১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

নিজের জন্য সময় কোথায়

-

সকাল সাড়ে ৫টা, ৬টা, সাড়ে ৬টা, ৭টা, কখনো আবার সাড়ে ৭টায় ঘড়িতে অ্যালার্ম দেয়া থাকে ঘুম থেকে ওঠার জন্য। সকালে এই পরিবার থেকে সবার আগে যে সদস্য বের হবে তার সময় অনুযায়ী অ্যালার্ম দেয়া হয়। খুব কম হলেও যাত্রার ৩০ মিনিট আগে উঠতে হয়। নাশতা রেডি করে খাইয়ে দিয়ে যাত্রা শুরু। শুধু পরিবারের কেউ নয়, কোনো আত্মীয়স্বজন ভোরে বাস বা ট্রেন ধরবেÑ তখনো একইভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছি ২৫-২৬ বছর। শুধু ভোরে নয়, রাতেও তাই। সর্বশেষ কে আসবে বা কে খাবে, সে পর্যন্ত অপেক্ষা আমারই। এই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়েছে কি না তা ভাবতে হলে বহু সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু ভাবনার সেই সময় নেই। সংসারের বাজার, সন্তানের স্কুল-প্রাইভেট বা কোচিং সব দায়িত্ব আমারই। কারণ সন্তানের বাবা চাকরি করে টাকা রোজগার করেন, আর আমি গৃহবধূ। গৃহবধূদের নিজের জন্য কি কোনো সময় বরাদ্দ থাকে বা তারা রাখে? কথাগুলো মিসেস আসমার।
তিনি আরো বলেন, স্কুল-কলেজ সপ্তাহে দুই দিন বন্ধ। সরকারি অফিসও দুই দিন বন্ধ। তাই বৃহস্পতিবার এলেই সবাই আনন্দ করে এই বলেÑ আগামীকাল শুক্রবার, পরের দিন শনিবার। কিন্তু আমার রুটিনের কোনো চেঞ্জ নেই। এমনটি শুধু আমার নয়, আমাদের শহর-গ্রামে মফস্বলের প্রায় সব গৃহিণীর। ঘর-সংসারের জন্যই তাদের পুরোটা সময়, নিজের বলে কোনো সময় নেই। অবশ্য এখন আমার রুটিনের কিছুটা পরিবর্তন। কারণ ঘর-সংসারের সব কাজ সেরে আমি লেখাপড়া করতে বসি। আর যখনই পড়ালেখা করতে বসি মনে হয় এই সময়টা শুধু আমার নিজের, একেবারেই নিজের জন্য। এমনটি আগে বুঝতাম না। যখন দেখি অনবরত কয়েক দিন সংসারের পেছনেই সময় কাটে, তখনই মনে হয়Ñ আহা নিজের জন্য কিছুই করতে পারি না।
কথা প্রসঙ্গে লিজার আম্মু বলেন, আগে তিনি নিয়মিত চা খেতেন। কিন্তু যে পরিবারে বিয়ে হয়েছে, এই পরিবারে চা খাওয়ার নিয়ম নেই। এখন তিনিও আর চা খান না। ঠিক বিপরীত কথা সাহিদার আম্মুর। চা খাওয়ার নেশা ছিল না, কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে এসে চা করতে করতে অভ্যাস হয়ে যায় চা খাওয়ার। শুধু চা বিষয়ে নয়, পরিবারের অনেক বিষয়েই কথা হয়। একই কথাÑ তাদের নিজস্ব যেমন কোনো সময়ই নেই তেমনি নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছারও মূল্য নেই। আর সময় খুঁজেও পান না।
তেজগাঁও এলাকার দুই স্কুলে পড়ে নাদিরা বেগমের দুই সন্তান। একজন মর্নিং শিপটে আরেকজন ডে শিপটে। ওনার বাসা মিরপুর। কোচিং সেন্টারের রুমেই কথা হয় তার সাথে। দুই সন্তান তার, স্বামী দেশের বাইরে থাকেন। সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে বড় সন্তানের স্কুল শুরু। তাই সাড়ে ৬টায় দুই সন্তানকে নিয়েই বের হন। বড় সন্তানের ছুটি ১২টায়, ছোট সন্তানের শুরু সাড়ে ১২টায় আর ছুটি সাড়ে ৪টায়। সকালের দিকে ছোটকে প্রাইভেট পড়ান, বিকেলে বড়টাকে। অতঃপর সাড়ে ৪টায় স্কুল ছুটির পর বাসার পথে রওনা। কখনো সাড়ে ৫টায় কখনো ৬টায় বাসায় পৌঁছেন। দুপুরের দিকে তিনজনের খাওয়া বাইরে অথবা বাসা থেকে কিছু নিয়ে এলে। তবে নিয়ে আসা যায় না এত সকালে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে সন্তানেরা খেয়ে ঘুমায় বা রেস্ট নেয়। নাদিরার শুরু হয় ঘর-সংসারের কাজ, রান্না। কারণ, পরের দিন এই সন্ধ্যার পর তিনি আবার রান্নাঘরে আসবেন। সব করে রাত প্রায় সাড়ে ১১টা ১২টায় বিছানায়। সকাল সাড়ে ৫টায় আবার উঠতে হবে। কারণ, সাড়ে ৬টায় স্কুলের পথে রওনা দেবেন। দুই স্কুলেই আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন ওদের একই শিফটে আনার জন্য, কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। সরকারি স্কুল সাপ্তাহিক বন্ধ এক দিন। সেদিন তো কাজের শেষ নেই। ঘরে-বাইরে হাটবাজার আর আত্মীয়স্বজনেরও কিছু দায়িত্ব পালন। সব করে নিজের জন্য কোনো সময় নেই।
গৃহিণীদের পাশাপাশি চাকরিজীবী নারীদের অনেকের একই অবস্থা। চাকরিজীবী নারীদের বেশির ভাগের বাসা ভাড়া নেয়া হয় অফিসের কাছে। অফিসের কাজের ফাঁকে সন্তানের দায়িত্ব তাকে পালন করতে হয়। দ্রুত কাজ সেরে কিছু সময়ের জন্য অন্যকে দায়িত্ব দিয়ে দৌড়ান সন্তানের স্কুলে। ওকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আবার অফিসে। কিন্তু মিথিলার বিষয় একেবারেই আলাদা। খামারবাড়িতে জব করতেন তিনি। হাজার হাজার প্রতিযোগীর সাথে চাকরির লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পান। দুই সন্তান হয়। ওদের স্কুলে দেন। বহু দৌড়িয়েছেন সন্তানদের পেছনে চাকরি করেও। সন্তানেরা তেজগাঁও এলাকার স্কুলে, বাসা মনিপুরী পাড়ায়। প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে ওদের স্কুলে দিতেন। স্কুল ছুটির সময় ৩০ মিনিটের ছুটি নিয়ে স্কুল থেকে ওদের বাসায় নিতেন। এক সময় দু’জনের স্কুল আলাদা হয়, তখন আর সম্ভব হয় না দুই বেলা অফিস থেকে বের হওয়া। মিথিলার স্বামী বেসরকারি চাকরি করেন। মিথিলার চেয়ে বেশি বেতন পান, যা দিয়ে সংসার চালানো যাবে। মিথিলার সরকারি চাকরি হলেও বেতন কম। বাধ্য হয়ে সন্তানদের কথা চিন্তা করে নিজের যোগ্যতায় পাওয়া চাকরি ছাড়তে হয়। মিথিলার এখন সময় কাটে স্কুল, বাসা আর সন্তানদের নিয়ে বিভিন্ন স্যারের কাছে নিয়ে যাওয়া-আসা করে। নিজের জন্য সময় কখন জিজ্ঞেস করায় হেসেই জবাব দিলেন, ‘নিজের আবার ব্যক্তিগত সময়, ভাবার সময় কই?’
শাহীন কলেজে পড়ে বিন্দু। সকালে ওর আম্মু রাহেলা বেগম কলেজে দিয়ে যান। ছুটির সময় মেয়ের জন্য খাবার নিয়ে আসেন। বিন্দুকে খাইয়ে গণিত স্যারের কাছে আসেন। সেখান থেকে অন্য স্যারের কাছে যান। সন্ধ্যার আগে ফেরেন বাসায়। এরপর পরিবারের অন্য কাজ। একজন মানুষের নিজের জন্য কিছু সময় থাকা দরকার বা রাখা উচিত, তা রাহেলা বেগমের মাথায় আসেনি কখনো। পাশে বসা তেজগাঁও কলেজের আয়েশার আম্মু। তিনি বলেন, সপ্তাহের পাঁচ দিন দুপুরে বাসায় খাওয়াই যায় না, অথচ তিনি গৃহিণী।
বর্তমান সময়ে কর্মজীবী নারীদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তবুও নারী বা পুরুষের রুটিনে অনেক ব্যবধান। সন্তানের অসুস্থতা বা পরিবারের যেকোনো প্রয়োজনে নারীকেই ছুটি নিতে হয়। সারা দিন অফিস সেরে বাসায় এসে ঘর-সংসারের কাজেই ব্যস্ত হতে হয়। অন্য দিকে পরিবারের খুব কম পুরুষ আছেন, যারা অফিস থেকে ফিরে সংসারের কাজে সাহায্য করেন। তাদের সময় কাটে আড্ডা দিয়ে, টিভির রিমোট হাতে কিংবা মোবাইল হাতে করে। ব্যক্তিগত জীবন বলতে কোনো মানুষ বা ব্যক্তির জীবনের যে অংশটিকে বোঝায়, যেটি তার জন্য একান্তভাবেই অন্তরঙ্গ এবং যেটি তার নিজস্ব সত্তা এবং স্বাধীন ইচ্ছা-অনিচ্ছার সাথে সম্পর্কিত। অথচ নারী সে চাকরিজীবী হোক কিংবা গৃহিণীÑ তার ব্যস্ততা অনেক। পরিবারের সবার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করেন তিনি। অথচ নিজের জন্য থাকে না কোনো সময়। একটু যে বিশ্রাম নেবেন কিংবা শখের একটা কাজ করবেন তা আর হয়ে ওঠে না। তাই সারা দিন পর হিসাবের খাতা খুললে দেখা যাবে, নিজের জন্য একটু সময়ও বরাদ্দ ছিল না। এক গবেষণায় বলা হয়, ৮৫ শতাংশ মানুষই মানসিক সমস্যায় ভোগেন। তাই বলে তারা মানসিক রোগী কিংবা পাগল নন। তবে এই ৮৫ শতাংশের মাঝে নারীদের সংখ্যা বেশি। তার প্রধান কারণ নারীদের নিজস্ব কোনো জগৎ নেই, নিজের জন্য বরাদ্দ করা কোনো সময় নেই; যে সময় তিনি মুক্তমনা হয়ে কল্পনার জগতে ঘুরে বেড়াবেনÑ নিজেকে নিয়ে ভাববেন।

 


আরো সংবাদ