২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ১ সফর ১৪৩৯

কুঞ্জ সাজাও গো

-


রাতে বাসায় এসে দেখি সারাঘরময় এক ধরনের হৈ চৈÑ রৈ রৈ কাণ্ড। সারাবাড়ি, বিশেষ করে ড্রয়িংরুম রোজী আপা বেশ সাজিয়ে ফকফকা করে ফেলেছে। ব্যাপার কী! বাসায় কোনো আয়োজন চলছে নাকি! কিসের আয়োজন! আজ তো ঘরের কারো জন্মদিন নয়। তাহলে ঘটনা কী! সম্ভবত রোজী আপাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। কিন্তু এমন আলামতের তো পূর্বাভাস আগেই দেখার কথা, তাও দেখিনি। তাহলে কিসের এই আয়োজন!
রোজী আপা তার ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মগ্ন হয়ে সাজছে। আমি তার ঘরে যেতেই বললÑ
‘তোকে খুঁজছি রঞ্জু। একটু বাজারে যা তো।’
‘কেন আপা?’
‘আমার মেরুন কালার লিপস্টিক নেই। তোকে এখনই আনতে হবে।’
‘ব্যাপার কী! বাড়িতে কিসের আয়োজন চলছে?’
‘পরে বলব। আগে লিপস্টিক নিয়ে আয়।’
রোজী আপা আমার হাতে টাকা ধরিয়ে দিলো বাজার থেকে মেরুন কালার লিপস্টিক আনতে। এই বোনকে বড্ড ভালোবাসি আমি। তাই তার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে বাজারের দিকে রওনা দিলাম।
মেরুন কালার লিপস্টিক নিয়ে বাসায় এসে দেখি রোজী আপা সেজেগুজে একেবারে সিনেমার নায়িকা হয়ে বসে আছে। লিপস্টিক পেয়ে খুশি হয়েছে বটে, কিন্তু লিপস্টিক খুলে আহত গলায় বলল, ‘এটা কী এনেছিস রঞ্জু! এটা তো খয়েরি কালার। মেরুন নয়।’
বুঝলাম লিপস্টিকের কালার নির্বাচনে আমার ভুল হয়েছে। রোজী আপাকে বললাম, ‘তাতে কী! ঠোঁটে মেখে নে।’
দ্বিমত পোষণ করে রোজী আপা বলল, ‘না না হবে না। আমার মেরুনটাই লাগবে। একটু পর দুনিয়ার মানুষ আমাকে দেখবে।’
বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘দুনিয়ার মানুষ দেখবে মানে! কে আসবে বাসায়?’
রোজী আপা মিষ্টি হেসে বলল, ‘পরে বলছি। যা না ভাই। মেরুন কালারটাই নিয়ে আয়।’

২.
এবার আর ভুল হয়নি। মেরুন কালারের লিপস্টিক পেয়ে রোজী আপা তার ভুবন ভোলানো হাসি ছাড়ল। ড্রয়িংরুমে এসে তো আমি আবার অবাক হলাম। ড্রয়িংরুমকে রোজী আপা আগের তুলনায় দশগুণ সাজিয়েছে। সারাঘরে যত কৃত্রিম ফুল ছিল, সবগুলো এনে ড্রয়িংরুমের এ কোণে ও কোণে সাজিয়ে ঘরটাকে করে তুলেছে এক অপরূপ লীলাস্থান। কিন্তু যে জন্য এই আয়োজন, সেটাই তো জানলাম না।
‘আপা, ছেলেদের বাড়ি কোথায়?’
‘কোন ছেলের কথা বলছিস?’
‘যে তোকে এখন দেখতে আসবে।’
‘মানে?’
‘কেউ তোকে দেখতে আসবে না আপা?’
‘না তো!’
‘তাহলে ঘরটাকে এত সাজিয়েছিস কেন? নিজেও তো মুখে গাঢ় মেকআপ মেখে হিন্দি ছবির নায়িকা হয়ে আছিস।’
‘আচ্ছা রঞ্জু, তুই কী ফেসবুকে আমার কর্মকাণ্ড দেখিস না?’
‘দেখি তো। ফেসবুকে তুমি খুব জনপ্রিয়। ৪৭ হাজার ফলোয়ার তোমার। এত লাইকÑ কমেন্ট আসে তোমার ভাগে।’
‘আজ বিকেলে কী স্ট্যাটাস দিয়েছি, দেখেছিস?’
‘না।’
‘দেখ, তাহলে বুঝবি কেন এই আয়োজন।’
ফেসবুক খুলে দেখি রোজী আপা বিকেলে স্ট্যাটাস দিয়ে লিখেছে, ‘আজ রাত দশটায় ফেসবুক লাইভে আসবো। সবাইকে গান শোনাব। দেখো কিন্তু।’
এতক্ষণে ঘটনা আমার কাছে পরিষ্কার হলো। রোজী আপা লাইভে মানুষকে গান শোনাবে বলে এই আয়োজনে মেতেছে। নিজেও সেজেছে আর ড্রয়িংরুমটাকেও সাজিয়েছে লাইভে সবাইকে ড্রয়িংরুমের সাজানো পরিবেশ দেখাবে বলে।
রোজী আপা ভালো গান পারে। গান শিখেছেও অনেক বছর। গান ছেড়ে দিয়েছে সেও অনেক দিন হলো। আমি নিজেই রোজী আপার গানের ভক্ত। ওই গলাটা আসলেই ভালো।
রোজী আপার স্ট্যাটাসের কমেন্ট লক্ষ করলাম। কমেন্ট সংখ্যা সাড়ে তিন শ’ অতিক্রম করেছে। কমেন্ট পড়ে বোঝা গেল মোটামুটি সবাই রোজী আপার লাইভে গান শোনার অপেক্ষা করছে। আমিও অপেক্ষায় থাকতে শুরু করলাম কখন দশটা বাজবে! ॥

৩.
এখন রাত দশটা। পরিচ্ছন্ন ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে রোজী আপা মোবাইল গুতাগুতি করছে। আমি পাশে গিয়ে বসতেই তীক্ষè গলায় বলল, ‘প্লিজ এখান থেকে যা। আমি এখন লাইভে বসব। তুই ছাদে চলে যা। ছাদ থেকে আমার লাইভ দেখ। আমাকে একা থাকতে হবে।’
বাধ্য ছেলের মতো রোজী আপার অনুরোধ রাখতে ছাদে চলে গেলাম।
দশটা পনেরো মিনিট বাজছে। রোজী আপা লাইভে আসছে না কেন! তার স্ট্যাটাসে ফেসবুকবাসীরাও তাকে লাইভে আসার তাগিদ দিচ্ছে।
নিচ থেকে রোজী আপার ডাক, ‘রঞ্জু, ছাদ থেকে নেমে আয় তো।’
রোজী আপার কাছে গেলাম। বলল, ‘দেখতো ফেসবুকে ঢুকতে পারছি না কেন? পাসওয়ার্ডে কাজ করছে না।’
বেশ কয়েকক্ষণ চেষ্টা করেও রোজী আপার ফেসবুক লগইন করতে পারলাম না। নিচতলার রনিকে ডাকতে হবে। রনি ফেসবুকের আগা মাথা সব জানে। এই সমস্যার সমাধান একমাত্র রনিই দিতে পারবে।
রনিকে ডাকা হলো। রনি মিনিটখানেক মোবাইলে গুতাগুতি করে নিরস গলায় বলল, ‘আইডি হ্যাক হয়েছে।’
রোজী আপার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। উঁচু গলায় বলল, ‘কী বলছিস! হ্যাক হয়েছে! কেডা আমার আইডি হ্যাক করল! আমি এখন লাইভে সবাইকে গান শোনাব কিভাবে? কত কষ্ট করে সাজলাম। ঘর দুয়ার সাজালাম।’
রোজী আপার অস্থিরতা বাড়ছে। আহারে বেচারি, লাইভে মানুষকে গান শোনাবে বলে এত আয়োজন। অবশেষে আইডিটাই হ্যাক হলো কি না! সব পরিশ্রম যে পণ্ড।


আরো সংবাদ