২৩ অক্টোবর ২০১৯

কন্যা থাকুক নিরাপদে

-

নাবিলারা দুই বোন। গল্প করতে করতে নাবিলার মায়ের কথা, ‘যা দিন পড়েছে, বড় মেয়ে বিয়ে দিলে তার বাসায় কি ছোট মেয়েকে একা বেড়াতে যেতে দিতে পারব।’
রাফিয়ার বয়স ছয়-সাত বছর। কাছাকাছি ফুফুর বাসায়, তিন-চার বছর বয়সী ফুফাতো বোনের সাথে খেলতে আসে প্রায়। ড্রাইভার গাড়িতে করে রাফিয়াকে ফুফুর বাসায় নিয়ে আসে আবার নিয়ে যায়। ফুফু আনিসার কথা, ‘ভাবীর মাথায় ঢুকাতে পারি না যে, ড্রাইভারের সাথে ওকে পাঠানো ঠিক নয়। ভাবী তো ড্রাইভারকে গলা সমান বিশ্বাস করে, আমি কিন্তু আমার মেয়েকে এভাবে ড্রাইভারের সাথে পাঠাতাম না’।
মিনুর বিয়ে হলো বছর দেড় হবে। শ্বশুরবাড়ি যাবে মিনু, মিনুর শাশুড়ি মিনুর মাকে কল করে বারবার বলছে, মিনুর সাথে যেন সীমাকেও বেড়াতে যেতে দেয়। সীমা মিনুর ছোট বোন। মিনুর মায়ের এক কথা, ‘আমি যখন যাব বেড়াতে তখন সীমাকে নিয়ে যাব। কিছু মনে করবেন না বিয়াইন, আমি আমার মেয়েকে একা অন্য কারো সাথে কোথাও পাঠাই না। আমি নিজেই সাথে করে নিয়ে যাই’।
রসায়ন, গণিত আর পদার্থ বিষয় পড়াচ্ছেন পাশাপাশি স্যারেরা। অভিভাবকদের জন্যও স্যারদের সুন্দর ভাবনা। বসার জন্য জায়গা আছে, আছে মাথার ওপর ফ্যানও। বেশির ভাগ অভিভাবক হচ্ছেন মেয়ে সন্তানদের মা। মেয়েরা নবম-দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ে। প্রায় সব মায়েদের একই কথা, ‘রাস্তাঘাট নিরাপদ নয়, কোথাও মেয়েদের নিরাপত্তা নেই বলেই তারা সাথে আসেন, বসে থেকে পড়িয়ে নিয়ে যান’।
আনিসার বাবা বিদেশে থাকেন। বাসায় মা আর তিন ভাইবোন ওরা। সবাই স্কুল-কলেজে পড়ে। আনিসার মা অসুস্থ, বন্ধ হয়ে গেল আনিসার ভাইয়ের স্কুলে যাওয়া। কারণ সে ক্যান্টনমেন্ট এলাকার স্কুলের তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে। আনিসা স্কুল থেকে ছুটি নিয়েছে, কোনো রকম অন্যদের সাথে প্রাইভেটে আসে। আনিসার মা বিছানায় থেকে সারাক্ষণ এই অভিভাবক, ওই অভিভাবককে কল করে, ‘আনিসা পৌঁছেছে তো, ছুটি হয়েছে তো। ছুটি হলে ওকে একটা রিকশায় তুলে দেবেন’।
মাত্র পাঁচটি ঘটনা উপরে উল্লেখ করলাম, প্রতিটিই আমার আশপাশের। এমন হাজার-হাজার, লাখ-লাখ ঘটনা আমাদের দেশের, যার একমাত্র কারণ মেয়েসন্তানের নিরাপত্তা কোথাও নেই। শুধু কি মেয়েসন্তান, ৫০-৬০ বছরের নারীদেরও নেই নিরাপত্তা। বড় বোনের সাথে ছোট বোন যাবে কি যাবে না লিখতেই মনে পড়ে ২৬ বছর আগে আমি নববধূ হয়ে যাওয়ার সময় সাথে আমার খালাতো বোন গিয়েছিল। কিন্তু ২৬ বছর পর আমার বড় মেয়ের বিয়েতে ছোট মেয়েকে আমি ছাড়া যেতে দেবো না আগেই বলে দিয়েছি। আসলে বাধ্য হয়েছি বলতে। কারণ আমাদের চারপাশের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আমাদের এমন কঠোর হতে বাধ্য করেছে।
হেড অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড সার্ভিস কোয়ালিটি, ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের জারা মাহবুব বলেন, ‘আমার সুযোগ হয়েছে ব্র্যাকের মতো বড় একটি পরিসরে কাজ করার। এই বেসরকারি সংস্থা অনেক আগে থেকেই নারী অধিকার ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করে আসছে। শুধু সচেতনতা বা শিক্ষিত করার মধ্য দিয়েই নয়, কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও ব্র্যাক অনেকাংশে মেয়েদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। পুরো ব্যাংকিং সেক্টরে আট হাজার নারী কাজ করে, যার এক হাজার দুই শতাধিক শুধু আমাদের ব্যাংকেই। আমরা এ নিয়ে গর্ব করি এবং আমরা বিশ্বাস করি, এই স্বাবলম্বী নারীরা তাদের পরিবারেও অনন্য ভূমিকা রাখছেন। তবে দেশীয় পারিপার্শ্বিকতা ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব অনেকাংশেই আমাদের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তা না হলে এই অগ্রযাত্রার গতি আরো বেগবান হতো’।
একটা সময় ছিলÑ মেয়েরা একটু বড় হলে ওদের প্রতি নজর দেয়ার দরকার ছিল। কিন্তু এখন বড় বা ছোট নয়, শিশু কিংবা কিশোরী নয়, ঘরে বা বাইরে নয়, প্রতিটা বয়সে, প্রতিটা ক্ষেত্রে সব জায়গায় মেয়েসন্তানের নিরাপত্তা জরুরি হয়ে গেছে। আমি কারো সাথেই সন্তানদের কোথাও যেতে না দিতে চাইলে প্রথমদিকে শাশুড়ি কিংবা স্বামীর প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। কথা শুনতে হয়েছে অনেক। আমি বুঝিয়ে বলেছি, ‘ধরুন একটা বাসায় বেড়াতে গেলেন ওকে নিয়ে, আপনি গল্পে ঢুকে গেলেন। মেয়েটা খেলতে খেলতে পাশের রুমে গেল, পাশের রুমটা ওর জন্য কতটুকু নিরাপদ তা কি আপনি জানেন? আপনার জায়গায় আমি হলে আমি গল্পের চেয়ে সন্তানের প্রতি নজর দেবো বেশি, আমি ওর সাথে পাশের রুমেই চলে যাব। আমি বলছি না সবাইকে অবিশ্বাস করি, কিন্তু আমি সচেতন থাকি। মেয়ে সন্তানের জন্য একটু বেশিই সচেতন হতে হবে।’
ইতুরা যৌথ পরিবারে থাকে, পরিবারে বাবা ছাড়াও অন্য পুরুষ সদস্য রয়েছে। একই পরিবারে থেকে কাকে বিশ্বাস কাকে অবিশ্বাস করবেন, তবে সচেতন হতে হবে আপনাকে। আপনার ছোট মেয়েসন্তানকে দেখে যদি কোনো পুরুষ গায়ে পড়ে আদর করতে আসে, সহজে তাতে সায় দেবেন না। কারণ, এই গায়ে পড়া আদরের আড়ালে কোনো খারাপ উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। বাংলাদেশে ধর্ষণের হাত থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই বলে মনে করছেন ঢাকায় জাতিসঙ্ঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শাবনাজ জাহিরিন। তিনি বলেন, ‘ধর্ষণ রোধ করে শিশুদের নিরাপদ রাখার জন্য যে ধরনের অবকাঠামো, লোকবল বা সেবা দরকার, সেগুলো এখনো অনেক কম।’
সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ করে কমিউনিটি লেভেলে যে ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজন আছে, সেগুলো এখনো কার্যকর নয়। এ বিষয়ে শাবনাজ জাহিরিন আরো বলেন, ‘কিছু সার্ভিস আছে বা লোকজন আছে। কিন্তু শিশুদের বিষয় বা এ ধরনের ঘটনাকে কেউই সেভাবে আমলে নেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামাজিক কল্যাণ কার্যক্রমের পক্ষ থেকে সোস্যাল ওয়ার্কারদের থাকার কথা, কমিউনিটি লেভেলে এবং প্রবেশন অফিসার যার একটা বিশেষ দায়িত্ব আছে, অনেক জায়গায়ই তারা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এরা ভালোভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয় এবং শিশুদের বিষয়গুলো যেভাবে দেখা উচিত বা কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম থাকা উচিত, সেগুলো এখনো ওইভাবে আমাদের দেশে গড়ে উঠেনি।’ (তথ্য সূত্র : বিবিসি নিউজ বাংলা ৮ জুলাই ২০১৯)
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন এই ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুদের হত্যা এবং নির্যাতনের সংখ্যা আশঙ্কাজনক। এই ছয় মাসে ৮৯৫ শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১০৪ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, ৪০ শিশু আত্মহত্যা করেছে, নিখোঁজের পর এক শিশু এবং বিভিন্ন সময়ে ১৭ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয়েছে ৪১ শিশুর। এই হিসাবকে কি আমরা মহামারী ধরতে পারি না। ছয় মাসে ৮৯৫ শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হত্যার শিকার। এই সংখ্যা আর কত হারে বাড়লে টনক নড়বে জানি না।
মেয়ে সন্তানের প্রতি অধিক সচেতন হতে করণীয়Ñ
আপনি বেড়াতে গেছেন, গল্পে মশগুল। একটু খোঁজ নিন আপনার সন্তান পাশের রুমে কার সাথে গল্প করছে, কার সাথে খেলা করছে। বিশ্বাস করে ওকে ঘুরতে পাঠালেন, কার সাথে পাঠালেন ভাবুন। গ্যারেজে আপনার সন্তান খেলতে যাবে, আপনিও সাথে যান। সিঁড়ি ঘর আপনার সন্তানের জন্য সবচেয়ে অনিরাপদ। লিফটে শিশু নিচে যাচ্ছে, ভাবছেন নিচেই তো যাবে; সামান্য সময়। না আপনি সাথে যান। বিভিন্ন বয়সে সন্তানের শরীরের পরিবর্তন আসে, আসার আগেই ওকে সে বিষয়ে জানান। সন্তানকে আপনার বন্ধু বানান, তাহলে ও সব কথা শেয়ার করবে। সন্তান ঘরে বন্ধু পেলে বাইরে বন্ধু বানাতে চাইবে না। আশপাশের ফ্লাটে কিছু পাঠাবেন, নিজে যান, সন্তানকে নয়। সন্তানের সাজ গোঁজের অভ্যাস থাকলে তাকে নিজেই কিনে দিন। সন্তানের কথায় বা আচরণে চেঞ্জ দেখলে ওকে সময় দিন। ও কোন কথা বলতে চায়, বলতে পারে না এমন হলে শান্ত মাথায় তা শুনুন। হঠাৎ করে সে মোবাইল আবদার করলে তাকে বুঝিয়ে বলুন। হঠাৎ কারো প্রতি কোনো পুরুষ রিলেটিভের প্রতি ওর ভালো আচরণ দেখলেও আপনি সতর্ক হোন।

 


আরো সংবাদ