২৫ আগস্ট ২০১৯

সমাজের হাল ঠিক রাখতে হলে সমস্যার সব জায়গায় হাত দিতে হবে : Ñ গিনা রিনেহার্ট

ভিন দেশ
-

গিনা রিনেহার্ট। তিনি অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ধনী নারী ব্যবসায়ী। ব্যবসায়িক সাফল্যে রিনেহার্ট এখন শুধু অস্ট্রেলিয়ায় নয় বরং গোটাবিশ্বের উদাহরণ। তিনি খনি অনুসন্ধান ও উত্তোলন প্রতিষ্ঠান হ্যানকক প্রসপেক্টিং প্রাইভেট লিমিটেডের (এইচপিপিএল) নির্বাহী চেয়ারম্যান। মূলত লোহার খনি থেকে এসেছে তার সম্পদের বেশির ভাগ। কোম্পানিটিকে বিশ্বের অন্যতম সফল ব্যবসায় নিয়ে আসেন কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্যের মধ্য দিয়ে। বিনেহার্টের বাবা ল্যাং হ্যানকক মৃত্যুবরণ করেন ১৯৯২ সালের দিকে। এর আগ পর্যন্ত তার বাবাই কোম্পানিটি চালাতেন। পাশাপাশি তার সুযোগ্য মেয়ে রিনেহার্টও কোম্পানি বা ব্যবসার নানা কাজে সহযোগিতা করতেন। বাবার মৃত্যুর পর কোম্পানিটি অর্থ, প্রশাসন, ক্রেতা ইত্যাদি সংক্রান্ত নানা সঙ্কটে পড়ে যায়। পড়ে যায় ঋণ দেউলিয়ায়। পুরো সম্পদ আটকা পড়ে যায় বন্ধকে। প্রচুর মামলাও হয়। রিনেহার্ট দেখেন এমন দুর্বিষহ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তখন এ সংক্রান্ত নানা দিক সামাল দিতে তিনি তার বাবার এই প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী চেয়ারম্যানের পদে বসেন। এ পদে থেকে ২০০৬ সালেই এ ধনকুবের বনে যান বিলিয়নিয়ার। ২০১০ সালে খনি অনুসন্ধান ও উত্তোলন পেরিয়ে এর বিস্তৃতি আরো বাড়াতে থাকে। তারপর বড় আকারের বিনিয়োগ করেন টেন নেটওয়ার্ক হোল্ডিংস এবং ফেয়ারফক্স মিডিয়ায়, যদিও তার এ সংক্রান্ত সুবিধা বা মুনাফা বিক্রি করে দেন। অবশ্য তা তিনি করেন আরো অর্থ বিনিয়োগের জন্য।
রিনেহার্ট ২০১১ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার নামকরা ধনী নারী ছিলেন। এ তথ্য ফোর্বস এবং ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ রিচ লিস্টের। তার সম্পদের মূল্য ২০১২ সালে উঠে যায় প্রায় ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এভাবে তিনি ধনকুবের ক্রিস্টি ওয়ালটনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের ধনী নারীর পরিচিতি পান। শুধু তাই নয়, তিনি ফোর্বস লিস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ডস হানড্রেড মোস্ট পাওয়ারফুল ওমেনেও স্থান করে নিতে সক্ষম হন। তবে কয়েক বছর ধরে তার সম্পদের মূল্য কিছুটা নি¤œমুখী হয়ে যায়। এর অবশ্য কারণ আছে। তখন গোটা অস্ট্রেলিয়ায়ই খনি সেক্টরে পিছুটান দেখা দেয়। তার পরেও তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উজ্জ্বলই ছিল। এটাও বলে রাখা ভালো যে, ১৯৭৩ সালে মাত্র প্রায় ১৯ বছর বয়সে তিনি জনৈক ব্যবসায়ী গ্রে-মিলটনের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তার সাথে মিলে বা দায়িত্বে আসার অল্প কিছু দিনের মধ্যে কোম্পানিটি আবার আলো বা আশার মুখ দেখতে থাকে। তখন কোম্পানির অন্যান্য কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীরা তাকে বাহবা দিতে থাকেন এবং নানা কাজে তাকে সহযোগিতা করতে থাকেন। নানা বুদ্ধি পরামর্শও দিতে থাকেন। তা কাজে লাগিয়ে রিনেহার্ট এটাকে ক্রমে একটি ঈর্ষণীয় উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন। এতে ফের প্রচুর মানুষের প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া রুটি-রুজির পথ প্রশস্ত হতে থাকে। তা দেখে গিনা রিনেহার্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং খুশিতে আত্মহারা হন।
ব্যবসা নতুন করে চালাতে গিয়ে রিনেহার্ট অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ী বনে যান। ২০১৯ সালে তার সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ৫০ ধনীর প্রথম কাতারেও চলে আসেন তিনি। শুধু তাই নয়, বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তিদের নামের তালিকায়ও এসে যায় তার নাম। তিনি এখন বিশ্বে বহুল পরিচিত একজন সফল নারী। হ্যানকক প্রসপেক্টিংয়ের সম্পদ বেড়ে আগের তুলনায় ৩০০ গুণ বেশি হওয়ায় যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।
এ সংক্রান্ত কাজ করতে থাকেন উইটেনুন নামক স্থানে। ১৯৯৯ সালের দিকে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান স্টেট গভর্নমেন্ট রিনেহার্টের পরিবারের নামে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব অনুমোদন দেয়। প্রস্তাবিত কাজের স্থানটি (হ্যানকক রেঞ্জ) নিউম্যান শহরের উত্তর-পশ্চিমে ৬৫ কিলোমিটার (৪০ মাইল) দূরে অবস্থিত। এভাবেই পিলবারা নামক স্থানেও তাদের কাজের অবদানের বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পায়।
১৯৬০-এর দশক থেকে হেমারসলে আয়রন নামক প্রতিষ্ঠান (খনি কার্যক্রম) থেকে সুনামযোগ্য রয়েলটি বা শতকরা হিসেবে মূল্য আসতে থাকে। ল্যাং হ্যানককের কাজ হলো খনিতে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সম্পদ অনুসন্ধান বা আবিষ্কারের জন্য নেমে যাওয়া। এর আরো কাজ হলো এ সংক্রান্ত ইজারার বিষয়টি দেখভাল করা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিনেহার্ট হ্যানকক প্রসপেক্টিং-এর কম উন্নতি হওয়া বাদবাকি বিষয়গুলো তুলে ধরা, যাতে কাজের ক্ষেত্রে এগুলোও একটি ভালো গতি পায়। আরো উদ্দেশ্য হলো যাতে যৌথ মালিকানার মাধ্যমে লাভের অংশ বাড়ে। তাতে ইজারাগুলো অর্থ সঞ্চয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। এভাবে পরবর্তীতে হ্যানকক প্রসপেকটিংয়ের মধ্যস্থতায় হোপ ডাউনস নামক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৫০ শতাংশ শেয়ার আয়ে সক্ষম হয়। এটি তাদেরই রাইও টিনটো নাম প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হয়। যার ফলে বছরওয়ারি প্রায় ৩০ মিলিয়ন টন লোহা উৎপাদন সম্ভব হয়। আরেকটি যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান মিনারেল রিসোর্সেস লিমিটেডের মাধ্যমে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন টন লৌহ উৎপাদনে সক্ষম হয়। এর নাম ফেরুজিনাস ম্যাঙ্গানিজ। সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ডের দ্য আলফা কোল এবং কেভিনস কর্নার প্রকল্প উভয় মিলে প্রায় ৩০ মিলিয়ন টন কয়লা উৎপাদন করবে বলেও আশা করা হয়। এভাবে আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লোহা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। যেগুলো রিনেহার্টের হ্যানকক প্রসপেক্টিংয়ের উন্নতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। কিছু উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রফতানি করেও প্রচুর মুদ্রা অর্জন করে।
একপর্যায়ে গিনা রিনেহার্ট এসব ছাড়াও কৃষিসহ আরো অনেক খাতে ব্যবসা বাড়াতে থাকেন। বেশ কিছু গবাদিপশুর খামার গড়ে তোলেন তিনি। তিনি ফসিল ডাউনস স্টেশন নামক একটি স্থান পান যা রীতিমতো বাজারে স্থান পায়। এ রকম ঘটনা ১৩৩ বছরের মধ্যে এটাই প্রথম। এখানে প্রায় ১৫ হাজার গবাদিপশু রাখা যায়। তবে ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে এর মূল্য প্রকাশ হয় না। তবে এর মূল্য প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
খনিজসম্পদ আহরণ, ব্যবহার ইত্যাদি ক্ষেত্রে কাজ করতে গিয়ে পরিবেশের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সে দিকেও নজর দেন এ ধনকুবের। তিনি অস্ট্রেলিয়ানস ফর নর্দান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমিক ভিশন প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি এসব ব্যাপারে বইও লেখেন, যাতে তা পড়ে এসব ব্যাপারে মানুষ সচেতন হয়। ২০১২ সালের লেখা অস্ট্রেলিয়ান রিসোর্সেস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ম্যাগাজিনে বলেন, যদি কেউ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে চায় তবে তাকে সময় নষ্ট না করে কাজের মধ্যে লেগে থাকতে হবে। বিনোদন, খাওয়া দাওয়া, বিশ্রাম প্রভৃতি ক্ষেত্রে খুব কম সময় দিতে হবে। এমনকি কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোটার ওপর নির্ভর করাও ঠিক হবে না নারীদের। অর্থাৎ বেশি অর্থ বা সুবিধা পেতে হলে প্রচুর কাজ করতে হবে। তবে তিনি দুঃখের সাথে বলেন, কোম্পানি ব্যবস্থাপনায় নারীদের সংখ্যা বাড়লেও সবচেয়ে উপরের স্তরে এখন পর্যন্ত পুরুষদের আধিপত্যই বেশি। গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়েও ভাবা দরকার নারীদের।
জনহিতকর কাজেও তিনি সময় দেন। কম্বোডিয়ার মেয়েদের এতিমখানাগুলো পরিদর্শন করে এর নানা সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেন। এখানকার একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিছহা’র (ঝওঝঐঅ) প্রতিনিধিত্ব করছেন। এই প্রতিষ্ঠানটি মানবপাচারের বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে। এর কর্মীরা নারী ও শিশুদের যৌন সন্ত্রাসসংক্রান্ত বিষয়গুলো একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। মেয়েরা যাতে খেলাধুলা, বিশেষ করে সাঁতারে ভালো করতে পারে সে জন্যও নানা ধরনের কাজ করে থাকেন। ২০১২ সালে সুইমিং অস্ট্রেলিয়া চার বছরের জন্য একটি ১০ মিলিয়ন ডলার তহবিলের ব্যবস্থার কথা ঘোষণা দেয়। এর সাথে কাজ করছে হ্যানকক প্রসপেক্টিং এবং জর্জিনা হোপ ফাউন্ডেশন। পরে এর মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানো হয়, যাতে করে এ সংক্রান্ত কাজ আরো ভালো হয়। গিনা রিনেহার্ট বলেন, সমাজের হাল ঠিক রাখতে হলে সমস্যার সব জায়গায় হাত দিতে হবে।


আরো সংবাদ