২৩ অক্টোবর ২০১৯

ইংলিশম্যান ড্যানিয়েল যেভাবে সুপারস্টার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ

ইংলিশম্যান ড্যানিয়েল যেভাবে সুপারস্টার মোহাম্মদ আবদুল্লাহ - ছবি : সংগৃহীত

মোহাম্মদ কারিফ ড্যানিয়েল আবদুল্লাহ যখনই ঘরের বাইরে যান, কুয়ালালামপুরের রাস্তায় লোকে নজর ফিরিয়ে দেখতে থাকে তাকে। চিৎকার করে ডাকে তার নাম ধরে।

“লোকে বলতে থাকে, ‘দেখ, দেখ, ম্যাট ড্যান!’অনেকে সাহস করে সেলফি তোলারও অনুরোধ জানায়,” বলছেন তার মা।

মালয়েশিয়ায় ‘ম্যাট ড্যান’এখন বিরাট তারকা। টেলিভিশনে তার ট্রাভেল শো, কিম্বা রেডিওতে সকালের অনুষ্ঠান অথবা রাস্তায় বিলবোর্ড মক্কা ভ্রমণের বিজ্ঞাপন, কোথায় না দেখা যায় ম্যাট ড্যানকে। কিন্তু একজন ইংলিশম্যান ড্যানিয়েল টেলর যেভাবে মালয়েশিয়ায় এসে ‘ম্যাট ড্যানে’ রূপান্তরিত হলেন, সেই কাহিনী বেশ চমকপ্রদ।

ইংল্যান্ডের কটসওল্ডের মধ্যবিত্ত অধ্যূষিত শহর চেলটেনহ্যামে বেড়ে উঠেছেন ড্যানিয়েল টেলর। আর দশটা ইংরেজ ছেলে যেভাবে বড় হয়, সেভাবেই।

স্কুল তার তেমন পছন্দ হতো না, তবে ক্রিকেট খেলতে ভালো লাগতো। এক সময়ে ইংলিশ ক্লাব গ্লস্টারশায়ারে খেলেছেন। তবে একটু বড় হয়ে ক্রিকেটেও আগ্রহ কমলো, নতুন নেশা হয়ে দাঁড়ালো মিউজিক আর নানা রকমের পার্টিতে গিয়ে আমোদ-ফূর্তি করা। পড়াশোনা ছেড়ে দিলেন। তাকে সারাক্ষণ দেখা যেত পানশালায়। কিছুদিন একটা কাপড়ের দোকানেও কাজ করেছেন।

২০০৮ সালে ড্যান কিছু টাকা জমিয়ে বেরিয়ে পড়লেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভ্রমণে। কয়েক মাসের ব্যাকপ্যাকিং ট্যুর শেষে ফিরে এলেন ইংল্যান্ডে। কিন্তু সে বছরেরই শেষে ড্যান আবার ফিরে গেলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়।

তার জীবন যে চিরদিনের জন্য পাল্টে যেতে চলেছে, সেটা ভাবতে পারেননি ড্যানিয়েল টেলর। মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলে আছে একটি ছোট্ট দ্বীপ পুলৌ কাপাস। পশ্চিমা পর্যটকদের থেকে দলছুট হয়ে সেখানে স্থানীয়দের সঙ্গে সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

স্থানীয় ভাষা রপ্ত করতে খুব বেশি সময় লাগলো না ড্যানিয়েল টেলরের। তার ধারণা ছিল, যে ভাষা তিনি শিখছেন, সেটা বাহাসা মালয়, যেটি কীনা মালয়েশিয়ার প্রধান ভাষা। কিন্তু একবার কুয়ালালামপুরে গিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন, তার বলা কথা কেউ বুঝতে পারছে না। একজন দোকানদারের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানতে পারলেন, আসলে যে ভাষা তিনি রপ্ত করেছেন, সেটি একটি আঞ্চলিক ভাষা, তেরেঙ্গানু। মালয়েশিয়ার তেরেঙ্গানু রাজ্যে মাত্র দশ লাখের মতো মানুষ এই ভাষায় কথা বলে।

শুরুতে বেশ দমে গিয়েছিলেন। ‘আমার মনে হলো আমি তো এখন অন্য কোথাও গেলে এই ভাষা কোন কাজে লাগবে না।’

কিন্তু একটি আঞ্চলিক মালয় ভাষা যেন ড্যানিয়েলের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ালো। এই ভাষা রপ্ত করার কল্যাণে তিনি পরিণত হলেন এক জাতীয় তারকায়। তেরেঙ্গানু রাজ্যে ততদিনে ম্যাট ড্যানকে নিয়ে একটা চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। একজন ইংরেজ তরুণ স্থানীয় ভাষায় অনর্গল কথা বলছে, এরকম একটা ভিডিও কেউ ছেড়ে দিল অনলাইনে। ইউটিউবে হাজার হাজার মানুষ সেটা দেখার পর তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো।

কুয়ালালামপুর থেকে এক টিভি ক্রু এসে তাকে প্রস্তাব দিল, ক্যামেরার সামনে কিছু একটা করার জন্য। দেখা গেল, টেলিভিশন ক্যামেরার সামনেও ম্যাট বেশ সাবলীল। তখন তাকে একটি ভ্রমণ বিষয়ক টিভি শো করার প্রস্তাব দেয়া হলো। ‘হারামাইন ব্যাকপ্যাকার্স-ট্রান্স সাইবেরিয়ান’ নামের এই টিভি শো প্রচারিত হতে শুরু করার পর রাতারাতি পাল্টে গেল ড্যানের জীবন।

ড্যান এখন মালয়েশিয়ার যেখানেই যান, লোকে তাকে চিনতে পারে। ইনস্টাগ্রামে তার ফলোয়ার ৮ লাখের বেশি। টিভি শোর দ্বিতীয় সিরিজ শেষে এখন তিনি একটি রান্নার অনুষ্ঠানও করছেন। তার নিজের একটি রেডিও অনুষ্ঠানও চালু করেছেন। ম্যাট ড্যানকে এখন নিয়মিত দেখা যায় মালয়েশিয়ার চ্যাট শো গুলোতে।

‘প্রত্যেক দোকানে, প্রত্যেক রাস্তায়, আপনি শুনবেন, এই যে ম্যাট ড্যান, ম্যাট ড্যান। অপরিচিত লোকেরা এসে ওর সঙ্গে সেলফি তুলতে চাইবে’, বলছেন তার বন্ধু ড্যানিয়েল বীমস।

মালয়েশিয়ায় তো অনেক বিদেশি আছেন, যারা অনর্গল মালয় ভাষা বলতে পারেন। তাহলে ম্যাট ড্যানকে নিয়ে কেন এত শোরগোল?

তেরেঙ্গানু রাজ্যের একজন কর্মকর্তা টুন ফয়সল বলেন, ড্যান তেরেঙ্গানুর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, কেবল সেটা নয়, সেই সঙ্গে যেভাবে তিনি স্থানীয় সংস্কৃতিও রপ্ত করেছেন, সেটাই তাকে একটা ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।’

ড্যান এর মধ্যে ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলামে দীক্ষা নিয়েছেন। বিয়ে করেছেন। তার স্ত্রী মালয়েশিয়ান মুসলিম নুরানদিফা। নিজের ধর্মবিশ্বাসের সাথে যায় না, এমন কোন কাজ করতে রাজী না ম্যাট ড্যান।

যেমন, তার অনুষ্ঠানে কোন মদের বিজ্ঞাপন নিতে রাজী নন। অন্য কোন নারীর সঙ্গে রোমান্টিক কোন দৃশ্যেও তিনি অভিনয় করতে রাজী নন।

বেশিরভাগ মানুষের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেলেও অনেক নেতিবাচক সমালোচনার মুখেও পড়তে হয় ম্যাট ড্যানকে।

‘অনেকে প্রশ্ন তোলেন, শত শত বিদেশি এখানে আসে, কাজ করে। তারা দুই তিন মাসে মালয় ভাষাও শিখে যায়। কিন্তু তারা তো কেউ সেলিব্রেটি হয় না। মালয় বলতে পারে এমন এক বাংলাদেশি শ্রমিকের সঙ্গে ম্যাট ড্যানের পার্থক্য কোথায়?’

মালয়েশিয়ায় পাকাপাকিভাবে থাকলেও মাঝে মাঝে তিনি ইংল্যান্ডে নিজের পরিবারের কাছে বেড়াতে যান। তার পরিবারের সদস্যরাও মালয়েশিয়ায় বেড়াতে আসেন।

কিন্তু ইংল্যান্ডে এলে ম্যাট ড্যানের মনে হয়, ইংল্যান্ড যেন আর তার দেশ নয়।

একসময় তার উইকএন্ড কাটতো মদ পান করে আর জুয়া খেলে। এখন আর তার জীবনে সেসবের স্থান নেই। যখন ইংল্যান্ডে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে বসে টিভি দেখেন, তখন কোন নিউজে যদি মুসলিমদের নিয়ে নেতিবাচক কিছু থাকে, তখন ড্যান অস্বস্তি বোধ করেন।

‘নিউজে হয়তো ইসলাম বিষয়ে কিছু বলা হচ্ছে, তখন যেন সবাই হঠাৎ নীরব হয়ে যায়।’

তবে দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় থাকা এবং সেখানকার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলার ফলে ড্যানের ইংরেজি অ্যাকসেন্টও যেন একটু বদলে গেছে।
‘কয়েক বছর আগে আমি আমার দাদীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে ফোন করি। কিন্তু আমার দাদী আমার ফোন রেখে দেন এই ভেবে যে আমি বুঝি কোন সেলসম্যান, তার কাছে ব্রডব্যান্ড বিক্রির চেষ্টা করছি।’

‘আমার কথার টান শুনে অনেকে প্রশ্ন করে, তোমার বাড়ি কোথায়। আমি বলি এখানেই। কিন্তু তারা বিশ্বাস করে না। তারা বলে, তুমি কি ওয়েলস থেকে এসেছ?’

ম্যাট ড্যান এখন তেরেঙ্গানু রাজ্যের পর্যটন বিষয়ক বিশেষ দূত। তার নিজের নামে চালু করেছেন একটি ফ্যাশন ব্রান্ড। তিনি শীঘ্রই একটি সিনেমাতেও অভিনয় করতে যাচ্ছেন। গত বছর মালয়েশিয়ার ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার তাকে লাইভ টিভি অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ায় স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি দেয়ার ঘোষণা দেন।

ড্যান ম্যাট এখন নিজেকে মালয় বলেই ভাবেন, মালয়েশিয়াকেই তার নিজের দেশ বলে মনে হয়।‘আমি যতটা না ইংরেজ, তার চেয়ে বেশি মালয়ী।’ সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ