাস্তবতা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন রোবট মানবিক উপাদানগুলোর দিকে লক্ষ্য রেখেই তৈরি করা হয় যাতে করে তারা সদা পরিবর্তনশীল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে মানুষকে সর্বোচ্চ এনার্জি দিয়ে সাহায্য করতে পারে। তা ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতে রোবট আমাদের জন্য আশীর্বাদ বলা যায়। যেমন হঠাৎ কোথাও আগুন লেগে গেলে উদ্ধার কাজে এদের ব্যবহার করা যায়, এ ছাড়াও অনুকরণমূলক বিভিন্ন কাজে রোবট খুব ইফেকটিভলি ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই রোবট মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে এই ধারণা অলীক এবং অনেকটাই অসম্ভব বলা যায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রগুলো নিয়ে তাই ভয়ের কিছু নেই বরং এসব রোবটকে আমরা আমাদের সঙ্গী কিংবা কাজের সহযোগী হিসেবে স্বাগত জানাতে পারি। তারপরও কোনো জড়তা বা অস্পষ্টতা থাকলে নিজেই ঘেঁটে দেখতে পারেন, এখন পর্যন্ত সায়েন্স ফিকশন অনুকরণে নয় বরং বাস্তবতার কথা, মানব কল্যাণের কথা মাথায় রেখেই তৈরি হচ্ছে এসব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বদলে দিতে যাচ্ছে সারা বিশ্বের মানুষের জীবন। অভূতপূর্ব এ পরিবর্তন মানুষের জীবনকে করবে সহজতর এবং একই সঙ্গে জীবনের গতি হবে এখনকার চেয়ে আরো অনেক বেগবান। সারা বিশ্বে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে প্রচুর আলোচনা এবং গবেষণা হচ্ছে। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মানুষের উচ্চাকাক্সক্ষা আরো বাড়ছে। এমন অনেক কাজ কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা করা হচ্ছে যা আগে কখনো ভাবতেও পারেনি মানুষ। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকেও প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে ভবিষ্যতের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বলতে যেটি বোঝানো হচ্ছে তা হলো সমাজ এবং অর্থনীতির বিভিন্ন অনুষঙ্গের নিরবচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত রূপান্তর। অর্থাৎ প্রতিটি ক্ষেত্রে রোবটিক্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কিভাবে মানুষের কল্যাণে আসতে পারে। এছাড়াও স্বয়ংক্রিয় যান, থ্রিডি বা ত্রিমাত্রিক ছবি, ন্যানো বা অতি ক্ষুদ্র প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা-প্রশাখা কিভাবে মানব জীবনকে বদলে দিতে পারে ও কিভাবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হতে পারে এ সব কিছুই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
ডব্লিউইএফের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী প্রধান ক্লাউস শোয়াব চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে নিজের লেখা একটি প্রবন্ধে বলেছেন, আমরা চাই বা না চাই, এত দিন পর্যন্ত আমাদের জীবনধারা, কাজকর্ম এবং চিন্তা-চেতনা যেভাবে চলেছে, তা বদলে যেতে শুরু করেছে। এখন আমরা এক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ডিজিটাল বিপ্লব সম্পর্কে বিস্তর ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালিয়েছেন ক্লাউস শোয়াব। স্মার্টফোনের মাধ্যমে বিশ্বের তথ্য-প্রযুক্তি খাতের পরিবর্তন, ইন্টারনেট অব থিংস, যন্ত্রপাতি পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, রোবোটিকস, জৈবপ্রযুক্তি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের মতো বিষয়গুলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সূচনা করেছে বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্বব্যাংকের ‘ডিজিটাল ডিভিডেন্ডস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনেও ডিজিটাল বিপ্লব সম্পর্কে নানা বিষয় উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন একদিনে বিশ্বে ২০ হাজার ৭০০ কোটি ই-মেইল পাঠানো হয় এবং গুগলে ৪২০ কোটিবার বিভিন্ন বিষয় খোঁজা হয়। একযুগ আগেও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এ পরিবর্তনগুলো ছিল অকল্পনীয়।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হিসেবে ডিজিটালাইজেশন এরই মধ্যে সর্বক্ষেত্রে বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আগামী ১০ বছরে ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে এমন সব পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হবে, যা এর আগে কখনো সম্ভব হয়নি। বিশ্বের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কী প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে দুই ধরনের মত পাওয়া যাচ্ছে। একদল বিশেষজ্ঞ বলছেন, এতে সব মানুষেরই আয়ের পরিমাণ ও জীবনমান বাড়বে। বিশ্বের পণ্য সরবরাহ প্রক্রিয়ায়ও ডিজিটাল প্রযুক্তি আনবে ব্যাপক পরিবর্তন। এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য পাঠানোর খরচ অনেক কমে আসবে এবং ইতিবাচক প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে।
অন্য একদল অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ডিজিটাল বিপ্লব বিশ্বের অসাম্য ও দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরো দুর্বিষহপর্যায়ে নিয়ে যাবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে মানুষের অনেক কাজ রোবট ও যন্ত্রপাতি দিয়ে করা হবে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তা সমস্যা তৈরি করবে। এছাড়া শ্রমবাজারে অল্প কর্মদক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা ও বাজার কমে যাবে যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সমস্যায় ফেলবে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল বিপ্লবের প্রভাব হবে ব্যাপক। ব্যতিক্রমী পণ্য সেবার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল গ্রাহক চাহিদা পূরণে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তি ব্যবহারে সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সরকার পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণেও ডিজিটাল বিপ্লব আনবে বড় পরিবর্তন। প্রযুক্তি-বিপ্লব সরকারি সেবাকে একদিকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসবে এবং অন্যদিকে মারণাস্ত্রের সহজলভ্যতা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ঝুঁকিও বাড়াবে। নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবই যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করবে সে আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষকরা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং নিয়ে এখন অনেক বেশি কাজ হচ্ছে। এই দুটি বিষয় নিয়ে গবেষণার ফলে মানুষের বেশ কিছু কর্ম উৎস তাদের জন্য আর বহাল থাকছে না। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবার এবং সেখানে যারা শিল্প-কারখানায় কাজ করে তাদের মধ্যে চাকরি চলে যাওয়ার একটি ভয় বেশি কাজ করে। কিন্তু যেসব কাজে মানুষের ইন্দ্রিয়ের প্রয়োজন হয় এবং যেসব কাজের জন্য একটি নিপুণ পরিচালনার প্রয়োজন পড়ে, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করলে ঠিক ফল পাওয়া যাবে না। যেসব কাজ মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং সৃজনশীলতার উপর নির্ভর করে, সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ আদৌ সম্ভব নয়। তবে আশার কথা হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জাতীয় কৌশলপত্র তৈরি করছে সরকার। প্রাথমিক খসড়া তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।


আরো সংবাদ