২৩ অক্টোবর ২০১৯

এ পৃথিবীতে মাঝবয়সী নারীরা একেবারেই একা নয় : লুসি এলমান

ভিন দেশ
-


লুসি এলমান। তিনি একজন আইরিশ লেখক। জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের ইলিয়নে। তবে মা-বাবার সাথে পাড়ি জমিয়েছেন (ছোট্ট বেলায়) ইংল্যান্ডে। এখন বসবাস করছেন স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ নামক স্থানে। সম্প্রতি লুসি এলমান এমন এক ধরনের অবাক করা একটি উপন্যাস লিখেছেন, যার কারণে বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে রীতিমতো তোলপাড় ও তুমুল হইচই দেখা দিয়েছে। আস্ত ও বিশাল একটি উপন্যাস লিখেছেন চার লাখ ২৬ হাজার ১০০ শব্দের মাধ্যমে। অবাক করা ও মজার বিষয় হচ্ছে, এক হাজার ২০ পৃষ্ঠার এ উপন্যাসটিতে ব্যবহার করা হয়েছে একটি মাত্র বাক্য। উপন্যাসটির নাম ডাকস, নিউবারি পোর্ট। তার উপন্যাসটি সাহিত্য বা পাঠক জগতে এমনভাবে সাড়া ফেলেছে, তা সম্প্রতি স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে ম্যান বুকার পুরস্কার ২০১৯-এর চূড়ান্ত সংক্ষিপ্ত তালিকায়। এমনও হতে পারে, এ বছরের ম্যান বুকার পুরস্কার উঠবে লুসি এলমানের হাতেই। ম্যান বুকার পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে আগামী ১৪ অক্টোবর (২০১৯)। দ্য বুকার প্রাইজ ফাউন্ডেশন এ তালিকা প্রকাশ করেছে বুকার পুরস্কারের দাফতরিক ওয়েবসাইটে, গত ৩ সেপ্টেম্বর। ছয়টি উপন্যাস স্থান পেয়েছে এবারের তালিকায়। এরই মধ্যে বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন শুরু হয়েছে তালিকায় স্থান পাওয়া মার্গারেট অ্যাটউডের উপন্যাস দ্য ‘টেস্টামেন্টস’। অ্যাটউডসহ আরো একজন লেখক অতীতে ম্যান বুকার পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০০ সালে অ্যাটউড ম্যান বুকার পেয়েছেন তার বিখ্যাত ‘দ্য ব্লাইন্ড অ্যাসাসিন’-এর জন্য। এর আগে এলমান বেশ ক’টি উপন্যাস লিখেছেন। কয়েকটি পুরস্কারও পেয়েছেন। ১৯৮৮ সালে প্রথম উপন্যাস সুইট ডেজার্টস বা মিষ্টি মিষ্টি লিখে পান গার্ডিয়ান ফিকশন পুরস্কার। দ্য গার্ডিয়ান নামক সংবাদপত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সাহিত্য পুরস্কার ছিল গার্ডিয়ান ফিকশন পুরস্কার। ১৯৯১ সালে দ্বিতীয় পুরস্কার ভ্যারিং ডিগ্রিস অব হোপলেসনেস বা হতাশার ডিগ্রি পরিবর্তনের। তা ছিল জেমস টেইট ব্ল্যাক মেমোরিয়াল পুরস্কারের তালিকায়। তৃতীয় উপন্যাস ‘ম্যান অর ম্যাঙ্গো’ বা মানুষ নাকি আম? একটি বিলাপ বা হতাশা (১৯৯৯), এটিও ছিল ব্ল্যাক মেমোরিয়াল পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। ২০০৩ সালে লেখেন ‘ডট ইন’ দ্য ইউনিভার্স বা ইউনিভার্সে বিন্দু। তা স্থান পায় বিলিভার বুক পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। ২০০৬ সালে লেখেন চিকিৎসক এবং নার্স। ২০১৩ সালে রচনা করেন মিমি। ১৯৯৫ সালে চিত্রনাট্য ‘গুপ্তচর’ যিনি একটি শীত ধরা পড়েছিলেন দ্য স্পাই হু কট এ কোল্ড। আর এবার লিখলেন হাঁস, নিউবারি পোর্ট। এলমানকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে রয়্যাল লিটারারি ফান্ড সম্মান। দেয়া হয় ফেলোশিপও। তিনি কেন্ট ইউনিভার্সিটিতে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে বক্তৃতা দেন, সেমিনার করেন সেপ্টেম্বর ২০০৯ থেকে জুলাই ২০১০ সালে। তার মায়ের নাম মেরি এলমান। মেরি এলমান নারীবাদী সাহিত্য সমালোচক। বাবা রিচার্ড এলমান। যিনি আমেরিকান জীবনীর পাশাপাশি সাহিত্য সমালোচক হিসেবে পরিচিতি পান। লুসি এলমানের স্বামীর নাম টড ম্যাকউইন। ম্যাকউইন একজন নামকরা লেখক। লুসি ১৯৮০ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় (ইংল্যান্ডের এসেক্সের একটি পাবলিক রিসার্চ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে। আর ১৯৮১ সালে এমএ করেন কোর্টল্ড আর্ট ইনস্টিটিউট অব আর্ট (লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্বশাসিত কলেজ) থেকে। তার নিজস্ব ভাষা ইংরেজি।
এরই মধ্যে বুকার পুরস্কারের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এলমানের ডাকস, নিউ বারি পোর্ট উপন্যাসটি সময়োপযোগী হয়েছে, এক কথায় অসাধারণ। এর মধ্যে নতুনত্ব আছে। সামাজিক নানা সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। অনেকে বলেছেন, উপন্যাসটি পড়তে পড়তে প্রায় শেষপর্যায়ে চলে এলেও খুঁজে পাওয়া যাবে না এর কোনো নির্দিষ্টতা। তারপরও শেষ না করে উঠতে ইচ্ছে হবে না।
অর্থাৎ পাঠকদের মনকে ভালোই মজাতে বা জমাতে পেরেছেন লুসি এলমান। আর এ কৌশলকেই বিশেষজ্ঞরা লেখার ম্যাজিক বলেছেন। আইরিশ টাইমস পত্রিকা মন্তব্য করেছে, লুসির নিউ বারি পোর্টে সবই আছে। আছে কল্পনা, বুদ্ধি, শ্বাসরুদ্ধকর ইত্যাদি অনুভূমির এক দারুণ সমন্বয় বা মিশ্রণ। বলা যেতে পারে, চলতি শতাব্দীর প্রথম কাতারের বা অসামান্য গ্রন্থগুলোর অন্যতম এ উপন্যাস। মূলত মাঝবয়সী এক নারীকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত হয়েছে উপন্যাসটি। এখানে বলা হয়েছে তার জীবনের কাহিনী। এতে আছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। মধ্যবয়সী এই নারী দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত। তার ওপরে আবার দ্বিতীয় বিয়ের জীবন। তার প্রথম স্বামী সম্বন্ধে কিছু না বলা হলেও বর্তমান স্বামী (লিও) সম্বন্ধে অনেক কথাই আছে। চার সন্তান রয়েছে এ দম্পতির। তার স্বামী ওহাইওর এক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক (প্রকৌশলের)। মাঝবয়সী চরিত্রটির চিন্তায় কেবলই স্বামী-সন্তান ছাড়াও আছে মুরগি ও পোষা বিড়াল। এ নারী রান্নার কাজ করেন ওহাইওর এক রেস্টুরেন্টে। তা থেকে যা আয় হয় তা দিয়েই চালান নিজ সংসার।
এখানে যে কেবল ভালোবাসারই গল্প রয়েছে তা নয়, আরো রয়েছে মার্কিন জটিল সমাজতত্ত্ব, বিষণœতা বিচ্ছেদ, নাগরিকদের হতাশা-উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ইত্যাদি। আরো দেখানো হয়েছে সমাজের সব ক্ষেত্রে মৃত্যুর ভয়াল জাল। অথচ প্রকাশ্যে নির্বিঘেœ বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায় অপরাধী বা হোতারা। অর্থাৎ দেখানো হয়েছে আমেরিকার অজানা অনিশ্চিত দিনগুলোর কথাও। আর এগুলোর সবই দেখানো হয়েছে ওই গৃহবধূর চোখ দিয়ে। অনেকে বলেছেন, এলমান এসব ভারসাম্যহীনতা দেখিয়েছেন নিপুণভাবে। পাশাপাশি রয়েছে এক পাহাড়ি সিংহের গল্প। তাই বলা হয়েছে, এ উপন্যাস মানে একটি বিপ্লবও। লুসি এলমান বিপ্লবী না হলেও তার লেখনীতে রয়েছে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা দিকের কথা।
লুসি এলমান বলেন, নানা কারণে হাতের নাগালে বই না থাকলেও নানা গল্প ঘুরপাক খেতে থাকে আমার মনের মাঝে। আমার লেখনীকে প্রভাবিত করছে অনেক বই। পড়লে তো অনেক কিছু সম্বন্ধে জানা যায়। হাঁস, নিউ বারি পোর্ট প্রকাশনার তারিখ ৪ জুলাই, ২০১৯। উপন্যাসটির বর্ণনাকারী যে নামহীন নারী, তিনি এক সময় ছিলেন কলেজশিক্ষক। অসুস্থতা এবং সাংসারিক চাপে তাকে শিক্ষাজীবন ছেড়ে দিতে হয়। একটি ঘটনায় বর্ণনাকারীর মা তার এক বোনকে নিউ বারি পোর্টের একটি হ্রদে ডুবিয়ে বাঁচাতে সক্ষম হন, যখন তিনি তাড়া করতে গিয়েছিলেন হাঁসের পেছনে। উপন্যাসের ধারাগুলোতে কেবলই ব্যবহার করা হয়েছে কমা, আধা-কোলন।
পাঠকেরা এত বড় উপন্যাস পড়বে কি না তা চিন্তা করেননি লুসি এলমান। এলমান বলেন, বই হচ্ছে এমন একটি মাধ্যম, যার দ্বারা অতি সহজেই মনের ভাব প্রকাশ করা যায়। সামাজিক নানা ঘটনা, মতামত ইত্যাদিও প্রকাশ করা সম্ভব। ভালো লেখা পাঠকের সমালোচনা (গঠনমূলকও হতে পারে), অনুভূতি ইত্যাদিকে সম্প্রসারিত করে। লেখালেখির জগতে এসব বিষয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরো বলেন, আমি লেখালেখিতে ভালোই সময় দিই। সব বাস্তব বা যথার্থ লেখাকে সাহিত্য বলা যায় এবং এজন্য আমাদের প্রচুর সময় দিতে হবে। আমার (এলমানের) বাবা বলেছেন, কোনো কিছু লেখার সময়ে এ সংক্রান্ত কোনো সমস্যায় পড়লে ভাববে, তুমি কোনো ফলাফলের দিকে এগোচ্ছ। তা সঠিক হোক বা না হোক, এ উপদেশ আমাকে কাজে দিয়েছে। লেখার বাহ্যিক সৌন্দর্য যেন কোনো বাড়তি পাওনা। অনেক সময় তা মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়। সুতরাং আমাদের মনের মধ্যে তাকাতে হবে। আমাদের সমাজ অনেক সময় নারী লেখকদের বিরক্তির সুরে দেখে। তবে আমি পাঠকদের পছন্দ করি। আমার লেখা বা উপন্যাস পরীক্ষা করা বা অনুসন্ধানের বিষয় নয়। আমি দেখাতে চেয়েছি, কিভাবে একটি স্তর তার দুই পা দিয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এখনকার পাঠকেরা সৃজনশীলতায় বেশ ভালো।
লুসি এলমান বিভিন্ন বইয়ের গঠনমূলক সমালোচনা করেন। মন্তব্য বা সমালোচনা করেন দ্য গার্ডিয়ানস, দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট, দ্য টেলিগ্রাফ, দ্য টিএলএস, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিও, দ্য বাফলার, বুক ফোরাম, দ্য গ্লাসগো হেরাল্ড, দ্য স্কটিশ রিভিউ অব বুকস, দ্য এভারগ্রিন, দ্য স্পেকটেটর, দ্য নিউ স্টেটসম্যান অ্যান্ড সোসাইটিসহ আরো অনেক ধরনের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে।
এলমান আরভন ফাউন্ডেশনে শিক্ষকতা করেন এবং কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে তিন বছর প্রভাষকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বলেন, আমি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখি এ পৃথিবীতে মাঝবয়সী নারীরা একেবারেই একা নয়। কেননা আমরা একজন আরেকজনকে সদয় দৃষ্টিতে দেখি। ডাকস, নিউ বারি পোর্ট মৃত্যুর কথা বলে না; উদ্ধার বা মুক্তির কথা বলে।


আরো সংবাদ